পাহাড়ে আমার পদ্মফুল

শনিবার, ০২ এপ্রিল ২০১৬

পাহাড়ে আমার পদ্মফুল

পাহাড়ে আমার পদ্মফুল
জাকিয়া সুলতানা

 


Litearture 02জানালা দিয়ে বাইরে তুষার ঝড় দেখছে বিন্তি। দেখতে দেখতে মার্চ চলে আসল বোস্টনে।তবুও চারদিকে বরফে ঢাকা। প্রকৃতি যেন জেদ করেছে কিছুতেই গা থেকে সাদা চাদর সরাবে না। আজকে আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলেছে, প্রায় আট ইঞ্চির মতো বরফ পড়বে। তাই বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ দিয়েছে; চারদিকে এত সাদার দিকে তাকিয়ে থেকে কেমন জানি বিষণ্নতায় ছেয়ে যাচ্ছিল মনটা। আর তখনই চার বছর আগের কথা মনে পড়ে বিন্তি জোরে জোরে হাসতে লাগল।

মাত্র ৪০ দিন বয়সী ছোট ছেলে সায়ানকে নিয়ে বোস্টনে স্বাধীনতা দিবসের একটা অনুষ্ঠানে গেছে ওরা সবাই। তিন বছর বয়সী বড় ছেলে জায়ান পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে তার ছোট ভাইকে সবার সঙ্গে, এটা আমার বাদর (ব্রাদার বলতে চাচ্ছিল, উচ্চারণ করতে পারছিল না)। একজন বলে, কি? তোমার বাদর? জায়ান মাথা নাড়ে। আর সবার অট্টহাসি, জায়ান কিছুতেই বুঝতে পারে না কেন সবাই হাসছে? বিন্তি ওকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, বাংলাতে বাঁদর হলো ইংরেজিতে ম্যাংকি।

বর্তমানে ফিরে এল বিন্তি। জায়ান বলছে, দেখো মা, সায়ান কিছুতেই আমাকে ভাইয়া ডাকে না, কেবল নাম ধরে ডাকে।

সায়ান বলে, না, আমি ভাইয়া ডাকতে পারব না, কঠিন নামে ডাকলে আমি ক্লান্ত হয়ে যাই!

বিন্তি সায়ানকে বলে, বাবারে, তুমি কত সৌভাগ্যবান, তোমার ভাইয়া ডাকার মতো একজন আছে। দুই ভাইয়ের আর ততক্ষণে বিন্তির কথার দিকে মনোযোগ নেই; রান্নাঘরে একটা কৌটা নিয়ে খোলার চেষ্টা করছে, আর বলছে মুড়ি চাই, মুড়ি চাই, মুড়ি চাই।

মুড়ি চাই, মুড়ি চাই কথাগুলো বিন্তিকে মনে করিয়ে দিল মা-বাবার কাছ থেকে শোনা পঁচিশে মার্চের সেই ভয়াল রাতের কথা; বিন্তির বাবা-মা তখন তাদের পাঁচ বয়সী ছেলে সন্তানকে নিয়ে থাকতেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের খুব কাছে একটা দোতলা বিল্ডিংয়ের একতলায়। রাস্তা দিয়ে যখন কোনো মিছিল যেত—ভাত চাই, কাপড় চাই; বাঁচার মতো বাঁচতে চাই বলতে বলতে; বিন্তির পাঁচ বছরের সেই ভাই মাথার ওপরে হাত তুলে বলত, মুড়ি চাই, মুড়ি চাই, মুড়ি চাই। ২৫ মার্চ বিন্তির বাবা অফিস থেকে বেতন পেয়েছিলেন। ফেরার পথে তিনি বিন্তির মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনে এনেছিলেন। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা মা সেদিন শাড়িটা পরেছিলেন। ওই দিন অনেক রাতে বিন্তির বাবা–মা ছেলে সঙ্গে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন।

এমন সময় হঠাৎ করেই গোলাগুলির শব্দ শুরু হয়। বিন্তির বড় ভাই দৌড় দিয়ে খাটের তলায় ঢুকে যায় আর মা-বাবাকে ডাকতে থাকে খাটের নিচে যেতে।

একটু পর বাইরে দরজায় সজোরে করাঘাত। বিন্তির মা আঁকড়ে ধরেন স্বামীকে।

মুরাদ সাহেব, মুরাদ সাহেব, তাড়াতাড়ি পালান, দরজার কড়া ক্রমাগত নাড়তে নাড়তে ওপরতলার বাড়ির মালিকের ছেলে মিন্টু বলতে থাকে। মুরাদ সাহেব দরজা খোলেন, মিন্টু বলে, চারদিকে পাকিস্তানি আর্মিরা আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, এক মুহূর্ত এখানে না থেকে পালান।

প্রতীকী ছবি। সংগৃহীতবিন্তির বাবা মুরাদ সাহেব সঙ্গে সঙ্গে দরজায় তালা দিয়ে পরিবার নিয়ে বের হয়ে যান। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, তার মধ্যে মাঝে মধ্যে ভেসে আসছে গোলাগুলির শব্দ। আর রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দিক থেকে দেখা যাচ্ছে আগ্নেয়গিরির মতো দাউ দাউ আগুনের শিখা। ছেলেকে কোলে নিয়ে আর স্ত্রীর হাত ধরে উল্টো দিকে দৌড়াতে থাকেন। মনে একটাই চিন্তা আরামবাগে খালার বাসায় যেতে হবে যেভাবে হোক। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে একটা রাস্তায় গিয়ে দেখেন, নানান বয়সী মানুষজন পাগলের মতো তাদের দিকে ছুটে আসছে আর বলছে আগুন আগুন। চারদিকে গোলাগুলির মধ্যে মুরাদ সাহেবরাও সবার সঙ্গে পালাতে পালাতে একটা পাগাড়ের মধ্যে গিয়ে পড়েন। সেই পাগাড় অনেক কষ্টে পার হতে গিয়ে মুরাদ সাহেব টের পান কোলের মধ্যে তার ছেলের হাত দুটো তার গলা প্রায় চেপে ধরেছে। তিনি ছেলেকে বলেন, ভয় পেও না, ভয় পেও না, শব্দ করো না।

না ছেলে আর শব্দ করতে পারেনি, গুলিটি পিঠের মধ্যে দিয়ে সরাসরি হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত গিয়েছিল, বাবা বলে আর শেষ ডাকটাও দিতে পারেনি। ছেলে হারানো শোকের সাত দিনের মাথায় বিন্তির মা একজন মৃত মেয়ে সন্তান জন্ম দেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক পরে জন্ম নেয় বিন্তি। বাবা-মা কোনো দিন ওর সামনে ওর বোন-ভাইয়ের নাম উচ্চারণ করেননি। বলেছেন তোর ভাইয়া। কোনো ছবি ওকে কখনো দেখতে দেননি; বলেছেন লাখ লাখ শহীদদের ছবির মাঝেই তোর ভাই-বোনকে খুঁজে পাবি; এ দেশটাকে তো সবার আত্মত্যাগের মাধ্যমেই আমরা পেয়েছি। কেবল মাঝে মাঝে রাতেরবেলা ঘুম ভেঙে গেলে বিন্তি শুনতে পেত, ঘুমের মধ্যে মায়ের হাহাকার—পাগাড়ে আমার পদ্মফুল গো, পাগাড়ে আমার পদ্মফুল।

জায়ান-সায়ানে খুনসুটিতে আবার বর্তমানে (২০১৬) ফিরে আসে বিন্তি। চোখ ভরা পানি নিয়ে বিন্তি গাইতে থাকে, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি, চিরদিন…।
এদিকে সায়ান বলতে থাকে, ভাইয়া, বাবা বলেছে বৃষ্টির মধ্যে রোদ উঠলে নাকি ব্যাঙের বিয়ে হয়! মা যে একটু আগেই জোরে জোরে হাসছিল, এখন দেখি আবার কাঁদছে, তাহলে এটাতে কি হবে? ডাইনোসরের বিয়ে? কোনো উত্তর না পেয়ে সায়ান তাকিয়ে দেখে, জায়ান মায়ের সঙ্গে আস্তে আস্তে গলা মেলাচ্ছে, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি, চিরদিন…।

বাইরে তুষার ঝড়ের শো শো শব্দ ছাপিয়ে কেন জানি তখনো বিন্তির কানে ভেসে আসছে ঘুমের মধ্যে বিন্তির মায়ের ফুঁপিয়ে আর্তনাদ, পাগাড়ে আমার পদ্মফুল গো,পাহাড়ে আমার পদ্মফুল।

শনিবারের চিঠি /আটলান্টা/ এপ্রিল ০২, ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:২২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০২ এপ্রিল ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com