পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির

ও নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা আব্দুল আউয়াল

মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ ২০২১

পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির
মাওলানা আব্দুল আউয়াল ছবিঃ সংগৃহীত

রবিবারের হরতালে তাণ্ডব আর নাশকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থানের জের ধরে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে দেখা দিয়েছে বিশাল ফাটল। সোমবার রাতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন জেলা হেফাজতে ইসলামের আমীর (সভাপতি) ও শহরের ডিআইটি মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়াল।

শবেবরাতের রাতে মসজিদে বয়ানকালে তিনি এ ঘোষণা দিয়েছেন। মাওলানা আব্দুল আউয়াল এ সময় নিজ দল হেফাজতের অনেককে ‘অতি উৎসাহী’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, আমি চাইনি পুলিশের কঠোর অবস্থান ভেঙ্গে মাঠে নামি আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক। এটাই আমার দলের অনেকে মেনে নিতে পারছেন না।


অপরদিকে মহানগর হেফাজতের নেতারা দাবি করেছেন, আব্দুল আওয়াল সংগঠন বুঝেন না। তিনি নেতৃত্ব দিতে বা গুছিয়ে কাজ করতে পারেন না।

তবে মাওলানা আব্দুল আওয়ালের মতো প্রবীণ আলেম ঘোষণা দিয়ে হেফাজত ছাড়ার ঘটনা নিয়ে চলছে আলোচনার ঝড়। বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালে ব্যাপক নাশকতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান স্পষ্ট করায় তাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন সাধারণ মুসল্লিসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

জানা গেছে, রোববার হেফাজতের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে মহাসড়কের কাঁচপুর পর্যন্ত এলাকা দফায় দফায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হেফাজতসহ হরতালের সমর্থনকারীরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৭টি যানবাহনে আগুন, অর্ধশত যানবাহন ভাংচুর করে। এ সময় গণমাধ্যম কর্মীদের ওপরও বেশ চড়াও ছিল হেফাজতের কর্মীরা। ভাংচুর করা হয় গণমাধ্যমের গাড়ি, মারধর করাসহ লাঞ্ছিত করা হয় বহু সাংবাদিককে।

কিন্তু একেবারেই উল্টো চিত্র ছিল নারায়ণগঞ্জ শহরে। নগরীর ডিআইটি মসজিদ, যেটি হেফাজতের নেতাকর্মীদের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেই ডিআইটি মসজিদে জেলা ও মহানগর হেফাজতের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকলেও ভাংচুর বা পিকেটিং কোনটিই হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার ভোর থেকেই ডিআইটি মসজিদের বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাজোয়া যানসহ বেশ কঠোর ও সতর্ক অবস্থান বিরাজ করছিল। কয়েকশ’ হেফাজত নেতাকর্মী সেখানে জড়ো হলেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুরোধে মাঠে নামেননি নেতারা। বিশেষ করে ওই মসজিদের খতিব ও জেলা হেফাজতের আমীর মাওলানা আব্দুল আওয়াল সেখানে পুলিশকে অনুরোধ করেও নামতে না পারায় নিজেদের নিবৃত্ত রাখার পরামর্শ দেন। আর এ বিষয়টি নিয়েই মূলত মহানগর হেফাজতের নেতারা নাখোশ হন আব্দুল আওয়ালের ওপর।

হেফাজতের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, মাওলানা আব্দুল আওয়ালের এই ব্যাকফুটে যাওয়াই কাল হয়েছে তার। ফলে সোমবার কেন্দ্রীয় হেফাজতের দোয়া কর্মসূচি ডিআইটি মসজিদে হওয়ার কথা থাকলেও সেটি আব্দুল আওয়ালকে না জানিয়ে ফতুল্লার দেওভোগ মাদ্রাসা মসজিদে স্থানান্তর করা হয়। মূলত এ বিষয়টি জানতে পেরেই সোমবার রাতে মসজিদে বয়ানকালে নিজের ইস্তফার কথা জানিয়ে দেন আব্দুল আওয়াল।

এদিকে নিজের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল আওয়াল জানান, রোববার সকাল থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে পুলিশ মসজিদের বাইরে ও চারপাশে অবস্থান নিয়েছিল। আমরা শত অনুরোধ আবদার করেও বের হতে পারিনি। এরই মধ্যে খবর পাচ্ছিলাম যে, সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোডে সন্ত্রাসীরা বাস পোড়াচ্ছে। সেখানে মাদ্রাসার ছাত্ররা ছিল না। এখন আমরা বা আমি যদি সেখানে বের হতাম তবে সিদ্ধিরগঞ্জের মতো এখানেও গুলি চালানো হতো, অনেক মায়ের বুক খালি হতো, সাধারণ মানুষের রক্ত-ঘামের টাকায় গড়ে উঠা এই মসজিদ ঝাঁজরা হয়ে যেত। কিন্তু আমাদের অতি উৎসাহী লোকজন এটা বুঝল না।

তিনি বলেন, তারা অভিযোগ করছে কেন আমি পুলিশ ব্যারিকেড না মেনে বের হলাম না। আর পুলিশ বলছে যদি বের হতেন তবে এই ১৭ বাস পোড়ানোর মামলায় আপনি হতেন ১নং আসামি। যদি সেদিন আমি বের হতাম আর লাশ পড়ত তবে আপনারাই আমাকে দোষ দিতেন। তাই আমার দলের লোকেরা ইতোমধ্যে আমাকে মাইনাস করে দিয়েছে। তারা দোয়ার স্থান পরিবর্তন করে ফেলেছে। যেহেতু আমার বয়স হয়েছে, আমি দাঙ্গা-হাঙ্গামা পছন্দ করি না, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার আর আমীর থাকার দরকার নেই। অতি উৎসাহীরা দল পরিচালনা করুক।

অপরদিকে এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ মহানগর হেফাজতের আমীর মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান জানিয়েছেন, পদত্যাগের বিষয়টি আব্দুল আওয়ালের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হলেও বিষয়টি সংগঠনের নিয়ম মোতাবেক হয়নি। কারণ উনি হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতাও। মসজিদে ওপেন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত না দিয়ে উনি দলীয় ফোরামে বিষয়টি বলতে পারতেন।

তিনি বলেন, রোববারের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি উনি কী করে সকাল ১০টার মধ্যে বলে দিলেন শেষ হয়ে গেছে, যা আমাদের অবাক করেছে। এ নিয়ে কর্মীরা উনার ওপর ক্ষুব্ধ।

ফেরদাউসুর রহমান বলেন, দোয়ার বিষয়টিও কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ ছিল; যা মহানগর দেওভোগ মাদ্রাসায় করেছে সোমবার বিকালে। উনি জেলা সভাপতি হয়ে জেলার পক্ষে তো দোয়ার আয়োজন করতে পারেননি।

এদিকে নাশকতার ব্যাপারে এই হেফাজত নেতা দাবি করেন, আমাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল কিন্তু অনুপ্রবেশকারীরা এসব ঘটিয়েছে।

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:০৬ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com