জ্বালানী কিংবা রিচার্জরবিহীন মোটরযান আবিস্কার করলনে বাগেরহাটের মানিক

শনিবার, ০২ জানুয়ারি ২০১৬

জ্বালানী কিংবা রিচার্জরবিহীন মোটরযান আবিস্কার করলনে বাগেরহাটের মানিক
Manik-and-PEV-car

মিজানুর রহমান মানিক

শনিবার রিপোর্টঃ জ্বালানী কিংবা রিচার্জের প্রয়োজন হবে না-যত মাইল খুশী ঘুরে বেড়ান নিজের গাড়িতে। এমন একটি পদ্ধতির উদ্ভাবন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বাগেরহাটের কৃতি সন্তান বর্তমানে পেনসিলভেনিয়ায় বসবাসরত মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মানিক। এনআরবি নিউজ

এ পদ্ধতি ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বকে পরিবেশ দুষণের হুমকি থেকে কিছুটা মুক্ত রাখার পাশাপাশি দৈনিক ট্রিলিয়ন ডলারের জ্বালানী সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। এমন অবিশ্বাস্য এই পদ্ধতির নাম দিয়েছেন ‘পিইভি’ (পিউর ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল)। এবং এটি উদ্ভাবন করেই চলতি ডিসেম্বরেই তিনি যুক্তরাষ্ট্র ‘প্যাটেন্ট এ্যান্ড ট্রেড মার্ক’ অফিসে তালিকাভুক্ত করেছেন। বিজয়ের মাসে বাঙালি তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের এ আবিষ্কারের কথা প্রবাসীদের মধ্যেও বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পাশ্চাত্যের উদ্ভাবনী জগতের সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়ার মত এই পিইভি পন্থার বাজারজাতকরণে মাণিক খুঁজছেন বিনিয়োগকারি। পেনসিলভেনিয়ার আপারডারবিতে বসবাসরত মাণিক বিত্তশালী বাংলাদেশিদের সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিতে চান।


ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, কুষ্টিয়া থেকে ইনফরমেশন এ্যান্ড কম্যুনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি সম্পন্নকারি বাগেরহাটের মংলার পশ্চিম শেহলাবুনিয়ার সন্তান মানিক সর্বশেষ ২০১৪ সালে চাকরি করেন ঢাকায় কাজী আইটি সেন্টারে। যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন ২০১৫ সালের জুলাই মাসে। মাণিক এনআরবি নিউজকে বলেন, এর আগে আমি ‘ফিডব্যাক পাওয়ার সিস্টেম’ উদ্ভাবন করেছি। এটি কোন ধরনের বিদ্যুৎ ছাড়াই ব্যাটারি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হয়ে থাকে অর্থাৎ টেলিফোনসহ যাবতীয় ব্যবহার্য জিনিষ চার্জের জন্যে নির্দিষ্ট স্থানের প্রয়োজন নেই। এই সিস্টেম ক্রয় করলে সারাজীবনের জন্যে রিচার্জের ঝামেলা শেষ। এ যন্ত্রের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মানিক বলেন, আমি মেকাট্রনিক্স, এ্যাস্ট্রোনমী এবং মহাকাশ বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে চাই আরো বড় ধরনের কিছু করার জন্যে।

‘পিইভি’ উদ্ভাবনের সূচনা প্রসঙ্গে ৩০ ডিসেম্বর বুধবার মিজানুর রহমান মাণিক এনআরবি নিউজকে আরো জানান : সময়টা ছিল ২০০৪ সালের ১৩ জানুয়ারী। একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। কোন এক জায়গায় যাওয়ার জন্য আমি ট্যাক্সি নিলাম যা কিনা মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণ করে। সেটি ছিল গ্রীষ্মকাল এবং খুব বাতাস। এমন সময় ভাবছিলাম তেল, গ্যাস ছাড়া গাড়ি চালানো যায় কিনা; শুধু বাতাস কিংবা হুইল ড্রাইভ ব্যবহার করে এটি সম্ভব কিনা। এই ভাবনা থেকেই ‘পিউর ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল’র ডিজাইন শুরু করলাম। এরপর আমেরিকাতে এলাম উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকারী খোঁজার উদ্দেশ্যে। আমেরিকার দুটি কোম্পানি আমাকে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু তারা যে পরিমাণ মার্কেটিং খরচ দাবি করল তা আমার সাধ্যের বাইরে। এরপর আবার গবেষণা ও পড়াশোনার দিকে মন দিলাম। কিন্তু উদ্ভাবনী মন শুধু নিত্য-নতুন আইডিয়া নিয়ে ভাবে। তাই আবারও এখানে এসে প্যাটেন্ট করলাম এবং বিনিয়োগকারী খোঁজার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ থেকে এখানে আসার একটাই উদ্দেশ্য, তা হল প্যাটেন্ট বিক্রি করা এবং আমার এই ‘পিউর ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল’ বাস্তবে পরিণত করা। আমেরিকায় অনেক বেশি সুযোগ সুবিধা, যা কিনা বাংলাদেশে থেকে করা সম্ভব নয় বলেই প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়েছি। আমি মনে করছি, আমার এই উদ্ভাবন জনপ্রিয়তা অর্জনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ আর বাঙালির মেধার প্রশংসা বিস্তৃত হবে।

সংক্ষিপ্ত কার্যকারিতা প্রসঙ্গে মাণিক আরো বলেন, এই ‘পিউর ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল’ তথা পিইভি নিজেই নিজের বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে কোনরকম তেল, গ্যাস ছাড়া। শুধু বাতাস এবং হুইল ড্রাইভ ব্যবহার করে গাড়ির ছাদে থাকা ‘টারবো ফ্যান’ ও জেনারেটরের মাধ্যমে এই গাড়ি কয়েকশো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে। আমেরিকা ও সারা বিশ্বে যতরকম বৈদ্যুতিক গাড়ি আছে তার মধ্যে টেসলা, নিশান, হুন্ডা, টয়োটা, ফোর্ড উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এসব গাড়ির চার্জের প্রয়োজন হয় যা কিনা খুবই ঝামেলার বিষয়। দেখা গেল পথের মধ্যে চার্জ শেষ হয়ে গেল কিংবা কয়েক মাইল দূরে গিয়ে চার্জিং স্টেশন খুঁজে বেশ কিছু সময় নষ্ট করে চার্জ দিতে হবে। আর এই পিউর ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল নিজের চার্জ নিজেই তৈরি করবে চলতি অবস্থায়ই। তাই কোন টেনশন ছাড়াই যত খুশি তত ভ্রমণ করতে পারবেন। এমনকি গাড়ির ভেতরে যত খুশি ইচ্ছেমত গান শোনা, এসি, হিটিং সবই সম্ভব অফুরন্ত বিদ্যুৎ দিয়ে।

মাণিক বলেন, আমরা অনেক ধরনের ইলেক্ট্রিক গাড়ি দেখেছি কিন্তু সব ধরনের ইলেক্ট্রিক গাড়িতে কোন না কোনভাবে রিচার্জ এর প্রয়োজন হয়। এখানে পিউর ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল অর্থাৎ পিইভি’র কথা বলবো যাতে কোনরকম চার্জ এর প্রয়োজন হয়না। এই পিইভি নিজেই নিজের বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে।

বাজারে অনেক ইলেক্ট্রিক গাড়ি আছে যা হাইব্রিড অথবা সম্পূর্ণ ইলেক্ট্রিক। সম্পূর্ণ ইলেক্ট্রিক গাড়ি আবার চার্জ নির্ভর। অর্থাৎ একবার চার্জ দিলে ৭০ মাইল থেকে ১০০ মাইল চলবে। তারপর আবার চার্জ করতে হবে। বারবার চার্জ করার ঝামেলা থেকে মুক্তি দেবে এই পিইভি গাড়ি। এই গাড়ি কখনও চার্জ দেয়ার প্রয়োজন নেই। এই গাড়ি নিজেই নিজের চার্জ তৈরি করবে বাতাস থেকে এবং নিজের চলমান চাকা থেকে। সারা পৃথিবীর যত গাড়ি আছে সেসব যদি এই পিইভি পদ্ধতি ব্যবহার করে তাহলে পৃথিবীতে কয়েক ট্রিলিয়ন গ্যালন তেল বা গ্যাস খরচ বেঁচে যাবে। শুধু সবচেয়ে বড় কঞ্জ্যুমার দেশ আমেরিকাতে গড়ে ৩৬৮ মিলিয়ন গ্যালন গ্যাসোলিন পোড়ানো হয় প্রতিদিন (২০১১ এর সমিক্ষানুযায়ী)। সে হিসাবে এক গ্যালনের দাম যদি হয় ৩ ডলার, তাহলে এবার ক্যালকুলেটরে দৈনিক কত মিলিয়ন ডলার এবং মাসে ও বছরে কত বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয় হিসাব করে দেখুন। আর বিশ্বের অন্যান্য দেশের খরচ হিসাব করলে সারাবিশ্ব দৈনিক কয়েক বিলিয়ন- ট্রিলিয়ন ডলার গাড়ির তেল বা গ্যাস বাবদ খরচ করে।

মাণিক বলেন, এই গাড়ি বিশুদ্ধ বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে। সঙ্গে সঙ্গে মটর হুইল ড্রাইভ থেকেও বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে। গাড়ির উপরে থাকবে দুটি ‘টারবো ফ্যান’ এবং নিচে থাকবে মটর হুইল ড্রাইভ-যা সম্মিলিতভাবে তিনটি জেনারেটর চালাবে এবং কয়েকশো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে। সেই বিদ্যুৎ গাড়ির অন-বোর্ড ব্যাটারিকে অবিরাম চার্জ করবে। কাজেই গাড়ি চলবে আনলিমিটেড মাইল, এমনকি গাড়ির যাবতীয় অডিও-ভিডিও, এসি, হিটিং সবই চলবে আনলিমিটেড।

নিত্যদিনের প্রচুর চাহিদার কথা মাথাই রেখেই এই পিইভির ডিজাইন করা হয়েছে যাতে বিন্দুমাত্র তেল বা গ্যাসোলিন এর প্রয়োজন নেই। কাজেই সারাবিশ্বে দৈনিক বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার তেল খরচ বেঁচে যাবে এবং বছর শেষে তেলের বাজেটও কমে যাবে। এমনকি সারাবিশ্বের অর্থনীতি আরো মজবুত হবে। তাছাড়া বিশ্বের কোথাও আর তেল দিয়ে গাড়ি চালানোর প্রয়োজন হবে না।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ ০২ জানুয়ারি ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০২ জানুয়ারি ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com