চোখের জল শুকিয়ে যায় তবু আসে না লাশ

বুধবার, ১৮ মে ২০১৬

চোখের জল শুকিয়ে যায় তবু আসে না লাশ

কাশেম কাব্য, ঢাকাঃ পিরোজপুরের গৃহবধূ নাজমা বেগম তার স্বামীর মৃত্যুর বর্ণনা দিলেন একবারে অবলীলায়। স্বামী তার সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় তিন মাস আগে। এখন তার চোখে আর পানি নেই। অপেক্ষা শুধু স্বামীর লাশটা দেখার! তিনি বলেই ফেললেন, ‘আর কান্না পায় না। আর কত কাঁদবো! ওরা যদি তাড়াতাড়ি লাশটা ফেরত দিতো তাহলে সান্ত্বনা দিতে পারতাম যে তাকে পেয়েছি, সে আমাদের সাথেই আছে।’

ভালো রোজগারের আশায় বিদেশ গিয়ে মারা গেলে এভাবেই অপেক্ষা করতে করতে চোখের জল শুকিয়ে যায় স্বজনদের। বিশেষ সৌদি আরবে হলে অপেক্ষার দিন যেন শেষ হয়ই না। কখনো চার মাস, কখনো ছয়মাস, আবার কখনো বছর ধরেও চেয়ে থাকতে হয়। দীর্ঘ অপেক্ষা কখনো অসীম বোধ হয় তাদের। তারপরও তো জীবন বয়ে যায়, মা তার ছেলের মুখটা শেষবারের মতো দেখার আশা ছেড়ে দেন, স্ত্রী চিন্তা করেন নিজের আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বাবা ভাই মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসে ধরণা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে শেষ আশ্বাসবাণী শুনে ঘরে ফিরে যান- কাগজপত্র ঠিক হলেই লাশ আসবে।


অনুসন্ধানে দেখা যায়, সৌদিতে মারা যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের লাশ ফেরত নিয়ে আসার এ চিত্র বহু দিন ধরেই চলে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো থেকে লাশ আসতে সময় লাগে এক সপ্তাহ থেকে সর্বোচ্চ এক মাস। সেখানে বৃহত্তম শ্রমবাজারের এ দেশ থেকে লাশ আসতে সময় লাগে ৩ মাস থেকে ১ বছর বা তারও বেশি। যেখানে কুয়েতে মারা যাওয়া কর্মীর লাশ ফেরত আনতে সময় লাগে ৩ থেকে ৭ দিন, বাহরাইন থেকে লাগে সর্বচ্চ ১০ মাস, জর্ডান থেকে সর্বচ্চ ৪১ দিন এবং মালয়েশিয়া থেকে লাশ আনতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ২ মাস।

দূতাবাস থেকে পাঠানো চিঠির হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে সৌদির রিয়াদ ও জেদ্দা শহরেই মারা গেছে ৭৩ জন বাংলাদেশি। এই সময়ে কুয়েত, বাহরাইন, জর্দান ও মালয়েশিয়ায় মারা গেছে ৩৫ জন। যদিও প্রকৃত হিসাবে মৃতের সংখ্যা আরো বেশি হবে।

জানুয়ারি মাসে মারা গেছে এমন ৩০ জন ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে বাংলামেইলের কথা হয়। যাদের মধ্যে সৌদিতে মারা যাওয়া ২০ ব্যক্তির স্বজনরা জানান, তিন মাসের বেশি সময় পরও তারা লাশ পাননি। বাকি অন্য চার দেশে মারা যাওয়া স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা সবাই লাশ পেয়েছেন।

কুয়েতে গত ১০ মার্চ মারা যান কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার গুনবতী গ্রামের তনু মিয়ার ছেলে ইব্রাহীম।পাঁচ দিন পরই তার লাশ আনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন মৃতের মামা আবু তাহের। তিনি কুয়েতে থাকা ৩৪ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, কুয়েত থেকে লাশ আনতে এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগে না।

গত ২৪ জানুয়ারি বাহরাইনে মারা যান বগুড়ার জেলার গাবতলী থানার কালুডাঙ্গা গ্রামের মন্তেজার রহমানের ছেলে রানা মিয়া। লাশ আনা প্রসঙ্গে তার স্ত্রী ছাবিনা খাতুন জানান, মারা যাওয়ার সাত দিন পর ১ ফেব্রুয়ারি তার স্বামীর লাশ ফেরত পান।

মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ জর্দানে ২০ ফেব্রুয়ারি মারা যান পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি  উপজেলার সারেংকাঠি গ্রামের সামছুল আলমের মেয়ে নারগিস আক্তার। তার লাশ ২৮ দিনপর গত ১৮ মার্চ দেশে আনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন মৃতের বড় ভাই শহিদ আকন।

অপরদিকে মালশিয়াতে মারা যাওয়ার ৪০ দিন পর ছেলে লাশ ফেরত পেয়েছেন ময়মনসিংহের মুক্তগাছা উপজেলার বেরুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা হোসেন আলী। তার ছেলে জালাল উদ্দিন গত ২৩  ফেব্রুয়ারি তারিখে মালয়েশিয়ার এক নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে মারা যান।

কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে চিত্রটা হতাশাজনক। আবার সেখানে মৃত্যুর সংখ্যাটাও বেশি। গত ৪ জানুয়ারি জেদ্দায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার কচবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা রফিক। তার লাশ এখনো দেশে আনা হয়ে কি-না জানতে ফোন দেয়া হয়েছিল তার স্ত্রী নাজমা বেগমের কাছে। ঢাকা থেকে বলছি শুনেই অপরপ্রান্ত থেকে বলেন, ‘ভাই লাশ কবে আসবে!’ সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর জানতে চাওয়া হলো- লাশ আসতে এখনো কেন দেরি হচ্ছে? উত্তরে নাজমা বেগম বলেন, ‘দূতাবাস শুধু আমাদের টাইম দেয়। কখন আসবে আর কেন আসছে না সেটা বলে না।’

কুমিল্লার চান্দিনা থানার বিচুন্দার গ্রামের বারেক আলীর ছেলে মো. কেফায়েতুল্লাহ সৌদিতে মারা যান গত ২৯ জানুয়ারিতে। তার চাচাতো ভাই আবু ইউসুফ জানান, ‘আমরা মন্ত্রণালয়ে যোগযোগ করেছি অনেকবার। তারা বলেন কমপক্ষে আরো তিন মাস সময় লাগবে। তাছাড়া লাশ যখন আসবে আপনাদের দূতাবাস থেকেই জানানো হবে’। কেন দেরি হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় আমাদের জানিয়েছে যত দিন পর্যন্ত সেখানকার কোম্পানি ক্লিয়ারেন্স না দিবে ততদিনে লাশ আসবে না। কবে আসবে এর কোনো নির্দিষ্ট সময়ও নাই। আমরা যতবারই ফোন দেই যোগাযোগ করি ততবারই একই কথা।’

এরকম অনির্দিষ্ট আশ্বাস নিয়ে দিনগুণছেন নোয়াখালীর রেজাউল হকের স্ত্রী রানী বেগম, কুষ্টিয়ার জাহিদ হোসেনের চাচা মিন্টু চৌধুরী এবং টাঙ্গাইলের খলীলের জামাতা কিসমত আলীসহ বেশ কয়েকটি মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন। তারা সৌদি আরবে গত জানুয়ারি মাসে বিভিন্ন কারণে মারা যান।

গত ১১ বছরে বিদেশের মাটিতে কাজ করতে গিয়ে মারা গেছে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার জন বাংলাদেশি শ্রমিক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক মারা গেছে সৌদি আরবে। দেশটিতে এই সময়ের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার শ্রমিক মারা গেছে। এসব পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাশ পরিবহন হিসাব অনুযায়ী।

তবে লাশ আনতে ধীরগতির অভিযোগ মানতে নারাজ সৌদিস্থ বাংলাদেশি দূতাবাস। দূতাবাসের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বাংলামেইলকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোন দেশ আছে যে সৌদি আরব থেকে আগে লাশ যাচ্ছে বাংলাদেশে? সৌদি থেকে দেরিতে লাশ যাচ্ছে এটা ঠিক না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাশ দেশে পাঠানোর ব্যাপারে দূতাবাসের সহযোগিতা থাকে। তবে যাদের কাগজপত্রের ঝামেলা থাকে তাদের ক্ষেত্রে একটু বিলম্ব হচ্ছে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, সৌদি থেকে লাশ আনার প্রক্রিয়াটা খুব দীর্ঘ। অনেক আইনি জটিলতার কারণে এই দীর্ঘসূত্রিতা হয়। যেমন, কোন লাশ বাংলাদেশে প্রেরণ করার জন্য বহির্গমন ভিসা লাগানো, এই ভিসা লাগাতে যত দিনের ইকামা রিনিউ নেই ততদিনের জরিমানা প্রদান করে ইকামা আপটুডেট করতে হয়।

তিনি আরো জানান, এগুলো আবার নিয়োগকর্তা ব্যাতিত করা জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ। অনেক সময় গরীব লোকজন নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভর করেন। অন্যদিকে নিয়োগকর্তাও গা ছেড়ে দেন। যার কারণে এসব দীর্ঘতর হয়। এছাড়া গভর্নর অফিস লেবার কোর্ট, থানা, ইমিগ্রেশন সিভিল রাইটস অফিস, হাসপাতালের মর্গ, কার্গো অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তর হতে অনুমতিপত্র গ্রহণ করতে হয়। এসব কাজ নিয়োগ কর্তা বা তার প্রতিনিধি ব্যাতিত অন্যকারো পক্ষে সৌদিআইন অনুযায়ী সম্পন্ন করা সম্ভবও হয় না।

তবে অন্যান্য দেশে এইসব জটিলতা নেই বলে তাড়াতাড়ি লাশ আনা সম্ভব হয় বলেও জানান তিনি।

এই সব জটিলতা নিরসনের কোনো উদ্যোগ আছে কি না সে ব্যাপারে কিছু জানাতে পারেননি ওই পদস্থ কর্মকর্তা।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ মে ১৮, ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৮ মে ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com