ছোট গল্পঃ

গোবরে পদ্মফুল

শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

গোবরে পদ্মফুল
প্রচ্ছদঃ সংগৃহীত

 

বেলা দ্বিপ্রহর। সময় গড়ার সাথে সাথে রুমার বাবার চিন্তা বাড়তে থাকে।মেয়ের স্কুল ছুটি হয় ২ টায় কিন্তু সেখানে ৪ টা বাজতে চললো এখনও রুমার আসার খবর নেই।বাড়ি থেকে গামছা কাঁধে করে বের হলো রশিদ মিয়া।এক মেয়ে,দুই ছেলে  আর রোগে মরা স্ত্রী নিয়ে টানাপোড়নের সংসার রশিদ মিয়ার।


রুমা পড়ে ক্লাস এইটে।সামনেই ওর বৃত্তি পরীক্ষা।ওর ছোটভাই পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তির জন্য কোচিং করে স্কুলে।আর সবার ছোটটি দিনরাত খেলা করে স্কুলে যায়না।পড়াশোনায় রুমা খুব ভালো।বরাবরই স্কুলের সুনাম কুড়িয়েছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়।পঞ্চমে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও ছিল গ্রামে সাড়া জাগানোর মতো।

রশিদ মিয়া স্কুলে গিয়ে খোঁজ পেলো না রুমার।মেয়ের জন্য বেশ চিন্তায় কপাল ঘামতে শুরু করেছে।ফিরে আসতে আসতে দেখলো রুমা কে এগিয়ে দিচ্ছে পাশের গ্রামের সুরমা খালা।রশিদ মিয়া কাছে গিয়েই জিজ্ঞেস করলো-আজ অ্যাতো দেরি ক্যান রে মা?

রুমা কিছু বলার আগেই সুরমা খালা উত্তর দিলো-আর কইয়েন না ভাইজান।আমার মেয়েডা,ঐযে হাসি ক্লাস থ্রী তে পড়ে।ওরে একটু অংক বুঝাই দিতেছিল রুমা।তাই দেরি হইছে।আপনে রাগ কইরেন না ভাইজান।বাড়ি ফিরে রুমা বাবাকে জানায় সে হাসিদের বাড়ি টিউশন নিছে।মাসশেষে সুরমা খালা ওকে ৩০০ টাকা দিবে।

রুমা এবার নবম শ্রেণিতে উঠেছে।এইটে বৃত্তি পাওয়ার পরও সাইন্স নেবার সাহস পায়নি।ও নিয়েছে আর্টস।যাতে নিজে পরিশ্রম করে ফলাফল ভালো করতে পারে।নাইনে তিনমাস যেতে না যেতেই হঠাৎ একদিন রশিদ মিয়া স্কুল থেকে রুমাকে নিতে এসেছে।রুমা ক্লাস বাদ দিয়ে যেতে ইচ্ছুক না হলেও ভুলভাল বুঝিয়ে বাবা কোনোমতে ওকে বাড়ি নিয়ে গেল।ও কিছু বুঝে উঠার আগেই পাশের বাড়ির জরিনা ভাবী ওকে একটা লাল শাড়ি পরালো।হালকা স্নো,পাউডার মুখে মাখিয়ে বললো চল বারান্দায় তোর জন্য সবাই অপেক্ষা করতেছে।রুমার বুঝতে তখন বাকি রইলোনা যে ওর বাবা ওর বিয়ের সম্বন্ধ করছে।

পাত্রপক্ষ রুমাকে খুব পছন্দ করে গেল।রুমা কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে একদিন স্কুলে গিয়ে ওর স্বপ্নের কথা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জানালো।আরও বললো যাতে যেকোনো উপায়ে বিয়েটা বন্ধ করা হয়।বিয়ের ঠিক তিনদিন আগে রুমার স্যার পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করাতে কোনোভাবে ঠেকানো গেল বিয়ে।

এবার রুমা উঠেপড়ে লাগলো পড়াশোনাতে।একদিকে অভাবের সংসারে সব কাজ করে নিজের পড়াশোনা,অন্যদিকে অসুস্থ্য মায়ের সেবা করা।এমনি করেই একদিন এস.এস.সির রেজাল্ট বের হলো।রুমা ওদের উপজেলাতে ৩য় হয়েছে।স্বপ্ন সত্যির পথে একধাপ এগিয়ে গেল সে।

স্কুলের সব শিক্ষকেরা হাজির রুমাদের কুঁড়েঘরে।ফুলেল শুভেচ্ছাসহ কত উপহার।সবাই খুশি হলেও রশিদ মিয়ার চিন্তা ও উৎকণ্ঠা যেন বাড়তেই লাগলো।মেয়ে বড় হয়ে গেছে বিয়ে দিবে কিভাবে।রুমা ভর্তি হলো উপজেলা সদরেরই একটি সরকারি কলেজে আবারও সেই আর্টসে।যাতে করে বাড়িতে সব কাজ করার পরও ওর পড়াশোনা বন্ধ না হয়।

দেখতে দেখতে বছর দুই পার হয়ে গেল।এইচ.এস.সির রেজাল্টেও রুমা অবিস্মরণীয় ফলাফল দেখালো।ভর্তির সুযোগ পেল প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।কিন্তু পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে কিনা সেই দ্বিধায় ঘুমহীন কাটে রুমার।অবশেষে শহরের এক বিত্তবান লোকের নজরে পড়ে খবরটি।সে সব দায়িত্ব নিতে চায় এবং রুমার মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে চায়।রুমা যদিও নারাজ অন্যের সহযোগিতা নিতে।তবুও তার বাবার এবং অসুস্থ্য মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ১ম বার বিসিএসে অংশ নেয় রুমা।১ম বারেই সবাইকে বাজিমাত করে পেয়ে যায় প্রশাসন ক্যাডার।যা অনেকের জীবনেই স্বপ্ন হয়ে থাকে।গ্রামের সবাই শুভেচ্ছা জানায় আর বাহবা দেয়।শত প্রশংসা কুড়িয়ে নতুন জীবন শুরু করে রুমা।আজ তার বাবা মা আর দুই ভাইকে নিয়ে থাকে সরকারি বাসাতে।নেই অভাব,নেই বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com