নিউইয়র্কে পাঁচ বছরে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে শতগুণঃ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষ

রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০১৪

নিউইয়র্কে পাঁচ বছরে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে শতগুণঃ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষ

 

mashবর্ণমালা নিউজ, নিউইয়র্ক : যশোরের চন্দনা সরকার সব সময়ই নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস থেকে পুরো মাসের বাজার করেন। এক দোকানে সব ধরনের কাঁচা বাজার, মাছ, মাংস, মসলা কেনা যায় বলে গত ১০ বছর ধরে তার কাছে সব কিছুর দাম মুখস্ত। আর সে কারণেই এখন বাজার করতে আসলে তার মুখ বিরক্তিতে ভরে থাকে। কারণ এখন সব কিছুর দাম আকাশ ছোঁয়া। তার মতো নিউইয়র্কে বসবাসকারী আর দশটি পরিবারেরও একই অবস্থা। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে শতগুন। কিন্তু বেতন, ভাতা, আয় বাড়েনি সেই তুলনায়। আর সে জন্যই নিউইয়র্কবাসীর এখন বাংলাদেশের মতোই ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থা।


জ্যাকসন হাইটসসের সব্জিমন্ডি, মান্নান গ্রোসারী, আপনা বাজার, হাট বাজার, তিতাস গ্রোসারী, মিনা বাজার, জ্যামাইকার ফাতেমা গ্রোসারী, কাওরান বাজারসহ আরও অনেকগুলো নিত্য প্রয়োজনীয় দোকার সরেজমিন ঘুরে দেখা জানান গত পাঁচ বছরে নিত্য প্রয়োজনীয় বহু জিনিসের দাম একশ থেকে তিনশ গুন বেড়েছে। আর অধিকাংশ জিনিসের দাম ৪০ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত বেড়েছে।

নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ এশিয়ানরা সাধারণত ভাত, মাছ, শাক-সব্জি থেকে পছন্দ করে। এর সাথে গরু, খাসী এবং মুরগী খেতেও পছন্দ করেন। কিন্তু এসব কিছুর দামই এখন আকাশছোঁয়া। সংসারের প্রয়োজনে এসব বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে কিন্তু তার জন্য করতে হচ্ছে অক্লান্ত পরিশ্রম। সংসারের প্রয়োজণীয় জিনিসের বাইরে আর ছোট সন্তানদের হাতে বেহিসেবি হয়ে একটা চকোলেট, ক্যান্ডি বা চিপস তুলে দিতেও অনেক ভাবতে হচ্ছে অভিবাবকদের।

পাঁচ বছর আগে ২০ পাউন্ডের যে চালের বস্তার দাম গড়ে ১০ থেকে ১২ ডলার ছিল, সেই চালের বস্তার দাম এখন ২৫ ডলার। একইভাবে মশুর, মুগ, খেসারী, বুটের ডালের দামও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। এক পাউন্ড গরুর মাংসের দাম যেখানে ছিল মাত্র দুই ডলার সেটা এখন বেড়ে দাড়িয়েছে সাড়ে তিন থেকে চার ডলারে। তিন ডলারের খাসির মাংসের পাউন্ড এখন সাত ডলারের কাছাকাছি। মুরগীর মাংসের দামও বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। পাঁচ লিটারের দুধের দাম দুই ডলার থেকে বেড়ে এখন চার ডলার। এক ডলারের ডিমের ডজন এখন ক্ষেত্রভেদে আড়াই থেকে সাড়ে তিন ডলার। মশলার দাম পাঁচ বছর আগের তুলনায় শতভাগেরও বেশি বেড়েছে। বেড়েছে বাংলাদেশী মাছসহ অনান্য দেশ থেকে আসার মাছের দামও। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসা ইলিশ মাছ কেনা এখন স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য স্বপ্নের মতো। মূল্যবৃদ্ধির কথা স্বীকার করেছেন জ্যাকসন হাইটসের মান্নান গ্রোসারীর স্বত্তাধিকারী সাঈদ এ মান্নান এবং জ্যাকসন হাইটস ব্যবসায়ী সমিতির সাধারন সম্পাদক ও ৩৭ এভিন্যুর তিতাস গ্রোসারীর মালিক আবুল ফজল দিদারুল ইসলাম।

জ্যামাইকা ১৬৯ এবং জ্যাকসন হাইটস এর কাঁচাবাজারের দোকানগুলোতে ঘুরে কথা হয়, গৃহিনী কামরুনেচ্ছা বেগম, আব্দুল জব্বার, মিয়া মনসুর, রেহানা জুথি, আমেনা ইসলাম, হাছান আলী, গোলাম আম্বিয়াসহ আরও কয়েকজন ক্রেতার সাথে। হাসান আলী আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে সেটা নিয়ে নিউজ হয়, প্রতিবাদ হয় কিন্তু এদেশে ক্রেতা আর বিক্রেতা ছাড়া কেউ জানতেও পারেনা তা। তিনি দুঃখ করে বলেন, আগে সপ্তাহ শেষে যে আয় হতো তা দিয়ে বাজার সদাই করার পরেও কিছু অর্থ জমানো যেতো। এখন বাজার সদাই করে বাড়ি ভাড়া দিয়ে কোন রকমে কষ্টেশিষ্টে চলে যায়। এক ডলারও জমানোর কোনো সুযোগ থাকে না।

কামরুন্নেছা বলেন, এসেছিলাম ইলিশ মাছ কেনার জন্য, কিন্তু দাম শুনে এখন ইলিশের পরিবর্তে রুই মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছি। একই ধরণের কথা বললেন রেহানা যুথি। তিনি গত ছয় মাসেও একটা ইলিশ কিনতে পারেননি ইচ্ছা থাকা সত্বেও। একই ধরণের দুঃখ করলেন অন্যরাও। কিন্তু নিরুপায় সবাই বাজার সদাই করছেন এখন জীবনের প্রয়োজনে। বিলাসিতা করে, শখের বশে কিংবা মনের টানে আর কিছুই কিনতে পারছেন না স্বল্প আয়ের কোনো মানুষ।

দোকান মালিকরা জানান, বাংলাদেশ থেকে সাধারণত ইলিশ ও অনান্য মাছ এদেশে আসে। কিছু কালিজিরা চাল আসলেও সেটার দাম খুব একটা বাড়েনি। কিন্তু মিয়ানমান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম বা অন্য দেশ থেকে যেসব মাছ আসে সেসবের দাম বেড়েছে বহুগুন। অভিযোগ আছে যে এসব দেশ থেকে আসা মাছকে বাংলাদেশী মাছ বলে ক্রেতাদের প্রতারিত করছে কোন কোন গ্রোসারী। আর বিমানে আসা তাজা মাছ নিয়ে এখনও সন্দেহ রয়ে গেছে ক্রেতাদের মাছে। ফরমালিন ছাড়া এই মাছ কিভাবে দুইতিন দিন তাজা তাকে তা নিয়েও প্রশ্ন অনেকের।

এদিকে পুরো আমেরিকায় উপমহাদেশীয় গ্রোসারী গুলোতে চালের সরবরাহ আসে ভারত থেকে। কিছু কিছু আসে পাকিস্তান থেকেও। কয়েক বছর আগে ভারতে চালের মূল্যবৃদ্ধির জের ধরে আমেরিকাতেও ভারতীয় চালের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। এদিকে বিশাল বাংলাদেশী কমিউনিটির ব্যবসা পেতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের চালের বস্তায় সুন্দর সুন্দর বাংলা নাম ব্যবহার করছে।

দুই ব্যবসায়ী সাঈদ এ মান্নান এবং আবুল ফজল দিদার জানালেন, বাংলাদেশের মতোই এদেশেও যে জিনিসের চাহিদা বেশি থাকে তার দাম বেড়ে যায়। আমদানী নির্ভর প্রায় সব ব্যবসাই আমেরিকানরা নিয়ন্ত্রণ করে বলে তারা যখন ইচ্ছা দাম বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে যে সব জিনিসের চাহিদা এশিয়ানদের কাছে বেশি তার দামও বেশি। রোজার সময় বা কোরবানীর ঈদের আগে গরু, খাসি, মুরগীর দামও তারা বাড়িয়ে দেয় বেশি চাহিদার কারণে। দাম বাড়ানোর ব্যাখ্যা দিয়ে আবুল ফজল দিদার বলেন, যেহেতু চাহিদার সময় বেশি সাপ্লাই দিতে হয়, তাই ম্যানপাওয়ার বেশি লাগে এবং বেশি সময় কাজ করাতে হয় ওভার টাইম দিয়ে। তাই তারা দাম বাড়ায় বলে দিদারের মতামত। একই ব্যাখ্যা সৈয়দ মান্নানেরও।

সৈয়দ মান্নান বলেন, আমি চেষ্টা করি নিজে কম লাভ করে ক্রেতাকে সাশ্রয়ী দামে দিতে। কিন্তু মূল সাপ্লাইয়ের জায়গা থেকে দাম বাড়িয়ে দেয়া হয় বলে ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় সেটা কমানো যায় না। তবে মাংশ কেনার ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, অষ্ট্রেলিয়ান হালাল ফ্রোজেন গোট দামে সস্তা আর খেতেও মজা। এটা ফ্যাটলেস। তাছাড়া মাংস কম খেয়ে তিনি মাছ খাওয়ার জন্যও পরামর্শ দেন। তার মতে, কাঁচা সব্জিসহ মাছ, মাংস সব কিছুই আমেরিকানদের নিয়ন্ত্রণে বলেই এখানে দাম বাড়ানোর সাথে তাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের কিছু করার থাকে না।

উডসাইডের বিসমমিল্লাহ পোলট্রির মালিক তরুন ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানালেন, গত ৬ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বিভিন্ন মাংসের দাম পাউন্ড প্রতি গড়পড়তা ৫০ সেন্ট থেকে ১ ডরার বেড়েছে। আর গত রমজান মাসে মুরগীর মাংস পাউন্ড প্রতি প্রায় ২ ডলার বেড়েছিল। এখন যে দামে মুরগীর মাংস কিনছেন মানুষ তার দাম পাউন্ড প্রতি কমপক্ষে ১ ডলার কম ছিল। সালাম জানালেন খাসীর মাংসের মূল্যও বছর ঘুরতে না ঘুরতে ১ ডলার বেড়েছে প্রতি পাউন্ড। গরুর মাংস পাউন্ড প্রতি বেড়েছে ৫০ সেন্ট।

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ২:৪৭ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com