চলন্ত ট্রেনে খুন

শনিবার, ০৫ মার্চ ২০১৬

চলন্ত ট্রেনে খুন

চলন্ত ট্রেনে খুন
সেলিনা জাহান প্রিয়া

 


Litearture 01১৯৯৫ সাল আজমল পেশায় একজন সাংবাদিক । ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে পাশ করা একজন সাহসী ছেলে । তার খুব কাছের বন্ধু শফিক তার একমাত্র বোনের বিয়ে । শফিকের বোনের বিয়ে তে না গেলে শফিক খুব মন খারাপ করবে । তাই সব কাজ বাদ দিয়ে শফিকের বাড়ি জামাল পুর মেলান্দ যাওয়ার জন্য রাতের ট্রেনের অপেক্ষা ।
কমলা পুর থেকে রাত ১১ টায় ট্রেন ছারে । ট্রেন জামালপুর হয়ে রংপুর যায় । মেইল ট্রেন । ঠিক টাইমে আজ ট্রেন ছেড়েছে । আজমল সিটে বসে দেখল মানুষ খুব অল্প । ট্রেন ছারতেই তেজগাঁ আর বিমান বন্দর থেকে অনেক মানুষ উঠেছে । একজন মহিলা মাত্র অনেক দূরে কর্নারে বসা । মহিলার কারো দিকে খেয়াল নেই । সাথে কেউ নেই ।
টঙ্গি ষ্টেশনে আসার পর আজমলের কামরার সব যাত্রী কেন জানি নেমে যাচ্ছে । আজমল ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ট্রেন ছারার সময় আবার চার জন যাত্রী ট্রেনে উঠল । কিন্তু সুন্দরী মেয়েটা তার সিটে ঠিকেই বসে আছে । কোন কথা বলছে না।
আজমল দেখল মেয়েটা ট্রেনের বাথ রুমে গেল । চার জন যাত্রী নিজেদের কি নিয়ে আলোচনা করছে । মেয়েটা বাথ রুম থেকে আসতেই চার জন কে দেখে বলে উঠল তোমরা ট্রেনে কেন ?
—- একজন বলল কাউকে না বলে কি বাসা থেকে আশা ঠিক হয়েছে ।
—- আমি কোথায় যাব না যাব সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার ।
— অন্য জন বলল আপনার স্বামীকে বলে যাওয়ার কি দরকার নাই ।
—- এটা আমি আমার স্বামীর সাথে বুঝব ।
— কিন্তু আপনার স্বামী এখন আমাদের সাথে বুঝতে বলেছে ।
— তোমরা ট্রেন থেকে নেমে যাও বলছি ।
— হা মিসেস সালমা মেম । তবে আপনাকে নিয়েই সামনের ষ্টেশনে নেমে যাব ।
— না আমি তোমাদের সাথে যাব না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে সামনের ষ্টেশনে পুলিশ
ডাকতে বাধ্য হব ।
—- সালমা মেম পুলিশ ডাকুন আর আর্মি ডাকুন । আমি যখন এসেছে তবে
আপনাকে নিয়েই যাব ।
আজমল বলল

—এটা কি শুরু করলেন । ভদ্র মহিলাকে কেন বিরক্ত করছেন ।
—- একজন আজমলকে ধমক দিয়ে বলল এই মিয়া চুপ করে বসুন । না কল্লা ফেলে
দিব । আজমল দেখল চার জন একসাথে আজমলকে বলছে । জানের মায়া থাকলে চুপ কর ।
—- মেয়েটি বলল চুপ করবে কেন । যা দেখছে । তাই বলছে ।
—- একজন বলছে । সালমা মেম জীবিত বা মরা আপনাকে নিয়ে যেতে হবে ।
— জীবিত আমাকে নিতে পারবে না। মরাই নিতে হবে ।
— মেম আপনার মাথার দাম তিন লাখ টাকা । শুধু মাথাটা ব্যাগে ভরে নিয়ে যাব ।
— মেয়টা বলল তাই নিয়ে যা । মনে রাখিস আমার নাম সালমা । আমার জীবন
থাকতে আমার বাবার টাকা আমি আমার স্বামীকে দিব না ।
— দুই জন লোক এসে আজমলকে বলল ট্রেনের বাথ রুমে যেতে ,
—- আজমল বলল এটা কেমন কথা । মেয়েটা বলল ভাই আপনি ভয় পেয়েন না ।
এই গুলো লেজ কাঁটা কুকুর কিছুই করতে পারবে না। ভাইয়া আমার বাড়ি ২৭
চামেলি বাগ ।
এই কথা বলা মাত্র একজন একটা চুরি বের করে মেয়েটির পেটে বসিয়ে দিল । মেয়েটা একটা চিৎকার করলো । দুই জন মিলে মেয়েটাকে নিচে ফেলে গলা চেপে ধরল । রক্তে ট্রেনের কামরা ভরে গেল । চার জন মানুষ মিলে মেয়েটাকে আজমলের সামনে মেরে
ফেললো । আজমল কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। তাদের সবার কাছে ছুরা । আজমল ভয়ে ট্রেনের বাথ রুমে গিয়ে পালালো । আজমল শুনতে পাচ্ছে চার জানের হাসি ।
একজন বলছে ঐ বেটা দরজা খোল । অন্যজন বলছে মাথা কাটার দরকার নাই । ওর জামাই বলেছে একটা আঙুল কেটে নিলেই হবে । যেই আঙুলে নীলা আংটি আছে । কাপড়ের ব্যাগটা নে । লাশ পরে থাক । এই দেশে কেউ কারো খবর রাখে না।
আজমলকে চার জন মিলে ডাকছে । এই বেটা বের হয়ে আয় । দরজা খোল । না হয় মেরে ফেলব । আজমল ভয়ে চুপ হয়ে গেল । কোন শব্দ আর করছে না। ভাবছে একটু আগে যেই মেয়েটা এত সাহস দেখালো এখন সে লাশ । চার জনের সাথে আমার পক্ষে পারা সম্ভব না। আজমল ভয়ে চুপসে গেল ।
তার পর কিছুই মনে নেই । হটাৎ দরজা ধাক্কার শব্দে আজমলের হুস আসলো । আজমল বাথ রুমের জানালা দিয়ে দেখছে অনেক মানুষ । এবার সাহস করে দরজা খুলল । কারন খুনিরা এত সময়ে চলে গেছে ।
দরজা খুলে দেখে সে জামালপুর । কিন্তু ট্রেনের মধ্য কোন রক্ত মানুষের লাশ কিছুই নাই । সে অবাক হয়ে চেয়ে আছে । একজন বলল ভাই কি এভাবে দেখছেন । আজমল যেই জায়গায় রক্ত পড়ে ভরে গিয়েছিল সেই খানে কোন রক্ত নাই । বাদামের খোসা আর কাগজ পড়ে আছে । আজমল বলল গতরাতে এই খানে একটা মেয়েকে চার জন মিলে হত্যা করেছে । সবাই হাসতে লাগলো । কি যেন বলেন ভাই । রাতে এই ট্রেন আসছে এখন চলে যাবে । আজমল তাহলে কি স্বপ্ন দেখছিল । না স্বপ্ন হতে পারে না।
স্বপ্ন হলে সে বাথ রুমে থেকে বের হবে। মেয়েটার হাতের রক্ত একটা সিটে লেগেছিল । আজমল সেই সিটের কাছে গেল না কোন রক্ত নাই । ট্রেনের কামরা থেকে নেমে বার বার ট্রেনের কামরা টা দেখছিল ।
কয়দিন পড়ে আজমল ঢাকা আসলো । কিন্তু বার বার ট্রেনের কথা মনে হচ্ছিল ।
মনে মনে ভেবে নিল এটা স্বপ্ন ছিল তার । একদিন কি একটা কাজে চামেলি বাগ গেল ফেরার পথে দেখে ২৭ চামেলি বাগ । আজমল রিক্সা থামিয়ে গেইটের সামনে নামলো । অনেক পুরানো বাড়ি । একজন বলল – কাউকে খোঁজছেন ।
— হ্যা এটা কি ২৭ চামেলি বাগ ।
— হ্যা ২৭ ই তো লিখা । আজমল বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো । একজন মহিলা
বের হয়ে বলল কাকে চান বাবাজি । এই বাসায় সালমা নামে কেউ আছে ।
মহিলা একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলল – আপনি কে বাবাজি ।
—- আমার নাম আজমল ।
—- সালমা কে কি করে চিন ?
— যে ভাবেই হক চিনি । সে কি আছে । মহিলা কেঁদে দিয়ে বলল বাবা সালমা নিখোঁজ আজ ১২ বছর হল । আমার মেয়ে । তুমি কি ওর সাথে পড়তে বাবা ।
—- না খালা । আমি একজন সাংবাদিক ।
—- বাবা কত সাংবাদিক । কত পুলিশ । কত কি করলাম । কিন্তু মেয়ে কে পাইলাম
না। আমার মেয়ে বড্ড ভাল ছিল । আমার স্বামী মারা যাওয়ার সময় তার সব
কিছু মেয়ের নামে দিয়ে যায় ।
—- আপনার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল কার সাথে ?
—- বাবা আর কি বলব সে কথা । আমার স্বামী তার প্রিয় বন্ধুর ছেলের সাথে বিয়ে
দিয়েছিল । আমার মেয়ের সাথে বিয়ের পর থেকে শুধু টাকা টাকা । আমার স্বামী
মারা যাওয়ার পর । একদিন রাতে মেয়ে আর মেয়ের জামাই বাসায় আসে ।
রাতে মেয়ে রাগ করে বাসা থেকে বের হয় । তখন আমি বাধা দেই । জামাই
বলে মা চিন্তা করবেন না। সালমা রাগ করে বাসাই যাবে । মেয়েটা রিক্সা নিয়ে
রাগ করে কোথায় চলে যায় । আজ পর্যন্ত তার কোন খোঁজ নাই ।
—– পুলিশে মামলা করেছিলেন ।
—– হা করেছি । পুলিশ মামলাটা সি আই ডি তে নেয় । সি আই ডি সালামার স্বামী কে সন্দেহ করে । কিন্তু মেয়ে তো আমার বাসা আমার সামনে থেকে চলে যায় । আমি মেয়ের জামাই কে নিয়ে সকালে জামাই এর বাসায় যাই মেয়ে নাই । জামাই  আমি সব জায়গায় খুজি । আমার জামাই তো অনেক ভাল মানুষ । মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার ৫ বছর পড়ে অন্য মেয়েকে বিয়ে করে ।

কিন্তু পুলিশ বলে এটা জামাই এ করেছে । কিন্তু প্রমান দিতে ব্যর্থ হয় পুলিশ ।
—- মামলার নাম্বার টা আছে আপনার কাছে ।
—- আজমল সালমার মায়ের কাছ থেকে মামলার নাম্বার টা নেয় । বিকেলে মালিবাগ
সি আই ডি তে আসে । সি আই ডি অফিসার । মিঃ কনক কে বলে আমি মামলাটা
তদন্ত করেছিলাম । কিন্তু আসামী খুব চালাক । সালমা কে সে খুব চালাকি করে নিখোঁজ করে দেয় । পুলিশের ধরানা মেয়েটা পাচার হতে পারে বা হত্যা । কিন্তু সালমার মায়ের সাক্ষীর জন্য সালমার স্বামী বেঁচে যায় । তার স্বামী বিষয়ে পুলিশ এর আগাতে পারে না মামলা ।।
—– আজমল বলল – আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই । আমি একজন
সাংবাদিক।
—– কি ভাবে সাহায্য করতে চান মিঃ আজমল ।।
—- মিঃ কনক সাহেব । যেই দিন মেয়েটা নিখোঁজ হয় । ঢাকা থেকে জামাল পুর
রেল ষ্টেশনে কোন মহিলার লাশ পাওয়া গেছে কিনা দেখতে হবে । নিখোঁজ থেকে
তিন দিনের মধ্যে ।
—- যদি লাসের রিপোর্ট পাওয়া যায় । আর যদি সেই লাসের রিপোর্টে মেয়েটির ডান
হাতের কোন আঙুল কাঁটা থাকে তবেই মিলে যাবে ।
—- লাসের সাথে আঙুলের কি সম্পর্ক ?
—- মিঃ কনক সাহেব । এটাই রহস্য ।।
ঠিক আছে চলুন কাল থেকে আমি আর আপনি তদন্ত শুরু করি । মিঃ আজমল আর মিঃ কনক মিলে জি আর পি পুলিশের গত ১২ বছর আগের রেল ষ্টেশনের লাসের তালিকা দেখছে । মিঃ কনক বলল আজমল সাহেব । একটা লাশ পাওয়া গিয়েছিল ।
গফর গাও রেল ষ্টেশনে ।
—– দেখুন তো কনক সাহেব কামরা নাম্বার টা আমার কামরা নাম্বারের সাথে মিলে কিনা । আজমল তার লিখা আগের কামরা নাম্বার আর লাশ পাওয়ার কামরা নাম্বার এক । মিলে গেল দেখে আজমল বলল মিঃ কনক হিসাব মিলে গেছে ।।
— কি হিসাব মিঃ আজমল ।
— রিপোর্ট দেখেন ডান হাতের আঙুল কাঁটা কি না ।
—- মিঃ আজমল ঠিক আঙুল কাঁটা । আপনি ফাইল নিয়ে চলুন অফিসে । আমাদের
যেতে হবে সালমার মায়ের কাছে ।
আজমল আর কনক মিলে সালমা মায়ের কাছে এলো । আজমল আর পুলিশ অফিসার
কনক মিলে সালমার মায়ের কাছে বসা ।
—- আজমল বলল খালামনি আপনার কি মনে আছে সালমা একটা নীলার আংটি
পড়ত ।
—- কেন মনে থাকবে না বাবা । আমার স্বামীর মারা যাওয়ার তিন দিন আগে সখ
করে মেয়েকে আংটি টি দিয়েছিল ।
— খালামনি আপনার মেয়ের জামাই এখন কোথায় । এখন তো ও তার অফিসে । তাহলে আপনি চলুন । আমাদের তো চিনবে না। আপনি আমাদের নিয়ে বলবেন সালমা আংটি টা দরকার ।
—- বাবা সাংবাদিক ঐ নীলার আংটিটা এখন জামাই বাবা জি মেয়ের কথা শরণ করে হাতে পারে ।
— মিঃ কনক আপনি বলবেন চার জনের একজন আপনি এরেস্ট করেছেন । আর আংটিটি চাইবেন ।
সালমার স্বামী খুব দারুন ব্যবসা করছে । অফিস লোক জন কাজ করছে । সালমার
মাকে নিয়ে অফিসে আসতেই সালমা স্বামী শাশুড়িকে দেখে খুব মিষ্টি একটা হাসি
দিয়ে বলল আম্মু আপনি কষ্ট করে কেন আমাকে ফোন করলেই হত ।
—- না বাবা । একটা কাজে আসলাম । সালমা নীলা পাথরের আংটিটা কোথায় ।
—- এই তো মা আমার হাতে ।।
— আজমল বলল বাহ ! তাই তো ! তা মিঃ সালমা আংটিটা আপনাকে কখন দিয়েছে।
—- কে আপনি ?
—- কনক কার্ড দেখালো । বলল যা প্রশ্ন করছি তার উত্তর দিন
—– এটা  বিয়ের এক সপ্তাহ পড়ে সালমা আমাকে দিয়েছে ।
—- খালামনি সালমা নিখোঁজ হওয়ার কত দিন আগে এই আংটি তাকে
দেয়া হয়েছে ।
—- নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস আগে ।
—- সালমা নিখোঁজ হওয়ার কত দিন আগে উনার সাথে বিয়ে হয়েছে । দের বছর ।
—- কি মিঃ । দের বছর আগে নাকি । নিখোঁজ হওয়ার আগে ।
—- ঠিক মনে নেই অনেক অগের কথা ।
—- আপনার চার জন থেকে একজন ধরাপরেছে যে আপনাকে আংটিটা আঙুল
সহ এনে দিয়েছে ।
—- মানে কে এরেস্ট হয়েছে ?
—– আপনাকে আংটি কে দিয়েছে ,
—- গফুর ।
— রাইট গফুর । নাম তো মনে আছে ।
সালমার মা বলল- তুই খুনি । আমার মেয়ের আংটি দে । সালমা মা তার স্বামীর হাতের আংটি টা নিজের হাতে নিয়ে নিল । সালমা স্বামী সব পুলিশের নিকট স্বীকার করল । আজমল বলল মিঃ কনক আমার কি কিছু আর বলতে হবে ।
—- না মিঃ আজমল । তবে আপনি কি করে জানলেন ।
—–বাকি চার জন গ্রেফতার হয়েছে তারাই বলে দিবে । কিন্তু ঐ চার জন বলছে ঐ দিন ট্রেনে একজন ছিল তবে সে এই আজমল না। আজমলের কাছে আজোও রহস্য । নিউ মার্কেট মোড় থকে কিছু গোলাপ কিনে আজমল সন্ধ্যায় চলে আসলো কমলা পুর রেল ষ্টেশনে । অপেক্ষা করছে জামালপুরের ঐ ট্রেনের । রাত নয়টায় ট্রেন আসে । ৯৬৯৬৯৬ কামরার কাছে যায় । ট্রেনে উঠে সালমা যে সিটে বসে ছিল ফুল গুলো ঐ সিটে রাখে । অনেক মানুষ উঠে ট্রেনে ফুল গুলো দেখে কেউ বসে না সিটে । ট্রেন ছাড়ে প্লাটফর্মে দাড়িয়ে থাকে আজমল । হটাৎ আজমল দেখে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের জানালা দিয়ে অনেক দূর থেকে মেয়েটা হাসি দিয়ে তার ফুল গুলো দেখছে । আজমল তার চোখ মুছে এবার দেখে মেয়েটা ফুল গুলো নিয়ে বাতাসে মিশে গেছে।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ মার্চ ০৫, ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১২:৪৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৫ মার্চ ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com