নগরের পরিধির সঙ্গে সেবাদানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

শনিবার, ২১ মে ২০১৬

নগরের পরিধির সঙ্গে সেবাদানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

নগরের পরিধির সঙ্গে সেবাদানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে
ধীরাজ নাথ

 


Muktoঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিধি বেড়েছে। সম্প্রতি সরকারি এক সিদ্ধান্তে ১৬টি গ্রাম হয়ে গেল শহর এবং সংযুক্ত হলো ঢাকা মহানগরীর সঙ্গে। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ৯ মে, ২০১৬ তারিখে অনুষ্ঠিত এক সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ৮টি করে মোট ১৬টি গ্রামীণ ইউনিয়ন যুক্ত হবে, যার ফলে এই দুটি মহানগরের আয়তন প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত হবে বেরাইদ, বাড্ডা, ভাটারা, সাঁতারকুল, হরিরামপুর, উত্তরখান, দক্ষিণখান এবং ডুমনি (খিলক্ষেত) ইউনিয়ন সমূহ। একইসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যেসকল ইউনিয়ন যুক্ত হবে তা হচ্ছে, শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল, সারুলিয়া, ডেমরা, মান্ডা, দক্ষিণগাঁও এবং নাসিরাবাদ ইউনিয়ন। উত্তর সিটি করপোরেশনের আয়তন ৮২.৬৩৮ বর্গ কিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হবে প্রায় ১৬০.৭৬৮ বর্গ কিলোমিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান আয়তন ৪৫ বর্গকিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হবে ১০৯ বর্গ কিলোমিটার। দুটি সিটি করপোরেশনে আগে ছিল মোট ৯৩টি ওয়ার্ড যা এখন হবে ১২১টি ওয়ার্ড। বিশাল এক শহর হতে চলেছে বৃহত্তর ঢাকা মহানগরী।

সম্প্রসারিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) ৪০ ভাগ এলাকা। নিতান্ত অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইলসহ আশেপাশের এলাকায় নাগরিক সুবিধা দিতে এবং জায়গা-জমির ভেজাল মীমাংসা করে হোল্ডিং ট্যাক্স বসাতে হিমশিম খেতে হবে মেয়র মহোদয়কে। এসকল এলাকায় বিশেষত ডেমরা-সারুলিয়া ডিএনডি বাঁধ এলাকায় জলাধার -খাল-বিল দখল করে যেভাবে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে এবং পানি নিষ্কাশন প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। অনেক স্থানে বিদ্যুত্ এবং স্যানিটারি পায়খানার দারুণ অভাব।

একইভাবে উত্তরে সিটি করপোরেশনের অধীনে সংযুক্ত হওয়া ভাটারা, বেরাইদ, ডুমনি এলাকায় সড়ক নেই বললেই চলে এবং পয়ঃনিষ্কাশন অত্যন্ত নাজুক। অনেক স্থানে আবাসন কোম্পানিসমূহ খাল-বিল ভরাট করে ফেলেছে বাধাহীনভাবে। ডিটেইল্ড এরিয়া প্লানে কোনো কোনো স্থানে খাল দেখানো হয়েছে ১৩০ ফুট, অথচ আছে ১৫ ফুট। এছাড়া এসকল এলাকায় বিদ্যুত্ ও গ্যাসের আছে তীব্র সংকট। যার অর্থ হচ্ছে প্রচুর সদিচ্ছা থাকলেও উত্তরের মেয়র মহোদয়কে গুলশান-বনানী এলাকা ছেড়ে বাড্ডা, সাঁতারকুল, ডুমনি, হরিরামপুরে মনোযোগ ও বিনিয়োগ করতে হবে অনেক বেশি। কিন্তু কোথায় পাবেন অর্থ? কোথায় তার জনবল?

যখন রংপুর এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হয়, তখনো দেখা যায় বেশকিছু গ্রামকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাত্ মানুষ শহরে অভিবাসন করেনি, শহর গিয়ে হাজির হয়েছে তাদের দুয়ারে। কিছুদিনের মধ্যে হয়তো ফরিদপুর সিটি করপোরেশন এবং ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন ঘোষিত হবে। এই দুটি শহরের আশেপাশে অবস্থিত বেশকিছু গ্রাম আছে তারাও শহর বলে চিহ্নিত হতে পারে। শহরমুখি অভিবাসন নয়, এ হচ্ছে শহরের পরিধি বিস্তারের লক্ষ্যে গ্রাম দখল। বিচিত্র এবং অভিনব এক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। বড় প্রশ্ন হচ্ছে, শহর ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্রশ্ন। পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুত্ প্রদানসহ পরিকল্পিত একটি আবাসিক নিবাসের ভাবনা।

প্রতিটি পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন হচ্ছে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, যারা তাদের বাজেট প্রণয়ন এবং ব্যয় নির্ধারণ করতে সক্ষম। কিন্তু তাদের আয়ের উত্স কি এবং কাজের পরিধি কি? সিটি করপোরেশন আইনের চতুর্থ তফসিলে আয়ের উত্স সম্পর্কে বলা আছে। তাতে উল্লেখ আছে ইমারতও জমির বার্ষিক মূল্যের ওপর করসহ (হোল্ডিং ট্যাক্স) ২৬ প্রকারের কর আদায়ের ক্ষমতা। উপকর, রেইট, টোল ও ফিস ইত্যাদি করপোরেশনের আয়ের উত্স। জনগণ শহরে বাস করবে কিন্তু কর দিতে রাজি নয়।

যাদের গ্রাম এখন শহর হয়েছে তারা কর দেয়ার কথা ভাববে না। কারণ গ্রামে চৌকিদারী ট্যাক্স ছাড়া অন্য কোনো কর দেওয়ার কথা তাদের মনের মধ্যে নেই। এছাড়া শহরে আছে বস্তিবাসী, তারা কর দেয় না, কারণ তাদের হোল্ডিং নাম্বার নেই। নগর কর্তৃপক্ষ মনে করে তারা হচ্ছে অননুমোদিত আবাসস্থল, যে কোনো সময় তাদেরকে উত্খাত করা যেতে পারে। অথচ ঢাকা শহরে বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৩৩ শতাংশ, যারা ট্যাক্স দেওয়ার কথা ভাবতেই পারে না। তাদের ৯০ শতাংশ যৌথভাবে শৌচাগার ব্যবহার করে, পানির সঙ্কটে কাটে তাদের দিনরাত।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ এর তৃতীয় তফসিল অনুসারে ২৮টি শিরোনামে ১২৫টি কার্যাবলির সম্পাদনের কথা বলা হয়েছে সিটি করপোরেশনকে। এসবের মধ্যে আছে জনস্বাস্থ্য, আবর্জনা অপসারণ, কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা, জন্মমৃত্যু এবং বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণ, পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন, কসাইখানা ব্যবস্থাপনা, ইমারত নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা বিধান, প্রমোদ উদ্যান সংরক্ষণ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ সাধন ইত্যাদি। এক কথায় সবুজ ও পরিচ্ছন্ন এবং নিরাপদ নগরী জনগণকে উপহার দেয়া তাদের দায়িত্ব। কিন্তু তাদের সক্ষমতা কোথায়?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন তাদের বাজেটের ৬০ শতাংশ নিজেদের আয়ের উত্স থেকে ব্যয় বহন করতে পারে মাত্র, অবশিষ্টের জন্যে হাত পাতে কেন্দ্রিয় সরকারের কাছে। তাই দেখা যায় সিটি করপোরেশনের নিজস্ব স্বাস্থ্য সেবা নেই বললেই চলে, মশার ওষুধ ক্রয়ের ক্ষমতা থাকে না। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার সার্বিক দায়িত্ব নগর কর্তৃপক্ষের, তারা অনেক ক্ষেত্রে অপারগ। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। তাছাড়া আছে পরিবেশ সংরক্ষণের ভাবনা।

এমন সামাজিক ও আর্থিক পরিস্থিতি সামনে রেখে বাংলাদেশের ছোট-বড় নগরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৌরসভা সমূহ, এ বি সি যেই ক্যাটাগরির হোক না কেন নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই কারো। কেন্দ্রিয় সরকারের কাছে থোক বরাদ্দের জন্যে স্থানীয় সরকার বিভাগে ধরনা দেয় মেয়র মহোদয়গণ বা তাদের নির্বাহী কর্মকর্তাগণ প্রতিনিয়ত। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে পৌরসভার সংখ্যা ছিল মাত্র ৮০টি, এখন সেখানে পৌরসভার সংখ্যা হচ্ছে ৩২৬টি এবং ১১টি সিটি করপোরেশন। উপজেলার সংখ্যা নবগঠিত কর্ণফুলিকে নিয়ে দাঁড়ালো ৪৯০টি। ভবিষ্যতে নগর জীবন হবে গণমানুষের আবাসস্থল, গ্রামীণ জীবন হবে গল্প কবিতার বিষয়বস্তু।

নগর হচ্ছে প্রগতির ইঞ্জিন এবং সভ্যতার সূতিকাগার। নগর হলো নিত্য নতুন চিন্তার মহাসড়কের সংযোগ, বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা ও উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডের অধিক্ষেত্র। তাই নগর সবাইকে আকর্ষণ করে, অর্থ বিত্ত এবং আয়-উপার্জনের সন্ধানে জনগণ ছুটে আসে নগরে, অভিবাসনের লক্ষ্যে। বাংলাদেশও কোনো ব্যতিক্রম নয়। সমগ্র দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে ১.৩ হারে, অথচ শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হচ্ছে প্রায় ৪.৫০ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী শহরে জনসংখ্যা বাড়ছে এবং বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৭০ শতাংশ লোকজন শহরে বসবাস করে। তবে বাংলাদেশে এখন মাত্র ২৮ শতাংশ লোকজন শহরবাসী যা ১৯৭৪ সালে ছিল মাত্র ৮ শতাংশ।

জনমিতি বিশারদদের হিসেব এবং বিভিন্ন সমীক্ষার ফলাফল হচ্ছে বাংলাদেশে ২০৩৯ সালে ৫০% লোকজন হবে শহরবাসী এবং ২০৫০ সালে প্রায় ৭০ শতাংশ লোকজন শহরে বসবাস করবে।

সবার উপর হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার এবং সদিচ্ছা। পাঁচটি সিটি করপোরেশনে ২০১৩ সালে যে সকল মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তাদের প্রায় সবাই এখন কারাগারে। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টির সঙ্গে সুশাসনের অভাব দৃশ্যমান হচ্ছে, আবার অনেক সময় রাজনীতি তাদেরকে বিপদগ্রস্ত করেছে। তবে সুশাসনের অভাব হচ্ছে ব্যাপক এবং প্রায় সর্বত্র।

আয়ের উত্স না থাকলে সেবার পরিধি বাড়বে কেমন করে? নগর থেকে সরকার ভ্যাট আদায় করে প্রচুর, তার ৫ শতাংশ নগর সমূহের সেবাদানের জন্যে বরাদ্দ করা যেতে পারে। কেন্দ্রিয় সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভর একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা তার সীলমোহর দিয়ে আইনি অধিকার কিভাবে প্রতিষ্ঠা করবে? এমন সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে শহর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে।

এসবের মাঝেও অনেকের ধারণা নগরের সম্প্রসারণ ও আকর্ষণ কেউ বন্ধ করতে পারবে না। নগর প্রশাসনে উত্কর্ষ সাধিত হবে, নগরভিত্তিক জীবনযাত্রার ব্যাপ্তি ঘটবে, এসবই হচ্ছে দেশবাসীর প্রত্যাশা। একইসঙ্গে সেবার পরিধি না বাড়াতে পারলে, নগর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি না হলে, মানুষ বলবে চাই না এই নাগরিক সভ্যতা, ফিরিয়ে দাও সেই অরণ্য।

শনিবারের চিঠি/আটলান্টা/ মে ২১, ২০১৬

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২১ মে ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com