ত্রাণমন্ত্রী মায়া মন্ত্রিত্ব পদ থেকে খারিজ

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০১৫

ত্রাণমন্ত্রী মায়া  মন্ত্রিত্ব পদ থেকে খারিজ

 

মিজানুর রহমান খান, ঢাকাঃ
 বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব এবং সংসদ সদস্য পদ ১৪ জুন থেকে খারিজ হয়ে গেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে এই মতামত দিয়েছেন।


ওই ধারার ২ দফার ঘ উপদফায় বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হবার এবং সংসদ সদস্য থাকবার যোগ্য হবেন না, যদি “তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দু বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে”।’ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ২০০৮ সালে জ্ঞাত আয়ের বাইরে অবৈধভাবে ৬ কোটির বেশি টাকার সম্পদ অর্জনের মামলায় ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ২০১০ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ কেবলই আইনি প্রশ্নে ওই রায় বাতিল করেন। দুদক এর বিরুদ্ধে আপিল করে। ১৪ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে হাইকোর্টে আপিলের পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন।

বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একজন আইনবিদ সদস্যসহ ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দুর্নীতি একটি নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ। সে কারণে ১৪ জুন তারিখে আপিল বিভাগ রায় দেওয়া মাত্রই মায়ার সংসদ সদস্য পদ এবং মন্ত্রিত্ব দুটোই বাতিল হয়ে গেছে। আইনের চোখে তিনি আর মন্ত্রী নন। এই প্রবীণ আইনবিদ বলেন, সংবিধানে বলা আছে, কারও সদস্যপদ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন এবং তাদের মতই চূড়ান্ত হবে। এই প্রবীণ আইনবিদ মনে করেন, এখানে কোনো বিতর্ক দেখা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, আপিল বিভাগের রায় দেওয়া মাত্রই তাঁর মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্য পদ খারিজ হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে প্রবীণ আইনজীবী এম আই ফারুকী এ প্রতিবেদককে বলেন, আইনের চোখে তিনি এখন একজন দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি। তবে সে কারণে তাঁর মন্ত্রিত্ব খারিজ হওয়া সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। শাহদীন মালিক বলেন, ‘আইন ও নৈতিকতা উভয় মানদণ্ডে মন্ত্রীকে অবশ্যই অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। এবং এখন স্পিকারের করণীয় হবে ১৯৮১ সালের সংসদ সদস্য যোগ্যতা নির্ধারণী আইনের অধীনে বিষয়টি আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।’

আইন কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০০১ সালে জেনারেল এরশাদের জনতা টাওয়ার দুর্নীতির মামলায় এই একই মত দিয়ে বলেছিলেন, আপিল করলেও দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সাজা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত সংসদের সদস্যপদ থাকবে না। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম তাঁর কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ বইয়ে বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরেও কোনো ব্যক্তি সংবিধানের ওই ৬৬(২) অনুচ্ছেদের কারণে অযোগ্য গণ্য হতে পারেন। যার অর্থ হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পর মায়ার সংসদ সদস্যপদ ও মন্ত্রিত্ব থাকে না।

মন্তব্য চাওয়া হলে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ‘বিষয়টি উচ্চমাত্রিক গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত, এটা কি আমাদের দেশে প্রযোজ্য?’

এ বিষয়ে ত্রাণমন্ত্রীর বক্তব্য জানার জন্য চেষ্টা করেও তাঁকে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁকে উদ্ধৃত করে তাঁর অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুদক আইনজীবী বিবৃতি দিয়েছেন যে, এখন নিম্ন আদালতের রায় বহাল হলো।’ তিনি আরও বললেন, এখন হাইকোর্টে পুনঃশুনানি হবে। তাহলে প্রশ্ন হলো পুনঃশুনানি হলে নিম্ন আদালতের রায় কীভাবে বহাল থাকবে?

অ্যাডভোকেট সাঈদ দাবি করেন, ‘পূর্ণাঙ্গ রায় না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসাটা যথাযথ হবে না।’ যোগাযোগ করা হলে এর উত্তরে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘রায় বহাল আমি বলিনি। আপিল বিভাগ কিছু পর্যবেক্ষণের আলোকে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে এখন পুনঃশুনানির জন্য পাঠিয়েছেন। নিম্ন আদালত যে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন, তার বৈধতা এখন পুনঃশুনানিতে বিচার্য।’

নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এ ধরনের বিষয়ে যদি আমাদের সুপ্রিম কোর্ট কোনো সিদ্ধান্ত দেন, সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।’ তবে তিনি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, ‘২০১৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে দোষী সাব্যস্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপিল করেই যে তার সংসদ সদস্যপদ টেকাতে পারেন না, তা স্পষ্ট করে দেন। আর আমাদের দেশে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বোধযোগ্য মূল্য রয়েছে।’ তিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘এর আলোকে আমাদের দেশে জনস্বার্থে একটি মামলা প্রত্যাশিত।’

মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে নিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারপ্রধানের কাছে আইনগত বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা তুলে ধরে কি না, জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, এ ধরনের অবস্থায় মন্ত্রিসভা বিভাগের স্বপ্রণোদিত হয়ে কিছু করার থাকে না। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পর সোমবার ছিল মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক। ত্রাণমন্ত্রী হিসেবে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান। সুত্রঃ প্রথম আলো

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ ২৩ জুন ২০১৫

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:০১ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com