ছোটগল্পের ছোট কথা

শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১

ছোটগল্পের ছোট কথা
প্রতিকী ছবি

ছোটগল্প কী, কেমন হওয়া উচিত, এর স্বরূপ, এ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় এ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘ছোটপ্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা
ছোট দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল
সহস্য বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু একটি অশ্রুজল
নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা
নাহি তত্ত্ব, নাহি উপদেশ
অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হইয়াও হইল না শেষ।’
এটাই ছোটগল্পের মূল রহস্য আর রচনাকৌশল। এই ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ কথাটি বড়ই গুরুত্ববহ। এ কথার ভেতরই ইঙ্গিত রয়েছে যে, ছোটগল্পে কখনোই কাহিনীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলা হয় না। যেমন বলা হয় উপন্যাসে। ছোটগল্পেও উপন্যাসের মতো কাহিনী থাকে। তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নয়। কাহিনীর ভেতরের কোনো অংশ নির্বাচন করে সেটাই ফুটিয়ে তোলা হয় ছোট পরিসরে। কবিতা কী এটা যেমন বলা সহজ নয়, তেমন ছোটগল্প কাকে বলে সেটা বলাও সমান জটিল। রবীন্দ্রনাথ যে বর্ণনা দিয়েছিলেন এতদিনেও তা পাল্টায়নি। এখনো ওগুলি ছোটগল্পের আবশ্যিক উপাদান ও উপকরণ বলে বিবেচিত। আজও তা সমান আধুনিক। তবে এটি ছোটগল্পের সংজ্ঞা নয়।
ছোটগল্প সেটা বর্ণনামূলক কাহিনীনির্ভর উপন্যাসের চেয়ে ছোট এবং অল্প কিছু চরিত্র নিয়ে আবর্তিত হয়। ছোটগল্পের কারিগর এডগার এলেন পোর ( ১৮০৯-১৮৫৯) মতে,
Short story should be read in one setting, anywhere from a half hour to two hours..
ইংরেজ লেখক এইচ জি ওয়েলসের মতে, ‘ছোটগল্পের আয়তন এমন হওয়া উচিত যেন ১০ থেকে ৫০ মিনিটের মধ্যে পড়ে শেষ করা যায়।’
ছোটগল্পের পরিধি ছোট হওয়ার কারণে এর কাহিনীর পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা সম্ভব নয়। সাহিত্য গবেষক শ্রীশচন্দ্র দাশ বলেছেন,
‘আসল কথা হইল এই যে, ছোটগল্প আকারে ছোট হইবে বলিয়া ইহাতে জীবনের পূর্ণাবয়ব আলোচনা থাকিতে পারে না, জীবনের খণ্ডাংশকে যখন লেখক রস নিবিড় করিয়া ফুটাইয়া তুলিতে পারেন, তখনই ইহার সার্থকতা। জীবনের কোনো একটি বিশেষ মুহূর্ত কোনো বিশেষ পরিবেশের মধ্যে কেমনভাবে লেখকের কাছে প্রত্যক্ষ হইয়াছে ইহা তাহারই রূপায়ণ। আকারে ছোট বলিয়া এখানে বহু ঘটনার সমাবেশ বা বহু পাত্র-পাত্রীর ভিড় সম্ভবপর নহে। ছোটগল্পের আরম্ভ ও উপসংহার নাটকীয় হওয়া চাই। সত্য কথা বলিতে কী, কোথায় আরম্ভ করিতে হইবে এবং কোথায় সমাপ্তির রেখা টানিতে হইবে, এই শিল্পদৃষ্টি যাহার নাই তাহার পক্ষে ছোটগল্প লেখা লাঞ্ছনা বৈ কিছুই নয়।’
সাহিত্য মানুষের মানসিক আহার। মানসিক চাহিদা থেকেই এর সৃষ্টি। জৈবিক চাহিদা ক্ষুধা পিপাসা দৈহিক তৃপ্তির মতো মানুষের অন্তরের ক্ষুধাও নিরন্তর। এই ক্ষুধার প্রধানতম নিবৃত্তি হয় সাহিত্য আর শিল্প থেকে। আর সাহিত্যের মধ্যে মানুষ গল্প শুনতে বড়ই ভালোবাসে। আমাদের অতীতের দিকে দৃকপাত করলে দেখা যাবে, আমাদের অতীত গল্পপ্রাণ। যুগ যুগ ধরে আমাদের ধর্মের বাহন হয়ে আছে গল্প। রামায়ণ মহাভারত বাদ দিলে হিন্দুধর্মের অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। আর জাতক বাদ দিলে বৌদ্ধ ধর্মও দার্শনিক তত্ত্ব হয়ে ওঠে। এ দেশের কাব্য নাটকগুলোর মূলেও আছে গল্প। অনেক পণ্ডিতের মতে আরব্য উপন্যাসের জন্মভূমিও ভারতবর্ষ। আজ যে আমরা সবাই গল্প শুনতে ভালোবাসি তার কারণ আমাদের পূর্বপুরুষরাও গল্প শুনতেন। এ প্রবৃত্তি আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের কাছ থেকে লাভ করেছি। আসলে মানুষের ইতিহাস যেদিন থেকে শুরু হয়েছে তার গল্পের শুরুও সেদিন থেকেই। মানবজীবনের আদিতে অ্যাডাম দিনভর মাটি কোপানো আর ইভ কাপড় বানানোর পর সন্ধ্যার অবকাশে সন্তানদের কাছে গল্প করতেন। মানুষ তার পরিবেশ, পরিস্থিতি, চার পাশের বৈচিত্র্য এবং বিনোদনের চাহিদা থেকেই প্রতিনিয়ত গল্পের জন্ম দিয়েছে। এখনো দিচ্ছে। নীতিশিক্ষা বা রূপকথা থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের সাহিত্যের সৃষ্টি এই মানসিক চাহিদা থেকেই।
সব ছোটগল্পই গল্প তবে সব গল্প ছোটগল্প নয়। গল্পকে ছোটগল্পে উন্নীত হতে হলে কিছু নান্দনিকতা ও কিছু শিল্পশর্তের সেতু দিয়ে ভ্রমণ করতে হয়। রবীন্দ্রনাথকে গল্প লেখার সাথে সাথে ভাষাও তৈরি করতে হয়েছিল। তৈরি ভাষা তিনি পাননি। গল্পপ্রবাহের সাথে তাল মিলিয়ে ভাষা বাছতে হয়েছে তাকে। কারো কারো নিজস্ব ভাষাভঙ্গিও গড়ে উঠতে পারে। মোঁপাসার মতো বিদেশী লেখকরা তৈরি ভাষা পেয়েছিলেন। আর একটা জিনিস বাস্তবতা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
‘ভেবে দেখলে বুঝতে পারবে, আমি যে ছোট ছোট গল্পগুলি লিখেছি বাঙালি সমাজের বাস্তব জীবনের ছবি তাতেই প্রথম ধরা পড়ে। কপালকুণ্ডলা বা দুর্গেশনন্দিনীতে যা ছিল তা সত্য নয়।’
ছোটগল্পে ছোট ছোট দুঃখকথা থাকবে, সহজ সরল হবে, বাগাড়ম্বর থাকবে না। শৈলী হবে নিজস্ব। অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে কেউ লিখতে পারে না। আমরা অর্থশাস্ত্র শেখার জন্য গল্প পড়ি না, গল্পের জন্য গল্প পড়ি। অনুকরণ ও হুজুগে লেখা ঠিক নয়। রামায়ণ মহাভারতেও গল্প আছে, যা আগেও বলেছি। বড় বড় রাজা, বড় বড় রাক্ষস, বড় বড় বীর, বানর আর লেজের কথা। কিন্তু লিখলেই তো হবে না, বিশ^াসযোগ্যতাও একটা ব্যাপার। সেদিকটাও খেয়ালে রাখতে হবে। গল্প বলেই সেটা অবাস্তবতায় পরিপূর্ণ হবে এমন তো নয়। যদি সেটা হয় গল্পকার সেখানেই ব্যর্থ। গল্প যেন হয় চেনা গল্প, নিজের গল্প। পাঠক যেন গল্প পড়ে সে গল্পে নিজেকে খুঁজে পান। যেন তার মনে না হয় এতক্ষণ সময় যে পড়লাম আর টাকা দিয়ে বইটা কিনলাম এটা আমার অপচয় হলো। লেখক যখন কোনো গল্প লেখেন তখন পাঠককে আহ্বান জানান সেটা পড়ার। পাঠক পড়বে বলেই লেখেন। কাজেই লেখকের দায়িত্ব পাঠককে ধরে রাখা। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কিভাবে, কী উপাদান দিয়ে তিনি লেখককে মোহাবিষ্ট করে রাখবেন, তার গল্পের সাথে রাখবেন, সেটা লেখকের ভাবনা। তিনি যদি শুধু চমক সৃষ্টি করার জন্য অল্প জানা বা অচেনা কোনো জীবনের বা পাত্রপাত্রীর গল্প লেখেন বা অভিজ্ঞতা নেই এমন বিষয়ে গল্প লেখেন তা পাঠককে আকৃষ্ট করতে পারবে না। সে গল্প পাঠকের কাছে কান্তিকর বা একঘেয়ে উঠতে পারে। পাঠক যেন কান্ত না হন, একঘেয়েমিতে না ভোগেন সে দায়িত্ব লেখকের। পাঠক গভীরতা চায়, অতলান্তে যেতে চায়, আতশবাজিতে তারা বিভ্রান্ত হয় না। ভাষার দুব্যোধ্যতা জটিলতাও পাঠক পছন্দ করে না। রবীন্দ্রনাথ শরৎ বা মানিক যে গল্প লিখেছেন সেখানে এমন কিছু ছিল যা পাঠককে চুম্বকের মতো ধরে রেখেছে, কাহিনীর বুনোট আর ভাষার প্রবাহমানতা, বর্ণনার মুনশিয়ানা দিয়ে পাঠককে তরতর করে টেনে নিয়ে গেছে। তাই সেগুলো সম্পূর্ণ গল্প হয়ে উঠেছে। যে গল্প পাঠককে মোহিত মোথিত উত্তেজিত, উদ্বুদ্ধ ভাবালু না করে সে গল্প গল্প হয়ে ওঠে না। শুধু তাই নয়, গল্প শেষ হওয়ার পর সে গল্পের শেষটা কেমন হতে পারত বা শেষের পর কী শেষ আছে সেটা যদি পাঠক না ভাবেন তবে ওটা সার্থক গল্প হয়ে ওঠে না। গল্পকার গল্প লেখেন আর পাঠকের জন্য সৃষ্টি চেতনার দ্বার খুলে দেন।

আমাদের চার পাশের মানুষ, তাদের কোমলতা, আশঙ্কা, বিভ্রান্তি, ভালো লাগা-মন্দ লাগা গল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে। তারা হয়তো অতি সাধারণ কেউ। কিন্তু তাদের আচার-আচরণ চিন্তাভাবনায় এমন দ্যুতি দেখা যেত পারে, যা চিরকালীন সাহিত্যে জায়গা করে নেয়। দখল করে নেয় পাঠকের মনোজগৎ। অনবদ্য গঠনশৈলী, ভাষা ব্যবহারে দক্ষতা, সচেতনতাও গল্পগুণের কারণে বিশ^সাহিত্যে স্থান করে নিতে পারে সে গল্প। আর ঘটনা ছাড়াও কোনো একটি বিশেষ মুহূর্ত, মানসিক অবস্থা নিয়েও গল্প হতে পারে যদি সেটিকে বিস্তার বা শেষ করার মুনশিয়ানা থাকে।
বিশ্বসাহিত্যে ছোটগল্প নবীনতম শাখা। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের হাতেই তার বিকাশ। এর আগে যা ছিল তার রাজরাজড়াদের আখ্যান।
ঈশপের গল্প বা জাতকের গল্প খ্রিষ্টের জন্মেরও অনেক আগে লেখা। গল্পের জন্ম নিয়ে বিতর্ক থাকলেও যতটুকু জানা যায়, সবার আগে গল্পে হাত পাকিয়েছেন মিসরীয়রা। তাদের ধর্মীয় বিষয় কাব্যে থাকলেও প্যাপিরাসে লেখা বাকি সবকিছুই ছিল গদ্যে। তারাই প্রাচীনতম গদ্যের অধিকারী। প্রাচীনতম মিসরীয় গল্পগ্রন্থের নাম, the shipwrecked sailor.. জাহাজ ডোবা নাবিক। যা খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সালে রচিত বলে ধারণা করা হয়। আব্বাসীয় যুগে আরব্য রজনীর ধারাবাহিকভাবে গল্প বলার ধ্রুপদী নিদর্শন। পারস্যের অনূদিত গল্প তোতাকাহিনী কিংবা ঠাকুরমার ঝুলি আমাদের গল্পের স্বর্ণসম্ভার। মুখে মুখে প্রচলিত গল্প হোমারের ইলিয়াড ও ওডেসির মতো মহাকাব্যে রূপ পেয়েছে। শেকসপিয়রের নাটকের উপকরণও জুটেছে মুখে মুখে প্রচলিত গল্প থেকে। চতুর্দশ শতকে ইংরেজ লেখক জিওফ্রে চসারের ‘কেন্টারবারি টেলস’কে গল্পের পূর্বপুরুষ বলা হয়। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি ফরাসি সাহিত্যে ‘নভেলা’ আবির্ভূত হয়। এরপর হয় ইউরোপীয় ভাষায় ‘আরব্য রজনী’র অনুবাদ। এরপর আসেন ছোটগল্পের জাদুকর মোপাসাঁ। তার ‘নেকলেস’, ‘এন ওল্ড ম্যান’ অবিস্মরণীয়। একই সময়ে রাশিয়ান গল্পের পসরা সাজান ইভান তুর্গেনেভ, দস্কয়েভস্কি, ম্যাক্সিম গোর্কি, আন্তন চেখভ। গত শতকে সমারসেট মম, ভার্জিনিয়া উলফ, জেমস জয়েস, ফকনার, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আর কল্পকাহিনী লিখে আইজাক আসিমভ চেতনার দুয়ার খুলে দেন। একই সময়ে আবির্ভূত হন জার্মান লেখক ফ্রান্স কাফকা। এ শতকের আরো উল্লেখযোগ্য লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কোজ, নাগিব মাহফুজ, হারুকু মুরাকামি। এলিস মুনরো ২০১৩ সালে নোবেল জিতেছেন।


আর্নেস্ট হেমিংওয়ে সবচেয়ে ছোট ছোটগল্পটি লিখেছিলেন, for sale, baby shoe, never worn.. বিক্রি হবে শিশুদের জুতো, কখনো ব্যবহৃত হয়নি। আরেকটি গল্প ফ্রেডরিক ব্রাউনের নক। the last man on earth sat alone in a room. There was a knock on the door. পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষটি একাকী একটা ঘরে বসে আছেন। কেউ একজন দরজায় নক করল। তবে কে করল?
ত্রৈলক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘ভূত ও মানুষ’, স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘নবকাহিনী’ গ্রন্থ দুটিও উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিত্যে উনিশ শতকের মাঝামাঝি বিন্দুতে সিন্ধুর গভীরতা লক্ষ্য করা যায়। ১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘যুগলাঙ্গুরীয় ও রাধারাণী’ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রথম গল্প ‘ভিখারিণী’ ১৮৭৪ সালে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর একে একে ‘একরাত্রি’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘কাবুলীওয়ালা’, ‘জীবিত ও মৃত’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’সহ আরো অনেক বিখ্যাত ছোটগল্প আমরা পাই। তবে রবীন্দ্রনাথের ‘ঘাটের কথা’ প্রথম সার্থক ছোটগল্প। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মামলার ফল’ গল্পের রাজ্যে বিশেষ জায়গা নিয়ে আছে। বিভূতিভূষণের গল্পে আমরা পাই কল্পনা প্রবণতা, অনুভূতির গাঢ়ত্ব। নজরুলের ‘শিউলীমালা’ একটা উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে আমরা পাই ফ্রয়েডীয় চেতনা, জৈবিক চাহিদার অকুণ্ঠ প্রকাশ।
সমরেশ বসুর ‘আদাব অসাম্প্রদায়িক’ চেতনার এক কালজয়ী প্রকাশ। বনফুলের বেশির ভাগ গল্প এক পাতাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সেই এক পাতার আবেদন হাজার পাতাকেও ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশে চল্লিশের দশকে আবুল মনসুর আহমেদ, আবু রুশদ, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ উল্লেখযোগ্য গল্পকার। দেশ ভাগ দাঙ্গা, মনস্বত্ব ধর্মীয় গোঁড়ামি কূপমণ্ডুকতা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন তারা। আবুল মনসুর আহমেদের ‘ফুড কনফারেন্স’ ও ‘আয়না’ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। আবু রুশদ নগরজীবনের প্রথম সার্থক রূপকার। তার ‘শাড়ি বাড়ি গাড়ি’, ‘মহেন্দ্র মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’, ‘গ্রীষ্মের ছুটি’, ‘জাহাজী’, উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তিত্বের সঙ্কটও লক্ষ্য করা যায় তার লেখায়। শওকত ওসমানের ‘পিঁজরাপোল’, ‘ঈশ^রের প্রতিদ্বন্দ্বী’, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘একুশের সঙ্কলন’, আলাউদ্দীন আল আজাদের ‘মৃগনাভ’, শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’, মাহবুবুল আলমের ‘মফিজন’, ‘শুন হে লক্ষীন্দর’ উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প। ইব্রাহিম খাঁ, আবুল ফজল, আবু জাফর শামসুদ্দীন, সৈয়দ মুজতবা আলী, জহির রায়হান, আবু ইসহাক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শাহেদ আলী উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প লেখক।
সাম্প্রতিক ছোটগল্পে সমাজ সচেতনতা, রাজনীতি, নিরীক্ষাধর্মিতা লক্ষ করা যায়। এ ছাড়াও ইমপ্রেশনারিজম, এক্সপ্রেশনিজম, সুররিয়ালিজম, কাঠামোবাদ, উত্তরকাঠামোবাদও পরিদৃষ্ট হয়।
সাম্প্রতিক ছোটগল্পকারদের গল্প নিয়ে বলব অন্য সময়, বিস্তৃত পরিসরে।
ছোটগল্পেরও আছে নানান রকম। প্রেমের গল্প, সামাজিক গল্প, ঐতিহাসিক, প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কিত গল্প, রূপক ও সাংকেতিক গল্প, অতিপ্রাকৃত, ব্যঙ্গ ও হাস্যরসাত্মক, মনস্তাত্বিক, গার্হস্থ্যবিষয়ক, উদ্ভিদ, প্রাণীবিষয়ক আরো কত কী। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘আদরিণী’ এমনই একটি গল্প।
শেষ কথা এটাই, ছোটগল্প সেটাই যাতে অল্প কথায় অধিক ভাব ব্যক্ত করতে হবে। আরম্ভ ও শেষ হবে নাটকীয়। গল্পের শেষে থাকতে হবে একটা মোচড়। স্থান কাল ঘটনার ঐক্য মেনে চলবে। বিশেষ মুহূর্ত বা চরিত্রের একটা বিশেষ দিক উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। রসঘন, বাহুল্য বর্জিত হতে হবে। রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার থাকতে পারে। শেষ হওয়ার পরও রেশ রয়ে যাবে, গুঞ্জরণ রয়ে যাবে।
তবে এ কথা ঠিক যে, প্রকৃত সৃজনশীলতার কোনো ম্যানুয়াল হয় না। কারণ প্রকৃত শিল্পীর প্রতিটি কাজই মৌলিক। তাই কোনো নিয়মে বেঁধে লেখার গতিরোধ করার চেষ্টা বাতুলতা। তবুও কিছু শৃঙ্খলা থাকে। সেই শৃঙ্খলার আওতায় আছে ছোটগল্পের এই নিয়মকানুনগুলো।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com