নিজেদের রক্তে রঞ্জিত আলীগ

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০১৫

নিজেদের রক্তে রঞ্জিত আলীগ

 

মাহবুব হাসান


ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেরাই এখন নিজেদের প্রতিপক্ষ। তাদের মধ্যে বাড়ছে দ্বন্দ্ব, একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন সংঘাতে। নিজেদের এ দ্বন্দ্বে বাড়ছে খুনোখুনি। নিজেদের আঘাতে নিজেরাই হতাহত হচ্ছেন। আর দুপক্ষই ক্ষমতাসীন হওয়ায় অসহায় প্রশাসন। এসব ঘটনায় কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না তারা।
বিবাদে জড়িয়ে পড়াদের বিপক্ষে দলকেও তেমন কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলক ক্ষমতাবানদের আশ্রয়-প্রশয়ে থেকেই কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী এসব ঘটাচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মন্ত্রী-এমপি বা কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন লক্ষ্য করা যায় এসব সংঘাতের নেপথ্যে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অধিকার ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয় বছরে (২০০৯-১৪) ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রায় ২০০ নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। আর ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আরও অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী খুনের সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৯ থেকে বর্তমান পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে ২৬ জন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ছিলেন, যারা ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন।মূলত আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগে একের পর এক সংঘর্ষ ও প্রাণহানি ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় রাখা, আধিপত্য বিস্তার কিংবা ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন নেতাকর্মীরা।
এসব নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনও। এতে এমনটিও দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও তার লোকজনের হাতে নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।তবে এসব অভিযোগ অস্বীকারই করেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। জানতে চাইলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম যুগান্তরকে বলেন, কিছু সুবিধাবাদী লোক দলে অনুপ্রবেশ করে এসব ঘটাচ্ছে। দলীয় কোন্দলে কোনো খুনোখুনির ঘটনা ঘটেনি। যদি কোথাও এমন কিছুর প্রমাণ মেলে, দল ও সরকার অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। দলীয়ভাবে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। যারা অপরাধ করছে তাদের আইনগত প্রক্রিয়ায় বিচার হবে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সর্বশেষ মঙ্গলবার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মাদারীপুরের শিবচরে আওয়ামী লীগের দুপক্ষের গোলাগুলিতে দুজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন- কুতুবপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আরশেদ মাদবর ও স্থানীয় দোকানদার শাজাহান দরানী।
একই দিন বরিশালে গণপূর্ত বিভাগের সাড়ে ৪ কোটি টাকার টেন্ডার জমা দেয়া নিয়ে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক ও বিএম কলেজের মঈন তুষার গ্র“পের সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হয়। সংঘর্ষের সময় র‌্যাব ও পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকলেও দুপক্ষই ক্ষমতাসীন দলের হওয়ায় অ্যাকশনে যেতে পারেনি। আগের দিন সোমবার ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সোনাপুরে আধিপত্য নিয়ে যুবলীগের দুগ্রুপের বিরোধে গুলিতে আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড সভাপতি আজিজুল হক নিহত হন। এ ঘটনায় আরও চারজন গুরুতর আহত হন। স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী রহিম উল্যাহ যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, তার কর্মসূচি থাকলেই জেলার সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর লোকেরা বাধা দেয়। এমনকি রাস্তা থেকে তার লোকজন ভিজিএফ, দুস্থ ভাতাসহ ত্রাণের মালামালও লুট করে নেয়।
রোববার এক মতবিনিময় সভায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের সামনেই দ্বন্দ্বে জড়ান ঢাকা-১৪ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মো. আসলামুল হক ও স্থানীয় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিন। একে অপরকে হুমকি-ধমকিও দেন।
গত ১০ মে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে আওয়ামী লীগের দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হন। সাতগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াদুদ মিয়া ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইব্রাহীম ইবুর সঙ্গে চলা দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এ সংঘর্ষ হয়।
২ মে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ও ময়মনসিংহ পৌর মেয়র একরামুল হক টিপু গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ৫ জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।
সম্প্রতি কুমিল্লা ও দিনাজপুরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে কয়েকজন নেতাকর্মী হতাহত হন। এর মধ্যে কুমিল্লায় শহর সভাপতি এবং দিনাজপুরে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হন। দুটি ঘটনাতেই কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ইন্ধন ছিল। কুমিল্লায় রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক এবং স্থানীয় নেতা বাহারের আশ্রয়-প্রশয় এবং দিনাজপুরে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর ইন্ধনেই এসব খুনের ঘটনা ঘটে।
একই অবস্থা ফরিদপুরের রাজনীতিতেও। এখানে মূল দল আওয়ামী লীগেই দ্বন্দ্ব। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ ও স্থানীয় এমপি নিক্সন চৌধুরীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। মূলত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে শুরু হওয়া এ দ্বন্দ্বেও জেরে এ পর্যন্ত হওয়া সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত ও কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুন হন ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও ফুলগাজী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক একরাম, নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজন, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে খুন হয়েছেন চীন শাখা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুল আলম মারুফ, রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মংক্য মারমা, সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু রায়হান, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় বালুয়াকান্দি ইউনিয়ন পরিষদেও চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুদ্দিন প্রধান, যশোরে যুবলীগের সভাপতি আলমগীর হোসেন এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রউফ।
২০১৪ সালের ২০ মে প্রকাশ্য দিবালোকে জনবহুল স্থানে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও ফুলগাজী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক একরামকে গুলি করে ও পুড়িয়ে মারা হয়। এর কিছু দিন আগেই ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে দিনে-দুপুরে অপহরণ করা হয়। এ সাতজনের পাঁচজনই সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যায় তাদের মৃতদেহ ভেসে ওঠে। দুটি ঘটনাই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল। দলীয় কোন্দলের কারণেই নরসিংদীর জনপ্রিয় মেয়র লোকমান, ২০১৩-এর ২৯ জুলাই রাতে গুলশানে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কি এবং খুলনায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা বিশাল হত্যাকাণ্ড।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের কাছে তার মন্তব্য চাইলে তিনি বলেন, যেখানে পুরো সরকারি ব্যবস্থাই ফায়দাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল সেখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিবাদ স্বাভাবিক। কেননা জনগণের কল্যাণ নয়, নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগিতেই ব্যস্ত নেতাকর্মীরা। ফায়দার তুলনায় ফায়দাকাক্সক্ষী অনেক বেশি। ফলে তারা সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি। কেননা, পরবর্তী সময়ে বাজেট আরও বাড়বে আর সুবিধাবাদীরাও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগ দেবে। সাময়িকভাবে ক্ষমতাসীন নেতাকর্মীদের জন্য এটা ভালো মনে হলেও এই প্রক্রিয়া ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে বলে মন্তব্য করেন সুজন সম্পাদক। তিনি বলেন, মানুষ অন্যায়ের শিকার হলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে, আর রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য জনকল্যাণ ব্যাহত হবে। সুত্রঃ যুগান্তর

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ০৪ জুন ২০১৫

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৫:২৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com