দূর্নীতি, বেকারত্ব দূর করতে আব্দুল আউয়াল বাঙালি জাতির কর্ণধার হতে চায়

সোমবার, ২২ আগস্ট ২০২২

দূর্নীতি, বেকারত্ব দূর করতে আব্দুল আউয়াল বাঙালি জাতির কর্ণধার হতে চায়
স্বপ্নবাজ আব্দুল আউয়াল [ ছবিঃ প্রতিনিধি ]

দীর্ঘ ২২ বছর ধরে আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে শিক্ষাকতা করছি। আমার শিক্ষাকতার জীবনে  অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে পড়িয়েছি। তাদের মধ্যে অনেকে পাশ করে আজ বড় বড় দায়িত্বও পালন করছে কেউ কেউ। ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকে কেউ লেখা পড়ায়  অনেক মনোযোগী হয় কেউ রাজনীতিতে মনোযোগী হয়।  আবার কেউবা প্রচন্ড রকমের অমনোযোগীও হয় লেখাপড়ায়।

কিন্তু আমার কাছে মনে হয়,একজন ছাত্রকে অবশ্যই সৎ আদর্শ মানুষ হতে হবে দেশকে ভালবাসতে হবে সবার প্রথমে।


প্রতিবছরের মতো এবছরও আমাদের কলেজে একাদশ শ্রেণীতে অনেক ছাত্র ভর্তি হয়েছে।তাদের মধ্যে একজন ছাত্র যার নাম আব্দুল আউয়াল। যে নিয়মিত ক্লাস করে ক্লাসের প্রতিটি পড়া করে আসে বাড়ি থেকে। লক্ষ্য করলাম গান, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক সবকিছুতেই তার দারুণ আগ্রহ।  ক্লাসের প্রতিদিনের পড়ার পাশাপাশি সময় পেলে আমি ছাত্র-ছাত্রীদের সাধারণত গান,আবৃত্তি, বক্তব্য শিখাতে চেষ্টা করি।বিনোদনের মাধ্যমে পড়ালেখা বেশি ভালো হয়।

শিক্ষক মানেই রাগ ভয় দূরত্ব এতে আমি বিশ্বাসী নই।শিক্ষক মানে বন্ধুর মতো পরম আস্থা বিশ্বাসের একজন প্রিয় মানুষও তো হতে পারে।তবে আওয়াল সবার থেকে ব্যাতিক্রম ছিলো তার মধ্যে দ্বিধা,সংকোচ ছিলো।

সে যে বক্তব্য শিখে আসতো? গান গাইতো কোথা থেকে শিখতো? তার হাতে তো কোন মোবাইল ছিলোনা? সেদিন ছিলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ৪৭ তম জন্ম বার্ষিকী সে বললো সে সাধারণ ছাত্রদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দিবে। বক্তব্য দিলোও।একদিন আমাকে একটি গান শুনালো যদি রাত পোহালে শোনা যেতো বঙ্গ বন্ধু মরেনাই? ভালোই গাইলো গানটি।কত পরিবারকে দেখেছি সন্তানকে গান গাওয়ানোর জন্য কত শিক্ষক রেখেছেন সময় অর্থ ব্যায় করছেন সন্তানকে গান গাওয়াতে পারছেন না।আর আউয়াল কতটা চেষ্টা, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী?

পরবর্তিতে তার সম্পর্কে জানলাম,সে এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান।তাই কি তার মধ্যে এত সংকোচ কাজ করতো? তবে ও হয়তো জানেনা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল ছাত্রের গুরুত্বই  সমান। যে পড়ালেখায় বেশি মনোযোগি সেই সকল শিক্ষকের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে।

ক্রমেই সে আমার সঙ্গে ফ্রি হতে থাকলো এখন তাকে বেশ স্বতঃ স্ফর্ত লাগে।তাকে দেখেই আমি বুঝতে পারি কলেজ জীবনটা তারা অনেক ভালো লাগছে আনন্দে কাটছে। সে আমাকে একদিন বলেই ফেলল কলেজ শিক্ষকদের বন্ধু সুলভ আচরন এখানকার পরিবেশ তার অনেক ভালো লাগে।আমি বললাম, যত বড় পরিবেশে যাবে তত মহৎ মানুষের দেখা পাবে’।তখন সে বললো ম্যাডাম আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই।আমি তাকে বলেছি অবশ্যই তুমি অনেক বড় হতে পারবে।তোমার মেধা অধ্যাবসায় থাকলে লক্ষ্যে অবশ্যই তুমি পৌঁছাতে পারবে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় বলতে হয় তোমাকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

পরে শুনেছি তার বাবা একজন দরিদ্র রিকশাচালক । তার মা গৃহিণী। তারা চার ভাইবোন। ছোটবেলা থেকে অনেক দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করে সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি শেষ করে মাধ্যমিক বিদ্যালইয়ে উঠেছে। তার বাবা মা তাকে কখনো বই কিনে দিতে পারেনি। সে যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে তখনই সে সাইকেল ম্যাকানিক এর কাজ শুরু করে। কলেজ থেকে গিয়ে সে তার ভাড়া করা দোকানে ম্যাকানিকের কাজ করে। লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসারের খরচ বহন করে।

আমার কাছে মনে হয় কোন কাজই অন্যায় বা লজ্জার নয়।যারা অন্যায় ভাবে বিলাসিতা করে ঘুষ খায়, দূর্নীতি করে,সরকারী পদে থেকে দায়িত্ব্যে অবহেলা করে।ঘুষ পাওয়ার জন্য মানুষকে হয়রানী করে।লজ্জা তো তারা পাবে। যারা অন্যায় ভাবে দেশের টাকা লুট করে।তারা তো সমাজে মাথা নত করে থাকবে।আউয়ালরা তো কোন অন্যায় করেনি।ওরা তো বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করছে।এতো একরকম লড়াই? ওতো মাথা উচু করে সম্মান নিয়ে বাচঁবে।

অথচ অনেক ছেলেই আছে  যাদের বাবা মার আর্থিক  অবস্থা ভালো। সংসার চালানোর জন্য তাদেরকে কোনো চিন্তা করতে হয় না। তারপরও তারা কলেজে  অনুপস্থিত। নিয়মিত পড়ালেখা করছে না। অনেকে বাজে আড্ডায় সময় নষ্ট করছে।মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে যুবসমাজদ।মোবাইল টিকটকে আসক্ত নতুন প্রজন্ম।

একদিন কলেজে আমি একটা পত্রিকা নিয়ে গিয়েছিলাম ওদেরকে একটা শিক্ষনীয়  লেখা দেখানোর জন্য। সে  পত্রিকাটি দেখে ভীষণ খুশি হল বলল আমি পত্রিকা পড়তে ভীষন পছন্দ করি ম্যাডাম। তখনই বুঝলাম জ্ঞান অর্জন করার জন্য সে কতখানি পিপাসার্ত?

আধুনিক যুগে যেখানে সকলেই সাইকেল, রিক্সা, মোটর সাইকেল যোগে  কলেজে আসে সেখানে সে  কলেজ থেকেপায়ে হেঁটে  অনেক দূর   বাড়িতে চলে যায়।

কয়েকদিন সে কলেজে আসছে না ।  সে হয়তো অসুস্থ্য ? কি মনে করে তার খোঁজ নিতে  একদিন আমি তার বাড়িতে চলে গেলাম। সে তো আমাকে দেখেই অবাক? সে বললো আজ পর্যন্ত কোন ম্যাডাম আমার খোঁজ খবর নিতে আসেনি। আসলেই ক্লাসে তার  অনুপস্থিতি আমার ভালো লাগছিলোনা।

গিয়ে দেখলাম তার একটি ভাই বাক প্রতিবন্ধি । এক বোন অসুস্থ্য তার লিভারের সমস্যা।বোনের ছেলেটি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু।ওর বয়স ১২/১৩ বছর আজও শিশুটি হাটঁতে পারেনা। ওর বোন আমাকে প্রশ্ন করেছিলো আপা আমার ছেলেটা কি কখনো হাঁটতে  পারবেনা? স্কুল যেতে পারবেনা? ওকি কখনো একা বাথারুম যেতে পারবেনা? আমি আউয়ালের বোনের কথার উত্তর দিতে পারিনি।

ওর  বাক প্রতিবন্ধি ভাই,  অসুস্থ্য বোন,  বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ভাগিনাকে দেখে আমার  মনটা ভীষণ খারাপ হলো মনে হলো আমরা কত অসহায়?  সত্যিইতো ওর ভাগিনা কত ছোট্ট শিশু? কখনো কি ও হাটঁতে পারবে?

আউয়াল বলেছিলো ম্যাডাম লেখাপড়া শিখে আমি বেকার ছেলেদের কর্মসংস্থানের চেষ্টা করবো। আমি যদি বাঙালি জাতির কর্ণধার হতে চাই । দেশ কে সুন্দর ভাবে গড়ে তুলতাম। দেশের বেকারত্ব ও দূর্নীতি নির্মুল করতাম?

সবাই আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ধনী রাষ্ট্রের নাগরিক হতে চায়।সবাই যদি তোমার মতো দেশকে ভালোবাসতো ? তবে আউয়ালের মতো প্রতিভাবান ছেলেরা দারিদ্রতার অভিশাপ নিয়ে লজ্জ্বা দ্বিধা সংকোচ নিয়ে কলেজে আসতোনা।সেও অধিকার পেতো মাথা উচু করে বাঁচবার।

তবে আউয়াল তোমরা কখনোই মাথা নোয়াবেনা দূর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে।শিক্ষা করবে তোমাদের জয়ী।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছিলেন,হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান ,তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অথবা দেশের বৃত্তশালী কারো সহায়তা পেলে আউয়ালের পথচলা হয়তো কিছুটা সহজ হতো।

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২২ আগস্ট ২০২২

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com