গন্তব্য

শনিবার, ২৫ জুন ২০১৬

গন্তব্য

গন্তব্য

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম


 

Litearture 02নিজের ছায়াকেও মানুষের কখনো কখনো অপরিচিত লাগে। কণ্ঠস্বর অন্যরকম শোনায়। পরিচিত সব কিছু অচেনা হয়ে ওঠে। আসে, এমন দিন প্রত্যেকের জীবনেই একবার হলেও আসে। ধানমন্ডি লেকে জটলার পেছন থেকে উঁকি দিয়ে আরিফের হটাত নিজেকে অলীক কিছু মনে হচ্ছে। নিষেধ সত্ত্বেও সে পা টানতে টানতে বেরিয়েছিল দুপুরবেলা। মিরপুর পর্যন্ত যাওয়া তার জন্য প্রায় অসম্ভব আর কখন কি ঘটে এখন কিছুই বলা যায় না। অন্তত শুক্রাবাদ মুনেমদের বাড়ি গেলে দুজনেরই খোঁজ পাওয়া যাবে ভেবেই সে বেরিয়েছে। ডান পা টেনে টেনে হাঁটতে হয় বলে সময় বেশি লাগে। এখন গণ-পরিবহনের সংখ্যাও কমে গেছে, দুএকটা ইপিআরটিসির লাল বাস আছে কিন্তু সেসব সব যায়গায় থামে না তাই চট করে পাওয়াও যায় না। প্রকৃতিও বোধ করি সময় টের পায়। এপ্রিলের শুরুতেই দাবদাহে পুড়ে রাস্তার কালো পিচের পেটের ভেতর থেকে গরমের হলকা উঠছে। আরিফ পকেট হাতরে দেখলো আট আনা আর একটা এক টাকার নোট দলা পাকানো। এই দলা দিয়ে রিকশা ভাড়া করা সম্ভব না। একটু যে ভয় লাগছে না তা নয় তবে আজ দিনটা হয়ত অন্যরকম। আজিমপুর কলোনীর সামনে থেকে হেঁটে নিউমার্কেট পর্যন্ত এসে, সে বাসে উঠে ৩২ নম্বরের মাথায় নেমে গেলো। এখান থেকে হেঁটে মুনেমদের বাড়ি খুব একটা দূরে না তবুও আরিফের জন্য লম্বা পথ। সাতাশের বাঁশের সাঁকোটা পেরিয়ে বায়ে মসজিদের গলি। আর ডান দিকে পিপল গাছের সারির ভেতর দিয়ে হাঁটলে ধানমন্ডি মাঠের সামনে পৌঁছে যাওয়া যায়। মাত্র ৫ দিনে কেমন বদলে গেছে গোটা শহর।

তাঁর খবর যদিও কেউ নেয়নি কিন্তু এমন সংকটের ভেতরও আরিফকে ঠিকই বের হতে হয়েছে। তাকে নিয়ে অবশ্য শংকারও কিছু নেই বলেই হয়ত আসেনি। যে মানুষ পোলিও আক্রান্ত পা নিয়ে প্রাত্যহিক কাজটাই ঠিকঠাক শেষ করতে পারে না তাকে নিয়ে অমূলক ভয়ের কি আছে! দুদিন হয়েছে কার্ফিউ তুলে নেওয়া হয়েছে তবে এর পরিবর্তে আবার জারি হয়েছে সান্ধ্য আইন। সূর্য ডোবার সাথে সাথে সব মানুষ হাস-মুরগির মতো ঘরের ভেতর ঢুকে যায় আর ভোরবেলা বের হয়। আস্তে আস্তে স্কুল-কলেজ খুলছে তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। শহরে মানুষইতো নেই। সবারই হয়ত গ্রামে বাড়ি আছে নয়ত আত্মীয় স্বজন আছে। শুধু তাদেরই কেউ নেই। দূর সম্পর্কের আত্মীয়রা আছেন মুন্সীগঞ্জের দিকে কিন্তু আরিফের বাবা ভরসা পান না। বলেন, যা হবে এখানেই হোক আর আমিত সারাজীবন ধরে সরকারি চাকরি করে এলাম; কে কি করবে? এমন সাহসী মানুষের পরবর্তী প্রজন্ম যে কি করে এত গোবেচারা ভিতু প্রকৃতির হয় সেটা অবশ্য জিনতত্ত্বের গবেষণার বিষয়! আরিফ এতটাই ভিতু প্রকৃতির যে দোতলার মিনুকে ডেকে দুটো বইয়ের নাম জিজ্ঞেস করতে কতদিন ইচ্ছে করেছে, গত বছর দুয়েকেও সে সাহস হয়নি। এইতো সেদিন আরিফ সুখটান দিতে দুপুর বেলা লুকিয়ে ছাদে উঠেছে। মিনু কাপড় তুলতে এলো। ভাবলো একবার জিজ্ঞেস করে, সে কলেজ করতে বের হচ্ছে কিনা? মনে মনে একবার রিহার্সেলও দিলো তারপর ঠিক যখন বলতে যাবে তখন অনিচ্ছাতেও চোখ নেমে নিজের পায়ের দিকে গেলো। ইশ কেমন পশুর মতো দেখতে তার ডান পাটা। আঙ্গুলগুলো বেকে বেকে থাকে আর সে জন্য নখগুলোতো ভালো করে কাটা হয়না। সেই নখের ভেতর ময়লার চাই জমেছে। নিজের আঙ্গুলের দিকে তাকিয়েই বাতাসের ঝলকায় আগুন নেভার মতো নিভে গেলো তার কথা বলার বাসনা, শুধু বেশ কিছুটা সময় নিয়ে পুড়ে যাওয়ার পরও বাতাসের স্মৃতিতে শিখার অস্তিত্ব থেকে যাওয়ার মতো কি যেন এক আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে রইলো বুকের ভেতর। ততক্ষণে মিনুর নেমে যাবার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে সিঁড়িতে।
আরিফের এখন কত বয়স! ২৪ হয়েছে বোধহয়। পুরুষের জন্য ১৮ নাকি দুর্দমনীয়, সেই বয়সও কি আর সে টের পেয়েছে নিজের ভেতর? আত্মরতিতেও যে নিজের ভেতর গ্লানি থাকে তা বোধ করি একটা পঙ্গু মানুষ ছাড়া আর কেউ সেভাবে অনুভব করতে শেখেনা। আরিফের সাহসের মধ্যে এই একটাই কাজ, দুপুরে আর রাতে ছাদে উঠে দুটো সিগারেট খাওয়া। বাকি সময় টেবিল চেয়ারেই কাটে। সন্ধ্যের দিকে এ পাড়াতেই দুটো টিউশনি, বেশ না হলেও পকেট খরচ মাঝে সাঝে বাসার জন্য এটা ওটা টুকটাক ঠিকই হয়ে যায়। হঠাৎ হয়তো দুপুরের দিকে সে ঘরে শুয়ে পড়ছে, মা আকস্মিক এসে বলবে, বাবা একটু তেল এনে দিবি? আরিফ জানে এই তেলের টাকা সকালে বাবা দিয়ে গিয়েছে তবুও সে আনন্দচিত্তে এই কাজটা করে কারণ মা যে টাকাটা জমাবে ওটুকুই মায়ের জোর। টিউশনির টাকা না পেলে আবার মায়ের কাছেই হাত পাতে আরিফ। বাড়িটা নিজেদের হওয়ায় বড় খরচাতো নেই আর বাবার চাকরি এখনো বছর চারেক আছে। এর মধ্যে তারও একটা কিছু হয়ে যাবে নিশ্চই। তবে দেশের যে পরিস্থিতি তাতে বাবার সরকারি চাকরির আসলে হাল-হকিকতের এখন কোন ভরসা নেই। আরিফ এসব খুব সচেতন মনে যে ভাবছে তা নয় তবে কাল বিকেল থেকে মনটা একটু কেমন হয়ে আছে মিনুর কথায়। হয়ত মিনু অমন করে না বললে সে আজ বেরও হতো না। এমন সময় কে কার খবর রাখে, তার মতো একটা দেড় পায়ের মানুষ কেন অন্যের জন্য যেচে এই বিপদের রাস্তায় নামবে।

মিনুরা আরিফদের বাড়ির ভাড়াটে। বছর দুই হলো এসেছে। মিনু ইডেনে পড়ছে সেকেন্ড ইয়ারে। ওর ছোট আরও দুই বোন। উপরের দিকটায় আলো-বাতাস বেশি হওয়ায় ভাড়াটা ভালো হয় তাই বাড়ির মালিক আরিফের বাবা পরিবার নিয়ে থাকেন নিচের তলায়। এখানে অবশ্য আরো একটা কারণ আছে, ভাড়াটের বাড়িতে কারা যাওয়া আসা করছে তা নজড় রাখা যায়। ওয়াপদার এ্যাকাউন্ট্যান্ট ইসমাইল তরফদার বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি ভুলেও তার সমর্থন কোনদিকে এখন পর্যন্ত বাড়ির কাউকে বুঝতে দেননি। নিয়মিত কানে মারফি রেডিও ধরে খবর শোনেন এবং চিন্তিত মুখ নিয়ে পায়চারি করেন কিন্তু শব্দ ব্যয় করে প্রতিক্রিয়া প্রকাশে সচেতন তাই ভেতরটা পড়া যায় না। মাঝেসাঝে আরিফকে ডেকে বলেন, দেশকালের বাতাস ভালো না, তোমার নিজেরও কিন্তু চলাফেরায় কষ্ট হয়– বলেই বুঝতে পারেন আঘাত দিয়ে ফেলেছেন হয়ত ছেলেকে। তখন মলম টাইপ প্রলেপ দেন, তুমি আমার একমাত্র বংশের বাতি, ছোটবোনের কথা মাথায় রেখে মানুষজনের সাথে কথাবার্তা বলবা, বুঝছো? আরিফ মাথা নেড়ে জানায় বুঝেছে। এরকম করেই সে সবসময় বুঝে এসেছে ছোটবেলা থেকে তাই তার ২৪ বছর বয়সটা অন্যদের ওই বয়সের মত নয়। ইউনির্ভাসিটিতে মুনেম আর তুষার আরিফের কাছের বন্ধু। ওরা দুজনই নিয়মিত পাঠচক্র করে, মাঝে মাঝে মাথায় লাল কাপড়ের ফেটি বাঁধে, ভালো পোষ্টার-দেওয়াল লিখতে পারে। ওদের ভাষায় চিকা মারা। সেই স্কুল থেকে তিনজন একসাথে আছে। সাবজেক্ট ভিন্ন ভিন্ন হলেও প্রতিদিন একবার কলাভবনের সামনে দেখা হয়। ওরাই গত মাসের শুরুর দিকে বলেছিল, খারাপ সময় আসছে প্রস্তুত হ আরিফ। আরিফ ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যায়, সে কি করে প্রস্তুত হবে! কোনদিন একটা শ্লোগান দেওয়াতো দূরের কথা মনে মনে উচ্চারণও করেনি। একদিন খোকা ভাই এসে ওদের মাঝখানে এক বান্ডিল কাগজ আর মার্কার কলম ছুড়ে দিয়ে বললো, আরিফ তোর না হাতের লেখা ভালো? কি কি লিখতে হবে আমি মুনেমগোরে বুঝায় দিছি। বিকাল পর্যন্ত কলা ভবনের সামনে থাকিস। তুষার চট করে বলে উঠলো খোকা ভাই, ওরে টাইনেন না, বেচারা ভিতুর ডিম। ওর আব্বা বাড়ি যায়গা দিবো না। খোকা ভাই’র কি হলো কে জানে ঠাস করে বলে বসলেন, একটা জোয়ান মর্দ পোলা বাপের ভয়ে কাম করবো না? হাঙ্গা কইরা বউ নিয়া শুয়া থাক, ভার্সিটিত তর কি কাম বেজন্মা?

আরিফ হা হয়ে গেল, কি বললো লোকটা! সে নিজেতো একটা শব্দও করেনি। তার হয়ে তুষার না হয় সমস্যার কথাটা জানিয়েছে, তাই বলে মানুষ এমন অসভ্য আর অশ্লীল হতে পারে! আরিফ যতদূর জানে এই লোকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও না। বড়লোকের ছেলে ধানমন্ডি মাঠে ফুটবল খেলে আর ক্যাম্পাসে আসে গুলতানি করতে। এরা দেশ উদ্ধার করতে নেমেছে! মনটা তিতিয়ে গেল। তুষার যদিও গরম পড়বে এবার, চাওয়ালা চাচা, বাদ দেন খোকা ভাই আমরাতো আছি–এই টাইপ কথাবার্তা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো কিন্তু আরিফ তাতে আরো লাল হয়ে উঠলো। সে উঠে পা টেনে টেনে ফুলার রোড পর্যন্ত এলো তারপর রিকশা পেলো। সাধারণত শাহবাগের যে বাসটা সোহরাওয়ার্দী হয়ে পলাশীর দিকে যায় সেই বাসেই ওঠে কিন্তু সেদিন আর ধৈর্য থাকলো না। আবার বাসা ছাড়া আরিফের কোথাও যাবারও নেই। অবিশ্বাস্য লাগছিল তার, এত অল্পতে যারা এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তারাই কিনা দেশের হাল ধরতে চাইছে! আশ্চর্য! নিজের জন্য গ্লানি তৈরি হয়নি আরিফের। সৃষ্টিকর্তা সবাইকে কি আর সমানভাবে তৈরি করেছেন, সবার পরিস্থিতিও এক না। সপ্তাহখানেক সে কলাভবনের সামনের দিকটা এড়িয়ে চললো, ওদিকটাতেই সবার জমায়েত হবার যায়গা। সে পেছনের গেট দিয়ে রেজিষ্টার বিল্ডিং-এর সামনের মাঠ দিয়ে যাতায়াত শুরু করেছে। কদিন পরই রেজিষ্টার ভবনের সামনে পড়বিতো পর মালির ঘাড়েই। একেবারে খোকা ভাই’র মুখোমুখি। কি অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ! কিছুই যেন ঘটেনি এমন একটা ভাব নিয়ে এগিয়ে এসে বললো, আরিফ পাঁচটা টাকা দে দেখি ভাই, পুরান ঢাকায় মিটিং করতে যাই, পকেট ফুটা। চল আগে চা খাই। আরিফের কাঁধে খোকা ভাই হাত দিয়ে হাঁটছে আর আরিফের সারা শরীর রাগে কাঁপছে। রাগটা নিজের ওপর বেশি, এই লোককে সে না বলতে পারলো না? জিন্নাহ মার্কা পাঁচ টাকার নোটও দিয়েছে আবার পা টেনে টেনে মধুর ক্যান্টিনের দিকে চা খেতেও যাচ্ছে। দুই আনা চায়ের বিল দিতে অবশ্য খোকা ভাই সেই পাঁচ টাকার নোটটাই ভাঙ্গালেন। মানুষটা কি আসলে তাকে প্রকারান্তরে সরি বলে গেল, নাকি আসলেই মনে নেই সেদিন কি বলেছেন? কিছু কিছু মানুষ আছে মুখ দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে জানে না। আরিফের রাগ অবশ্য তাতে কমেনি।

কিন্তু এই খোকা ভাই তাকে সত্যি সত্যি চমকে দিলো সেই ভয়াবহ রাতে আর আজ ভরদুপুরে। সেদিন দু’জন একসাথে চা খাওয়ার পর আর দেখা হয়নি। পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়ে গেল, ভার্সিটি অনানুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হলো। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকেই আরিফের বাবা অস্থির হয়ে ঘরের ভেতর পায়চারি করছেন আর রেডিও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খবর শোনার চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে মনে হলো শব্দের তান্ডব শুরু হয়ে গেছে। মর্টার আর গুলি। একটু পর পর বড় রাস্তা দিয়ে সাই সাই করে ছুটে যাওয়া ভারি গাড়ির চাকার শব্দ। থামার কোন লক্ষণ নেই। শব্দ যেন ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসছে। এর সাথে যোগ হয়েছে মানুষের আর্তচিৎকার। পুরো শহরটাই জান্তব এক আক্রোশের শব্দে পরিণত হয়েছে। জানালার শার্সির ভেতর দিয়ে চোখ নিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো আরিফ। একেতো নিচের তলা তার ওপর রাস্তায় কোন আলো নেই, শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার। আতংকে আশেপাশের সবাই দরজায় তালা ঝুলিয়ে রেখেছে। দোতলার ভাড়াটেরা ভয়ে নিচে নেমে এসেছে। আরিফ নিজের ঘরে বসে টের পেলো মিনুরা তিনবোন মুনার ঘরে খাটে বসে আছে। মুরুব্বিরা সবাই বসার ঘরে বাতি নিভিয়ে বসে নিচু স্বরে কথা বলছে। আরিফের বাবা এসে বলে গেলেন লাইট অফ রাখতে। এর ঘণ্টা দুই পর আকস্মিক নীল একটা আলো সাইরেন বাজাতে বাজাতে এলাকার ভেতর ঢুকলো। আরিফ কিছুক্ষণ আগে বসার ঘরে মুরুব্বিদের সাথে এক কোনায় এসে মায়ের পাশে বসেছে। সাইরেন ক্রমেই তাদের গলির আরো কাছে এসে গেলো। খোলা জিপে দাঁড়িয়ে একজন ঘোষণা দিচ্ছে। প্রথমে শব্দটা অস্পষ্ট ছিলো তারপর স্পষ্ট হলো। সে মাইক দিয়ে এ্যানাউন্স করে যাচ্ছে আক্রমনের খবর। মুনার ঘর থেকে মেয়েদের ফুপিয়ে কাঁদার শব্দ আসছে। জিপটা আরিফদের বাসার সামনে দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় নীল আলোতে জানালার ভেতর দিয়ে দেখে আরিফের পরিচিত মনে হলো, তবে ঘোষকের কণ্ঠস্বরে নিশ্চিত হলো এবার। লোকটার কি অসম্ভব সাহস। সে খোলা জিপে দাঁড়িয়ে সিনা টান করে বলে যাচ্ছে, হায়েনারা রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর, বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ চালাইছে। আমি আপনাদেরই ছেলে, বীর বাঙ্গালী ভাই-বোনেরা আমার, যে কোন সময় হামলা হইতে পারে, আপনারা এই মুহূর্তে অস্ত্র ধরতে প্রস্তুত থাইকেন। আরিফ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলো সেই ঘোষণা। একইতো সমান উচ্চতার একটা মানুষ অথচ কি প্রশস্ত দীর্ঘ মনে হচ্ছিল খোলা জীপে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটাকে। যখন সবাই বাতি নিভিয়ে আত্মগোপন করে ভয়ে কাঁপছে তখন অমন করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে মানুষটা। জিপ দুইবার একই রকম করে এলাকা টহল দিয়ে চলে গেল মিরপুর রোডের দিকে। ওপাশে মর্টার আর গুলির শব্দ আবার শুরু হয়েছে। ট্যাঁ ট্যাঁ করে কি এক জান্তব শব্দ চলছে যেন, কেয়ামতের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত থামবে না। এরই মধ্যে কোন সাহসে এমন করে প্রাণ হাতে নিয়ে পথে নেমেছে লোকটা আরিফ ভেবে পাচ্ছে না! জিপটা ক্রমশ দূরে যাচ্ছে আর কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছে। বোঝা যাচ্ছে ওই একই কথাই তিনি সমস্ত মহল্লায় মহল্লায় ঘোষণা করছেন। সারারাত মাথার ভেতর মর্টার, গুলির শব্দের সাথে বারবার প্রতিধ্বনি তুললো মানুষটার কণ্ঠস্বর। পরদিন থেকে শুরু হয়েছে কার্ফিউ। দেখা মাত্রই গুলি। তিনদিন সেই কার্ফিউ বহাল থাকার পর পরশু থেকে শিথিল করে সান্ধ্য আইন জারি হয়েছে।
এ কদিন কার্ফিউ কি শুধু বাইরে ছিল! মানুষের মনের ভেতরও কার্ফিউ চলেছে নয়ত একদিনও ছাদে সে দোতলার কারো আসা দেখল না কেন? এতদিন পর কাল দুপুরেই ছাদে তার মিনুর সাথে দেখা।
– আরিফ ভাই আমি আপনাকে দেখেই উঠেছি
আরিফের বুকের ভেতর পাড় ভাঙ্গার শব্দ হচ্ছে, সে গোপনে আবার একবার নিজের পায়ের দিকে তাকালো। মিনু সবে গোসল করেছে তার গা থেকে সাবানের ঘ্রাণ বের হচ্ছে। আরিফ কি বলবে বুঝতে পারছে না। মিনু কণ্ঠস্বর আরো খানিকটা নামিয়ে আরিফের দিকে একটু এগিয়ে এলো। আরিফের নিশ্বাস আটকে যাবার অবস্থা তবুও সে মুখে কোন শব্দ করছে না। মিনু এবার একটু পরিস্কার করেই বললো, আরিফ ভাই আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন আমি আপনার সাথে কথা বলছি?
– মিনু শুনছি আমি আপনি বলুন
– এবার বোধহয় একটু ভরসা পেলো মিনু
– আপনি কি এই দুদিনে একবারও বাইরে গিয়েছিলেন?
– না, এই পরিস্থিতিতে কি করে যাই! ইউনির্ভাসিটিতে ক্লাশতো হচ্ছে না।
– আশ্চর্য মানুষ! আমি কি আপনার ক্লাশের কথা বলেছি নাকি? দেশের এই অবস্থায় খবর নিতেওতো আপনার বয়সি ছেলেরা ঘরে বসে থাকে না।
আরিফ এবার বাতাসে মিইয়ে যাওয়া মুড়ির মত হয়ে মাথার পেছনে হাত নিয়ে চুলকাতে শুরু করলো, আমিতো আসলে সম্পূর্ণ সুস্থ না চলাফেরার জন্য।
– আরিফ ভাই, মানুষ পরিপূর্ণ সুস্থ হয় মনে। আপনার আব্বা-আম্মা আপনাকে মানসিকভাবে অসুস্থ্য করে রেখেছে। এবার আরিফ একটু সহজ হচ্ছে, এই মেয়েটা তাহলে তাকে নিয়ে ভাবে। যদিও বেশ কঠিন কথা বলেছে মুরুব্বিদের নিয়ে তবে কথাতো সত্যি।
– আমার একটা কাজ করে দেবেন? আমি খুব দুঃশ্চিন্তায় আছি, পারবেন?
– বলেন কি কাজ?
– আমি আপনার অনেক ছোট, আপনি করে বলতে হবে না।
– না ঠিক আছে আসলে আপনি বললে স্বস্তি পাই, বলেন কি কাজ?
এবার মনে হলো মিনুর চেহারা একটু বদলে গেছে, সে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। আপনার বন্ধু তুষারের কোন খবর জানেন?
আরিফের এক মুহূর্তে মনে হলো সে আসলে রেলিঙয়ের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ এসে একটা টোকা দিলেই পলকা কাগজের মত পড়ে যাবে নিচে। যথাসম্ভব নিজেকে সামলে বললো, আপনি তুষারকে চেনেন?
– জি, তুষার ভাইতো আমাকে আপনাদের বাসা খালি আছে খবর দিয়েছিল।
সেতো দুই বছর আগের কথা।
জি, প্লিস কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। আপনি শুধু সম্ভব হলে একবার তার খবরটা নেবেন?
আরিফ পকেট থেকে ক্যাপস্টেনের একটা শলাকা বের করে ধরালো তারপর বললো, বেশ কাল পাবেন। মিনু মাথা নিচু করে আবার নেমে গেলো দোতলায়।
আরিফ শান্তভাবে সিগারেটটা শেষ করে নিজের পায়ের দিকে তাকালো, এবার মনে মনে একটু হাসলো।
সেই খবর নিতেই আসলে সে বের হয়েছে আজ কিন্তু মাকে বলেছে নিউ মার্কেট পর্যন্ত যেয়েই আবার ফিরে আসবে। সে মনে মনে তুষারের আচরণেও অবাক হয়েছে। এত কাছের বন্ধু কিন্তু দুবছরেও একবার বুঝতে দেয়নি মিনুকে সে চেনে। বিষয়টাতো অন্য রকমও হতে পারতো নাকি তার পোলিও আক্রান্ত পায়ের জন্য সবাই আসলে তাকে এমনিতেই বাতিলের কাতারে ফেলে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে ! পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষই তার শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকলেও তার বাইরের জীবন নিয়ে কোন অনিরাপত্তায় ভোগে না। অথচ এই বয়সের ছেলেদের গল্পগুলো উল্টো হয়। সে কি শুধু এই পায়ের জন্য! কিন্তু খোকা ভাই? সেদিন অমন কিছু বাজে কথা শোনালেও সেই মানুষটা কিনা হিসেবেই ধরেনি আরিফের সীমাবদ্ধতা। সে কি অদ্ভুত এক আহ্বানের ভেতর দিয়ে তারপর না পারার অভিযোগে খেপে গিয়ে মুখ খারাপ করেও আরিফকে পরিপূর্ণ মানুষ ভাবার মত উদারতা দেখালো না ? নয়তো এত ছেলে থাকতে কেন তাকেই ডাকল আর না পেয়ে খেপেও উঠল!

আরিফ ৩২ নম্বরে বাস থেকে নেমে গিয়েছে। জটলা দেখে সাহস করে এগিয়ে গেল। আর একটু চেষ্টা করে ঢুকে পড়লো ভিড়ের ভেতর। ২৫ মার্চ রাতের পরদিন সকালে কোন পত্রিকা হাতে পায়নি। মারফি রেডিওতে খবর শুনেছে, তারপর আস্তে আস্তে পরিস্কার হয়েছে সব কিছু। ৫ দিন আগে সে রাতে খোকা ভাইর খোলা জিপে দাঁড়িয়ে অমন করে মাইকিং করার দৃশ্যটা চোখে ভাসছে। কেউ একজন বললো ভিড়ের ভিতর আহারে পরশু কার্ফু থামার লগে লগেই মানুষটা কি ভরাট কণ্ঠ নিয়া আমাগো পাড়ায় মাইকিং করলো, আরেক জন বোধহয় বললো, ঘটনাটা কি কাইলকের নয়তো শরীরডা এমন ফুইলা উঠছে কেন?
ধানমন্ডি লেকের পানিতে একটা মানুষের ঝাঝড়া হয়ে যাওয়া শরীর ভাসছে। ফুটো ফুটো হয়ে যাওয়া যায়গাগুলো থেকে অনেক সময় ধরে রক্ত বেরিয়েছে, পানিতে ধুয়ে গেছে তবু রয়ে গেছে। মাথার একটা পাশ থেতলে দিয়েছে রাইফেলের বাট দিয়ে। চোখটা কি উপরে নেয়া না মাছে খেয়েছে কে জানে ! হাতের সেই সিকো ফাইভ ঘড়িটা না থাকলে আরিফ বিশ্বাস করতো না। এই ঘড়িসমেত হাতটাই তার কাধে রেখে রেজিষ্টার বিল্ডিং থেকে হেঁটে হেঁটে মধুর ক্যান্টিন পর্যন্ত গিয়েছিল। এই হাতেই কাগজের বান্ডিল ছুড়ে দিয়ে বলেছিল তর না হাতের লিখা ভালো? শ্লোগান লেখ। আরিফ ভিড়ের ভেতর থেকে সরে মূল সড়কে এসে দাঁড়ালো। তাঁর শরীর অসহ্য এক যন্ত্রনায় কাঁপছে। সে ব্যাঙ্গাত্মক চোখে নিজের পায়ের দিকে তাকালো। রোদের ভেতর নিজের ছায়া পড়েছে। ছায়াটা অপরিচিত লাগছে। এতক্ষণে মিনু নিশ্চয়ই খবর নেওয়ার ছলে একবার তাদের বাড়ি এসেছে, মা নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তা নিয়ে কান খাড়া করে রেখেছে দরজার শব্দের দিকে। কিছু যায় আসে না, গোটা বাংলাদেশ এখন একজন মা। আরিফ সামনে একজনকে দেখে জিজ্ঞেস করলো, ভাই গাবতলী থেকে যশোর রোডে যাওয়ার বাস ছাড়ে? উত্তরের অপেক্ষা না করেই আরিফ যশোর রোডের বাস ধরতে গাবতলী হাঁটা শুরু করেছে। তার কানের কাছে দাঁড়িয়ে কেউ একজন ক্রমাগত বলে যাচ্ছে আরিফ হাঙ্গা কইরা বউ নিয়া ….. আবার সেই একই কণ্ঠস্বর বলে যাচ্ছে ভাইবোনরা আমার, অস্ত্র ধরেণ যে কোন সময়…

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / জুন ২৫,২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:০১ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৫ জুন ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com