নিউইয়র্কের বাংলা সংবাদপত্রের একাল-সেকাল

শনিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

নিউইয়র্কের বাংলা সংবাদপত্রের একাল-সেকাল
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদপত্রঃ ছবি সংগৃহীত

১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক থেকে আমরা প্রথম যখন সাপ্তাহিক ঠিকানা বের করি, তখন এবং এখন এই ২০১৯ সালের মধ্যে যথেষ্ট ফারাক। এটা শুধু সময়ের নয়, পারিপার্শ্বিক অবস্থারও। ওই সময় আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে যোগাযোগ সহজ ছিল না, ব্যয়বহুল তো ছিলই। তখনো চিঠিপত্রই ছিল যোগাযোগের প্রধান বাহন। ফোন যোগাযোগ শুধু ব্যয়বহুলই নয়, বাংলাদেশের সব জায়গায় এখন যেভাবে সহজে পৌঁছানো যায়, তা সম্ভবই ছিল না। এখন ডিজিটাল যুগ, মোবাইল ও ইন্টারনেটে মুহূর্তে প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছানো যায়। সে সময় তা ছিল কল্পনামাত্র। ফোন–সুবিধা ছিল প্রধান প্রধান শহরে। একটা সংযোগের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হতো। গ্রামের আত্মীয়স্বজন শহরে ফোনওয়ালা কারও বাসা বা অফিসে আসতেন প্রবাসী নিকটজনদের সঙ্গে কিছু কথা বলতে। ফোনকলের মূল্য ছিল মিনিটপ্রতি তিন-চার ডলার। ফোন কার্ডের প্রচলন তখনো শুরু হয়নি। সে সময় আমার বাসার ফোনে একটিমাত্র ওভারসিজ কলে ৮৫ ডলার বিল দেখে আঁতকে উঠেছিলাম।

দেশের ও প্রবাস কমিউনিটির খবরাখবর জানার ব্যাপক চাহিদা পূরণে সে সময় সাপ্তাহিকীর আত্মপ্রকাশ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। যদিও তখন একটি পাক্ষিক (প্রবাসী) ও আধা ঘণ্টার বেতার অনুষ্ঠান (পদ্মার ঢেউ) ছিল; কিন্তু বর্ধিষ্ণু কমিউনিটির চাহিদা পূরণে তা যথেষ্ট ছিল না। পরে আধা ঘণ্টার একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানও (রূপসী বাংলা) যোগ হয়। কিন্তু সাপ্তাহিকীর ফ্রিকোয়েন্সির সঙ্গে এর তুলনা করা যায় না। তাই অতি সহজেই সাপ্তাহিকটি ব্যবসায়িকভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। এ ছাড়া প্রকাশনার দিনক্ষণ মেনে চলা, ভালো বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পত্রিকাটি তখন নিউইয়র্ক ও এর বাইরে অধিকাংশ প্রবাসীর ঘরে পৌঁছে যায়। পত্রিকার এ অপ্রতিরোধ্য গতি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় সাপ্তাহিক বাঙালি ও বাংলা পত্রিকা প্রকাশের পর।
পত্রিকাগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা গড়ে ওঠে। ইতিবাচক দিক হলো, এ প্রতিযোগিতার ফসল পেলেন পাঠকেরা। শুধু পৃষ্ঠা সংখ্যার দিক থেকেই পত্রিকা বড় হলো না, এর সঙ্গে বিস্তৃতি ঘটল নিজস্ব সাংবাদিকতার। কার কটা এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট প্রকাশ হলো, কমিউনিটির খবরাখবর কে বেশি যত্ন নিয়ে ছাপল, এসব বিষয়ও প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত হলো। এর সঙ্গে সুন্দর অঙ্গসজ্জা, সাহিত্য, খেলা, বিনোদন, ফ্যাশন, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পাতা সংযোজন করে পত্রিকাকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা চলতে থাকল। পাঠক চাহিদার এক বড় অংশ ছিল নামী কলামিস্টদের কলাম। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, এবিএম মূসা, নির্মল সেন, মতিউর রহমান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বদরুদ্দীন উমর, শফিক রেহমান, আতাউস সামাদ প্রমুখের লেখা আগেভাগে কীভাবে ছাপা যায়, তার নীরব প্রতিযোগিতাও ছিল। ঢাকার পত্রিকায় প্রকাশিত এসব কলামসহ রিপোর্ট, খেলা, সিনেমা ইত্যাদি সব বিষয় আসত ইন্টারনেটে। এ ব্যাপারে ঢাকায় একটা সার্ভিস গড়ে উঠেছিল। তাঁরা ব্রাউজ করে, অথবা কম্পোজ করে সব আইটেম বিদেশের গ্রাহকদের (প্রবাসের পত্রিকা) কাছে পাঠাতেন এবং মাসোহারা পেতেন। সম্ভবত এখন এ সার্ভিস নেই। কারণ অনলাইনে তো সবই পাওয়া যায়।
১৯৯৬ সালে আমার সম্পাদনায় বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয়। কিছুদিন পর কলামিস্ট আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর নিউইয়র্ক সফরকালে আমাদের পত্রিকায় একান্তভাবে লেখার জন্য তাঁকে অনুরোধ করি। তিনি রাজি হন, তবে একটু ভিন্নভাবে। যে লেখা আমাদের দেবেন, একই লেখা ঢাকার একটি দৈনিকেও যাবে। আমাদের পত্রিকা সোমবার প্রকাশিত হয়, ঢাকার দৈনিকেও যাবে সোমবারে। সুতরাং লেখাটি আমাদের প্রায় একান্তই থাকল, নিউইয়র্কের জন্য তো টাটকাই। আমরা রাজি হলাম এবং লেখার সম্মানীও নির্ধারণ হলো। এভাবে চলল কিছুদিন। আমরাও গর্বের সঙ্গে বলতে পারলাম, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী একান্তভাবে আমাদের জন্য লিখছেন। আফসোস, বেশি দিন এভাবে চালানো গেল না। সমস্যা দেখা দিল; ফ্যাক্সের জটিলতা বা অন্য কোনো কারণে লেখাটি আমাদের কাছে সময়মতো না পৌঁছালে এটি আর আমাদের থাকত না। ঢাকার দৈনিকে যথারীতি প্রকাশের পর তা প্রবাসের পত্রপত্রিকায় সঙ্গে সঙ্গে পুনর্মুদ্রিত হয়ে যেত, ওটা আর আমাদের একান্ত থাকত না। এক সপ্তাহ পর এটা ছাপার আর কোনো কারণ থাকতে পারে না। এ বিষয়ে আলাপ করলাম আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং দুষলেন লন্ডনের সামাদ সাহেবকে। উল্লেখ্য, সামাদ সাহেবই প্রথম ঢাকার পত্রিকার সবকিছু কম্পোজ করে বিদেশে পাঠানোর এই সার্ভিস চালু করেন। সুতরাং এখানেই ইতি ঘটল বিশেষ ব্যবস্থায় আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা ছাপানোর।
এবার শফিক রেহমানের যায়যায়দিন–এর লেখা ছাপানো প্রসঙ্গ। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর মতো শফিক রেহমানের লেখাও বিভিন্ন পত্রিকা ছেপে থাকে। আমরা ভাবলাম যদি লেখাটা সবার আগে আমরা পাই, তাহলে পত্রিকা আরও আকর্ষণীয় করা যেত। শফিক রেহমানের নিউইয়র্ক সফরকালে আমাদের ইচ্ছার কথা তাঁকে জানালাম। তিনি সানন্দে রাজি হলেন। কথা অনুযায়ী তাঁর কলামটি ঢাকার এক দিন আগেই নিউইয়র্ক থেকে আমাদের পত্রিকায় বের হবে। যায়যায়দিন ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় মঙ্গলবার, আর আমাদের পত্রিকা বের হয় সোমবার। সোমবার যখন আমাদের পত্রিকা বাজারে যায়, তখন ঢাকার সময় সোমবার রাত ৯–১০টা। এর ৮–১০ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় বের হয় যায়যায়দিন। এভাবেই চলল কয়েক সপ্তাহ। এটা জানাজানি হয়ে গেল যে, শফিক রেহমানের কলাম তাঁর পত্রিকার আগেই বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ফলে এই ব্যবস্থা আর অব্যাহত রাখা সম্ভব হলো না লেখকের ইচ্ছানুযায়ীই। তিনি একটি টেকনিক্যাল কারণের কথা জানালেন। তাঁর লেখায় এমন বিষয়বস্তু থাকতে পারে, যা আগেভাগে জানলে সরকার সাময়িকীর বাজারজাত আটকে দিতে পারে। সুতরাং এ ঝুঁকি তিনি নিতে চাইছেন না। এভাবে তাঁর লেখাও সবার হয়ে গেল, আমাদের একান্ত থাকল না।
এ ব্যাপারে এবিএম মূসা ছিলেন খুবই উদার। নিউইয়র্কে এক আড্ডায় তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মূসা ভাই, আপনার লেখা তো সবাই ছাপছে। কেউ কি কখনো অনুমতি নিয়েছে? আপনার মতামত কি?’ উত্তরে এবিএম মূসা বললেন, ‘অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই। সবাইকে জানিয়ে দিন, আমার লেখা যে কেউ ছাপতে পারেন।’
বর্তমানে নিউইয়র্ক থেকে বাংলায় প্রায় কুড়িটি সাপ্তাহিকী ও সাময়িকী বের হচ্ছে। এ ছাড়া বের হয়ে কিছুদিন চলার পর বন্ধ হয়ে গেছে আরও ডজনখানেক পত্রিকা। নিউইয়র্কে প্রথম আলোর আত্মপ্রকাশ বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক ঘটনা। পত্রিকাটি অর্ধেকের বেশি পথ এগিয়ে রয়েছে শুধু তাঁর নামের কারণে। আর বাকিটুকু অর্জিত হচ্ছে পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালা, গুণগত মান, নিজস্ব কলাম, রিপোর্ট, আকর্ষণীয় অঙ্গসজ্জা ও কর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ একদল তরুণ লেখকের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, যাঁরা প্রতি সপ্তাহে আকর্ষণীয় কলাম, রিপোর্ট, অনুবাদ পাঠকদের কাছে হাজির করছেন, যা এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বহুলাংশে। প্রতিযোগিতায় শীর্ষে থাকতে চাইলে এই প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।
সংবাদপত্রের সহকর্মী কোনো কোনো বন্ধু জিজ্ঞেস করেন, পত্রিকার কদর বাড়াতে তাঁরা আর কী কী করতে পারেন। আমি কলকাতার সানন্দা সাময়িকীর শর্মিলা বসুর একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলি, ‘মান উন্নত করুন, প্রকাশনা অবশ্যই জনপ্রিয় হবে।’ কারণ, পণ্যের গুণগত মান ঠিক থাকলে, বাজারজাতকরণে তার সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
লেখক: নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক।


শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ফেব্রুয়ারি ০৬ ,২০২১

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ২:১৫ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com