পাঁচ বছরের বন্দী জীবন থেকে মুক্ত হলেন কলেজ শিক্ষিকা রোজী ও তার ছেলে জিমুন

বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০১৪

পাঁচ বছরের বন্দী জীবন থেকে মুক্ত হলেন কলেজ শিক্ষিকা রোজী ও তার ছেলে জিমুন
jimu

জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে অবোধ শিশু জিমুন

 

শনিবার রিপোর্টঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে ইডেন কলেজে শিক্ষকতা করেছেন জাহান আরা বেগম রোজী (৪৫)। তার স্বামী সিলেট সদর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আবুল কালাম আজাদ ভূঞা। একমাত্র ছেলে মেহেদী ইসলাম জিমুনের জন্মের কিছুদিন পর ভেঙে যায় আজাদ-রোজীর সংসার। সেই সঙ্গে রোজী ও তার একমাত্র সন্তানের স্বপ্নেরও মৃত্যু হয়। খড়গ নেমে আসে মা-ছেলের জীবনে। ২০০৯ সালের শেষদিকে তাদের ওই দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘরে বন্দি করে রাখে রোজীর বড় ভাই শেরশাহ। শেরশাহ ঢাকার ইস্কাটনে ব্যবসা করেন। দুই ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে অপর ভাই শাহেনশাহ মানসিক ভারসাম্যহীন। এক বোন ইতিমধ্যে মারা গেছেন। বড় ভাইয়ের ভয়ে অন্য চার বোনের কেউই রোজীর খোঁজ নেয় না। তাদের তিন বোন থাকেন ঢাকায়। এক বোন ফেনী শহরেই বসবাস করেন। তিনি শহরের রামপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।


 দুটি পাকা ঘরের অন্যটি ভাড়া দেয়া। ভাড়াটেরা ভাড়ার চার হাজার টাকা পাশের দোকানে জমা দেন। আর দোকানদার রোজী ও তার সন্তানকে জানালার ফুটো দিয়ে চাল-ডাল সরবরাহ করেন। শেরশাহ খুব একটা আসতেন না বলে জানান স্থানীয়রা। ভাড়াটিয়ারা জানান, ভুতুড়ে ওই ঘরের ভেতরে একটি লাইট থাকলেও পাখাটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল ছিল। সূর্যের আলোও সেখানে পৌঁছে না। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না থাকায় ভ্যাপসা-দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠে ঘরটি। কক্ষের ভেতরে একটি টয়লেট ও রান্নার একটি চুলা আছে। এছাড়া আছে দুটি জানালা। ফেনী শহরের রামপুর শাহীন একাডেমি সড়কের জনাকীর্ণ এলাকায় বিশালাকার একটি বাড়ির কক্ষ থেকে অবশেষে পাঁচ বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হলেন সেই মা ও শিশু। স্থানীয়রা জানান, পৈতৃক সম্পত্তি আত্মসাৎ করতে বড় ভাই শেরশাহ শিশুসন্তানসহ রোজীকে মানসিক প্রতিবন্ধী সাজিয়ে বন্দি করে রাখে। মা ও সন্তানের বন্দি জীবনের ঘটনাটি পত্রিকায় প্রকাশ হলে বিষয়টি প্রশাসনের নজড়ে আসে। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রশাসন মা ও সন্তানকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়।

 বুধবার দুপুরে শুরু হয় অভিযান। সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকারের নেতৃত্বে ফেনী মডেল থানার ওসি মো: মাহবুব মোর্শেদসহ বিপুল পুলিশ অভিযানে অংশ নেয়। একপর্যায়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরিফুল আলম তানভীর, ফেনী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: অসিম কুমার সাহার নেতৃত্বে মেডিক্যাল টিম, স্টেশন অফিসার মো: জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে ফায়ার ব্রিগেড দলও ঘটনাস্থলে পৌঁছে। বেলা ২টায় রহস্যময় ওই বাড়ির আশপাশে বিপুল সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরাসহ দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা সাধারণ মানুষ ভিড় জমায়। এ দিকে ৩টা ৪০ মিনিটে শুরু হয় শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান। ফায়ার সার্ভিস দল তিনটি দরজা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে ওই মা জাহানআরা বেগম রোজী (৪৫) ও শিশু মেহেদী ইসলাম জিমুনকে (১১) উদ্ধার করে। তাদের দুইজনকে ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। তাদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান পুলিশ সুপার মো: রেজাউল হক পিপিএম।

 ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: অসিম কুমার সাহা জানান, দীর্ঘ দিন ঘরে বন্দী থাকায় দু’জনই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। দুইজনকে পুলিশ পাহারায় হাসপাতালের একটি কেবিনে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। উদ্ধারের পর ফুটফুটে জিমুন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। এক প্রতিবেশী জানান, একসময় ছেলেটি বেশ চঞ্চল ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন কক্ষবন্দি থাকায় ধীরে ধীরে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে শিশুটি। তিনি আরও জানান, রোজীও মানসিক প্রতিবন্ধী। কেউ এলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। তবে জিমুন ভেতর থেকে কথা বলার চেষ্টা করত। জানালা দিয়ে পাশের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে বই নিয়ে পড়ত। এক ভাড়াটিয়া জানান, জিমুন অত্যন্ত মেধাবী। কোনো ধরনের বই পেলে মুখস্থ করে ফেলত সে।

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৪:২৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com