ডানায় ডানায়

শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১

ডানায় ডানায়
প্রচ্ছদঃ কুনাল বর্মণ।

তমার ক্লান্ত লাগছিল না। মন চাইছে গত দিনের মতো আড্ডা দিতে। আবার কবে এই শৈলশহর, এমন সন্ধ্যা আসবে কে জানে। তখন তার ব্যক্তিগত জীবনের বিন্যাসও কেমন হবে জানা নেই। আপাতত সে স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া কচুরিপানার মতো। সেই কচুরিপানা গত সন্ধ্যায় অনাবিল আনন্দ পেয়েছে প্রায় অপরিচিত এক ব্যক্তির রসিকতায়, কথাবার্তায়। গল্পের বই, মোবাইলবন্দি সিনেমা আজও তাকে টানল না। সে তো সব সময়ই থাকে। সে নিজেই বল্লাল সেন বরাটের দরজার কপাটে টোকা মারবে কি না যখন ভাবছে, তখন তার দরজায় শোনা গেল সেই প্রত্যাশিত কণ্ঠ। তমা দ্রুত গিয়ে দেখল দরজায় কফি কাপ সমৃদ্ধ দু’টি হাত এবং একটি সহাস্য মুখ বিশ ওয়াটের সাদা আলোর মতো জ্বলজ্বল করছে।
স্মিত হেসে কথা শুরু করলেন বল্লাল, “কি ম্যাডাম, বিরক্ত হবেন না কি কালকের মতো?”
“খুব হব! ঘরে বসে বসে এত চমৎকার সময় কাটছে যে, ভাবলাম একটু বিরক্ত অন্তত হওয়া উচিত। ভাবছিলাম আপনাকে ডাকব কি না!”
“ডাকলেন না কেন?”
“ভাবলাম যদি বিশ্রাম নেন, আজ ধকল তো কিছু কম যায়নি।”
“চলুন, কালকের ওই টেবিলটাতেই বসি। আমার আবার সব ধকল উধাও হয়ে যায় চা আর কফির গন্ধে।”
“সেটা আমারও হয়। কিন্তু আমায় তার চেয়েও বেশি তাড়িয়ে নিয়ে চলে নতুন জায়গার অনুভূতি। বার বার মনে হয়, এই মাটিতে, এই ধুলোয় আগে তো কখনও আমার পা পড়েনি, জানি না ভবিষ্যতেও পড়বে কি না! তাই আর একটু ধুলোমাটি মেখে নিই। তখন আর ক্লান্তি আসে না। আজ আপনার কাছে কাছে ছিলাম। ছেলেমেয়েদের কী সুন্দর বলছিলেন আপনি পাহাড়ের কথা! আমার খুব ভাল লেগেছে।”
“ও তো সবাই জানে, দুটো বই পড়লে, পুরোটাও পড়তে হবে না, চারটে পাতা ওল্টালেই জানা যায়! দেখবেন, পরের বার এলে আপনি আমার চেয়েও ভাল করে বলতে পারছেন।”
“আচ্ছা বল্লালবাবু, পঞ্চচুল্লিকে সবচেয়ে সুন্দর কখন দেখতে লাগে?”
“এ তো কঠিন প্রশ্ন করলেন, আমার তো সব সময়ই ভাল লাগে।”
“না, পাশ কাটিয়ে যাবেন না। একটা অন্তত স্পষ্ট উত্তর দিন।”
“একটা গল্প আছে, জানেন! তখন পূর্ণিমা। বরফে মোড়া মুন্সিয়ারিতে ফেটে বেরোচ্ছে পাগল জ্যোৎস্না। এক বাঙালি ছোঁড়া তখন এসেছিল এখানে। সঙ্গে অন্য লোকও ছিল। তারা বলল, জানলার শার্সি ফাঁক করে পাঁচ শৃঙ্গের রূপ দেখ রে ছেলে! সে বলল, মাথা খারাপ? বলে খোলা আকাশের নীচে পায়চারি করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গাইতে পাহাড়ের রূপ দেখতে লাগল। পূর্ণ জ্যোৎস্না পাহাড়চুড়োয় পড়ে হলুদ হয়ে যায়। মনে হয় জোছনার সঙ্গে মুঠো মুঠো হলুদ সোনার গুঁড়ো এসে নামছে পাহাড়ের বুকে।”
“এই মুন্সিয়ারি? এই পঞ্চচুল্লি? আপনি যে ভাবে বলছেন, মনে হচ্ছে যেন অন্য কোনও দেশ, অন্য কোনও গ্রহের ছবি দেখতে পাচ্ছি।”
“এই সেই দেশ তমা, এই সেই গ্রহ। আজ যদি একটু রাত অবধি জাগতে পারেন, তা হলে তার সামান্য নমুনা হয়তো আপনিও দেখতে পাবেন।”
“জেগে থাকব, এ আর এমন কী! কত অকাজের জন্য জাগি, এ তো সাক্ষাৎ দেবদর্শন! বলুন, তার পর কী হল! সেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের?”
“সে ছোকরাকে সবাই বলল, বিশু ঘরে আয়। ভিতরে এসে জানলার পাশে বোস। বাইরে খোলা আকাশের নীচে রাশি রাশি হিম নামছে, ওখানে থাকিস না। কিন্তু তখন তার আবেগ এসেছে গানের। সে প্রাণের আমেজে গলা ছেড়ে গাইছে আর পর্বতচূড়ার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হচ্ছে!”
“তার পর!”
“তার পর যা হওয়ার তাই হল। পরের দিনই কুপোকাত। ডাবল নিমোনিয়া।”
“আহা রে!”
“তিন দিন বেঁচেছিল।”
“অ্যাঁ? মারা গেল? সে কী!”
“হিমালয় যেমন উদার, তেমন নির্মম। কোথাকার বকেয়া হিসেব কোথায় মিটিয়ে নেয়, কে জানে!”
“যা! আহা রে, বেচারা হয়তো কত রকম পরিকল্পনা করে রেখেছিল, ফিরে এটা করবে, ওটা করবে। হয়তো কত জনকে কথা দেওয়া ছিল। সব ভেসে গেল।”
“মনে হচ্ছে বিশু নয়, আপনি নিজের কথা বলছেন। মনে হচ্ছে আপনারই হয়তো কাউকে কথা দেওয়া আছে। অথবা কথা রাখার আছে। এখান থেকে ফিরে কোন কিছু নিষ্পত্তির কথা আছে।”
“এটা আপনার খুব খারাপ দিক! সব কিছু নিয়েই ভবিষ্যদ্বাণী করতে শুরু করেন আপনি বল্লালবাবু। আমার তো মনে হয় আপনার নামও অন্য কিছু, আর যা-ই হোক, বল্লাল নয়।”
“ঠিকই বলেছেন, আর কী মনে হয়?”
“মনে হয় অনেক কিছু আপনি বলেন, তার থেকে ঢের বেশি বলেন না।”
“কী রকম?”
“এই যেমন, কাল বললেন মেঘার কথা। আমার তো মনে হয়, সে এখন আপনার ঘরে বসেই আপনার শিশুপুত্রের কাঁথা বদলাচ্ছে।”
“আরে দূর! মেঘা তো বেলেঘাটায় থাকে। এখন তো সে পায়ের ওপর পা তুলে ছাত্র পড়াচ্ছে।”
“আপনি দেখতে পাচ্ছেন?”
“পাচ্ছি তো!”
“কী দেখছেন?”
“এই তো একটা পেল্লায় ঘর। দরজার বাইরে কত জুতো খোলা। ঘরটায় শতরঞ্চি পাতা। তার ওপর জনা পঁচিশ ছেলেমেয়ে খাতা খুলে বসে রয়েছে। মেঘা একটা হোয়াইট বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি এঁকে বাস্তুতন্ত্র বোঝাচ্ছে। ওর ফোন বেজে উঠল। ও পড়াতে পড়াতে কখনও ফোন ধরে না। শুধু আড়চোখে দেখে নেয় কার নম্বর ভেসে উঠল। এই যে ছবি আঁকছে, ওর টেবিল কাঁপছে ফোনের কম্পনে। ও তাকিয়ে দেখল ফোন করেছেন জামাইবাবু। সচরাচর যা করে না, তাই করল ও, ছেলেমেয়েদের ‘এক মিনিট আসছি’ বলে বেরিয়ে এল ঘরের বাইরে। বলল, ‘বলুন’। তিনি বললেন, ‘শনিবার অ্যাকাডেমিতে নাটক দেখার দুটো টিকিট পেয়েছি, তোমার দিদির তো কোমরে ব্যথা, তুমি যাবে মেঘা আমার সঙ্গে?’”
“একটা কথা বলবেন, বল্লালবাবু?”
“ভবিষ্যদ্বাণী নয় তমা ম্যাডাম, এটা ফিচলেমি।”
“আপনি এখনও ভালবাসেন, না? মেঘাকে?”
“দূর! তার মুখটাও মনে করতে পারব না।”
“এক দিনের জন্য হলেও ভালবেসেছিলেন?”
“ওগুলো ঠাট্টা, মজা, মশকরা।”
“আপনি কোনও দিন কাউকে ভালবেসেছেন?”
“তা হলে একটা গল্প বলি আপনাকে…”
“গল্প নয়, সত্যি কথাটা বলবেন? চাইলে নাও বলতে পারেন৷ এটা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়৷ প্রশ্ন করাটা উচিত নয়।”
“আপনি খুব দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছেন তমা।”
“আপনি কী করে ভবিষ্যদ্বাণী করেন?”
“আপনি চোখ বন্ধ করে থাকেন, তাই দেখার জিনিসও দেখতে পান না।”
“কী দেখার জিনিস দেখতে পাইনি বলুন।”
“আপনার বান্ধবীকে।”
“আমার বান্ধবী, মানে গরিমা? ওকে দেখিনি? ওর সঙ্গেই তো ছিলাম!”
“ছিলেন, কিন্তু দেখেও দেখেননি। না হলে আপনিও বুঝতে পারতেন যে, ও সন্ধেয় ডুব মারবে, রাতে ডুব দেবে, আবার খুব ভোরে চলে আসবে।”
“কাল ভোরে ও চলে আসবে?”
“আমি তো তাই দেখছি। আপনি তখন ঘুমচোখে জিজ্ঞেস করবেন, ক’টা বাজে?”
“আর কী দেখতে পাচ্ছেন?”
“দেখতে পাচ্ছি, ও জানতে চাইবে ও রাতে না থাকায় কোনও সমস্যা হয়েছিল কি না। আপনি ঘুম চোখে বলবেন, না হয়নি। তার পর বলতে যাবেন পঞ্চচুল্লি দেখার প্রসঙ্গ। বলতে গিয়ে মনে হবে, সে যেন মন দিয়ে শুনছে না আপনার কথা। আপনি তখন ‘আচ্ছা এখন ঘুমোই, পরে বলব’ বলে আবার শয্যা নেবেন।”
“এখন দেখতে পাচ্ছেন?”
“কাকে? গরিমাকে? দেখতে পাচ্ছি।”
“আমায় দেখতে পাচ্ছেন, বল্লাল?”
“পাচ্ছি। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।”
“কী দেখছেন?”
লেখা পাঠান
শনিবারের চিঠির সাহিত্য পাতায় প্রতি শনিবার  কবিতা, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী প্রভৃতি প্রকাশিত হয় । আপনি লেখা  পাঠাতে চাইলে আপনার লেখা সংযুক্ত করে নিচের ইমেইল ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন। লেখার সঙ্গে অবশ্যই ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে হবে। ইমেইলঃ editor@thesaturdaynews.com
——————————————————————————————————–

“দেখছি আপনার শরীরের ভিতর থেকে ক্লান্তি এসে ডাকছে। বলছে, একটু ঘুমোব। আপনার মন বিদ্রোহ করছে। বলছে, তুমি চাইছ বলেই উল্টোটা করব। ঘুমোব না। আপনার শরীর শিথিল হয়ে আসছে ক্লান্তিতে। আপনি বসে আছেন এখানে, আর ভাবছেন কলকাতার কথা। হয়তো লণ্ঠনের আলোয় কোনও প্রিয় মানুষের সঙ্গে রেস্তরাঁয় বসে বলা কথার প্রসঙ্গ। কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে বিচলিত আপনি। হয়তো সেই সিদ্ধান্ত নিতে হলে আপনাকে দু’ভাগ হয়ে যেতে হবে।”
“আমি ঘুমোব না বল্লাল।”
“ঘুমোবেন কেন, ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিন।”
“ঘরে যাব না। একটা কফি বলবেন প্লিজ়?”
“না, আপনাকে একটা অন্য কথা বলি তমা। এখন কৃষ্ণপক্ষ। পূর্ণিমা চলে গেছে সদ্য। একটু বেশি রাতে চাঁদ উঠবে। তার আলোয় স্বর্গ নেমে আসবে পঞ্চচুল্লিতে। এখন একটু বিশ্রাম নিন। আমিও ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে নিই একটু। বরং ডিনারের পর গল্প করতে করতে পর্দা সরিয়ে সেই রূপ দেখব।”
“বল্লালবাবু, আপনি কী জাদুকর?”
“ঠিক বলেছেন তমা। আমি কলকাতার মিঠাইওয়ালা, মুন্সিয়ারির জাদুকর। আর একটা কথাও নয়। ঘরে যান। ডিনারের সময় হলে আমি দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকব। আপনার ঘুম ভেঙে যাবে। এখন একটু বিশ্রাম নিন, দেখবেন ঝরঝরে হয়ে গেছেন।”
পৌনে তিন ঘণ্টা পর
ডাইনিং থেকে ঘরে এসেই বিছানায় এলিয়ে পড়েছিল তমা। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল তার শরীর, তার চেতন, অবচেতন। এর পর যখন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল, যখন তার ঘুম ভাঙল, যখন পূর্ববর্তী স্মৃতিসমূহ ফিরে এল মগজ পর্দায়, তখন নিজেকে বেশ তরতাজা লাগল। সে প্রথমে একটু উঁচু গলায় বলল, যাচ্ছি। তার পর হাই তুলে, আড়মোড়া ভেঙে ফুরফুরে মেজাজে গিয়ে দরজা খুলল। দেখল ডাইনিংয়ে খাবার ঢাকা দিয়ে রাখা। একটা টেবিলে বসে একাই খাচ্ছে জীবেশ। বল্লাল বলল, “ওকে অপেক্ষা করতে বললাম তিন জনে এক সঙ্গে খাব বলে, কিন্তু বলল ও খুব ক্লান্ত।”
বলতে বলতেই হাত তুলে জীবেশ বলল, “জানিসই তো, আমার কাজের চাপ কেমন! আজ কিন্তু এক পেগও খাইনি, অবসর পেয়ে রিসার্চের কাজগুলো নিয়ে একটু বসেছিলাম। আমি আগে খেয়ে নিলাম তমা। খেয়ে একটু ঘুমোব। চোখ জুড়ে আসছে। গরিমা কি নীচে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে? ওকে বলে দিস কিছু যেন মনে না করে।” জীবেশের কথা শুনে শুধু একটু হাসল তমা। বল্লাল তাকে বলল, “আপনিও খেয়ে নিতে পারেন। আমি এক বার এক তলায় ঢুঁ মেরে আসি।”
তমা বলল, “চলুন, আমিও যাব!”
এক তলায় গিয়ে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে টুকটাক গল্প করে, সেল্ফি তোলার আবদার মিটিয়ে, পরের দিনের পরিকল্পনা করে তারা যখন ওপরে এল, তত ক্ষণে ঘরে গিয়ে দোর এঁটেছে জীবেশ। দোতলায় দুই মহিলা এক ঘরেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, দুই পুরুষ নিয়েছিলেন আলাদা ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত। এখনও গেস্ট হাউসের এক জন কর্মী গরম রাখার পাত্রে খাবার নিয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। বল্লাল, তমা দু’জনেই গিয়ে বসল তাদের নির্দিষ্ট প্রান্তদেশের টেবিলে। রুটি, নিরামিষ নবরত্ন কারি পরিবেশন করে ছেলেটি চলে গেল। খেতে খেতে তমার মনে হল, এই অচেনা লোকটা তার ভেতরের মানুষটাকে বেশ চিনতে পারছে। এক বার মনে হল এ হয়তো কোন ছদ্মবেশী সন্ন্যাসী, যে সংসারবদ্ধ মানুষকে খুব সহজেই চিনে নেয়। আচ্ছা, এমন নয় তো, যে তার মতিগতি বোঝার জন্য বিপ্লবই এই লোকটাকে পাঠিয়েছে!


 

কলকাতা ।।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৭:১৩ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com