চশমা

শনিবার, ০৩ জুন ২০১৭

চশমা

চশমা
মুহ শরীফ উল ইসলাম

 


 

Litearture 01অবসর প্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি জনাব মঞ্জুর ইলাহির অবসর জীবন মোটেই বিড়ম্বনহীন নয়। বরঞ্চ অবসরে এসে বিড়ম্বনা আরও বেড়ে গেছে। আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে সাংসারিক খরচ হু হু করে বেড়ে চলেছে। কথায় আছে কেরানীদের ছেলেমেয়ে থাকে বেশি, মঞ্জুর এলাহির ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম নয়। তারও সংসারে  ছেলেমেয়ের সংখ্যা আট। তাদের শিক্ষা দীক্ষা খাওয়া দাওয়া কাপড় চোপড় খরচ একমাত্র বেতনে কুলিয়ে উঠত না। বছরে বছরে পৈত্রিক সম্পদ বিক্রি করতে করতে তা শূন্যের কোটা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্রাচুটির প্রাপ্য টাকা দেখিয়ে বাজার থেকে ধারের পরিমাণও কম ছিল না। অবসরে যাওয়ার পর যা পেয়েছিল তা দিয়ে দেনা শোধ করার পরও বেশ দেনা রয়ে গেল। এখন আর বাজারে কেহই ধার দিতে চায় না। অনেক দোকানদার এমন ভাব করে যেন তারা  এলাহি সাহেবকে চেনেন ই না।

এক সময় এলাহির পত্রিকাপড়া নিয়মিত অভ্যাস ছিল এখন আর পড়া হয় না। সংসারে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের যেখানে সংকুলান হয় না সেখানে বাসায় একটা পত্রিকা রাখা গোদের উপর বিষ ফোঁড়া। তা ছাড়া মঞ্জুর এলাহি এখন চোখে ভাল করে দেখেন না। পত্রিকা পড়তে হলে চশমার সাহায্য লাগে। অনেকদিন আগে ডাক্তার বলেছিলেন চশমা নিতে, প্রেসক্রিপশনও দিয়ে ছিলেন। প্রেসক্রিপশন চশমার দোকানে দেখালে তারা বলল ৪ হাজার টাকার মত লাগবে। অত টাকার যোগাড় না হওয়ায় চশমা কেনা হয়ে ওঠে নাই। ৮ জন ছেলেমেয়ের সবাইকে শিক্ষিত করে তুলেছেন কিন্তু সবাইই বেকার। সাধ্যমত সবাই চাকরির চেষ্টা করছে , পারছে কই? বড় ছেলে এম এ পাস করেছে ৫ বছর হল । এলাকার এক পরিচিত ছেলে ঢাকা ইউনিভারসিটিতে পড়াশুনা করে , থাকে হলে। তার রুমে মেঝেতে শুয়ে কোন রকমে রাত্রি যাপন করে বড় ছেলে জালাল এলাহি টিউশনি করে ঢাকায় থেকে চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝেও টিউশনির  টাকা বাঁচিয়ে মাঝে মাঝে বাবাকে ২ বা ৩ হাজার টাকা পাঠায়, এ টাকায় সংসারে তেমন কিছু হয় না, তবুও বাবা বলে এ টাকাটা তার কাছে চশমার মত। চশমা যেমন ঝাপসা চোখকে দেখতে সাহায্য করে তেমনি এই সামান্য টাকাও সংসারের অভাবকে দূর করতে কিছুটা হলেও সাহায্য করে। অবসর প্রাপ্ত লোকদের জন্য কর্মক্ষম প্রতিটা সন্তান এক একটা উজ্জল চশমা। কবে যে আমার ছেলেমেয়ে গুলো আমার চশমা হয়ে উঠবে।জালাল এলাহি সব সময় চিন্তা করে বাবা ভাল করে দেখতে পারে না।বাবার জন্য একজোড়া চশমা কেনা বিশেষ প্রয়োজনত প্রেসক্রিপশনটা সব সময়  তার পকেটে থাকে। মাঝে মাঝে চশমার দোকানে গেলে দরদামও করে। টাকা হলেও সে চশমাটা কিনে ফেলবে। কিন্তু টাকার জোগাড় সে কোনভাবেই করে উঠতে পারছে না। এদিকে হলে থাকাটাও নিরাপদ নয়। বহিরাগতদের হলে থাকা  কর্তৃপক্ষ  পছন্দ করে না। মাঝে মাঝে হলে তালাশি হয়। তখন খুবই বিপদ।জালাল এলাহি হলে থাকতে পছন্দ করে না।  কিন্তু না থেকেও উপায় নাই। মেসে থাকার মত নিয়মিত আয় তার নাই। হলে ফ্রি থাকতে পারায় বাড়িতে সে কিছু টাকা দিতে পারে। কেউ যাতে জানতে না পারে তাই সে নিয়মিত রাত ১১-১২ টায় হলে আসে। অত রাতে এসে নিয়মিত শেভ করা করা হয় না। রেজার  শেভিং ক্রিমও থাকে না। সব সময়ই তার মুখে উচ্চ গুচ্ছ দাঁড়ি লেগেই থাকে। তার নবম শ্রেণীর প্রাইভেট ছাত্রী আফসানা সেদিন কি ভাবে বলে ফেলল স্যার আপনাকে সেভ করলে সুন্দর লাগে। আমার বান্ধবী শাহানা বলে দাড়িতে আপনাকে গুন্ডা মাস্তানের মত লাগে। গতকাল রাত ১২ টার দিকে হলে ফেরার সময়ে মুগদাপারায় পুলিশ জালাল এলাহিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধরে ফেলে। নাম জালাল এলাহি বলতেই পুলিশ তাকে ভ্যানে তুলে ফেলে, অন্য কোন কথা বলার সুযোগই দেয় না। মুগদাপারার শিস্য সন্ত্রাসী মুরগির জালাল। মানুষ খুন করা তার কাছে অতি তুচ্ছ ব্যাপার। মুরগির মত মানুষ ধরে সে নাকি জবাই করে তাই তার নাম মুরগি জালাল। গোপন খবর পেয়ে পুলিশ তাকে ধরার জন্য মুগদাপারার ওঁৎ পেতে ছিল। জালাল এলাহিকে পেয়ে তারা মনে করে মুরগি জালাল কে পেয়ে গেছে।

সকালের পত্রিকায়  হেডলাইন হল পুলিশের সাথে গুলি বিনিময়ে মুরগির জালাল নিহত।পত্রিকা পড়ে  সন্ত্রাসী নিহতের খবরে অনেকেই আনন্দিত হল। কিন্তু আসল ঘটনা কেহই জানতে পারল না। সংবাদ মাধ্যম বা গোয়েন্দাদের কেহই কোন খোজ নিল না কোন জালাল মারা গেল।পুলিস জালাল এলাহিকে মুরগি জালাল হিসাবে চালিয়ে নিল। মরার সময়ে জালাল  এলাহির পকেটে ছিল বাবার জন্য চশমার প্রেসক্রিপ্সন।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ০৩ জুন, ২০১৭

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৩ জুন ২০১৭

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com