পাড়ি

শনিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৫

পাড়ি

পাড়ি
সাইফুল ইসলাম

 


Litearture 01বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে ঘরবাড়ি। বসে বসে যারা ঝিমুচ্ছিল বা ঘুমিয়ে পড়েছিল, এক ঝাঁকুনিতে জেগে ওঠে তারা। অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ায় একে অপরকে। মনে হয় ভারী কোনো বোমা ফেটেছে কোথাও। ঠাওর করার চেষ্টা করে কোথায় ফেটেছে বোমাটি। ঘর থেকে বের হয় সলিমুদ্দিন। বাড়ির ঢালে লাউয়ের মাচার নিচে যায় সে। শামসুল, মুন্নাফসহ সাত-আটজন সেখানে বসে আছে। সলিমুদ্দিন জিজ্ঞেস করে ওদের- কী অইছে রে?

– কিছুই বুঝতে পারতাছি না। আশুগঞ্জের দিগে ঝিলিক দিয়া উঠল, তারপর বিকট শব্দ।

– পাকিস্তানিরা কিছু করল নি?

– না, হে ক্ষ্যামতা আর নাই তারার। আখাউড়ায় যে প্যাদানি খাইছে ইন্ডিয়ান আর্মির আতে, তাতে মাজার হাড্ডি এতক্ষণ ভাইঙ্গা গেছে।

– দুই একদিনের মধ্যেই নি ইন্ডিয়ান আর্মি চইল্যা আইব এই এলাকায়।

– আমার এক কতা মনে অয়।

– কী মনে অয়রে?

– দেহোস নাই, ভূত-পেত্নিরা চইলা যাওয়ার সময় গাছের ডাল, ঘরের বেড়া ভাইঙ্গা থুইয়া যায়?

– হ্যাঁ, দেখছি তো।

হেরাও হেই রহম জানান দিয়া যাইত্যাছে।

– অইতে পারে কিন্তু।

– এই ল, আশুগঞ্জে যাই।

– অক্ষণ?

– হ্যাঁ। ল দেইহা আসি, পাকিস্তানিরা গেছে গা না আছে।

– নু যাই।

সবাই দল বেঁধে রওনা হয় আশুগঞ্জের দিকে।

ততক্ষণে ফর্সা হতে শুরু করেছে পুবের আকাশ। দেখা যায়, আশুগঞ্জ রেলসেতুর একটি অংশ ভেঙে কাত হয়ে আছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে পাকিস্তানিরা চলে গেছে, আর যাওয়ার সময় ভেঙে দিয়ে গেছে সেতুটি। তার শব্দেই কেঁপে উঠেছিল এলাকা। পাকিস্তানিরা চলে গেছে এ ভাবনা সলিমুদ্দিনদের চলায় বলায় একটা ছন্দ এনে দেয়, যে ছন্দ স্বাধীন দেশে নিশ্বাস নিলে এসে পড়ে স্বাভাবিক নিয়মেই।

সলিমুদ্দিনদের মতোই বিভিন্ন গ্রামের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তাদের সাত-আটজনের দল হয়ে ওঠে হাজারো জনতার মিছিল। নেতাহীন সুশৃঙ্খল সে মিছিলে স্লোগান ওঠে- জয় বাংলা, জয় মুক্তিবাহিনীর জয়, জয় মিত্র বাহিনীর জয়। মিছিল থেকে কেউ কেউ ভাঙা সেতু, ইউনিয়ন অফিস, পুলিশফাঁড়ি, পাটের কুঠি, চালের আড়ত দেখতে যায়। কিন্তু তাতেও ছোট হয় না মিছিল। আসে নতুন নতুন মানুষ। যারা মিছিল ছেড়ে যায়, তারাও ফিরে আসে মিছিলেই। মিছিলই হয়ে ওঠে সবার ঠিকানা।

সলিমুদ্দিনরাও একসময় মিছিল থেকে বের হয়। ততক্ষণে যাদের বাড়িঘর, দোকানপাট পুড়িয়ে দিয়েছে তারা ফিরে এসেছে, গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে সবকিছু। রাস্তার পাশে বসেছে চিঁড়া, গুড়, মুড়ি-মুড়কির দোকান। নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে আট আনার মুড়ি-মুড়কি কেনে। তা ভাগ করে যার যার কোচায় ভরে নেয়। তা খায় আর ঘুরে ঘুরে দেখে পাটের গুদাম, ধানের আড়ত, নৌকার ঘাট।

ততক্ষণে ইউনিয়ন অফিস, পুলিশফাঁড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। ওরা ফাঁড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। দেখে রাইফেল কাঁধে হাফ শার্ট-লুঙ্গি পরে খালি পায়ে পাহারা দিচ্ছে এক মুক্তিযোদ্ধা। কে আগে ঢুকবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলি হয় কিছুক্ষণ, একসময় ফাঁড়িতে ঢুকে পড়ে সবাই। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাকে জিজ্ঞেস করে- ফাঁড়ির দারোগা আছে নি?

– পাকিস্তানি দারোগা তো পালাইছে। অক্ষণ আমরার কমান্ডারই দারোগা। কী কোনো কাম আছে নি?

– না এম্নি, কথা কইতাম।

– যান ভিতরে, যা কওয়ার তাইনেরে কন।

ওরা ভিতরে গিয়ে চেয়ারে বসা মুক্তিযোদ্ধা ইকবালকে সালাম জানায়। সে জিজ্ঞেস করে- কী কোনো কাম আছে নি ফাঁড়িত?

– না তেমুন কোনো কাম নাই, এক রাজাকারের বিরুদ্ধে নালিশ দিতাম। হে আমরার গ্রাম পোড়ায় দিছে।

– ঠিক আছে, ওই যে মুক্তিযোদ্ধা আকতার অখন ফাঁড়ির কেরানির কাম করতাছে। তার কাছে যায়া নালিশ লেইহা দেন। আর দুই একটারে পাইলে ধইরা দিয়েন। মাইরা ফালাইয়েন না জানি।

– ঠিক আছে। মুক্তিযোদ্ধা কেরানির কাছে নালিশ দিয়ে ফাঁড়ি থেকে বের হয় ওরা।

এভাবেই বেলা বাড়ে। পেট জানান দেয় বেলা বাড়ার কথা। বাড়ি ফিরে যাবে নাকি বিজয়ের উৎসবেই মেতে থাকবে এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হয় কিছুক্ষণ। এ সময়েই শোরগোল শোনা যায়, বিশাল দলবল নিয়ে আশুগঞ্জ পৌঁছে গেছে মিত্রবাহিনী। সঙ্গে নিয়ে এসেছে লম্বা নলের কামানওয়ালা ট্যাংক। তারা যাবে ঢাকা ঘেরাও করতে। শোরগোল শুনে বাড়ি ফেরা হয় না কারো, সবাই ছোটে মেঘনা নদীর দিকে।

মেঘনার পাড়ে ঢাকার দিকে কামান তাক করে দাঁড়িয়ে আছে অন্তত কুড়িটি ট্যাংক। তার পাশে চারটি জিপগাড়ি। জিপের বনেটের উপরে ম্যাপ বিছিয়ে কী যেন আলোচনা করছে মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে শত শত মানুষ। কেউ কেউ ভিড়ের মধ্যে যেতে না পেরে গাছের ডালে বা উঁচু কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। ভিড় ঠেলে কাছে চলে যায় সলিমুদ্দিনরা। মিত্রবাহিনীর এক শিখ অফিসার তখন আলোচনা করছে। সে বলছে- ব্রিজ তো টুট গায়া, ইয়ে নদীয়া ক্যায়ছে পার হোগি?

ওদের সঙ্গে থাকা বাঙালি বলে- ট্যাংক তো নদীতে ভেসে থাকতে পারে, নামিয়ে দাও না।

– আরে ইয়ার, ইয়ে গাঙ বহুত বড়া। থোড়া যা কার বন্ধ হো যায়েগি, তব কেয়া করোগি ইয়ার।

ওদের মধ্যে বাংলা হিন্দি ইংরেজি উর্দু মিশেলে কথাবার্তা চলতে থাকে, আর তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকে এলাকার মানুষ। ভাষা বুঝতে না পারলেও হাত নাচানো দেখে বোঝে যে, ট্যাংকগুলো মেঘনা পার করা নিয়ে কথা হচ্ছে। এ নিয়ে খুবই চিন্তিত মনে হয় ওদের। সে চিন্তা চিন্তিত করে গ্রামবাসীকেও। তাদের মধ্যেও শুরু হয় আলোচনা। হঠাৎ একজন লাফিয়ে উঠে বলে- আমরা হগ্গলে মিলা এই ট্যাংক পার কইরা দিমু।

– ক্যামনে পার করবা এই ট্যাংক?

গ্রামবাসী নিজেরা আলাপ করে, ভাবে- ট্যাংকগুলো যদি পানিতে ভেসে থাকতে পারে, তবে গুন টানার মতো করেও তা পার করা যাবে। সলিমুদ্দিন মিত্রবাহিনীর সঙ্গে থাকা বাঙালিকে ডাক দেয়- এই হুনো।

– দেখছো না জরুরি কথা বলছি। ধমক দেয় সে।

তাকে হাত ধরে টেনে আনে গ্রামবাসীর মধ্যে। বলে- আমরাও জরুরি কথাই কমু।

– কী কইবা কও।

– আমরা ট্যাংকগুলা পার করার চেষ্টা করুম নি?

– কী রহম কইরা পার করবা? এগুলা নদীর মাঝ পর্যন্ত যেতে পারবে, তারপর?

– দড়ি দিয়া বাইন্ধা ওপার থাইক্যা টাইনা তুলমু।

বাঙালি কিছুক্ষণ চিন্তা করে, তারপর বলে- কিন্তু এত দড়ি পাইবা কই?

– ওই চিন্তা তোমার করণ লাগত না। বাড়ি বাড়ি টোকায়া দড়ি নিয়া আসমু। তুমি খালি ইন্ডিয়ানগোরে রাজি করাও।

বাঙালি চলে যায়। সে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, ট্যাংক দড়িতে বেঁধে নদী পার করতে চায় গাঁয়ের মানুষ। প্রথমে রাজি হয় না সে। ঢাকায় পৌঁছানো জরুরি বলে সে পরীক্ষামূলকভাবে একটি ট্যাংকের পার করা দেখতে পারে সে। তারপর অন্যগুলো পার করার অনুমতি দেবে সে।

এ কথা শুনে গ্রামবাসী ছুটে যায়। এক দণ্ডের মধ্যেই গরু-ছাগল বাঁধার দড়ি এনে স্তূপ করে ফেলে নদীর পাড়ে। কেউ কেউ সে সব দড়ির তিন-চারটিকে একসঙ্গে পাকিয়ে শক্ত করে, আবার কেউ কেউ একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া দিয়ে লম্বা বানায়। সে দড়ি বেঁধে দেয় ট্যাংকের সামনের আংটার সঙ্গে। কয়েকজন নৌকায় দড়ি নিয়ে চলে যায় মেঘনার পশ্চিম পারে। ততক্ষণে ওপারেও দাঁড়িয়ে গেছে শত শত মানুষ। মিত্রবাহিনীর দুই সিপাই ভয়ে ভয়ে ট্যাংকে উঠে ইঞ্জিন চালু করে, নামিয়ে দেয় মেঘনায়। দুই পাড়ের মানুষ উত্তেজনায় ফেটে পড়ে, ধ্বনি তোলে ‘জয় বাংলা।’ সে ধ্বনি যেন ট্যাংকের গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। বিরামহীন ধ্বনিতে ঢেউয়ের তালে তালে ট্যাংক ভেসে চলে। মাঝ মেঘনায় ইঞ্জিন থেমে যায়, কিন্তু জয় বাংলা ধ্বনি আর থামে না। সে ধ্বনির তালে তালে দড়িতে টান পড়ে ওপার থেকে। গতি ফিরে পায় ভেসে থাকা ট্যাংক। এ সময় বাইচ দিতে দিতে দুটি ছিপ নাও ট্যাংকে দুই পাশে চলে আসে। সাহস বাড়ে ট্যাংকে থাকা দুই সৈনিকের। তারা ট্যাংকের ডালা খুলে মাথা বের করে, হাত তালি দেয়। ওদের দেখে সাহস বাড়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবাসীরও। তারাও হাততালি দিয়ে জবাব দেয়। বাইচের নৌকার মাল্লারা নেচে নেচে গান গায়- ‘জয় বাংলা ধ্বনি তুলে বৈঠাতে দাও টান, হেঁইও বলে গাওরে সবাই স্বাধীনতার গান।’ ধীরে ধীরে মেঘনার ভৈরব পাড়ে ভেড়ে ট্যাংকটি। তা দেখে আনন্দে চোখে পানি এসে যায় কারো কারো। উল্লাসে ফেটে পড়ে দুই পাড়ের মানুষের সঙ্গে মিত্রবাহিনীর সদস্যরাও। এটা তাদের কাছে মনে হয় বিজয়ের প্রথম ধাপ, ঢাকা দখলের শুরু। প্রথম ট্যাংকটি পার করতে পারায় জনতার ওপর আস্থা বাড়ে মিত্রবাহিনীর। তাদের দায়িত্ব দেয় ট্যাংক পার করার। স্বাধীনতার আনন্দে একের পর এক ট্যাংক পার হয়ে জমা হয় ওপারে। এর মধ্যেই গ্রামের মানুষ বড় দুটো নৌকা একসঙ্গে বেঁধে তাতে বসিয়ে দেয় বাঁশের মাচা। সে জোড়া নৌকায় একে একে পার করা হয় জিপগাড়ি, গোলাবারুদসহ অন্যান্য জিনিসপত্র।

এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মিত্রবাহিনী একাত্ম হয়ে ওঠে মেঘনার দুই পাড়ের মানুষের সঙ্গে। গ্রামের মানুষ তাদের জন্য নিয়ে আসে পালানের পাকা কলা, পেঁপে। কেউবা আনে মুড়ি-মুড়কি। ভারতীয় সৈন্যদের এসব খাওয়াতে পেরে আনন্দে আত্মহারা হয় গ্রামের মানুষ।

সন্ধ্যার আগেই মিত্রবাহিনীর সব কিছু পার করে দেয় গ্রামবাসী। পার হয় মিত্রবাহিনীর সকল সদস্য, এবার বিদায়ের পালা। খোলা জিপে উঠে দাঁড়ায় মিত্রবাহিনীর কমান্ডার, স্যালুট জানায় গ্রামবাসীকে। চিৎকার করে বলে- জয় বাংলা। গ্রামবাসীও তার উত্তরে ধ্বনি তোলে জয় বাংলা।

ঘড় ঘড় শব্দ তুলে চলতে শুরু করে ট্যাংকগুলো। গ্রামবাসীদের অনেকেই দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানায় তাদের। কেউ কেউ ট্যাংকের পেছনে পেছনে দৌড়ায়, তারাও ঢাকা দখলে সঙ্গী হবে মিত্রবাহিনীর।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / ১২ ডিসেম্বর ২০১৫

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com