২০ বছর ধরে

গরিবদের একবেলা ফ্রি খাওয়াচ্ছেন আলী আজগর

শুক্রবার, ১৯ মার্চ ২০২১

গরিবদের একবেলা ফ্রি খাওয়াচ্ছেন আলী আজগর
হোটেল মালিক আলী আজগর নিজে হাতেই খাবার তুলে দিচ্ছেন গরিবদের পাতে। ছবিঃ সংগৃহীত

চেষ্টা, শ্রম ও সাধনার মাধ্যমে জয় করা যায় সব-সেটাই প্রমাণ করেছেন তিনি। ২০ বছর ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরে গরিব ও অসহায়দের একবেলা ফ্রি খাওয়াচ্ছেন। তাঁর বাড়ি নাটোরের সিংড়া উপজেলার মহেষচন্দ্রপুর গ্রামে। বর্তমানে জমি কিনে নওগাঁ শহরের চশরামচন্দ্র মহল্লায় বসবাস করছেন। তিনি হোটেল ব্যবসায়ী আলী আজগর হোসেন।

নিজেও এক সময় গরিব ছিলেন বলে অসহায়, ভিক্ষুক, এতিম ও ভবঘুরেদের একবেলা ফ্রি পেটভরে খাওয়ান এই আলী আজগর হোসেন। এতে গরিববান্ধব হিসেবে এলাকায় তাঁর বেশ সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে।


হোটেলের সামনে চেয়ার-টেবিলে বসে তৃপ্তির সাথে ফ্রি খাবার খাচ্ছে গরিব দুঃখী মানুষ। ছবিঃ আসাদুর রহমান জয়

নওগাঁ শহরের বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আদালত চত্বরের ফটকের বিপরীতে রাস্তার পশ্চিম পাশে ‘হাজীর নজিপুর হোটেল অ্যান্ড বিরিয়ানী হাউজ’ নামে দোকানটি এই আলী আজগর হোসেনের।

হোটেলমালিক আলী আজগর হোসেন বলেন, ‘খুব অভাবের মধ্য দিয়ে কোনো রকমে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। বাবা দুটি বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের চারটি মেয়ে আর দ্বিতীয় বিয়ে করেন আমার মাকে। তাঁর ছয় ছেলে সন্তান। ছয় ভাইয়ের মধ্যে আমি ছোট। বয়স যখন ১৫ বছর, তখন বাবা মারা যান। এরপর ২৪ বছর বয়সে আমি বিয়ে করি। এক বছর পর আমাদের ঘরে একটি ছেলে সন্তান আসে। অভাবের সংসার অন্যদিকে আমাদের যৌথ পরিবারে ভাইবোনদের নিয়ে পারিবারিক নানা কলহ লেগেই থাকত। এরই এক পর্যায়ে ১৯৯৭ সালে মা ও ভাইবোনদের ওপর অভিমান করে স্ত্রী ও ছয় মাসের সন্তানকে নিয়ে নওগাঁয় এসে ‘মল্লিকা’ নামের এক হোটেলে দৈনিক ২৫ টাকা বেতনে কাজ শুরু করি। বেশ কয়েক বছর হোটেলে কাজ করলাম। হঠাৎ একদিন হোটেলমালিক নওগাঁর পত্নীতলার আলীম উদ্দিন তাঁর ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যান।’

আলী আসগর আরও বলেন, ‘পরে হোটেল মালিককে বুঝিয়ে নিয়ে আসি এবং তাঁর দোকান চালানোর জন্য অনুমতি নিই। মালিক বললেন, যদি দোকান চালাতে পার, তাহলে চালাও। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এরপর দুই কেজি গরুর মাংস বিক্রি থেকে শুরু করি। অনেক কষ্টের পর আজ আমি প্রতিষ্ঠিত হোটেলের মালিক। বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ জন কর্মচারী, সকাল-বিকেল দুই শিফটে কাজ করে। শহরে মাথা গোঁজার একটু জায়গা হয়েছে। ছেলে ও মেয়ে পড়াশোনা করছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। সপ্তাহে প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরে ৩০০ থেকে ৪০০ গরিব বিশেষ করে ভিক্ষুকদের পেট ভরে ফ্রি খাওয়াই।’

এ ছাড়া অন্য দিনেও যদি কোনো গরিব অসহায় মানুষ আসে, তবে তাদেরও ফ্রি খাওয়ান আলী আজগর। খাবার মেন্যুতে থাকে মাছ, মাংস, ডিম, ভর্তা, সবজি ও ডাল। হোটেলের সামনে চেয়ার-টেবিলে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথমে দেখলে মনে হতে পারে ছোট-খাটো একটি অনুষ্ঠান। এভাবে ২০ বছর ধরে গরিবদের একবেলা খাবার খাইয়ে আসছেন তিনি।

হোটেলে খেতে আসা জাহেরা বেওয়া বলেন, ‘খুব গরিব মানুষ বাপো, পরিবার থ্যাকা হামাক কেউ দ্যাখে না। ভিক্ষা করা খাই আর বৃহস্পতিবার অ্যাসা আজগর বাপোর হোটেলত পেট ভরা খাই, কোনো ট্যাকা ল্যায় না।’

বয়োজ্যেষ্ঠ শেফালি বেগম ও তাহের আলীসহ বেশ কয়েকজন বলেন, গরিব মানুষ। ভিক্ষা করে ভালোমন্দ খেতে পারি না। তিন-চার বছর ধরে এ হোটেলে নিয়মিত খেতে আসি। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরে এসে কখনো গোশত ও কখনো মাছ দিয়ে পেট ভরে খাবার খাই।

আলী আজগরের মতো সমাজের বিত্তবানরাও যদি এই ধরনের কল্যাণকর কাজে এগিয়ে আসেন তবে দেশের চিত্র অনেকটাই পাল্টে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করে সচেতন মহল।

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:২২ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১৯ মার্চ ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com