খুলনা শহরের ভূতের বাড়ির ইতিবৃত্ত

সোমবার, ০২ ডিসেম্বর ২০১৯

খুলনা শহরের ভূতের বাড়ির ইতিবৃত্ত
কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে সেই ভূতের বাড়ি

Khulna loveবাড়ির দুজন বাসিন্দা আত্মহত্যা করেছেন। যে কারণে অন্যরা বহু আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। সেখানে এখনো রাতে নারী কণ্ঠের খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পান অনেকে। আবার কখনো অশরিরী ছায়ামূর্তিও দেখেছেন বলে অনেকের দাবি। সব মিলিয়ে শহরবাসীর কাছে পরিত্যক্ত এই বাড়িটি ‘ভূতের বাড়ি’ নামে পরিচিত। খুলনা শহরের খানজাহান আলী রোডের টুটপাড়া কবরস্থানের পাশে এই বাড়ির অবস্থান।

ভূতের বাড়ির ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, মুর্শিদকুলি খাঁর অধীনস্ত জমিদার ছিলেন রঘুনন্দন। তার কর্মচারী ছিলেন দয়ারাম। তিনি ১৭১৪ সালে মাগুরা জেলার মহম্মদপুরের রাজা সীতারাম রায়কে পরাজিত করে অনেক অর্থ ও ভূসম্পত্তি দখল করেন। যশোর ও খুলনা অঞ্চলে তার অনেক জমি ছিল। তিনি নাটোরের দীঘাপাতিয়া রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীতে তিনি ‘রাজা দয়ারাম’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। রাজা দয়ারামের এক ভাগ্নির নাম ছিল শীলা। তার বোন এবং ভগ্নিপতি হঠাৎ এক রাতে একইসঙ্গে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবা-মাকে হারিয়ে শীলা আশ্রয় পান মামা রাজা দয়ারামের ঘরে। এখানে উল্লেখ্য যে শীলা অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন।


একদিন রাজবাড়ির মঞ্চে যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। যাত্রায় রাজার তহশীলদার অমূল্য ধনের পুত্র নিশিকান্তের অভিনয়ে মুগ্ধ হন শীলা। একে অপরের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে গোপনে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতে থাকে এবং তারা সিদ্ধান্ত নেন পালানোর। শীলা পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন রাজবাড়ির নৈশপ্রহরীর হাতে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আগেই দ্রুত বিয়ে দেওয়া হয় শীলা রানীকে নিধুরাম নামের এক যুবকের সঙ্গে। গোপনে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় খুলনায়। নিধুরামকে দায়িত্ব দেওয়া হয় খুলনা অঞ্চলের খাজনা আদায়ের জন্য। শীলা রানী ও নিধুরামকে উঠতে হয়েছিল পরিত্যক্ত এই ভূতের বাড়িতেই। এখন বাড়িটি যেখানে অবস্থিত তার পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত হতো ময়ূর নদী। বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা দয়ারাম। উদ্দেশ্য, সেখানে থেকেই খাজনা আদায়। খাজনা আদায়ের সময় রাজার লোকজন এ ভবনে থাকত। কাজ শেষে তারা নাটোর ফিরে যেত। তখন বাড়িটি তালাবদ্ধ হয়ে থাকত। কিন্তু শীলা রানী ও নিধুরামকে পাঠানো হয়েছিল স্থায়ীভাবে ওই বাড়িতে থাকার জন্য। ওদিকে শীলার বিয়ে হয়ে গেছে জানতে পেরে নিশিকান্তের পাগল হওয়ার উপক্রম। তার মনের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য বাবা-মা খুলনা জেলার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটিতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠান। তবে শীলা নিধুরামের সঙ্গে খুলনায় আছেন তা নিশিকান্ত জানতেন না। কিন্তু শীলা যে নিশিকান্তকে তখনও ভালোবাসেন তা নিধুরাম বুঝতেন। অন্যদিকে শীলার স্বামী নিশিকান্তকে নিধুরাম চিনতেন।
শীলা নিধুরামের সঙ্গে এলেও তাকে স্বামী হিসেবে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেননি। এজন্য তার দেহ তিনি নিধুরামকে স্পর্শ করতে দেননি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ বাড়তে থাকে। এক রাতে শীলা আত্মহত্যা করেন। শীলার পরিণতি দেখে নিধুরামও আত্মহত্যা করেন। সকালে ঘরে দুজনের লাশ দেখে চাকর-বাকরও ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। একপর্যায়ে ভবনটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
তবে কেউ কেউ দাবি করেন, বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন জনৈক দীননাথ সিংহ। তিনি ছিলেন কুখ্যাত নীলকর উইলিয়াম রেনীর অন্যতম সহযোগী। পাকিস্তান আমলে জনৈক মোক্তার এ বাড়িতে বসবাস করতে আসেন। তার এক ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে বাড়িতে মারা যান। এরপর গোলাম জব্বার নামে এক ডাক্তার এ বাড়িতে বাস করতে এলে তার এক চাকরও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। সাধারণ লোকের ধারণা, এগুলো সব নাকি ভূতের কারসাজি। ষাটের দশকে এই ভূতের বাড়িতে খুলনা জেলা আনসার কার্যালয় করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ভূতের বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা করার জন্য জামায়াতে ইসলামী নেতা মওলানা এ কে এম ইউসুফ একাত্তরের মে মাসে এই বাড়িতে ৯৬ জন জামায়াত যুব ক্যাডার নিয়ে রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলেন। শোনা যায় ‘রাজাকার’ নামটি তিনিই দিয়েছিলেন। এটাই ছিল একাত্তরের প্রথম রাজাকার ক্যাম্প। ভূতের বাড়িটি বর্তমানে আনসার ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এতকিছু ঘটে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ভবনটি সম্পর্কে ভীতিকর ধারণা পোষণ করে। কবরস্থানের পাশে হওয়াতে এই ভীতি আরো বেড়ে গেছে।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ০২ ডিসেম্বর, ২০১৯

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:০৬ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০২ ডিসেম্বর ২০১৯

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com