‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ আমার মন ভুলায়রে…’

শনিবার, ০৪ জুন ২০১৬

‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ আমার মন ভুলায়রে…’

‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ আমার মন ভুলায়রে…’

 


শনিবার ভ্রমনঃ পাহাড়ের গায়ে গায়ে কত না শহরে- বনপথে ঘুরে বারবার শুধুই মনে পড়েছে বাংলার অপরূপ ‘রাঙামাটি’র কথা। পার্ব্বত্য  জেলা রাঙামাটির রূপ সৌন্দর্যের সাথে কারো যে হয় না তুলনা। এই জনপদে রয়েছে- হ্রদ, ঝরণা, জলপ্রপাত, অরণ্য, উপজাতি, মেঘ পাহাড়, পাহাড়ের পর পাহাড়, পাহাড়িয়া আঁকাবাঁকা পথ। কখনওবা মনে হয় – পাতার বাঁশি বাজায় বসি পাহাড়িয়া কোনো ছেলে…। তাই এই অনণ্য রূপের রাঙামাটি’র – ‘রাঙামাটি’ নামটিও মনের কোনে উঁকি দেয়, গানে ও ঠাঁই পেয়েছে বার বার। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা -‘ গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ আমার মন ভুলায়রে। ওরে কার পানে মন হাত বাড়িয়ে লুটিয়ে যায় ধূলায়রে ..’ গানের এ দু’টি লাইন মনে হতেই ভ্রমণ পিয়াসীদের রাঙামাটির কথাই তো মনে পড়বেই।

ষড় ঋতুর বাংলাদেশের এই রাঙামাটি একেক ঋতুতে একেক রূপ ধারন করে – গ্রীষ্মে এখানের হ্রদে সন্ধ্যায় ইঞ্জিন চালিত বোটে উঠলে মন চলে যায় চাঁদের দেশে। বর্ষায় অথৈ জল দেখে বলতেই হয়-“ঝরো-ঝরো ধারে ভিজিবে নিচোল, ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল – ওই বেনুবন দোলে ঘন ঘন পথ পাশে দেখ চাহি রে ” এই চরণ দু’টি। শরতে রাঙামাটিতে ঘুরে বেড়ালে-“কার মধু ডিঙা ভিড়বে এ ঘাটে ফিরবে কি প্রিয় ঘরে/ শেফালিকা তলে কাঁকনের বোলে মালা গেঁথে থরে থরে ” খুঁজে পাওয়া যায় গানের এই কথারই প্রতিচ্ছবি। হেমন্তে নব সাজে সেজে ওঠে পাহাড়ের অরণ্যে গাছপালা, যেনই তখন হয়ে ওঠে সর্বত্র সবুজের সমারোহ। শীতে রাঙামাটির পাহাড়ের পথ ধরে চলতে – এই পাহাড়ের পথে ভ্রমন যেন সফল হয়ে দেখা দেয়। যেনো হৃদয় মন মিশে যায় পাহাড়-অরোণ্যের সাথে। তখন ভাবতেই হয় -“মন ছুটেছে আজ তেপান্তরে / ঐ দূর গাঁয়ে ধান ক্ষেতে/ আলোরই ধারে ধারে/ রাঙামাটির ভূবনখানি’’ গানের এই কথাগুলি। বসন্ত এখানে মানে রাঙামাটিকে জানান দেয়-“ আমি গোলাপের মতো ফুটবো ….. জানি পাপিয়া দূরে রয়/ আমি স্বপনের কথা বলিয়া স্বপনে ভাসিয়া যাই/ আমি চাঁপার কুঞ্জে কুহূ আমি কেতকী বনের কেকা” গানের এই কথাগুলি।

আহা অপরূপ শোভাময় পার্ব্বত্য জেলা রাঙামাটি হতে পারতো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উল্লেখ্যযোগ্য ভ্রমণ স্পট। তা কী হয়েছে?  হয় নি। এর পিছনে যে সব সমস্যা আছে তা হলো, যেমন- রাঙামাটিতে গেলে এর বাইরে – বরকল, মারিশ্যা, কাপ্তাই, বাঘাইছড়ি, রাজস্থলি, কাউখালী, সাজেক, কাসালং, শুভলং, বড় হরিনা, রূপাখড়ি, সারে খং, বুড়িহাট, কমলপতি, কাঁকড় ছড়ি, মোগবন, ছমছমিয়া, ময়দং, ভূষণছড়া, চন্দ্রঘোনা-ইত্যাদি কতনা আকর্ষনীয় স্পটে যাওয়ার জন্য নেই কোনো প্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থা । রাঙামাটির মতোই আকর্ষনীয় এর প্রতিটি উপজেলা, যেমন-বরকল, বাঘাইছড়ি, কাউখালী, জুরাইছড়ি, লংগদু, নানিয়ার চর, বিলইছড়ি, কাপ্তাই, রাজস্থলিতে ট্যুরিষ্টদের জন্য রাত্রি যাপনে নেই কোনো সুব্যবস্থা। রাঙামাটির বাইরে ওই সকল পাহাড়ে ঘেরা অপার সৌন্দর্যময় উপজেলাগুলিতে স্থাপিত হয়নি আধুনিক মানের কোনো হোটেল-মোটেল। তাহলে ট্যুরিষ্টরা কী আশায় বুক বেঁধে দলে দলে ছুটবে ওই পাহাড় অরন্যের বন-পথে। এ জন্য অবিলম্বে রাঙামাটির প্রতিটি উপজেলায় হোটেল-মোটেল স্থাপন করার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থায়। রাঙামাটির বাইরে পাহাড়-অরণ্যে বেড়ানোর কথা ট্যুরিষ্টরা ভাবতেই যেনো ভয় পান।  নিরাপত্তার বড়ই যে অভাব-এটাই আসল কারণ। কখন কী হয়ে যায়, সন্ত্রাসীরা ধরে নিয়ে মুক্তিপন দাবী করার মতো ঘটনার কথা সবার-ই তো জানা। ভয় ভীতি নিয়ে কেউ আর রাঙামাটি শহরের বাইরে যেতে চান না। ভ্রমণ যেনো ওখানেই ক্ষান্ত হয়ে পড়ে। অথচ নয়ন লোভা সকল সৌন্দর্য রয়ে গেছে ছোট ছোট উপজেলাগুলিতে কিংবা পাহাড়িয়া গাঁয়ের পথে পথে।

রাঙামাটি থেকে এর প্রতিটি উপজেলায় যাতায়াতের ব্যবস্থা আরও সহজ করার উদ্যেগ নেয়ার পাশাপাশি ট্যুরিষ্টদেরকে দিতে হবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা।

রাঙামাটি শহরে ঢুকলে এখন আর চোখে পড়ে না উপজাতি-চাকমা, মগ, মুরং, মারমা, টিপরা উপজাতীয়দেরকে।  অথচ ১৯৭০ সালে পাহাড়ের টানে প্রথম রাঙামাটিতে গিয়ে চোখে পড়েছে শুধু উপজাতি পুরুষ-মহিলাদেরকেই। রাঙামাটরি পথে ঘাটে হাটে বাজারে ফল-ফলাদি নিয়ে বসে থাকতে দেখেছিলাম উপজাতি তরুণী-বৃদ্ধদেরকেই। তাদের কারোবা হাতে চুরুট অথবা চুরুট টানতে-এ দেখার সেই স্মৃতি কী করেই বা ভুলি। আহা রূপালি পর্দায় ‘নীলাঙ্গুরীয়’ ছবিতে অনিমা দাশগুপ্তার গাওয়া নায়িকা যমুনা দেবীর লিপে-“এই রাঙামাটির দেশে/ এই গাঁয়ের পথের ধারে আমার মনের মানুষ হলো কি আজ মন ভুলাবে ….. ফুল জাগানো বনের লতা তারাও যেনো কয়রে কথা/মোর মন রাঙিয়ে গান করে কোন বুলবুলি আর চন্দনারে …………”  শুনেই প্রথম মুগ্ধ  হয়েছিলাম  পাহাড়িয়া রাঙামটির প্রতি। গানের এই কথাগুলি স্মরণ করে বার বার ছুটে গিয়েছি রাঙামাটিতে। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত যতবার গিয়েছি ওখানে উপজাতীয়দের কন্ঠে শুনেছি-চাকমা ভাষায় গান, দু’নয়ন ভরে দেখেছি ওদের নৃত্য। সেই যুগে রাঙামাটিতে বসবাস ছিলো শুধুই যে উপজাতিদের, তখন এদেরকে উপজাতি বলা হতো-এখন তো বলা হয় ‘আদিবাসী’ । ১৯৮০ সালের পর থেকেই রাঙামাটিতে উপজাতিদের বসবাস হ্রাস পেয়ে বাঙালিদের বসবাস বেড়ে যেতে শুরু করলো। দ্রুত এর পরিবর্তন হওয়ায় আজ আর মনে হয় না-এটি যে একদা ছিল উপজাতীয়দের শহর। তাই রাঙামাটি জেলার – বরকল, বাঘাইছড়ি, মারিশ্যা, নানিয়ারচর, বিলইছড়ি, জুরাইছড়ি, লংগদু-প্রভৃতি উপজেলায় শুধুই উপজাতীয়দের বসবাসের ব্যবস্থা রেখে গড়ে তোলা হোক উপজাতি শহর রূপে। তবেই স্বচক্ষে দেখা মিলবে উপজাতীয়দের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য। আর এভাবেই ট্যুরিষ্টদের আনাগোনা বেড়ে যাবে এই সব উপজাতীয় শহরে। ওই সব পাহাড়িয়া শহরে ট্যুরিষ্টদের অবস্থানে আধুনিক মানসম্পন্ন আবাসিক হোটেল – মোটেল স্থাপনের পাশাপাশি তাদের ঘুরে বেড়ানোতে দিতে হবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ।

পাহড়িয়া রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে হাউজ বোটও চালু করতে হবে। হাউজ বোটে – ট্যুরিষ্টদের রাত্রিযাপনে চাই থাকার ব্যবস্থা। এই হাউজবোটগুলি দুই পাহাড়ের মাঝ থেকে বয়ে যাওয়া নদী হয়ে দূরে-বহুদূরে চলে যেতে পারে- সেই ব্যবস্থারও উদ্যোগ নিতে হবে। রাঙামাটির প্রতিটি উপজেলায় থাইল্যান্ডরে রাজধানী ব্যাংকক এর সমপরিমান আনন্দ বিনোদনের ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন। আর তা বাস্তবায়িত করে বিদেশী টিভি চ্যানেলে  এর প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হলে বিদেশ থেকে দলে দলে ট্যুরিষ্টরা আসবে এই রাঙামাটিতে। এসব উদ্যোগ গুলি বাস্তবায়িত হলেই পার্ব্বত্য রাঙামাটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের শ্রেষ্ট পর্যটন কেন্দ্র রূপে। সংগ্রহ

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / জুন ০৪,২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৪ জুন ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com