পদ্মা সেতুঃ আমার স্বপ্ন, আমাদের স্বপ্ন

বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২০

পদ্মা সেতুঃ আমার স্বপ্ন, আমাদের স্বপ্ন
স্বপনের পদ্মা সেতু

এ লেখাটা না লিখে পারা গেল না। আমার লেখা একটা ফ্যান্টাসি গোত্রীয় উপন্যাসের শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। ওটা ঝুলে গিয়েছিল। সেই ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল। তারপর বেশ কিছুদিন একটা অক্ষরও লিখিনি। এখন সে কাজ চলছে। ভেবেছিলাম উপন্যাসটা শেষ করার আগে না পারতে অন্য কিছু লিখব না। যাহোক, বিষয় হল পদ্মা সেতু, পদ্মা বহুমুখী সেতু।
আমি ও আমাদের পরিবার অনেক দিন থেকে ঢাকা যাতায়াত করি। তবে আমার স্মৃতিতে যতটুকু আসে ১৯৭২ বা ৭৩ খ্রিস্টাব্দে সম্ভবত একবার ঢাকা যাওয়া হয়েছিল। আব্বা-মা, ভাই-বোন সহ পুরো পরিবার। তখন আমাদের ঢাকা যেতে হত লঞ্চে। পিরোজপুরের হুলারহাট ঘাট থেকে লঞ্চে উঠতে হত। সে অনেক যোগাড় যন্ত্রের ব্যাপার ছিল। ভোর বেলায় আমাদের বাড়ি অর্থাৎ সে সময়ের খুলনা জেলার বাগেরহাট মহাকুমার কচুয়া থানার টেংরাখালী গ্রাম থেকে টাবুরে নৌকায় ( ছই দেয়া এক জাতীয় নৌকা) চেপে তখনকার খরস্রোতা বলেশ্বর নদী বেয়ে বেয়ে পিরোজপুর পৌঁছাতে হত। দুঃখের বিষয় ফারাক্কার মরণ বাঁধের কারণে সে বলেশ্বর অনেকটা অনাব্য হয়ে পড়েছে । নদীর দু’পাড় কেটে আবার নাব্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে । যাই হোক,নদী পথে ভ্রমণের সময় গোন-বেগোনের (জোয়ার-ভাটা/ পক্ষ স্রোত এবং বিপক্ষ স্রোত বা উজান) এর বিষয় খুব মাথায় রাখতে হত। পিরোজপুর এসে বেবিটেক্সি বা রিক্সা চেপে হুলারহাট এসে তারপর লঞ্চে উঠতে হত। সে এক বিরাট ঝক্কি-ঝামেলার ব্যাপার!
আমরা সেবার কাঠবডি লঞ্চ জলকপোতে চড়ে ঢাকা গিয়েছিলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে, জলকপোত লঞ্চের কেবিন গুলো ছিল একদম অপরিসর। ঠিক খুপরি ঘরের মত। সেই মনে-থাকা ঢাকা যাতায়ত শুরু।
বাসে করেও ঢাকা যাওয়া যেত। আমাদের বাড়ি থেকে খুলনা গিয়ে থাকতে হত। ভোরে ঢাকার বাসে উঠতাম। বাসে সকালের নাস্তা দিত- বাটারবন রুটি, লাড্ডু আর কলা। সেই ছোট বেলায় সেই নাস্তা যে কী স্বাদের ছিল! সকাল হলেই লোভাতুর মন নিয়ে সেই নাস্তার অপেক্ষা করতে থাকতাম। কখন নাস্তা আসে! কখন নাস্তা আসে!! যতদূর মনে পড়ে, পরিবহন গুলোর নাম ছিল যাত্রিক, দ্রুতি বা পরে সোহাগ।
তখনকার বাস এখনকার মত মাওয়া-কাওড়াকান্দি বা কাঁঠাল বাড়ি দিয়ে পদ্মা পার হত না। রুট ছিল খুলনা-যশোর-ঝিনাইদহ-মাগুরা তারপর ফেরী করে মধুমতী নদী পার। এই ঘাটের নাম কামারখালী। কামারখালীতে পরে অবশ্য সেতু হয়ে যায়। তারপর ফরিদপুরের বিস্তির্ণ এলাকা পেরিয়ে রাজবাড়ী-গোয়ালন্দ-দৌলতদিয়া ঘাট। ফেরী করে পদ্মা পার। এরপর আরিচা-মানিকগঞ্জ-ঢাকা গাবতলী।
ঐ রুটের পাশাপাশি এরপর চালু হয় বাগেরহাট-গোপালগঞ্জ-মাদারীপুরের শীবচর উপজেলার কাওড়াকান্দি ঘাট দিয়ে কখোনো ফেরী করে, কখনো লঞ্চে আবার কখনো স্পিড বোটে পদ্মা পার হয়ে মাওয়া তারপর ঢাকা সায়েদাবাদ। এই রুট যখন চালু হয়, তখন অন্তত পাঁচটা ফেরী পার হয়ে কচুয়া মানে আমার বাড়ি ফিরতে হত। তখন কী ভাবনায় ছিল সব গুলো নদীর উপর একদিন সেতু তৈরী হয়ে যাবে!
তবে হাঁ, দিনে দিনে নদী গুলোর দুপার সেতু দিয়ে যুক্ত হয়ে যায়। শুধু বাকী থাকে প্রমত্তা পদ্মা।
পদ্মা সেতু নিয়ে কথা চলতে থাকে। মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির পর চুক্তি হতে থাকে। তারপর শুরু হয় রাজনীতি আর কুট কৌশল। দেশিয় ও আন্তর্জাতিক। এক পর্যায়ে বিশ্ব ব্যংক কল্পিত দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে অনীহা প্রকাশ করে। দেশে-বিদেশে ওঠে গেল গেল রব। কায়েমী স্বার্থবাদীরা চালাতে থাকে নানান রকম অপপ্রচার। ব্যক্তিগত ভাবে আমার এবং হয়তো আমার মত অনেকের খুব মন খারাপ হয়ে পড়ে। সেতু হবে এ আশায় আমি চাটিবাটি নিয়ে ঢাকায় বাসা নিয়েছি। স্থিতি হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অর্থাৎ বিবি-বাচ্চা ঢাকায় আর আমি কচুয়ায়। আমি ও আমরা খানিক হতোদ্যম হয়ে পড়ি। কিন্তু হতাশায় নিভে যাওয়া প্রদীপে আলো জ্বালার জীয়নকাঠি নিয়ে হাজির হন একজন রাষ্ট্রনায়ক, এক মহান স্টেটস ম্যান। তিনি আর কেউ নন অকুতোভয় পিতার সাহসী কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দেশিয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
আজ পদ্মা সেতু এক বাস্তবতা। পদ্মার দুপার আজ অন্তত স্টিলের স্প্যান দিয়ে বেঁধে ফেলা সম্ভব হয়েছে। ইনশাআল্লাহ আর এক বছরের মাথায় আমরা সেতুর উপর দিয়ে পদ্মা পার হতে পারব। অথচ পদ্মা সেতু নির্মান কাজ চলার প্রাথমিক পর্যায়ে, এমন কি মাঝ বরাবর এসেও, যতবার লঞ্চে করে নদী পার হয়েছি, তত বারই সেতু না-হওয়া নিয়ে কী তির্যক মন্তব্য! কত নেতিবাচক কথা! কত বিদ্রুপাত্মক বাক্যবাণ! ভাব খানা এমন, সে ভেতরের খবর জানে, সেতু হচ্ছে না। কাজ কর্ম যা হচ্ছে, সব আই ওয়াশ, লোক দেখানো। আমার এক এক সময় মনে হত, হয়তো কেউ এসব লোক লাগিয়েছে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর জন্য। স্যাবোটাজ করার জন্য। তবে আমি সান্তনা খুঁজেছি, এগুলো হয়তো বাঙালি সূলভ সব জান্তা ভাব প্রকাশক এক অভিব্যক্তি বই অন্য কিছু নয়। আমি আশা করি, আমার সান্ত্বনামূলক মানসিক ভাবনা যেন ঠিক হয়।
পদ্মা সেতু এখন স্বপ্ন নয়; এক সাহসী অভিযাত্রার বাস্তব রূপ।

কচুয়া, বাগেরহাট।


 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com