ছোট গল্প

গোলাম আলি

শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২০

গোলাম আলি
অলঙ্করণঃ মামুন হোসাইন

গোলাম মাওলা এলাকার একজন অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ ।
মূল নাম গোলাম মাওলা হলেও এলাকার সবাই তাকে গোলাম বলে ডাকে । কেউ গোলাম ভাই, কেউ গোলাম চাচা, কেউ গোলাম আলি,  বয়স্করা শুধু গোলাম ইত্যাদি, ইত্যাদি । গোলাম মাওলার অর্থ আল্লার গোলাম । শুধু গোলাম মানে ভৃত্য বা চাকর ।
সম্বোধন গুলো শুনতে শুনতে গোলাম মাওলার বউ শবনমের স্বামীর উপর বিরক্ত ধরে যায় ।  সে ঝাঁঝিয়ে ওঠে এলাকার মানুষগুলো তোমায় গোলাম বলে ডাকে ।   এলাকার একজন মহাজন মানুষ তুমি । মাঠে ধানী জমি, গোয়ালে গরু, পুকুরে মাছ । কি না আছে তোমার ? ফসলী মৌসুমে পাঁচ সাত জন কৃষাণ খাটে তোমার কৃষি জমিতে । এলাকায় কারো মেয়ের বিয়ে, বাবার শ্রাদ্ধ  আর্থিক সাহায্যের জন্য ছুটে আসে তোমার কাছে ।  তারপরেও এলাকার সবাই তোমায় গোলাম বলে ডাকে ।  কিসের অভাব তোমার ? আর মানুষগুলোর কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি একটা স্ক্র ঢিলা আদম সন্তান। তোমার আত্ন সম্মান বলতে কি কিছু নাই নাকি ?
আমি কি জানি ? মানুষগুলো কেন যে আমায় শুধু গোলাম বলে ডাকে ? চুলায় ফেলে দাও মানুষের কথাগুলো । নামে কি যায় আসে  ? তারা আমায় ভালোবেসেই ডাকে । তাতে কি আমার জাত যায় ? স্ত্রীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন গোলাম মাওলা।
শনবনম গজগজ করতে করতে সংসারের অন্য কাজে মন দেয় ।
মানুষের মুখ তো আর বন্ধ করা যাবে না। গোলাম মাওলা ভাবতে থাকে কিভাবে বউকে যুৎসই একটা জবাব দেয়া যায়। শত হলেও বউ তো  ! তাকে যে খুশী রাখতেই হয় । যে নামে সত্যিই কিছু  যায় আসে না । গোলাম হলেই  ভৃত্য আর আকবর হলেই সম্রাট হবে এই দিব্যি তাকে দিয়েছে ?
ভাবতে ভাবতে গোলাম মাওলা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতে ঘুরতে দেখে রাস্তার পাশের খাদে এক কিশোরি হাঁস চরাচ্ছে । গায়ে মলিন ছিন্ন শাড়ি । পাশের বাড়ি থেকে কে যেন উচ্চস্বরে ডাকছে । রাণি , ও রাণি বেলা যে গড়িয়ে এলো হাঁসগুলো কুড়িয়ে  নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আয়  । গোলাম মাওলা ভাবে নাম রাণি । রাজ্যের অধিকর্তী । পরনে ছেঁড়া শাড়ি, হাঁস চরানি ।
হাটের দিন । রিকশা চেপে হাটে যাচ্ছে গোলাম মাওলা । যে ছেলেটা রিকশা চালাচ্ছিল  ওর নাম ওবায়েদুল কাদের । মন্ত্রীর নামে নাম। চালায় রিকশা ।
রিকশা চলতে চলতে নদীর ঘাটে এসে পড়ে । সামনে কালী মন্দির । এখানে একটি শশ্মানও আছে । এমন সময় শশ্মান সংলগ্নঘাটে একদল লোক একটি শবদেহ নিয়ে হাজির । দাহ করতে হবে । কৌতুহলবশত গোলাম মাওলা মৃত ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে শোনে স্থানীয় ভূপেন মন্ডলের বাবা অমর মন্ডল  । ‘অমর’ মানে যে মরে না, চিরজীবী ।
এই সব দেখতে দেখতে গোলাম মাওলা হাটে গিয়ে পৌঁছিল। হাটে বাজার সওদা করতে করতে সে ভাবতে লাগলো বউকে বোঝানোর উপযুক্ত তথ্য তার হাতের মুঠোয় । যে নামে সত্যিই সত্যিই কিছু  যায় আসে না । কথাটা সে আজকে বুঝিয়ে বলবে। প্রয়োজন শুধু উপযুক্ত পরিবেশ ।
এবার ভাবে বউকে খুশি করতে কি কেনা যায়? হাটে আসার পূর্বে যা বউ এর বাজার সওদার লিষ্টে নাই ।
হ্যাঁ ইলিশ। বউ এর খুব পছন্দ ইলিশ মাছ। তার নিজেরও পছন্দ । বউকে খুশি করতে বড় দেখে একটা ইলিশ কিনলো ।
বাজার সওদার ব্যাগ থেকে সওদাপাতি তুলতে গিয়ে ব্যাগের মধ্যে চকচকে রূপালী ইলিশ আর বউয়ের মুখে ফকফকা হাসির ঝিলিক দেখে গোলাম মাওলার বুঝতে আর বাকি থাকলো না যে বউ ইলিশ দেখে খুব খুশী হয়েছে ।
কি ব্যাপার হঠাৎ করে এত বড় একটা ইলিশ ? ইলিশের দর কি একটু পড়েছে বাজারে ? ব্যাগ থেকে মাছ তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল শবনম।
না। দর পড়েনি । সচারচর এমন বড় ইলিশ পাওয়া যায় না। তাছাড়া ইলিশ তো তোমার খুবই পছন্দের মাছ। তাই নিয়ে এলাম ।
তাই বুঝি ?
খাঁটি সরিষার তেলে ইলিশ ভেজেছে বউ । তার প্রাণকাড়া গন্ধে গোটা বাড়ি ম ম করছে। রাতে স্বামী স্ত্রী  দু’জনে  খেতে বসেছে খাবার টেবিলে  । স্বামীর পাতে ইলিশের মাথাটা তুলে দিতে দিতে শবনম জিজ্ঞেস করল রান্না কেমন হয়েছে ?
আর বোলো না ! অতুলনীয় । অবশ্য তোমার রান্না সব সময়ই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আসলেই সে একজন পাকা রাঁধুনি। দেবর ননদ সব্বাই তার রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ।
প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে । স্বামীর মুখে রান্নার প্রশংসা শুনে খুশীতে গদ গদ হয়ে শবনম বলল, তোমায় ইলিশের এক টুকরা ডিম দেই ?
না, না। তোমার আছে ?
হাসি মুখে জবাব দিল, হ্যাঁ আমার আছে ।
দিবে ? দাও, তা হলে ।
গোলাম মাওলা বুঝে নিল বউয়ের সাথে কথাটা পাড়ার এখনই মোক্ষম সময় ।
জানু তোমাকে একটা কথা বলি?
কি কথা ?
ঐ যে তুমি প্রায়ই বলো , গ্রামের লোকজনে আমার মূল নাম রেখে ভুলভাল নামে ডাকে । এ ভাবে ডাকলে তোমার খারাপ লাগে । মাঝে মধ্যে আমারও লাগে । আসলে ব্যাপারটা কিন্তু তা নয় । কে কি নামে ডাকলো তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। এই বলে গত কয়েক দিনের সংগ্রহ ঝুলিতে থাকা সব বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো পর্যায়ক্রমে বলতে শুরু করল,
শোন, সেদিন রাস্তার খাদে দেখা মিলল এক কিশোরির, হাঁস চরাচ্ছে । পরনে মলিন শাড়ি। নাম তার রাণি । কোন মুল্লুকের রাণি তা জানা গেল না।
গতকাল যার রিকশায় চড়ে হাটে গিয়েছিলাম তার নাম কি জান ?
কি ?
ওবায়েদুল কাদের । একজন মন্ত্রীর নামে নাম । তার মামা নাকি একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত । দলের প্রভাবশালী নেতার নাম ওবায়েদুল কাদের, তিনি মন্ত্রী। তাই ভাগ্নের নাম রেখেছেন ওবায়েদুল কাদের । ভাগ্নে বড়  হলে মন্ত্রী হয়ে দেশ চালাবে বলে । মন্ত্রী মহাশয় দেশ চালায় না । চালায় রিকশা ।
রিকশায় চড়ে হাটে যেতে যেতে রাস্তায় যে কালীবাড়ি শস্মানঘাটের দেখা মিলে সেখানে দেখলাম লোকজন একটি মৃদেহ সৎকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে । জানা গেল মৃত ব্যক্তির নাম ‘ অমর ’ মানে যার মৃত্যু নেই । নাম অমর, মৃত্যু নেই । সেও মারা গেছে ।
এই হলো তোমার নামের কাহানী। তারপরেও কী বলবে কেউ আমায় গোলাম বলে ডাকলেই আমি  ভৃত্য বা চাকর হয়ে গেলাম ?
বাংলা সিনেমায় একটা গান আছে না,
‘নামের বড়াই করো নাকো নাম দিয়ে কী হয়?
নামের মাঝে পাবে না তো সবার পরিচয় …’
নামের মাঝে পরিচয় নেই বরং কাজের মাঝেই পরিচয়, এ কথাটি জ্ঞানী-গুণী সকলেই বলে থাকেন। বলেই সুর দিয়ে গানটি গেয়ে উঠল গোলাম মাওলা ।
আরে আরে গান থামাও । এই গভীর রাতে খেতে বসে তোমায় গান গেয়ে শোনাতে হবে না । তুমি গলা ছেড়ে গান গাচ্ছ ছেলে-মেয়েরা শুনলে তোমাকে পাগল ছাড়া আর কিছুই বলবে না ।
তুমিও কিন্তু নজরুলের গানের বিখ্যাত শিল্পী শবনম মুস্তারী নও । নও উর্দু সিনেমার নায়িকা শবনমও । তুমি হলে গোলাম আলির একমাত্র বউ মানে মেরি জান ‘ শবনম আলি ।’ এই বলে চেয়ার বাঁকিয়ে তাকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বলল, আই লাভ ইউ, বেবি । আই লাভ ইউ।
শবনমও আহ্লাদে বলে উঠল, হয়েছে , হয়েছে মিস্টার গোলাম আলি তোমাকে আর একটি ইলিশের টুকরা দিমু ?
না, আজ আর থাক ।

বিদ্রঃ   রচনাটি শুধু মাত্র বিনোদনের জন্য । এটির সাথে জাতি, ধর্ম বা কোন ব্যক্তির মিল নেইযদি কোন মিল পাওয়া যায় তা সম্পূর্ণভাবে কাকতালীয় ।


শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ২৫ ডিসেম্বর , ২০২০

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com