ত্যাগ

শনিবার, ০৬ জুন ২০১৫

ত্যাগ

 

মুহঃ শরীফ উল ইসলাম


 

Litearture 02শ্বশুর বাড়িতে ঢুকেই ঈশরাত প্রচণ্ড রকমের ধাক্কা খেল। নিজের উপর খুবই রাগ হচ্ছে। কি রকমের গাধা সে, একেবারেই নিম্ন মানের গাধা।৫ বছর ধরে সে আজাদের  সাথে প্রেম করছে অথচ সে আজাদের পরিবারের কোন খোঁজ খবর জানে না। কে তার বাপ, তারা কয় ভাইবোন তারা করে কি, কোথায় বাড়ি ঘর। আজ সকালে আজাদ বলল, চল কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করি। চিন্তা ভাবনা না করেই সে রাজী হয়ে গেল।একেই বলে অন্ধ প্রেম। কাজী অফিস থেকে সোজা ধানমণ্ডিতে আজাদদের বাড়ি। এখনই সে জানতে পারল আজাদের বাবা বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রী। আর তার বাবা হাই স্কুলের হেড মাষ্টার, অবস্থা তেমন একটা নয়। আজাদদের সহিত তাদের আকাশ পাতাল ব্যবধান।
আজাদের বাবা কি তাদের সম্পর্ক মেনে নেবে ?  বুকটা তার দুরু দূরু করে কাঁপছে। তারা যখন বাসায় ঢুকল তখন আজাদের বাবা মাওলানা    জাইদুল ইসলাম জিহাদি বাসায় ছিলেন না। আজাদের মা তাকে বলল, তোমার নাম কি?
 ঈশরাত জাহান।
 শোন ঈশরাত তোমরা নিজেরা নিজেরা বিয়ে করেছ এতে আমার বলার কিছু নাই। ঘর সংসার করবা তোমরা। তোমরা সুখী হলেই আমার সুখ।তবে সমস্যা হল তোমার শ্বশুরকে নিয়ে। সে একজন মন্ত্রী, তার একটা সামাজিক মর্যাদা আছে। একজন মন্ত্রীর ছেলের বিয়ে হবে মহা ধুমধামেরসাথে, পত্র পত্রিকায় সচিত্র সংবাদ হবে।
আজাদের মা ঈশরাতকে নানান গহনা গাঁটি বেনারসিতে সাজাইয়া বললেন, তোমার শ্বশুর ধর্মের ব্যাপারে খুবই কড়াকড়ি। এতদিন কি করেছ তাকোন বিষয় নয় তবে এখন থেকে পর্দায় থাকতে হবে, ঘরের বের হলে বোরখা পড়তে হবে, বাড়ির ভিতর হিজাব পড়বে এবং হিজাব পড়ালেন।
রাতে তোমার শ্বশুর বাসায় আসবেন তিনি তোমার ইন্টার্ভিউ নিবেন, সেখানে পাস করলে আমার কোন বাঁধা নেই। ছেলে তোমাকে পছন্দ করেছে আমারও তোমাকে পছন্দ হয়েছে।
রাতে  মাওলানা জাইদুল ইসলাম জিহাদি আজাদ  ঈশরাতকে নিয়ে বসলেন।রাগে তার গা থর থর করে কাঁপছে। তিনি আজাদকে বললেন তুমি একজন মন্ত্রীর ছেলে, তোমার বিয়ে হবে অন্য একজন মন্ত্রী বা এমপি বা উচ্চ পদস্থ  কর্মকর্তার মেয়ের সাথে। হবে মহা ধূমধাম। পত্র পত্রিকা সপ্তাহ ব্যাপী সচিত্র সংবাদ ছাপাবে। তা না তুমি একা একাই বিয়ে করলে, বল তোমার শ্বশুর মহোদয়ের বংশ পরিচয়। কোথাকার রাজা বাদশাহ তিনি।
বাবা আমি ঈশরাতের বংশ পরিচয় কিছুই জানি না, আমি তাকে ভালোবাসি তাকে বিয়ে করেছি ।
খুবই ভাল করেছ তা না হলে কি আর কলিকালের পোলাপান , তা মেয়ে তোমার নাম কি ?
 ঈশরাত জাহান
ঈশরাত জাহান, তুমিই তোমার বাবার পরিচয় দাও, যদি দেওয়ার মত কিছু থাকে।
আমার বাবার পরিচয় দেওয়ার মত  তেমন কিছু নাই । তিনি একটা স্কুলের সামান্য শিক্ষক ।
তেমন কিছু না , তাতো বুঝতেই পেরেছি, তা তিনি করেন টা কি? ঢাকায় থাক কোথায়, ঢাকায় কি কোন বাড়ি টরি আছে, না বস্তি টসটিতে ভাড়া থাক।
না ঢাকায় আমার কেহ থাকে না,আমি বিশ্ব বিদ্যালয়ের হলে থেকে পড়াশুনা করি। আমার বাবা গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার।
 তুমি গ্রামের মেয়ে, তা তোমার বাবার বাড়ি কোথায়?
মাগুরা, আমার বাবা মাগুরা আদর্শ হাই স্কুলের হেডমাস্টার।
তুমি হাবিবুর রহমানের মেয়ে ?
আপনি আমার বাবাকে চেনেন ?
 চিনব না কেন, রাজনীতি করি, দেশের অনেককেই চিনতে হয় । হাবীবের তো কোন ছেলেমেয়ে নাই। তিনটা ছেলেই জন্মের ৩ মাসের মাঝে মারা য়ায়। তুমি এলে কোথা থেকে?আমার জন্ম স্বাধীনতার সময়ে, শুনেছি আমার আগে আমার বাবা মায়ের তিনটি সন্তান  মারা য়ায়।
Lekha শোন আজাদ, ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন হয়। মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান আর কাফেরদের জন্য হিন্দুস্তান ।পাকিস্তানের উন্নতি ও অখণ্ডতা প্রথম থেকেই হিন্দুদের সহ্য হচ্ছিল না।। পাকিস্তান ধ্বংস তাদের কাম্য ছিল। ১৯৭১ সালে এসে গেল তাদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কিছু বিছিন্নতাবাদীকে সহয়তার নামে ছিন্ন ভিন্ন করতে চাইল শান্তিপ্রিয় পাকিস্তানকে । পাকিস্তান সরকার পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য গ্রামে গঞ্জে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। আমরা ধর্মপ্রাণ মানুষেরা সেনাবাহিনীকে স্বাগত জানালাম, বিছণ্ণতাবাদীদের খুঁজে বের করতে সাহায্য করলাম। তারা প্রথমে খুঁজে খুঁজে হিন্দুদের শায়েস্তা করতে থাকে।  কিন্তু হিন্দু চেনা সহজ নয় তাই সেনা বাহিনী লুঙ্গি তুলে পরীক্ষা করতে থাকে। এতেও সমস্যা দেখা দিল । হিন্দুরা খাৎনা করা শুরু করল এমনকি কলেমাও মুখস্থ করা শুরু করে ।
 মাগুরা আদর্শ হাই স্কুলের সহকারী হেডমাস্টার ছিল তপন কান্তি দাস ।আমি ছিলাম ধর্মীয় শিক্ষক। হিন্দুদের দুরাবস্থা দেখে আমি তপনকে বললাম , তুই বউ বাচ্চা নিয়ে হিন্দুস্থানে চলে যা । তপনের ২ মাসের একটা মেয়ে ছিল।
 হারামজাদা বলে কি  হিন্দুস্তানে যাব কেন ?  এটা আমার জন্মভূমি। যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকে  ততক্ষণ বলব জয় বাংলা ।
জয় বাংলা তোর পাছায় দেবে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গ্রামে গঞ্জে ঢুকে পড়ছে, কখন তাদের সামনে পড়বি। হিন্দুস্তানে যাবি না, তাহলে এক কাজ কর, খাৎনা নিয়ে ফেল এবৎ কলেমাটা মুখস্থ কর ।
 মালাউনটা আমার কথা শুনল না।
একদিন মাগুরা শহরে আর্মি এসে গেল। আমি তাদের পথ ঘাট চিনিয়ে দিলাম। তপন ছিল হাবীব স্যারের বাসায় লুকিয়ে। আর্মিরা তাকে ও তার বউকে পেয়ে গেল।
 তাদেরকে কলেমা পড়তে বলল, তারা পারল না। আর্মিরা তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলল। পরে শুনেছিলাম হাবীব স্যার ও তার বৌ তপনের মেয়েটিকে নিয়ে হিন্দুস্তানে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। এই মেয়ের সাথে তপনের বউয়ের মুখের হু বহু মিল। আমার বিশ্বাস এই মেয়েই সেই তপন দাসের মেয়ে। ওর গায়ে কাফেরের রক্ত, ওকে ত্যাগ কর, ওঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জিহাদি বলতে থাকে ওকে এই মুহূর্তে ঘর থেকে বের করে দাও।
 বাবা আমি ঈশরাতকে ভালবাসি , ও হিন্দু কি মুসলমান আমি জানি না, জানতে চাই না। আমি ওকে ত্যাগ করতে পারব না।
তা হলে তুমিও এই মুহূর্তে আমার বাড়ি ত্যাগ কর, আমি তোমাকে ত্যাজ্য করলাম।
আজাদ ঈশরাতের হাত ধরে টান দিয়ে বলল, চলো আর এক মূহূর্ত এখানে নয়। চলো আমরা ।আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। আমার বাবার প্রতিপত্তির প্রতি আমার এতটুকুও লালসা নাই। তোমার ভালোবাসায় আমি সবই ত্যাগ করতে পারি।
আজাদের হাত ধরে ঈশরাতও বেড়িয়ে পড়ল।
 
আটলান্টা, জর্জিয়া
০১ জুন, ২০১৫

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ০৬ জুন ২০১৫

 

বিদ্রঃ আমাদের ওয়েবে প্রকাশিত কোন সংবাদ ,গল্প/ আর্টিকেল পূর্ব অনুমতি ব্যতিত প্রকাশ করা যাবে না ।

 পূর্বে প্রকাশিত আরো গল্প

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৬ জুন ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com