তারাবীর নামায ৮ রাকাত নয় ২০ রাকাত আদায় করা সুন্নত

শনিবার, ০৪ জুন ২০১৬

তারাবীর নামায ৮ রাকাত নয় ২০ রাকাত আদায় করা সুন্নত

তারাবীর নামায ৮ রাকাত নয় ২০ রাকাত আদায় করা সুন্নত
মুফতি ওসমান গনি সালেহী

 


আমি কুরআন শরীফের বিন্যাস, বিশুদ্ধ হাদীছ, উলামায়ে কিরামের উক্তি ও আকলী দলীল সমূহ
দ্বারা এর প্রমাণ দিচ্ছি।
১) কুরআন শরীফে সুরাও আছে, আয়াতও আছে এবং রূকুও আছে। কুরআন শরীফের যে সব বিষয় বস্তুর নাম রয়েছে, সে গুলোকে সূরা বলা হয় আর যে সব বাক্যের ভিন্ন ভিন্ন নাম নেই, ওগুলোকে আয়াত বলা হয়। কিন্তু রূকুকে রূকু কেন বলা হয়, তা ভেবে দেখা দরকার। কেননা সূরার অর্থ হচ্ছে কোন কিছুকে পরিবেষ্টন করা আর আয়াত অর্থ চিহ্ন, যেহেতু সূরা একটি বিষয় বস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করে যেমন- সূরা বলদ আর আয়াত খোদায়ী কুদরতের চিহ্ন হিসেবে বিবেচ্য, সেহেতু এ নামকরণ যথার্থ হয়েছে। কিন্তু কুরআনী রূকুকে রূকু কেন বলা হয়, তা একবার তলিয়ে দেখা দরকার। রূকু মানে নত হওয়া। তাজবীদের কিতাবসমূহ থেকে জানা যায় যে হযরত উমর ও উছমান (রাঃ) তারাবীহর নামাযে যেই পরিমাণ কুরআন পাঠ করে রূকু করতেন, সেই অংশের নাম রূকু রাখা হয়েছে। তারবীহের নামায বিশ রাকাত এবং রমযানের সাতাশ তারিখে কুরআন খতম- এ হিসাবে ধরলে, কুরআনে পাকে মোট ৫৪০ রূকু হওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু খতমের দিন কোন কোন রাকাতে ছোট ছোট দু’তিন সূরা একসাথে পড়ে ফেলা হতো, সেহেতু কুরআন শরীফ ৫৫৭ রূকু সম্বলিত হয়েছে। যদি তারাবীহের নামায আট রাকাতই হতো, তাহলে রূকুর সংখ্যা ১১২ হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত ছিল। অতএব কুরআনের রূকুর সংখ্যাই প্রমাণ করছে যে তারবীহের নামায বিশ রাকাত। কোন ওহাবী আট রাকাত তারাবীহের সমর্থনে কুরআনী রূকুর কোন ব্যাখ্যা দিতে পারবে কি?
২) তারাবীহ ﺗﺮﺍﻭﻳﺢ শব্দটি ﺗﺮﻭﻳﺢ এর বহুবচন, যার অর্থ হলো শরীরকে আরাম দেয়া।
তারবীহের নামাযে চার রাকাতের পর কিছুণের জন্য বসে আরাম করা হয়। সেই বসাটার নাম তরবীহা। এ জন্য এই নামাযকে তারাবীহ অর্থাৎ আরামের সমষ্টি বলা হয়। আরবীতে কমপক্ষে

তিনটাকে বহুবচন বলা হয়। যদি আট রাকাত তারাবীহ হয়, তাহলেতো এর মধ্যে মাত্র একবার তরবীহা পাওয়া যাচ্ছে এবং এর নাম তারাবীহ (বহুবচন) হতো না। তিন তরবীহার (বিশ্রাম) জন্য
কমপক্ষে ষোল রাকাত তারাবীহ হওয়া বাঞ্ছনীয় অর্থাৎ প্রতি চার রাকাত পর এক তরবীহা। বিতরের আগে কোন তারবীহা বা বিশ্রাম নেওয়া হয় নাৎ তাই তারাবীহের নামই আট রাকাত
তারাবীহের দাবীকে অপ্রমাণ করে।
৩) প্রতি দিন বিশ রাকাত নামায অত্যাবশ্যক-সতের রাকাত ফরয ও তিন রাকাত বিতর, যথা- ফজরে দু’রাকাত, যোহরে চার রাকাত, আসরে চার রাকাত, মাগরিবে তিন রাকাত এবং ইশায় চার রাকাত ফরয ও তিন রাকাত বিতর। পবিত্র রমযান মাসে আল্লাহ তা’আলা এ বিশ রাকাতের পরিপূর্ণতার জন্য আরও বিশ রাকাত তারাবীহের নামায নির্ধারণ করেছেন। লা মযহাবীরা
সম্ভবতঃ পাঁচ ওয়াক্তিয়া নামাযেও আট রাকাত পড়ে থাকেন নতুবা আট রাকাতের সাথে ঐ বিশ রাকাতের কি সামঞ্জস্য থাকতে পারে?
৪) হাদীছ সমূহঃ স্মর্তব্য যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিতভাবে তারাবীহের নামায জামাত সহকারে আদায় করেননি; কেবল দু’এক দিন আদায় করেছেন। অবশ্য তিনি বলে দিয়েছেন যে যদি এটা নিয়মিতভাবে আদায় করা হয়, তাহলে ফরয হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর হবে। তাই তোমরা ঘরের মধ্যেই নামায পড়ে নিও।
কেউ কেউ বলেন এ নামায আসলে তাহাজ্জুদের নামাযই ছিল, যা রমযান মাসে গুরুত্ব সহকারে আদায় করানো হয়েছে। এ জন্য সাহাবায়ে কিরাম সাহরীর শেষ সময়ে এ নামায থেকে ফারেগ হতেন। হযরত সিদ্দীক আকবর (রাঃ) এর যুগেও এটা সুষ্ঠ ভাবে আদায়ের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। লোকেরা আলাদা আলাদাভাবে পড়ে নিতেন। হযরত উমর (রাঃ) এ ব্যাপারে যথার্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, বিশ রাকাত তারাবীহের নামায নির্ধারণ করেন এবং বিশ রাকাত নিয়মিত ভাবে জামাত সহকারে আদায়ের ব্যবস্থাও করেন। তাই সঠিক বক্তব্য হচ্ছে তারাবীহের নামায মূলত
সুন্নাতে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কিন্তু একে নিয়মিতভাবে জামাত সহকারে বিশ
রাকাত আদায় করাটা হচ্ছে সুন্নাতে ফারুক (রাঃ)। নবী করীম (দঃ) আট রাকাত তারাবীহের নির্দেশও দেননি এবং এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতাও করেননি। এমনকি আট রাকাত তারাবীহ পড়া সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। তাই বিশ রাকাতের উপর সাহাবায়ে কিরামের ঐক্যমত হওয়াটা সুন্নাতের বিপরীত নয়।আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে-
ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﺑِﺴُﻨَّﺘِﻰْ ﻭَﺳُﻨَّﺖِ ﺍﻟْﺨُﻠَﻔَﺎﺀِ ﺍﻟﺮَّﺍﺷِﺪِﻳْ َ (তোমাদের জন্য আমার সুন্নাত ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত পালনীয়) যা হোক আমরা বিশ রাকাতের সমর্থনে সাহাবায়ে কিরামের আমল পেশ করলাম। দেখি, লা মযহাবীরা তাদের আট রাকাত তারাবীহের সমর্থনে এমন কোন সহীহ মরফু হাদীছ পেশ করতে পারে কিনা, যদ্দারা আট রাকাত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। ইনশা আল্লাহ কখনও
পারবে না। আমাদের দাবীর সমর্থনে উত্থাপিত হাদীছ সমূহ নিম্নে পেশ করা হলো-
১। হযরত উমর (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের যুগে বিশ রাকাত তারাবীহ জামাত সহকারে আদায়ের ব্যবস্থা করেন। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরাম একমত ছিলেন। ‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’ কিতাবে হযরত সায়েব ইবনে ইয়াযিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে-
ﻗَﺎﻝَ ﻛُﻨَّﺎ ﻧَﻘُﻮْﻡُ ﻓِﻰْ ﻋَﻬْﺪِ ﻋُﻤَﺮَ ﺑِﻌِﺸْﺮِﻳْﻦَ ﺭَﻛْﻌَﺔً ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﻴﻬﻘﻰ ﻓﻰ
ﺍﻟﻔﺮ ﻗﺔ ﺑﺎﺳﻨﺎﺩ ﺻﺤﻴﺢ
২। হযরত ইবনে মনি হযরত আবি ইবনে কা’ব থেকে বর্ণনা করেছেন-
ﻓَﺼَﻠَّﻰ ﺑِﻬِﻢْ ﻋِﺸْﺮِﻳْﻦَ ﺭَﻛْﻌَﺔٍ
৩। বায়হাকী শরীফে বর্ণিত আছে-
ﻋَﻦْ ﺍَﺑِﻰ ﺍﻟْﺤَﺴْﻨَﺎﺕِ ﺍِﻥَّ ﻋَﻠِﻰّ ﺍﺑْﻦِ ﺍَﺑِﻰْ ﻃَﺎﻟِﺐِ ﺍَﻣَﺮَ ﺭَﺟُﻠًﺎ ﻳُّﺼَﻠِّﻰ
ﺑِﺎﻟﻨﺎﺱِ ﺧَﻤْﺲَ ﺗَﺮْﻭﻳﺤﺎﺕٍ ﻋِﺸْﺮِﻳْﻦَ ﺭَﻛْﻌَﺔً
৪। ইবনে আবি শিবা, তিবরানী, কবীর, বায়হাকী, আবদ ইবনে হামিদ ও বগবী
বর্ণনা করেছেন-
ﻋَﻦْ ﺍِﺑْﻦِ ﻋَﺒَّﺎﺱٍ ﺍَﻥَّ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰَّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﺼَﻠِّﻰْ
ﻓِﻰْ ﺭَﻣَﻀَﺎﻥَ ﻋِﺸْﺮِﻳْﻦَ ﺭَﻛْﻌَﺔً ﺳِﻮِﻯ ﺍﻟْﻮِﺗْﺮِ
এ হাদীছ থেকে বোঝা যায় যে স্বয়ং হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিশ রাকাত
তারাবীহের নামায পড়তেন।
৫। বায়হাকী শরীফে বর্ণিত আছে-
ﻭَﻋَﻦْ ﺷِﺒﺮِﻣﺔَ ﺍِﺑْﻦِ ﺷَﻜْﻞٍ ﻭَّﻛَﺎﻥَ ﻣِﻦْ ﺍﺻْﺤَﺎﺏِ ﻋَﻠِﻰِّ ﺍِﻧَّﻪَ ﻛَﺎﻥَ
ﻳﻮُﻣّﻬُﻢْ ﻓِﻰْ ﺭَﻣَﻀَﺎﻥَ ﻓَﻴْﺼَﻠِّﻰْ ﺧَﻤْﺲ ﺗَﺮْﻭِﻳْﺤَﺎﺕٍ ﻋِﺸْﺮِﻳْﻦَ ﺭَﻛْﻌَﺎﺓٍ
৬। একই বায়হাকীতে আরও বর্ণিত আছে-
ﻭَﻋَﻦْ ﺍَﺑِﻰْ ﻋَﺒْﺪِ ﺍﻟﺮَّ ﺣْﻤَﻦِ ﺍﻟﺴَّﻠَﻤِﻰِّ ﺍَﻥَّ ﻋَﻠِﻴﺎ ﺩَﻋَﻰ ﺍﻟْﻘُﺮَّﺍﺀَ ﻓِﻰْ
ﺭَﻣَﻀَﺎﻥِ ﻓَﺎَﻣَﺮَ ﺭَﺟُﻠًﺎ ﻳُّﺼَﻠِّﻰْ ﺑِﺎﻟﻨَّﺎﺱِ ﻋِﺸْﺮِﻳْﻦَ ﺭَﻛْﻌَﺔً ﻭَّﻛَﺎﻥَ ﻋَﻠِﻰ
৭। সেই বায়হাকীতে সহীহ সনদ সহকারে
আরও বর্ণিত আছে-
ﻋَﻦِ ﺍﻟﺴَّﺎﺋِﺐِ ﺍِﺑْﻦِ ﻳَﺰِﻳْﺪَ ﻗَﺎﻝَ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻘُﻮْﻣﻮْﻥَ ﻋَﻠَﻰ ﻋَﻬْﺪِ ﻋُﻤَﺮَ ﻓِﻰْ
ﺷَﻬْﺮِ ﺭَﻣَﻀَﺎﻥَ ﺑِﻌِﺸْﺮِﻳْﻦَ ﺭَﻛْﻌَﺔً
(সহীহুল বিহারীর- ﻛَﻤْﻴَﻘْﺮَﺍﻧِﻰ ﺍﻟﺘَّﺮْﻭِﻳْﺢِ শীর্ষক অধ্যায়ে এর বিশ্লেষণ দেখুন) উপরোক্ত রেওয়ায়েত থেকে প্রতিভাত হলো যে স্বয়ং হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তারাবীহর নামায বিশ
রাকাত পড়তেন এবং হযরত উমর ফারুকের খিলাফতের সময় এ বিশ রাকাতের উপর যথাযথ আমল করার সূচনা হয়েছিল।

হযরত ইবনে আব্বাস, আলি, আবি ইবনে কাব, উমর, সায়েব ইবনে ইয়াযিদ প্রমুখসাহাবায়ে কিরাম এর উপর আমল করেছিলেন।
উলামায়ে উম্মতের অভিমতঃ
তিরমীযী শরীফে সওমের আলোচনায়- ﻣﺎ ﺟﺎﺀ ﻓﻰ ﻗﻴﺎﻡ ﺷﻬﺮ ﺭﻣﻀﺎﻥ শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-
আহলে ইলমের আমল ওটার উপর, যা হযরত আলী, উমর ও অন্যান্য সাহাবায়েকিরাম থেকে বর্ণিত আছে অর্থাৎ বিশ রাকাত। এটাই হযরত সুফিয়ান ছুরী, ইবনে মুবারক ও ইমাম শাফেঈর অভিমত। ইমাম শাফেঈ স্বীয় শহর পবিত্র মক্কায় এরই অনুশীলন দেখতে পান অর্থাৎ মুসলমানেরা বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন।

অতএব সহি হাদিস শরীফের আলোকে এটাই প্রমানিত হয় যে তারাবীর নামাজ ৮ রাকাত নয় ২০ রাকাত আদায় করাই সুন্নত | ৮ রাকাত আদায় করা সম্পূর্ণ বেদাত ও সুন্নতের খেলাফ | আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেন সহি বুঝ দানের ক্ষমতা দান করেন আর সকল প্রকার মিথ্যাচার ও বিব্রান্তি থেকে হেফাজত করেন |

লেখক : মুহাদ্দিস, দারুন্নাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রসা, ঢাকা

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / জুন ০৪,২০১৬

 

ন ০৪,২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৪ জুন ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com