ছিটমহলে উড়লো লাল সবুজ পতাকা

রবিবার, ০৭ জুন ২০১৫

ছিটমহলে উড়লো লাল সবুজ পতাকা

 

 

রেজাউল করিম মানিক ও আমিনুল ইসলাম, লালমণিরহাটঃ স্থল সীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের দলিল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটল অর্ধালক্ষাধিক ছিট্মমহবাসীর । আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে গেল মুক্তির পথ ।


 ছিটমহলবাসী খুঁজে পেল নতুন দেশের ঠিকানা। দেশ পাওয়ার আনন্দ মিছিলে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠলো ছিটমহল। বাড়ি বাড়ি উড়ানো হল লাল-সবুজের পতাকা। পটকা ফুটিয়ে, আতশবাজী করে আনন্দ-উল্লাস করছে ছিটের বাসিন্দারা। আনন্দের জোয়ারে ভাসছে তারা। আনন্দ ভাগাভাগি করতে একে অপরকে আলিঙ্গন করছেন। সেই সঙ্গে ঘরে ঘরে চলছে মিষ্টি বিতরণ।

সব ছিটমহলেই শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয়েছে জাতীয় পতাকা। জানানো হয়েছে সশ্রদ্ধ সালাম। ফুলেল শুভেচ্ছা দেয়া হয়েছে ছিটমহল বিনিময় কমিটির নেতাদের।

ঢাকায় দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে স্থল সীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের দলিল বিনিময় করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। বিকেলে লালমনিরহাট জেলার অভ্যন্তরে আদিতমারীর কুটি, বাতৃগাছ, হাতীবান্ধার উত্তর গোতামারী, পাটগ্রাম উপজেলার বাশঁকাটা, উফারমারা, লতাবাড়ী, ভোটবাড়ী, জোংড়া ও কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া, কালমাটি, সাবেহগঞ্জ, দিঘলটারি, ছেউটিকুর্শাসসহ সব ছিটমহলের হাজার হাজার নারী, পুরুষ, শিশু বাংলাদেশের লাল সবুজ জাতীয় পতাকা নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় আনন্দের সঙ্গে নাচতে থাকে।

ঢাকায় দলিল বিনিময়ের পরে আনন্দ মিছিল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে উত্তর গোতামারী ছিটমহলের লোকজন। এসময় তারা নরেন্দ্র মোদি জিন্দাবাদ, শেখ হাসিনা জিন্দাবাদ, মমতা ব্যানার্জি জিন্দা বলে নানা স্লোগান দিতে থাকে।

হাতীবান্ধার উত্তর গোতামারী ছিটমহলের সহির উদ্দিন বাংলামেইলকে বলেন, ‘৬৮ বছর পর আল্লাহ এ্যালানী হ্যামার দিকে চায়া দেখছে। হামরা এখন বাংলাদেশের নাগরিক।’

LALMONIRHAT-pic01এদিকে, কুড়িগ্রাম সীমান্ত থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার ভেতরে ফুলবাড়ি উপজেলা সদরের অভ্যন্তরে এক হাজার ৬৪৩ একর আয়তনের দাসিয়ারছড়া বাংলাদেশের ভেতরে সর্ববৃহৎ ভারতীয় ছিটমহল। এখানে প্রায় ১০ হাজারের বেশি লোকের বসতি। স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী, দাসিয়ারছড়ার নতুন ঠিকানা বাংলাদেশ। সকাল থেকেই দলিল বিনিময়ের অপেক্ষায় ছিলেন তারা। চলে আনন্দ মিছিলের প্রস্তুতি। বিকেলে খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কালিরহাট বাজারে ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির অফিস চত্বরে আসতে থাকে ছিটের বাসিন্দারা। সবাই আনন্দে মেতে ওঠেন। সবাই মিলে লাল সবুজ পতাকা নিয়ে র‌্যালি করে। পরে শুরু হয় সমাবেশ। সমাবেশে যোগ দেন আওয়ামী লীগের কুড়িগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক জাফর আলী, ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাসির উদ্দিন মাহমুদ। এ সময় ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সভাপতি মইনুল হক, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা খান, দাসিয়াছগা শাখার সভাপতি আলতাফ হোসেনসহ সব নেতা উপস্থিত ছিলেন।

দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেলাম। আমরা ৬৮ বছর কাটিয়ে দিয়েছি বন্দি অবস্থায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এক ভয়ানক জীবন যাপন করেছি। হাসপাতাল নাই, বিদ্যুৎ নাই, স্কুল-কলেজ নাই, বিচার-আচার নাই, কোনো দেশেই সহজে চলাচলে উপায় ছিল না। এখন নতুন দেশ, নতুন ঠিকানা পেলাম। অনেক আনন্দ লাগছে। আশা করছি সরকার তাড়াতাড়ি আমাদের সমস্যা সমাধান করবেন। ছিটমহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আমারা শান্তিতে বসবাস করতে পারবো।

অন্যদিকে, ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহল ছিটকরলা-১, ২ বাসিন্দারাও তাদের বাড়ি বাড়ি ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন। শনিবার ছিট করলা-২ এ গিয়ে দেখা যায় বাসিন্দারা সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ভারতের পতাকা উত্তোলনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিকেলে সবাই তাদের বাড়ি বাড়ি ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। তারাও ভারতে যাওয়ার আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন। পটকা ফাটিয়ে উল্লাস করেন। এ ছিটের চেয়ারম্যান খোকা মিয়া বলেন, জন্মভুমি ছেড়ে যাচ্ছি কষ্ট হচ্ছে। তবে আনন্দ লাগছে একটি নতুন দেশ পাওয়ার। এতোদিন কোনো দেশের সুবিধা পাইনি। আশা করছি ভারতে গেলে কিছু সুবিধা পাব। ছেলে মেয়েদের পড়া-লেখা করাতে পারব।

LALMONIRHAT-pic03বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দলির বিনিময়ের পরে বাংলাদেশের ভিতর ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হবে। একইভাবে ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল হয়ে যাবে ভারতের ভূমিতে। ছিটমহলবাসীরা তাদের জমিতে তাদের ভিটামাটিতে বসবাসের সুযোগ পাবেন। কাউকে স্থানান্তরের প্রয়োজন হবে না।

উন্নয়ন চান ছিটবাসী: ছিটমহলগুলোর অধিকাংশতেই নেই তেমন রাস্তা ঘাট, নেই স্কুল কলেজ, মাদরাসা। তাই সরকারের কাছে তাদের জোর দাবি যতদ্রুত সম্ভব ছিটমহলে উন্নয়ন করার। এছাড়া প্রশাসনের তদারকি বাড়িয়ে খুব দ্রুত স্বাভাবিক করে আনার দাবি জানান।

ছিটমহলের নাগরিকরা জানান, প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় ছিটগুলোতে চলছে সীমাহীন অনিয়ম। অনেকেই নানা হুমকি ধামকির মধ্যে বসবাস করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ৭ জুন ২০১৫

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০৭ জুন ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com