জামালের বহিষ্কার ঠেকাতে আমেরিকাজুড়ে প্রতিবাদ

শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

জামালের বহিষ্কার ঠেকাতে আমেরিকাজুড়ে প্রতিবাদ

ইব্রাহীম চৌধুরী, নিউইয়র্কঃ অভিবাসন পুলিশের হাতে আটক রসায়নের শিক্ষক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সৈয়দ জামালকে দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে আমেরিকাজুড়ে বিশাল ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো একজন ব্যক্তির বহিষ্কার ঠেকাতে আমেরিকার গণমাধ্যমে এত আলোচনা খুব কমই হয়েছে। কানসাসের লরেন্স থেকে গত সপ্তাহে তাঁকে বাসার সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

চেঞ্জ ডট ওআরজি নামের নাগরিক সংগঠন থেকে সৈয়দ জামালের পক্ষে রীতিমতো নাগরিক আন্দোলন শুরু হয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে মার্সই লিউসচেন ৭ ফেব্রুয়ারি সকালেই তাঁর জন্য জরুরি করণীয় ঠিক করার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, এখনই সোচ্চার হওয়ার সময়। সবাই যেন ফোন হাতে নিয়ে আইস শিকাগো অফিস ও মিসৌরি অফিসে ফোন করে সৈয়দ জামালের মুক্তির জন্য আহ্বান জানান। শিকাগো আইস অফিসের চিফ কাউন্সিল কেরেন লান্ডগ্রেনের নম্বর ৩১২-৫৪২-৮২০০ এবং কানসাস সিটির চিফ মেলিসা ক্যাস্টিলোর ফোন ৮১৬-৩৯১- ৭২০০ নম্বরে ফোন করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এসব অফিসে ফোন করে কী বলতে হবে, তা-ও বলে দেওয়া হয়েছে।


চেঞ্জ ডট ওআরজি থেকে বলা হয়েছে, ফোন করে যেন নিজের নাম, কোন নগর থেকে কথা বলেছেন—তা বলতে হবে। ফোনদাতা তাঁর বক্তব্য লিখে রাখার অনুরোধ করবেন। সৈয়দ জামালের সমর্থনে কথা বলার জন্য তাঁর মামলা নম্বর (০৯২৫২০৯৪৫৬) উল্লেখ করে অভিবাসন মামলাটি রি-ওপেন করাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনুরোধ জানাতে হবে। মানবিক কারণে সৈয়দ জামালকে তাঁর আমেরিকান নাগরিক সন্তানদের কাছ থেকে যেন বিচ্ছিন্ন করা না হয়, আদালতে মামলাটি মানবিক কারণে পুনর্বিবেচনা করতে ফোন করে অনুরোধ জানাতে হবে।

সৈয়দ জামালের পক্ষে আমেরিকায় বাংলাদেশি নাগরিক ব্লগগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠছে। জামালের আবেদনের সমর্থনে তাদের প্রচারণাও চোখে পড়ার মতো, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। সৈয়দ জামাল নানাভাবে মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে তাঁর বিতাড়নের ব্যাপারে আমেরিকার মূলধারায় ব্যাপক হইচই শুরু হয়েছে। নিউইয়র্কের বাইরে শ্বেতাঙ্গ বহুল এলাকায় তাঁর বসবাস ছিল। দীর্ঘদিন শিক্ষকতায় ছিলেন। তাঁর সহকর্মী, শিক্ষার্থীসহ উদারনীতিক বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন দ্রুতই পেয়েছেন সৈয়দ জামাল।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, রসায়নের একজন শিক্ষক তাঁর সন্তানদের স্কুলে নিতে ঘর থেকে বেরিয়েছেন, আর অভিবাসন পুলিশ তখনই তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। সিবিএস নিউজের শিরোনাম, ‘৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা একজন রসায়নের শিক্ষককে আটক করেছে আইস পুলিশ।’ আর এনবিসি লিখেছে, ‘কানসাসের একজন রসায়নবিদ যিনি ৩০ বছর ধরে আমেরিকায়, তাঁকেও দেশে পাঠাতে চায় ইমিগ্রেশন পুলিশ। সিএনএন শিরোনাম করেছে, ‘একজন শিক্ষককে দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে কানসাসের লরেন্স কমিউনিটির অভূতপূর্ব ঐক্য।’ এসব ছাপা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সব গণমাধ্যমে। টেলিভিশনে চলছে টক শো আর অভিবাসন আইন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা।

কানসাসের লরেন্স থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক সৈয়দ জামালের পক্ষের এসব সংবাদ এত বেশি মানুষ পড়েছেন যে ৬ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকের ট্রেন্ডিং বা সর্বোচ্চ আলোচিত বিষয়ে উঠে আসে। এসব সংবাদ নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার পাশাপাশি মানুষ নানা রকম মন্তব্যও করছেন।

‘সময় এসেছে সৈয়দ জামালের মতো মেধাবী এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষদের পক্ষে কথা বলার। সবাই জেগে উঠুন, আর সৈয়দ জামালের দেশে ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। একই সঙ্গে রুখে দাঁড়ান আমাদের পাগলপ্রায় অভিবাসনরীতির প্রতিও’—ডেক্সাই জুন নামের এক ব্যক্তি একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছেন তাঁর ফেসবুক ওয়ালে। তাঁর লেখার শিরোনাম, জামালের দেশে ফেরা ঠেকাতে হাজারো মানুষের চিঠি। নাদিয়া হোসেইন নামের একজন মানবাধিকারকর্মী তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘আমাদের সরকার আমাদের করের টাকায় চলা অভিবাসন দপ্তর আর অভিবাসন পুলিশকে ওই সব মানুষের দেশে ফেরত পাঠানোর মিশনে নেমেছে, যাদের দরকার ছিল এই দেশে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে ৩০ বছর ধরে আছেন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রসায়নবিদ সৈয়দ জামাল। এই শিক্ষাবিদ তিন সন্তানের জনক। এসব সন্তান ও তাঁর স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
কানসাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী সৈয়দ জামাল গত ২৪ জানুয়ারি সন্তানদের স্কুলে দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় আইস পুলিশের হাতে আটক হন। সৈয়দ জামালকে যখন আটক করা হয়, তখন তাঁর স্ত্রী তাঁকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজে বাধা দেওয়ার দায়ে তাঁরও সাজা হতে পারে বলে সতর্ক করেন আইস পুলিশের সদস্যরা।
সৈয়দ জামালের বড় ছেলে ১৪ বছর বয়সের তাসিন জামাল একটি ভিডিও বার্তায় বাবার দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে সবার কাছে আবেগঘন অনুরোধ জানিয়েছে। ভিডিও বার্তায় তাসিন বলে, ‘বাবাকে ছাড়া এই বাসায় আমরা নিঃস্ব। যুক্তরাষ্ট্রের আইন তাঁকে নাগরিকত্ব গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রেখেছিল। আমার ছোট ভাইটি সারাক্ষণ কাঁদে। আমার মা একটি কিডনি নিয়ে বেঁচে আছেন। তিনিও মারা যেতে পারেন তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হলে। বাবাকে ছাড়া ভাইবোন আমরা এখনো অসহায়। এ অবস্থায় আমি সবার কাছে অনুরোধ করছি, আমার বাবাকে আমাদের পরিবারে ফিরিয়ে আনার জন্য।’

এই অনুরোধে মাঠে নেমেছেন কানসাসের লরেন্সের মানুষ। তাঁরা সভা করে, প্ল্যাকার্ড নিয়ে সৈয়দ জামালের মতো বাবা, শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীকে আমেরিকা থেকে বিতাড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করেছেন। চেনজ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ১৫ হাজার মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহের অভিযানে নেমেছেন তাঁরা। তবে সর্বশেষ খবরে সৈয়দ জামালের পক্ষে শুধু ১৫ হাজার মানুষ স্বাক্ষরই করেননি, বরং তাঁর সংবাদটি এখন আমেরিকার আলোচিত বহিষ্কার সংবাদে পরিণত হয়েছে।

শনিবাবের চিঠি / আটলান্টা / ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:৪১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com