কোন কাননের ফুল

শনিবার, ১৪ মে ২০১৬

কোন কাননের ফুল

কোন কাননের ফুল
অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

 


বিনোদনবাসন মেজে, ঝিগিরি করে যাঁকে একসময়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে, তিনিই হয়ে উঠেছেন পরবর্তীকালে বাংলা সিনেমার ও সঙ্গীতের সম্রাজ্ঞী কাননদেবী। আগামি ২২ মে তাঁর জন্মশতবর্ষ। এ বছরই তথ্যচিত্রে ফিরে আসছেন তিনি ডা.‌ জ্যোতিপ্রকাশ গুহ-‌র প্রযোজনায় ও শম্পা মিত্রের পরিচালনায়। জন্মশতবর্ষে কাননদেবীকে এটাই এই প্রজন্মের শ্রদ্ধা ও প্রণাম।
ছোটবেলায় পরের বাড়িতে লাথি-‌ঝাঁটা খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করতে হয়েছে। খাবার জুটত না দু’‌বেলা। বাবা রতনচন্দ্র দাস মার্চেন্ট অফিসে কাজ করতেন। একটা ছোটখাট সোনা-‌রূপার দোকানও ছিল। কিন্তু নানান কুঅভ্যাসের জন্যে আয়ের চেয়ে ব্যয়ই ছিল বেশি। ফলে, প্রচুর ধারদেনা রেখে যখন অকালে মারা গেলেন রতনচন্দ্র, তখন সেই ঋণ শোধ করতে ছোট্ট কাননের মাকে সর্বস্ব বিক্রি করে পথে নামতে হল। সেই কাননই পরবর্তীকালের বাংলা সিনেমা ও গানের কাননবালা থেকে অদ্বিতীয়া কাননদেবী হয়ে ওঠেন।

জীবনের এইসব অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করেননি কাননদেবী। বরং সেই কঠিন অভিজ্ঞতার আগুনে পুড়ে আরও বেশি খাঁটি, আরও বেশি মানুষ হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে, সেইসব কথা স্বীকার করার মতো তেজ ও সততা তাঁর ছিল। তাই, এমন কথাও তিনি স্বীকার করেছেন, বড় হয়ে তিনি কারও কারও কাছে শুনেছেন, বাবার বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন না তাঁর মা। এর উল্টো কথাও শুনেছেন। কিন্তু, নিজের আত্মকথায় তিনি বলেছেন, ‘‌এ নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। আমি ‘‌‌মানুষ’‌, সেই পরিচয়টাই আমার কাছে যথেষ্ট। শুধু দেখেছি, বাবার প্রতি তাঁর আনুগত্য ও ভালবাসা কোনও বিবাহিত পত্নীর চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না। হয়ত বা সেই ভালবাসা-‌জাত কর্তব্যবোধের দায়িত্বেই বাবার সমস্ত ঋণভার অম্লানবদনে মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। তাই দরিদ্রের সংসারের যা কিছু সোনা-‌দানা ও বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার মতো জিনিসপত্র ছিল, সব বিক্রি করে বাবার ঋণ শোধ করলেন।’‌

‘‌এরপরই শুরু হল চরম দুরবস্থা। একবেলা আহার সবদিন জুটত না। জীর্ণতম বস্ত্র মায়ের অঙ্গে, আমার অবস্থাও একইরকম।’‌

এই সবই কাননদেবীর নিজের কথা। তারপর দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে কাকুতি-‌মিনতি করে আশ্রয় জোটানো। কিন্তু, কানন আর তাঁর মা আশ্রয় নেওয়ার পর সেই আশ্রয়দাতা বাড়ির ঝি, রাঁধুনি দুই ছাড়িয়ে ছিলেন। এই সব কাজ করতে হত কানন আর তাঁর মা-‌কে। এবং প্রতি মুহূর্তে অপমান, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা শুনতে হত তাঁদের। একদিন মায়ের হাত থেকে চায়ের প্লেট পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। তখন বাড়িসুদ্ধ সবাই তেড়ে মারতে গেল মা-‌কে। দশ বছরের কানন মায়ের হাত ধরে সেদিন আবার রাস্তায় নেমে আসে। এর চেয়ে উপোস করে মরাও ভাল— এটাই মা-‌কে বলেছিল সেই দশ বছরের মেয়েটা।

তারপর বারো ঘর এক উঠোনের এক বাড়িতে ঠাঁই। তখনই পরিচিত এক ভদ্রলোক তুলসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা। তাঁকে কাকাবাবু বলত ছোট্ট কানন। কাননের মিষ্টি মুখ, মায়াবী চোখ দেখে ছবিতে কাজ করার জন্যে তিনি নিয়ে যান বিখ্যাত পরিচালক জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। বাংলা চলচ্চিত্রের তখন শৈশব অবস্থা। বুলি ফোটেনি। নির্বাক ছবি ‘‌জয়দেব’‌-‌এ সুযোগ হল রাধার চরিত্রে অভিনয় করার। ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেডের সেই ছবিতেই প্রথম ফুল ফুটল কাননের অভিনয়ের। সেটা ১৯২৬ সাল।

এই ছবির পর চার বছর ছিল কাননের প্রস্তুতি পর্ব। ম্যাডান কোম্পানির ব্যানারেই তৈরি হল বাংলার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র ‘‌ঋষির প্রেম’‌। এই ছবিতে উৎপলার ভূমিকায় অভিনয় করলেন, গানও গাইলেন কাননদেবী। সেটা ১৯৩১ সাল। ওই বছরেই ছোট ছবি ‘‌জোর বরাত’‌-‌এ তিনি নায়িকা এবং ‘‌প্রহ্লাদ’‌ ছবিতে তিনি নারদের ভূমিকায়।

তারপর, দীর্ঘযাত্রা। এবং বাংলা ছবির অদ্বিতীয়া নায়িকা–‌গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা। বাংলা, হিন্দি মিলিয়ে ৫৬টি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। প্রথম দিকে পৌরাণিক ছবিতে পুরুষ চরিত্রেও দর্শকদের মাতোয়ারা করে দিয়েছেন তিনি।‌ ‘‌বিষ্ণুমায়া’‌ ছবিতে নারায়ণ করেছেন, কৃষ্ণও করেছেন। ১৯৩৫ সালে ‘‌মানময়ী গার্লস স্কুল’‌-‌এ তাঁর অভিনয় তাঁকে অভিনেত্রী হিসেবে বিশেষ সম্মানের আসন দিল। ফণী বর্মার ‘‌বিষবৃক্ষ’‌ ছবিতে তাঁর কুন্দনন্দিনী বহু প্রশংসিত। ১৯৩৬-‌এ দেবকী বসুর ‘‌বিদ্যাপতি’‌ তাঁকে অসাধারণ জনপ্রিয়তা দেয়। আর, প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘‌মুক্তি’‌ তো বাংলা ছবির ইতিহাসেই অবিস্মরণীয় সংযোজন। মুক্তি-‌র সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। এ ছবিতে কাননদেবীর অভিনয়ও যেমন, তাঁর গলার রবীন্দ্রসঙ্গীতও বিদগ্ধ দর্শক, শ্রোতাদের কানন-‌অনুরাগী করে তোলে। কাননদেবীর কণ্ঠে ‘‌আজ সবার রঙে রঙ মেলাতে হবে’ শুধু মুক্তি-‌র রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ে থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি বাঙালির ঘরে। তবে, তাঁর কণ্ঠে দ্বিভাষিক ‘‌শেষ উত্তর’‌ বা ‌ ‌‘‌জবাব’‌ ছবির ‘তুফান মেল’‌ গান মাতিয়েছিল সারা ভারতের মানুষকে। ‘‌শেষ উত্তর’‌-‌এর ‘‌আমি বনফুল গো’‌ গানটাও বাঙালি কোনওদিন ভুলবে না। ভোলা যাবে কাননদেবীর গাওয়া ‘‌যদি ভাল না লাগে তো দিয়ো না মন’‌?‌ না, ভোলা তো যাবেই না, সেই চল্লিশের দশকে সুশীল মজুমদারের ‘‌যোগাযোগ’‌-‌এ তাঁর কণ্ঠে এ গান শুনে আপামর বাঙালি মন দিয়েছিল তাঁকে।

নিজে অভিনয় করেছেন, গান গেয়েছেন। পরবর্তীকালে তৈরি করেছেন নিজের প্রোডাকশন হাউস— শ্রীমতী পিকচার্স। ১৯৪৯ সালে শ্রীমতীর প্রথম ছবি ‘‌অনন্যা’‌য় তিনিই নায়িকা। শ্রীমতীর তৃতীয় ছবি ‘‌মেজদিদি’‌র পরিচালক তাঁরই স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্য। তারপর ‘‌নববিধান’, ‘‌দেবত্ত’‌, ‘‌আশা’‌। শ্রীমতী পিকচার্সের সব ছবিতেই তিনি অভিনয় করেননি। শ্রীমতীর ১৯৫৯ সালে তৈরি ‘‌ইন্দ্রনাথ, শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি’ ছবিতেই শেষবারের মতো অভিনয় করেন কাননদেবী। এ ছবির ৩৩ বছর পরে ১৯৯২ সালের ২৭ জুলাই তিনি মারা যান। তবে ছবি করা ছেড়ে দিলেও ‌‌ দুঃস্থ, অবসরপ্রাপ্ত‌ অভিনেত্রীদের জন্যে তাঁর চিন্তাভাবনা কখনও থামেনি।‌ তৈরি করেছিলেন ‘‌মহিলা শিল্পী মহল’‌। সাহায্য করেছেন বহু শিল্পীকে। একসময় নিজে কষ্ট করে বড় হয়েছেন তাই অন্যের কষ্ট দেখলে পাশে দাঁড়াতেন সঙ্গে সঙ্গে।

তবে, এসব কথা ঘটা করে বলেননি  কখনও। কিন্তু নিজের যাত্রাপথের সত্যকে গোপন করেননি তাঁর আত্মকথা ‘ সবারে আমি নমি’‌তে। এমন এক মহৎ জীবনকে আমাদের সামনে আনার জন্যে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞ এই বইয়ের অনুলেখিকা সন্ধ্যা সেনের কাছে।

যে দারিদ্রের মধ্যে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাতে তাঁর জন্মদিন যে ছেলেবেলায় কখনও পালন করা হয়নি, এটাই স্বাভাবিক। এই বইতেও উল্লেখ নেই জন্মদিনের কথার। তাঁর জীবনকে তথ্যচিত্রের মধ্যে ধরার জন্যে এগিয়ে এসেছেন ডা.‌ জ্যোতিপ্রকাশ গুহ। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে কানন-‌অনুরাগী। তাঁর প্রযোজনায় তৈরি হচ্ছে কাননদেবীকে নিয়ে তথ্যচিত্র। পরিচালনা করছেন শম্পা মিত্র। শম্পা নিজেও কাননদেবীর ভক্ত। এর আগে অতীত দিনের গায়ক গৌরীকেদার ভট্টাচার্যকে নিয়ে তথ্যচিত্র পরিচালনার সময় শম্পার সঙ্গে পরিচয় জ্যোতিপ্রকাশবাবুর। দুই কানন-‌ভক্তের পরিচয়ের ফলশ্রুতি এই তথ্যচিত্র।

তথ্যচিত্রের মূল কাজ শেষ। এখন সম্পাদনা করছেন সুবর্ণ মিত্র।

এমন একটা ঘটনাবহুল, বর্ণময়, মহৎ জীবনকে তথ্যচিত্রের মাপে ধরে ফেলা যে সহজ কাজ নয়, এটা মানেন শম্পা। এই তথ্যচিত্রে কাননদেবীর বহু ছবির ক্লিপিংস এবং গান তো থাকছেই, থাকছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার। বিখ্যাত রেকর্ড সংগ্রাহক সুশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায় বই দিয়ে, রেকর্ড দিয়ে সাহায্য করেছেন শম্পাকে।

কাননদেবীর জন্মদিন নিয়ে কিছুটা সংশয় আছে আজও। তবে, বাংলা তারিখটা যে ৮ জ্যৈষ্ঠ, এটা নিশ্চিতভাবে জানালেন জ্যোতিপ্রকাশবাবু। তিনি এই তারিখটা জেনেছিলেন কাননদেবীর স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্যের কাছ থেকে। আর, শম্পা জেনেছেন কাননদেবীর আত্মকথার অনুলেখিকা সন্ধ্যা সেনের কাছ থেকে।

আর ৮ দিন বাদেই ৮ জ্যৈষ্ঠ, কাননদেবীর জন্মশতবর্ষ। তিনি কানন। পরবর্তী জীবনে বহু মানুষ আশ্রয় পেয়েছেন সেই কাননে। কিন্তু, আমাদের আজও বিস্ময়, পথের মেয়ে থেকে তিনি কোন জেদ, সংগ্রাম এবং আত্মবিশ্বাসে হয়ে উঠলেন বাংলা ছবির সম্রাজ্ঞী?‌ সত্যিই এমন একটা মহৎ জীবন আমাদের বহু কিছু শিক্ষা দেয় আজও। এবং তাঁর দিকে তাকিয়ে আজও আমাদের উচ্চারণ করতে হয়— তিনি সত্যিই কোন কাননের ফুল?‌  তাঁর সৌরভ আজও অম্লান। শতবর্ষে তাঁকে আমাদের শ্রদ্ধা ও প্রণাম।‌‌‌

শনিবারের চিঠি/আটলান্টা/ মে ০৭, ২০১৬

 

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৪ মে ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com