জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা খালেদা জিয়ার ৭ বছর জেল

মঙ্গলবার, ৩০ অক্টোবর ২০১৮

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা খালেদা জিয়ার ৭ বছর জেল

Rajnitiবাংলাদেশ ডেস্কঃ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে অপর তিন আসামি আবদুল হারিছ চৌধুরী (পলাতক), জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলামকেও সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেককে দশ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারের সাত নম্বর কক্ষে স্থাপিত ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন। এ সময় খালেদা জিয়া অনুপস্থিত ছিলেন।


তার আইনজীবীরাও আসেননি। এক বছরের মধ্যে দুটি দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি একই আদালত বিদেশ থেকে এতিমদের জন্য আসা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের  কারাদণ্ড দেন। ওই সাজার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। ৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে বর্তমানে চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রাখা হয়েছে।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, খালেদা জিয়া রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহ করেছেন এবং সেটা ব্যয় করেছেন। এটা কাম্য হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় পদে থেকে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার উৎসাহ যেন না পান, সে জন্য তার কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন ।

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে সোমবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে সোমবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার

এদিকে রায় প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। গতকাল দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এই ফরমায়েশি রায় দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার দেশের সব জেলা সদর ও রাজধানীতে বিক্ষোভ করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। রায় ঘোষণার পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঝটিকা মিছিল করেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেন। এ ছাড়া মগবাজার এলাকায়ও ঝটিকা মিছিল করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

এদিকে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছিলাম, সফল হয়েছি, তাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। অন্যদিকে রায় প্রত্যাখ্যান করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেছেন, খালেদা জিয়া হাইকোর্টে বিচার পাননি। আপিল বিভাগেও বিচার পেলেন না। আজকের রায় ফরমায়েশি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানান তিনি। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের এক নম্বর হলে এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান। বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন নজির স্থাপন হয়েছে। তিনি বলেন, দুদক সরকার ও আওয়ামী লীগের অধীন একটি সংগঠন। খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের সদস্য মো. সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, এই রায় একতরফা। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টটি প্রাইভেট। এখানে রাষ্ট্রের কোনো টাকা নেই। সরকারের হস্তক্ষেপে জোর করে সাজা দেওয়া হয়েছে। এই সাজার বিষয়ে আপিল করা হবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর সিনিয়র আইনজীবীরা সিদ্ধান্ত নেবেন।

আট বছর আগে দুদকের দায়ের করা এ মামলার চার আসামির মধ্যে খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব আবদুল হারিছ চৌধুরী শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। তবে তার তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সহকারী একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান গতকাল রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আদালতের দৃশ্যপট :গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিচারক মো. আখতারুজ্জামান ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতের এজলাসে বসেন। বিচারক বলেন, রায়টি অনেক বড় বিধায় সম্পূর্ণ পড়ছি না। রায়ের মূল অংশটি পড়ছি। ছয় শতাধিক পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার দুপুর সোয়া ১২টায় পড়া শেষ করেন তিনি। রায়ে ১৫টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি আসামিদের সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করেন। রায় ঘোষণার পর দুই আসামি জিয়াউল ইলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার একমাত্র পলাতক আসামি হারিছ চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

রায়ে আদালত বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতা অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত ট্রাস্টের অনুকূলে অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহ করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়াকে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন বিচারক। অন্য তিন আসামি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে খালেদা জিয়াকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অপরাধে সহায়তা করায় তাদেরও সমপরিমাণ শাস্তি দেওয়া যুক্তিসঙ্গত বলে উল্লেখ করেন তিনি। দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অন্য তিন আসামিকে একই সাজার আদেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে কেনা কাকরাইলের ৪২ কাঠা জমি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন আদালত।

রায় ঘোষণার সময় দুদকের বিশেষ কৌঁসুলি মোশররফ হোসেন কাজল, ঢাকা মহানগর পিপি আব্দুল্লাহ আবুসহ অন্যান্য আইনজীবী এবং মামলার বাদী দুদকের উপ-পরিচালক হারুন অর রশীদসহ অন্যান্য কর্মকর্তা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এ মামলার বিচার চালানোর সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে যান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। গতকাল সকাল ৯টা ১০ মিনিটে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সেই লিভ টু আপিল খারিজ করে দেন। ফলে রায় ঘোষণার বাধা কেটে যায়। ওই আদেশের বিষয়টি অবহিত হওয়ার পরই রায় ঘোষণা করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের বিচারক। কয়েকটি ধার্য তারিখে আসামি পক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন না করায় বিচারক গত ১৬ অক্টোবর এ মামলার বিচারিক কাজ শেষ করে ২৯ অক্টোবর রায়ের দিন ধার্য করেন।

প্রেক্ষাপট : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক হারন-অর রশীদ।

এজাহারে বলা হয়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ট্রাস্টের নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত এক কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি। ঘটনার তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে উল্লেখ করে ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ঢাকার বিশেষ জজ-৩-এর তৎকালীন বিচারক বাসুদেব রায় ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।

বাড়তি নিরাপত্তা বন্দোবস্ত : পুরান ঢাকায় সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় গতকাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। নাজিমুদ্দিন রোডের বিভিন্ন অংশে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়। কর্নার মসজিদ এলাকা থেকে আগন্তুকদের তল্লাশি করে ঢোকানো হয়। ওই সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকে দুপুর পর্যন্ত। র‌্যাব-পুলিশ সদস্য সতর্ক পাহরায় নিয়োজিত থাকেন। কারাগারের চারপাশে পুলিশ টহল রাখা হয়। রায় ঘোষণার সময় আদালতের আশপাশে বিপুলসংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সদস্য অবস্থান নেন।

খালেদা জিয়ার এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান সম্পন্ন :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বেশ কিছু শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাকে ভিআইপি কেবিন থেকে রেডিওলজি ও এক্স-রে বিভাগে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে কেবিনে ফিরিয়ে আনা হয়।

বিএসএমএমইউ পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন সমকালকে বলেন, মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী খালেদা জিয়ার কোমরের অস্থিসন্ধির সিটিস্ক্যান এবং মেরুদণ্ডের এক্স-রে করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার এসব পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া যাবে। ওই রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসার পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / অক্টোবর ৩০,২০১৮

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৭:১১ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ৩০ অক্টোবর ২০১৮

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com