পাখি মা এবং বিশ্বাস

বুধবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

পাখি মা এবং বিশ্বাস
এই সেই সাদা  টিয়া  যে দু হাত দুরত্বে  মাটিতে স্হির ভাবে বসে ছিল  [ ছবিঃ লেখক ]

আমার বর্তমান বাড়িতে বসবাস প্রায় এক বছরেরও বেশী ।এ টি কেনার মুল আকর্ষণ ছিল দুই তালায়,  দুটি বারান্দা । উপরের বারান্দাটা বেশী পছন্দের , ওটা একটি টানেলের মধ্যে এবং সব সময় মৃদুমন্দ বাতাস বহমান । সকালে চুপচাপ বসে কফি বা চা পান এবং পাওয়া না পাওয়া নিয়ে ভাবা যায় ।আমার দুবছর ছয় মাস বয়সি নাতির ও জায়গাটা খুব পছন্দ । আমাদের নানা নাতির বহু কোয়ালিটি সময় এখানে উদযাপিত হয় । বারান্দায় বসে আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, রেলিং এ প্রচুর পাখির আনাগোনা । প্রথম প্রথম আমি বসলে ওরা উড়ে চলে যেত । নীচের বারান্দার সামনে একটি গাছে আমার ছোট মেয়ে পাখিদের খাবার ও পানির ব্যবস্হা করে দেয় এতে করে তাদের আনাগোনা ও ব্যাপক ভাবে বেড়ে যায় । বারন্দায় বসার পর, তারা রেলিং এ বসে থাকত । আমাদের সহাবস্থান ভালই চলছিল । আমার নাতি ও তার বর্তমান বয়সের ভাষায় পাখির মত কিচির মিচির করে, সে রেলিং এর পার্শ্বে দৌড়া দৌড়ি করলে ওরা আর ভয় পেয়ে উড়াল দেয় না।প্রসঙ্গ ক্রমে কোন প্রাণী নিরাপদ, এনিয়ে গত মে মাসে হিমালয় পর্বতে হাঁটার উদ্দেশ্যে নেপালে যাই । সেখানে চন্দ্রাগীরি নামে একটা পাহাড় আছে প্রায় ৬,০০০ ফুট উঁচু । আমি একজন গাইডের সাহায্যে হেঁটে উঠার সিদ্ধান্তে নেই ।  তার নাম ছিল বিষ্ণু । প্রায় ২,‌০০০ ফুট ওঠার পরে আমেরিকার কায়োটি অথবা বাংলাদেশের গেছো বাঘ ধরনের দুই প্রাণী দেখে আমার আত্মারাম খাপছাড়া । পা পিছলে গড়ে গিয়েছিলাম বিষ্ণু না ধরলে নীচে চলে যেতাম । ব্যাপারটা তাকে অবাক করে দেয়, আগেরদিন আমরা ২৩ কিলোমিটার সাবলীল ভাবে হেঠেছি । বলল এরা তোমার ক্ষতি করবে না, মানুষের ক্ষতি করে মানুষ । এদের কামড় খাবার আগে হয়ত পিছন থেকে কোন মানুষ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারে । হেসে বললাম তুমি ত তিনবার পতন থেকে রক্ষা করেছ । পাল্টা হেসে বলল ওটা আমার ধর্ম ও কর্ম । গভীর ভাবে আন্তরিক হাসি দেয়া লোক থেকে দুরে থাকবা ।

ফুলের টবে ঘুঘুর বাসা [ ছবিঃ লেখক ]

পাখি সংক্রান্ত দুটি ঘটনার উল্লেখ করে মুল গল্পে যাবো । বেশ কয়েক মাস আগে আমি বসে বই পড়ছি হঠাৎ করে সাদা রং এর এক টিয়া পাখি আমার থেকে দু হাত দুরে এসে মাটিতে বসে স্হির ভাবে চেয়ে থাকল । সাধারণত যেসব পাখির আনা ঘোনা এটা তার থেকে ভিন্ন । প্রায় দুঘণ্টার মত আমার পাশে খুব নির্ভিক ভাবে নড়া চড়া ঘোরাঘোরি চলছিল । কিন্তু আমার একটু আতিথিয়তার ইচ্ছা হল , নীচে গিয়ে সিরিয়েল এনে কার দিকে দিতেই উড়ে চলে গেল । পাখিটার সাথের সময়টুকু কিন্তু পারস্পরিক নিরাপত্তার ও নির্ভরতার ছিল । আমি এক পর্যায়ে ফেসবুকে ওর ছবি দিয়ে একটি ষ্টাটাস দেই “ পাখিটা আমার কাছে কি চায়? আমি ওঁকে কিইবা দেব ।” বেশ মজার মন্ত্যব্য আসে , এর আটলান্টা প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক মনজিলুর রহমানের এক চমৎকার মন্তব্য উল্লেখ করছি । ‘ পশু পাখি মানুষ চিনে । মানুষে মানুষ চিনে না।‘


আমি প্রতিদিন পাঁচ মাইল হাঁটার চেষ্টা করি  শনি ও রবিবারে একটু বেশী । মুলত পার্ক এবং পাহাড়েই হাঁটতেই যাই । আটলান্টার পার্ক গুলি গাছপালা ও জঙ্গলে পরিপূর্ন । আমাদের হাঁটার পরিধি হল ১.১৪ মাইল । এক অনেকটা মেঘলা দিনে একা হাঠছি তখন পর্যন্ত হাঁটার সতীর্থরা আসেন নাই । হঠাৎ দেখি দুটি ছোট পাখি উড়ে উড়ে চলছে পুরো পরিধী আমরা এক সাথে ঘুরলাম । প্রথম দিকে একটু নার্ভাস হলে ও ছোটবেলার পাখীদের নিয়ে কবিতা মনে পড়ল “ One for sorrow , two for joy. পাখি দুটি দেখে সকাল বেলা মনটা খুশি  হয়ে গেল । দুটো ঘটনাই কাকতালীয় বহুদিন থেকে পাহাড় জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই প্রকৃতির মাঝে গেলে এমন অদ্ভুত  অদ্ভুত ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে।

গত সপ্তাহে আবার পাখি নিয়ে আরেক ঘটনা । আমার স্ত্রীর ফুলের খুব শখ । বাসার ভিতরে বাইরে উপরের এবং নিচের বারান্দায় ফুলের টব , গাছ আর গাছ । আমি বেশীর ভাগ সময় বাসা থেকে কাজ করি আমার অফিস কাম ষ্টাডি রুমের দরজা দিয়ে উপরের বারান্দার দরজা । লেপটপের স্কীরিন আর কীবোর্ড যখন ক্লান্ত করে ফেলে পাঁখি আর ফুলগাছ আমাকে  প্রশস্তি দেয় । আমি মাঝে মাঝে দরজা দিয়ে  বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকি । গত সপ্তাহে কফির কাপ নিয়ে বারান্দায় বসছি হঠাৎ করে ফুলের টব থেকে একটা ঘুঘু পাখি উড়ে গেল । মাঝে মাঝে এরকম হয় প্রথমে গা করিনি কিন্তু কিছুক্ষন পরে ঘুঘুটা আবার বসছে আবার উড়ে যাচ্ছে । এবার একটু মনোযোগ দিলাম দেখি বসার চেয়ার থেকে হাত দুয়েক দুরে ফুলের টবে  ঘুঘুটি বাসা বেঁধেছে । পাখিরবাসা বাড়িতে নূতন কিছু নয় , প্রায় ১৫টা  লেবু গাছ আছে সাপ ও বিড়াল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লেবু গাছ প্রতি বছর বহু পাখি মা ও ছানাদের সুরক্ষা দিয়েছে । আমার আগের ও বর্তমান বাড়ির লেবু গাছের কাটা বছরের বিশেষ সময়ে পাখি দের সুরক্ষা দেয় । কিন্তু এবার একদম নাকের ডগায় । দু এক দিনের মধ্যে বাসায় কয়েকটি ডিম এসে গেল । মা ঘুঘু ও আমার নাতির মধ্যেও এক ধরনের সমযোতা এসে গেল । মা পাখি তাকে দেখে ভয়ে উড়াল দেয় না , নাতি যদিও ফুলের টবের উপরিভাগ দেখার মত লম্বা হয় নাই । কিন্তু টবের কাছে গেলে চুপ চাপ থাকে অন্য সময়ের মত উচ্ছসিত হয়ে চিৎকার করে না । আস্তে আস্তে এসে বলে নানা  পাখি । দিনের এবং বিকালের বৃহৎ অংশ মা পাখিটার সাথে কাটতে লাগল । আমি এ মা এবং তার মাতৃত্ব নিয়ে কৌতূহলী হয়ে পড়লাম । আবিষ্কার করলাম সব মাদের মা হওয়া এক বিরাট যুদ্ধের ব্যাপার । আমি নিজেও তিন সন্তানের বাবা । বাবা হবার সময় আমেরিকায় টিকে থাকার যুদ্ধ লড়তে গিয়ে মা হওয়ার যুদ্ধ স্ত্রী একাই লড়েছেন । বহুদিন হাসপাতালে বহু একক মায়ের যুদ্ধ এবং ত্যাগ দেখে অভিভুত হয়েছি । এক মায়ের প্রসব বেদনা নাকি অনেকগুলি হাড় ভাঙ্গা কষ্টের সমান । লেবার ডে উইকএন্ডে তিন দিনের জন্য বাড়িতে ছিলাম না । ফিরে রাতে ঘুঘু মাকে দেখতে গেলাম । মনে হল সে ক্ষুদায় কাতর ডিমে তা দিয়ে বসে আছে । আমি কাছে গেলাম তার কোন ভ্রুক্ষেপ নাই । পরের দিন সকালে মনে হল ছোট ছোট ছানার আগমন ঘটেছে । মা পাখিটা গত তিনদিন কোন পানাহার ছাড়া ছানাদের আগলে বসে আছে । একবার মনে হল আমি কিছু খাবার রাখী, কিন্তু গুগলের গবেষনায় নিষেধ করা হোল । এটাই পাখি মায়ের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ।নূতন করে আবার আবিস্কার করলাম  দুনিয়ার সব মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করে, বাচ্চাদের সুরক্ষা দেয় । আমার অতিথী মা , তার বাচ্চাদের নিয়ে নিরাপদে ফিরে যাক । দুনিয়ার সব মায়ের সালাম ।

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৭:১২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com