মিনি উপন্যাস

কৃষ্ণকলি

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০

কৃষ্ণকলি
কৃষ্ণকলিঃ নন্দ কিশোর সাহা

হিয়া বেশ বিব্রত বোধ করে। ওকে উদ্দেশ্য করেই এটা হয়েছে। চুপ করে শুনে যেতে হবে। অযথা হবে মুখোমুখি হওয়া। কমবেশি সব মেয়েকেই এটা সহ্য করতে হয়।
রেলক্রসিংয়ে কয়েকটি দোকান প্রতিদিন ৪ টা নাগাদ এখান থেকে সাইকেলে যেতে হয় টিউশনিতে। কখনো গেট পড়ে যায়, কখনো বা হাই স্পিডে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যায়।
সব গান সুখকর হয় না। কয়েকটা ছেলে আড্ডা দেয় দোকানে। না দেখার ভান করে চলে যায়। আজ গাইল রবীন্দ্র সঙ্গীত। এই ছেলেরা বড় একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত গায় না। তবু কে যেন গাইল-
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি
কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
হিয়া শ্যামলা। ওর চোখ গুলি হরিণের চোখের সঙ্গে তুলনা করা যায় কি না, তা ওর জানা নেই। গাঁয়ের লোকেরা কালো মেঘে কালো বলে। ওকে কেউ কালো মেয়ে বললেও হরিণ নয়না বলেনি। তবে ওর চোখ দুটি মন্দ নয়। মা তো তাই বলে।
ইদানিং মাঝে মাঝে শাড়ি পরে। গতকাল পরে ছিল। রংটা খানিকটা বাসন্তী । রেলক্রসিংয়ে আসতেই কানে ভেসে এলো-
বাসন্তী রং শাড়ি পড়ে চলছে একা সঙ্গী বিহীন
আচল ওড়ে দুরন্ত বায়, অতল যে তার  হৃদয় গহীন।
গতকাল অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে ছিল। আজ থেমে গেল। তারপর দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেল। ছেলেটার দিকে সামনে এসে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে ধরল ছেলেটির দিকে। বললো- মেয়েদের দেখলে গান গাইতে ইচ্ছে করে?
একটু অপ্রস্তুত হল ছেলেটি। এভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার জন্য হয়তো তৈরি ছিল না।
না, মানে এমনি গাই। মেয়েদের কথা বলছেন কেন?
অন্য কোন কাজ নেই?
কাজের কথা বলছেন? না, একটা কাজ আজও যোগাড় করতে পারেনি।
আড্ডা না দিয়ে চেষ্টা করুন।
উত্তর দেওয়ার আর কোন সুযোগ না দিয়ে হিয়া সাইকেলটা নিয়ে হেঁটে চলল। খানিকটা এগিয়ে গন্তব্যে ছুটে চলল সাইকেলে।
সকাল-বিকেল দুইবার টিউশনি। হাজার দুয়েক এর মত রোজগার। এটা অবশ্য ওর জন্য কম নয়। বরং বেশ ভালোই। ইচ্ছে করলে আরো দুই একটা করা যায়। কিন্তু অতটা সময় দিতে ইচ্ছে হয় না। জীবনটা তো আর টিউশনি নির্ভর হতে পারে না।
এরপর বেশ ক’টা দিন কেটে গেছে। দিবাকরকে আর রেলক্রসিংয়ে দেখা যায়নি। বোধয় কাজের সন্ধানে থাকার পরামর্শ টা কাজে লাগিয়েছে। মুখটা চেনা। কী নাম কে জানে। প্রয়োজন হয়নি। যাক যেখানে খুশি। বিরক্ত করা তো বন্ধ হয়েছে?
হিয়া রেলওয়েতে চাকরির জন্য আবেদন করেছিল মাস চারেক আগে। অনেক গুলো আবেদন করেছে। এজন্য পড়াশুনার ফাঁকে প্রস্তুতিও নিয়েছে। এটি ওর প্রথম ইন্টারভিউ কার্ড। একটা উত্তেজনা অনুভব করে। চাকরি না হোক, সূচনা তো ভালো করা যায় । ক’দিন ধরে বিভিন্ন রকম গাইড নিয়ে প্রস্তুতি নিল।
লিখিত পরীক্ষা 1 ঘণ্টায় শেষ হলো। বারোটায় খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে এল হিয়া। চৈত্রের দুপুর, বেশ রোদের তেজ। একটু হাঁটতেই বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে শ্যামলা বরণ মুখমণ্ডলে। বাস স্টপেজে এসে অপেক্ষা করছে দ
হিয়া। বাড়ি পৌঁছাতে ঘন্টাখানেক। দাঁড়াতে হলো খানিকটা সময়। কিন্তু বাসের তো প্রচুর ভিড়। তারপর ভ্যাপসা গরম। বাস থামতেই ভিড়ে ঠাসা গাড়িতে উঠে পড়ল হিয়া।
এই যে বসুন।
চোখ সরাতে গিয়ে বুঝতে পারলো, ওকেই দিবাকর বসবার জন্য বলেছে। দিবাকর ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে।
হিয়া বলল – না না ঠিক আছে। অসুবিধা নাই।
পথ তো অনেক। আপনি বসুন।
দিবাকর বসবার জায়গা করে দিয়েছে। অগত্যা হিয়াকে বসতে হলো। একটা অস্বস্তি লাগছিল। বিশেষ করে সেই দিনের ঘটনার জন্য।

২য় পর্ব।।


মিনিট পনেরো বাদে পাশের যাত্রী উঠে যেতেই দিবাকর হিয়ার পাশে বসলো। হিয়া আর এক দফা অস্বস্তি এড়ানোর জন্য হাতের পত্রিকায় চোখ রাখল। কিন্তু পত্রিকা আর কতক্ষণ পড়া যায়। খানিক বাদে দিবাকর প্রশ্ন করল পরীক্ষা কেমন হলো?
পরীক্ষা?
মানে ইন্টারভিউ কেমন হলো?
মোটামুটি। কিন্তু আপনি–
ম্লান হাসল দিবাকর। হ্যাঁ জানি।
কী করে জানলেন?
দেখুন আমি আপনার খোঁজ খবর রাখি,একথা মনে করবেন না।
তাহলে জানলেন কী করে?
আমিও গিয়েছিলাম কিনা।
সে না হয় হল। কিন্তু-
এটা কোন জটিল বিষয় নয়। পোস্ট অফিসে পাঁচটি ইন্টারভিউ কার্ড এসেছিল। তিনটা ছেলে, দুইটা মেয়ে। আপনার নামটা তখনই দেখেছিলাম।
আপনি আমার নাম জানেন?
সত্যি বলতে কী জানি না।  মানে জানতাম না।
তাহলে?
চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছেন আর এইটুকু বুঝলেন না?
তার মানে?
তার মানে, আপনার ফাইল এর উপরেই  তো-
ও তাই বলুন। আমি ভাবলাম-
ভেবেছিলেন বখাটে ছেলে। রাস্তায় গান গেয়ে সময় কাটায়।
আপনি সেদিনের কথাটা ভুলতে পারেননি।
না পারারই তো কথা। যাক এ কথা, পরীক্ষা কেমন হলো তার কিন্তু উত্তর দেননি।
মনে আছে। কিন্তু সুযোগ পাইনি।
ঠিক বলেছেন। নানা কৌতুহল এর জন্ম হয়ে পড়েছিল। তাই তাড়াতাড়ি সব কৌতুহল মিটিয়ে দিয়েছি।
পরীক্ষাটা মোটামুটি হয়েছে। পোস্ট তো ২৫০ টি। এপ্লাই করেছে কতজন, কে জানে।
অনেক, সব চাকরির ক্ষেত্রে এই অবস্থা। আবেদন করেছে ৮ হাজার।
তাই নাকি? বিস্ময় ভরা কন্ঠে হিয়া বলল
এটা আর বেশি কী?
আপনি অনেক খবরই রাখেন। নিশ্চয়ই আপনিও প্রার্থী।
তাতো নিশ্চয়ই।
আপনি কেমন লিখলেন?
আপনার মত। তবে আশা করি রিটেনে হতে পারে।
ওরা সারাক্ষণ ইন্টারভিউ সংক্রান্ত কথা বললো। তারপর বাস থামতেই দুইজনে নেমে পড়ল।
দিন পনেরো বাদে রেলক্রসিংয়ে দেখা হয় হিয়ার  সঙ্গে। হিয়া না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিল।
দিবাকর ডাকল – এই যে হিয়া, শুনুন।
হিয়া এগিয়ে যেতেই দিবাকর বলল-হেলথএ আবেদন করেছিলেন নাকি? ১৫ তারিখ ইন্টারভিউ।
হ্যাঁ করেছি। কার্ড পেয়েছি।
চাকরির জন্য বোধ হয় খুব বেশি চেষ্টা করছেন। দিবাকর রহস্য করে বলল।
আপনি করছেন না?
বাদ দিয়েছিলাম। আবার চেষ্টা করছি।
বাদ দিয়ে আবার চেষ্টা?
বাহ আপনি তো বললেন, আড্ডা না দিয়ে চেষ্টা করতে। সে জন্য করবেন, সেটা কোন কথা হলো?
ঠিক সে জন্য নয়। আমার একটা চাকরির খুব দরকার। নিশ্চয়ই হয়ে যাবে ।
বছর খানেক তো চেষ্টা করছি।
এরই মধ্যে কি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন?
ঠিক ক্লান্ত নয়। হতাশা লাগে মাঝে মাঝে।
হতাশা লাগলে একটু আড্ডা দেবেন।
আপনি বোধ হয় ব্যাপারটাকে ঠিক –
আরে না না। এমনি বললাম।
এরপর ওদের ব্যবধান কমেছে। অনেকটা কাছে এসেছে ওরা। দুজনেই বেকার। চাকরির খোঁজ খবর নেওয়া দেওয়া করেছে।
হিয়ার একটা হীনমন্যতা ছিল। দিবাকরের সঙ্গে আলাপে সেটা খানিকটা কমেছে। ওর গায়ের রং শ্যামলা। এই ভাবনাটা জীবনের জন্য বড় বাঁধার কারণ হয়ে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করেছে ওর মনে।

৩য় পর্ব। ।

হিয়ার নিজের প্রতি ঘৃণা হয় মাঝে মাঝে। শুধু গায়ের রংটা শ্যামলা বলে তিন তিন বার পাত্রপক্ষ সংবাদ দেবে বলে চলে গেছে । আর সংবাদ দেয়নি । হিয়া প্রথম দুবার বুঝতে পারেনি। তৃতীয় বারে বুঝেছিল সংবাদ আসবে না । তাই চতুর্থবার আর পাত্রপক্ষের সামনে বসে নি ।
এভাবে আর নিজেকে কতবার অপমান করবে । বিয়ে ছাড়া কি জীবনটা মিছে অর্থ হীন? দোকানের পণ্যের মত কেউ ওকে সামনে বসিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে । তারপর মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে চলে যাবে। এটা আর ভালো লাগে না। কোনো ছেলে ওকে কেন বিয়ে করবে? সবাই তো চায় সুন্দরী স্ত্রী, শ্বশুর বাড়ির সম্পদ। ওর কোনটাই নেই। এর বেশি তাদের তো দরকার নেই।
একজন পুরুষ যদি তার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে আর তাকে নিয়ে কী ঘর করা যায়। তাই প্রথমেই টিউশনি। তারপর চাকরির খোঁজ করতে থাকে হিয়া। মনের এমন একটা অবস্থায় দেখা হয় দিবাকরের সঙ্গে। এখন জীবনটা একটু অর্থবহ মনে হয়। বিশেষ করে, দুজনেরই একটা চাকরির প্রয়োজন। এই অনুভূতিটা ওদের খানিকটা ঘনিষ্ঠ করে তোলে।
একদিন দিবাকর বলে- হিয়া চল  না   কোথাও ঘুরে আসি।
ঘুরতে যাব? ঘুরতে যাওয়ার কথা বলছো কেন? এইতো বেশ কাটছে। মাঝে মাঝে তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি একসঙ্গে।
না আমি সে কথা বলছি না।
কী বলতে চাচ্ছ তাতে স্পষ্ট করে বলবে।
বলছিলাম একটা ভালো বই এসেছে। চলো না দেখে আসি।
হইয়া  দিবাকরের এই আকস্মিক প্রস্তাবে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়। দিবাকরের সিনেমায় যাওয়ার কথা ভাবেনি কখনো। তাই বলে-
না থাক, ওসব আমার ভাল লাগেনা।
সিনেমা ভালো লাগে না? কী যে বলো না।
তা বলিনি। সিনেমা হলে যাওয়ার অভ্যাস নেই আমার। ও বুঝেছি।
কী বুঝেছো?
তুমি আমাকে বন্ধু ভাবতে পারো নি।
দিবাকর, বন্ধুত্ব কখন হয়?
যখন কোনো সংশয় থাকেনা মনে।
কিন্তু আমার মনে হয়, এটা সংশয়ের ব্যাপার নয়। বরং যখনই দুজনের মনের অবস্থায় এক রকম  হয় তখনই বন্ধুত্ব হয়।
ঠিক বলেছ । সমস্যা এক রকম হলেই বন্ধুত্ব হয়ে যেতে পারে। তবে সে দিক দিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব হতে পারে। কেমন? জানতে চাই হিয়া।
আমাদের দুজনের সমস্যা প্রায় এক রকমের। চাকরি, একটা চাকরি চাই।
দিবাকর, তুমি ঠিকই বলেছ। সমস্যা প্রায় এক রকমই।
ঠিক একরকম নয়। পার্থক্যটা কী বলতো?
একটা পার্থক্য আছে? কী সেটা জানতে চায় দিবাকর। আমার রঙ কালো।
এনিয়ে তুমি ভাবো?
তুমি ভাবনা? হিয়া আগ্রহ ভরা চোখে তাকায়।
ভাবলে কী করতে? বন্ধুত্ব হতো না? দেখ হিয়া,  রংটা কোন ব্যাপার নয়।
সত্যি তাই?
হ্যাঁ তাই, তোমার মেধা আছে। এই মেধার কাছে রঙ তুচ্ছ।
মেধা দিয়ে কী হবে দিবাকর?
কেন মেধা থেকে প্রতিষ্ঠা, তুমি নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠা পাবে। সেটার কতটুকু বিশ্বাস করতে পারি।
তোমার এই হীনমন্যতা আমি দূর করে দেবো। আমরা দুজনেই বেকার। কেউ কারো ভার গ্রহণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। একটা চাকরি পেলে-
যদি না পাও?
তুমি বা আমি কেউ পেয়ে যাব। তখন আর দেরী করবো না। বিয়েটা সেরে ফেলব।
কেন আমার হীনমন্যতা দূর করার জন্য?
ঠিক তাই।
দিবাকর, তুমি অনেক ভাল।
থাক , আর প্রশংসা করতে হবে না।
এভাবেই ওদের অনাগত জীবনের ভাবনা এগিয়ে চলে। পরদিন ওদের দেখা হলো আবার। হিয়া খানিকটা মনঃক্ষুন্ন হয়ে বললো- দিবাকর, তুমি হয়তো কাল কষ্ট পেয়েছ।
না, কষ্ট কেন?
আসলে আমি পারিবারিক দিক দিয়ে খানিকটা সংকীর্ণ পরিমণ্ডলে বাস করি।
আমি সেজন্য তো তোমার কাছে কোন কৈফৎ চাইনি। কৈফিয়ৎ চাইবে কেন? নিজের মনের অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করছি মাত্র।
আমি বুঝেছি, তোমার ইচ্ছা আছে। হয়তো মায়ের কাছে ছোট হবে ভেবে-
তুমি আমায় ভুল বুঝনা। চলো আজ ছবি দেখে আসি।
আসলে এতদিন ধরে ভেবে তুমি ঠিক করেছো যে ছবি দেখতে যাবে। বেশ ভালো কথা। আমি আর এ নিয়ে কোনো তোমার কোনো দোষ দেব না। যা করবে ভেবে করবে এতে আর দোষের কী?
দুজনে সিনেমা হলে যায় ছবি দেখার জন্য। দিবাকার আগে থেকেই টিকিট কেটে রেখেছিল। দূর থেকেই হিয়াকে দেখে হাত তোলে দিবাকর। দুচোখে একটা খুশির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ে। শেষ হয় প্রতীক্ষা।
হিয়া কাছে আসতেই বলে- ভাবছিলাম শেষ পর্যন্ত আসতে পারবে কিনা।

৪র্থ পর্ব।।

তোমার সংশয় ছিল?
তা তো একটু ছিলই।
তারপর দুজনে সিনেমা হলের ভিতরে প্রবেশ করে। সবচেয়ে পিছনের সিট নেয় ওরা। হিয়া মনে মনে একটু অস্বস্তি বোধ করে। বলে – এত দামি টিকিটের কী প্রয়োজন ছিল?
তুমি এই প্রথম কারো সঙ্গে সিনেমা দেখতে এলে। দামি টিকিট না কাটলেই কী হয়?
তুমি কোন বড়লোক নও।
তা ঠিক, বড়লোক নই। তবে তোমার জন্য একটু খরচ করার ক্ষমতা আমার আছে।
তবু মনে হয় এটা একটু বেশি মাত্রায় বিলাসিতা হয়ে গেছে। সাধারণ টিকিট হলেই তো হত।
আসলে এটা ছিল একটা বিশেষ কেবিন। এই কেবিনে বসে দুজনে সিনেমা দেখতে খানিকটা অস্বস্তি থেকেই হিয়া এ কথা বলেছে। দিবাকর হয়তো তা বুঝে নিয়েছে। কিন্তু নিজের স্বচ্ছলতার কথা বলে তা এড়াতে চাইল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সিনেমা হল দর্শককে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। হয়তো সিনেমাটা ভালো। তা না হলে পূর্ণ হবে কেন? ভালো একটা ছবি দেখা যাবে এই ভেবে খানিকটা তৃপ্তি বোধ করলো হিয়া।
কিছু সময় অন্তর আলো নিতে লাগল। ক্রমাগত গাঢ় হতে থাকলো অন্ধকার। সবশেষে যেন একটা আলো-আঁধারের খেলা, একটা স্বপ্নীল পরিবেশ। আর তার মাঝে দুজনকে পাশাপাশি মন্দ লাগছে না হিয়ার।
পতপত করে জাতীয় পতাকা উড়তে থাকে। বিশাল পতাকা। সবাই দাঁড়িয়ে পতাকাকে সম্মান জানাচ্ছে। ওরাও উঠে দাঁড়ালো। পতাকা দেখানো শেষ হতেই দিবাকর হিয়ার হাত ধরে।  রোমাঞ্চিত হয় হিয়া। বাঁধা দেয় না, বাঁধা দিতে পারেনা। সংকোচের কথা বলেছিল দিবাকর। তাই দিবাকরের ইচ্ছার কাছে খানিকটা সঁপে দিয়েছে নিজেকে।
কাহিনী শুরু হয়ে গেছে। শুরু থেকেই একটা চমকপ্রদ সূচনা। হিয়া মনযোগ  দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দিবাকর মন দিয়ে দেখছে বলে মনে হলো না। দিবাকার মনঃসংযোগ করেছে হিয়ার প্রতি। হিয়া খানিকটা বিরক্ত বোধ করে। হালকা আপত্তি প্রকাশ করে। কিন্তু খানিকটা বাদে দিবাকর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
হিয়ার কাছে ব্যাপারটা খারাপ লাগে। ক্রমাগত অশান্ত হয়ে উঠছে দিবাকর। ওর অসংযত হাত হিয়ার অঙ্গে খেলা করে। নিরুপায় হিয়া নিজেকে সমর্পণ করে।
এক সময় ছবি শেষ হয়। নিশ্চুপ বেরিয়ে আসে হিয়া। সিনেমা নিয়ে আলোচনার কিছু ছিল না। কারণ দিবাকর তা দেখেছে বলে মনে হয় না।
কী হলো হিয়া তুমি এমন করছ কেন?
দিবাকর, আমি এটা চাই নি।
সরি, আমি দুঃখিত। তুমি এমন ভাববে জানতাম না। দুদিন বাদে আমরা তো বিয়ে করবো। তুমি এত মন খারাপ করছো কেন?
ঠিক আছে তুমি সরি বলেছো। এ নিয়ে আর কিছু বলতে চাইনা।
ভেরি গুড।
দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। পরিবেশ তখনো খানিকটা ভারী হয়ে আছে। সেটা লক্ষ্য করে দিবাকর তা হালকা করার চেষ্টা করে।
হিয়া, তোমার চাকরির কোন সংবাদ আছে নাকি? ইন্টারভিউ ভালোই দিয়েছি। ওদের কথা শুনে তো মনে হয়েছে আমায় সিলেকশন দেবে।
তা তো গতকাল বলেছিলে। তারপর কোন খবর আছে নাকি, তাই বল ।
এত তাড়াতাড়ি সংবাদ হয় নাকি?
তা ঠিক। আমি একটু অস্থির হয়ে পড়েছিলাম বোধ হয়। তোমার কোন খবর আছে নাকি?
না হিয়া , কোন সংবাদ নেই। আমি এখন আর আলাদা করে কিছু ভাবি না। তোমার আমার যারই চাকরি হোক বিয়েটা আর দেরি করতে চাইনা।
হিয়া বলল- যদি দুজনার কারু  না হয়?
কি যে বল। নিশ্চয়ই হবে। অন্তত তোমার হয়ে যাবে। আমি জানি।
আমার হয়ে যাবে?
হ্যাঁ হবে।
এত নিশ্চিত হচ্ছ কেন?
তোমার যা রেজাল্ট  তাতে তোমায় ঠেকাতে পারবে না।
খানিকটা এগিয়ে ওরা যে যার পথে পা বাড়ায়। সন্ধ্যার বেশি বাকি নেই। হিয়ার বুকটা কেঁপে ওঠে। মা যদি প্রশ্ন করে, কী জবাব দেবে। মিথ্যা বলতে পারবে না। মিথ্যা বলতে হলে নিজের  মাঝে যুদ্ধ করতে হবে। দিবাকর খুশি হবে তাই আসতে হয়েছিল। তবে দিবাকরের আচরণটা প্রত্যাশিত ছিল না। অন্যায় খুশির জন্য কিছু মেনে নিতে হয়।
সপ্তাহ খানেক বাদে হিয়ার মনে হলো এবার অফিসে যাবে। যদিও এভাবে খোঁজ খবর নিতে যাওয়া ঠিক নয়। কিন্তু ওরা সেদিন যেভাবে বলেছিল তাতে তো মনে হয়েছিল খুব তাড়াতাড়ি এপয়েন্টমেন্ট পেয়ে যাবে। সেদিনই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করার জন্য রওনা হল।

৫ম পর্ব।।

অফিস দোতালায়। বেশ বড় অফিস। চারিদিকে বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। হিয়া ধীর পায়ে উপরে উঠে আসে। সিড়ির ডান দিকেই ক্লার্কদের রুম। কার কাছে যাবে ঠিক অনুমান করতে না পেরে ক্লার্কদের রুমে ঢুকে পড়ে।
ওকে ঢুকতে দেখেই একজন ভদ্রলোক বলে উঠলেন-মিস হিয়া কেমন আছেন?
হিয়া একটু অবাক হল। ভদ্রলোক তাহলে ওকে ঠিক চিনে রেখেছেন। এত লোকের মাঝে ওকে চিনে রাখলেন কী করে। হিয়া এগিয়ে গেল।
বলল-ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন তো?
টেবিলের সামনে দাঁড়াতে ভদ্রলোক বললেন – বসুন। ধন্যবাদ বলে চেয়ারে বসতে বসতে উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে থাকে।
আমি তো আপনাকে খুঁজছিলাম।
আমাকে খুঁজছিলেন?
হ্যাঁ, আপনি যখন এসে পড়েছেন, তখন বড় সাহেবের সঙ্গে একটু দেখা করে আসুন। স্যার উপরে বা দিকে বসেন।
উনি কি আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন?
না, ঠিক তা নয়। তবে উনি আপনাকে খুঁজছিলেন। আবার বলছেন আপনি খুঁজছিলেন। কিন্তু আমার ঠিকানা তো অ্যাপ্লিকেশনে  ছিল।
না, না এসব কথা তো ডাকযোগে হয় না ।
কী সব কথা?
আপনি কি স্যারের সাথে কথা বলতে চান? না আমার সঙ্গে?
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না । কার সঙ্গে কথা বলা দরকার?
সেটা আপনার ইচ্ছে। আমি বললে আপনি বিশ্বাস করতে পারেন কিনা, তাই স্যারের সঙ্গে কথা বলতে বলছিলাম।
ও আচ্ছা। আপনি যখন বিশ্বাসের কথা তুলছেন তখন বোধ হয় স্যারের সঙ্গে কথা বলাই ভালো।
সে আপনার ইচ্ছে। উনি কি উপরে আছেন?
হ্যাঁ আছেন। আপনি চলে যান উপরে। কোন অসুবিধা নেই।
হিয়া আর দেরি না করে বড় সাহেবের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। তারপর অফিস কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ায়। নেমপ্লেট টা পড়ে নেয়।
মে আই কাম ইন স্যার?
ইয়েস, কাম ইন।
স্যার আপনি আমার সন্ধান করছিলেন?
হ্যাঁ, বসুন  মিস হিয়া।
হিয়া সামনের চেয়ারে বসতেই মিঃ পালিত বললেন- আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। আমি সরাসরি কথা বলা পছন্দ করি।
বলুন স্যার।
আমরা আপনাকে আপয়েন্টমেন্ট দিতে চাই। ভালো ক্যাণ্ডিডেট পেয়েছিলাম। তারপরও কথাটা আপনাকে বলতে চাই আগে।
আগে বলতে চান?
অন্য ক্যাণ্ডিডেটদের এবিলিটি আছে বলে মনে হয় না। কিসের আবিলিটি স্যার?
আমরা অ্যাপোয়েন্টমেন্ট লেটার এর জন্য দুই লক্ষ টাকা ধার্য করেছি। এটা উপর মহলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ধরা হয়েছে।
হিয়া নিরুত্তর। এমন কথা শোনার জন্য তৈরি ছিল না। খানিকটা বাদে  বলল – স্যার আমাকে কি ধনী মনে হয়েছে?
না ধনীর কথা বলিনি। তবে সক্ষম মনে হয়েছে।আপনার চেহারায় তো দারিদ্রতার ছাপ নেই।
দারিদ্রতার ছাপ থাকে পোশাকে, চেহারায় নয়।
সক্ষম কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। আপনার চেহারার তো একটা আভিজাত্যের ছোঁয়া আছে  বলে মনে হয়।
স্যার চেহারার কথা বলছেন। আমায় দেখে তিন তিনজন পাত্র ফিরে গেছে। সেটা আমার কালো চেহারার কারণে।
আপনি কালো এটা ঠিক নয়। শ্যামলা মেয়েরা নিজেকে কালো বলে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ ঠিক তাই।
কেন বলে?
অন্যরা তাদেরকে ফর্সা বলুক, এজন্য।
ভারী অদ্ভুত কায়দা। কিন্তু একথা কি আপনার চিন্তা থেকে বলছেন?
দেখুন হিয়া, আমরা আলোচনা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। আমি এটা বলতে চাইনি। আর এ নিয়ে কোনো কথা বলা ঠিক নয়।
স্যার, এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। চাকরিটা লোভনীয় তা ঠিক। কিন্তু আমি একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। টিউশনি করি।
আমি আমাদের কথা বললাম। আপনি ভেবে দেখবেন। এখনি উত্তর না দিলেও হবে।
বড় সাহেব আর এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলেন না। তিনি বোধহয় প্রসঙ্গ টা সংক্ষিপ্ত করতে চান। তাই বললেন-ঠিক আছে। সপ্তাহ খানেক এর মধ্যে আপনার মতামত জানাবেন।
হিয়া বেশ খানিকটা সময় তবু বসে রইলো। তারপর বললো – ঠিক আছে। তাহলে উঠি স্যার।
আচ্ছা আসুন। তবে সময়টা মনে রাখবেন।
নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে এল হিয়া। এভাবে এত গুলি টাকা ঘুষ চাইবে ভাবতে পারিনি।  ভেবেছিল চাকরি টা ওর হয়ে যাবে। কিন্তু ঘুষের কথা বলবে কে জানত। নীরবে হাঁটতে থাকে হিয়া।
দিন দুই আর  দিবাকরের সঙ্গে দেখা হলো না। অনাবশ্যক মনে করে আর দিবাকরকে কিছু জানাবে না বলে ঠিক করলো।   রেলক্রসিং এ একটু অপেক্ষা করল।
না, এভাবে ও চাকরি নিতে পারে না। এটা নিজের আত্ম মর্যাদার অপমান।
টিউশনি যাওয়ার পথে দেখা হলো দিবাকরের সঙ্গে।
কী ব্যাপার? তোমার দেখা পাওয়া কঠিন বেশ উৎসাহ নিয়ে বলে দিবাকর।
তুমি খোঁজ করছিলে?
তাহলে কি তোমার চাকরিটা হয়ে গেছে?
না হয়নি।
হয়নি? কিন্তু কেন?
ওরা  দুই লক্ষ টাকা চায়।
তাই নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি ওটা পেয়ে যাচ্ছো।
মানুষ যা চায় তার কম পরিমাণই পায়। এটা তার একটা ঘটনা মাত্র।
ঠিকই বলেছ। এটা তো সব সময়ই হচ্ছে। আমরা ভাবি এক আর হয় অন্য রকম।
দুজনে হেঁটে চলে। একটা হতাশার হাওয়া খেলা করে দুজনার মাঝে। দিবাকার হঠাৎ করে বেশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বলে ওদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এই দুর্নীতির কথা ফাঁস করে দেয়া দরকার। জোচ্চোরের দল।
হিয়া বলে – সমাজটার অঙ্গে অঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত ক্ষত। অনিয়ম আর দুর্নীতিতে সব ভরে গেছে। এ অবস্থায় একটা পরিবর্তন হওয়া দরকার।
কে করবে এই পরিবর্তন?
আমরা সবাই মিলে করব। এজন্য জনসচেতনতা চাই। জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
সেটা তো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। কোনকিছু রাতারাতি হয় না।
দিবাকর আবার হিয়াকে সিনেমা দেখার প্রস্তাব দেয়।হিয়া  এড়িয়ে যায়।
এতে দিবাকর মনঃক্ষুন্ন হয়। হিয়া  সেটা বুঝতে পেরেও চুপ করে থাকে।

৬ষ্ঠ পর্ব। ।

হিয়ার মায়ের উৎকণ্ঠা বাড়ে।  বিশেষ করে তিন তিনটা পাত্র ফিরে যাওয়ার তিনি খানিকটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। সব মা বাবাই চান তার মেয়েকে সুপাত্রে দান করতে। সুপাত্র না পাওয়া গেলে অন্তত অবিবাহিত দেখতে চায় না কেউ। হিয়া বুঝে নিয়েছে, একটা শ্যামলা মেয়ে যতই সুন্দরী হোক তার বিয়েটা সহজে হবার নয়। তারপর যদি প্রচুর যৌতুক পাওয়া না যায় তাহলে কোন হৃদয়বান এগিয়ে আসে না।
দিবাকর ওর চাকরি নিয়ে চিন্তিত। তাহলে দিবাকর কী ওর চাকরিটা কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। হিয়া মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তৃতীয় বার পাত্রপক্ষের সামনে বসে ছিল। না, আর এভাবে পাত্রী নির্বাচনের পরীক্ষায় বসবে না। ওর চাকরি না হলে কি দিবাকর ওকে বিয়ে করতে রাজি হবে? অনুমান করা যাচ্ছে না। আর এইসব কারণে হিয়াকে একটা চাকরি জোগাড় করতেই হবে। এ জন্য কঠিন পড়াশোনা শুরু করে।
দিবাকরের ভাগ্য সুপ্রসন্ন। কিছুদিনের মধ্যেই ওর একটা চাকরি হয়ে যায়। কর্মে যোগদান করে। তারপর সপ্তাহ শেষে একদিন বাড়ি ফিরে আসে। দেখা হয়  হিয়ার সাথে। দিবাকর এখন আর বিয়ের প্রসঙ্গ তুলে না। কিন্তু ওতো চাইছিল দুজনার কারো একটা চাকরি হয়ে গেলে বিয়েটা সেরে ফেলবে। কিন্তু ওর নীরবতা দেখে হিয়ার মনে প্রশ্ন জাগে। তাহলে দিবাকর কি অন্য কিছু ভাবছে।
পরের সপ্তাহে আবার ওদের দেখা হয়। হিয়া দিবাকরের ব্যাপারটা বুঝে নিতে চায়। একটা পরিষ্কার ধারণা দরকার।
বলে- আমার চাকরি কবে হবে জানি না। তুমি ভাগ্যবান দিবাকর। মা এরই মাঝে আমার বিয়ের জন্য আবার তাড়া দিচ্ছেন।
আসলে মেয়েদের একটা বিয়ের বয়স থাকে। তাই মা-বাবার উৎকণ্ঠা তো থাকবে। এতে আর দোষ দেওয়ার কিছু নেই।
তা ঠিক বলেছ, আমি ছেলে হলে মা হয়ত এত চিন্তা করতেন না। জীবন কত জটিল এখন বুঝতে পারছি।
ঠিকই বলেছ, জীবন খুবই জটিল। প্রতি পদক্ষেপ এই জটিলতা। আসলে কি জানো হিয়া, যা দিনকাল পড়েছে তাতে আর একা সংসার চালানো কঠিন। তুমি সাহসী মেয়ে । অন্তত আমি তোমার এজন্য প্রশংসা করি। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আমি যখন চাকরি পেয়েছি তখন তুমি পাবে না তা কী হয়। চাকরি পাওয়ার আগে আর ভালো ছিলাম । এখন তো দায়িত্ব বেড়ে গেছে ।
তা ঠিক, তোমার দায়িত্ব বেড়েছে। আসলে জীবন হলো দায়িত্ব আর কর্তব্যে ভরা একটা সময় মাত্র।
বেশ সুন্দর করে বললে। আমি হয়তো এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারতাম না।
হিয়া ব্যাপারটা বুঝে ফেলে,  দিবাকর ওকে এড়িয়ে যাচ্ছে। ওর কাছে চাকরিটা একটা বড় ব্যাপার। ক্রমাগত শিথিল হতে থাকে ওদের বন্ধন। বাড়ি ফিরে হিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করাটা বেশি জরুরি কাজ মনে হয় না। দিবাকরের অভিভাবকেরা সুন্দরী পাত্রী সন্ধান করছে। হিয়ার মতো শ্যামলা পাত্রী ওদের চোখে পড়বে না এটা নিশ্চিত।
দিবাকরের সঙ্গে সপ্তাহের ছুটির দিনে দেখা হয়। খানিকটা সময় কাটে। হিয়া মজা করে বলে – দিবাকর বেশ কিছুদিন চাকরি করছ। বেতন পত্র মন্দ না। কিছু খাওয়াবে না?
নিশ্চয়ই খাওয়াবে। কি খাবে বলো?
ধাৎ বোকার মত বলছ। এ আমি একটু মজা করলাম। বরং চলো একটা সিনেমা দেখে আসি।
একদিন যেতে চাওনি।
যায়নি?
গিয়েছিলে, আবার যাওনি- দুটোই ঠিক। তুমি খুব ভালো প্রস্তাব দিয়েছো। আমার নিজেরই বলা উচিত ছিল। কিন্তু সংকোচে আর বলিনি। আজ নিজে যখন বলছ আমার যাওয়া উচিত। কিন্তু তুমি কথাটা এমন সময় বললে।
কেমন সময়, হিয়া জানতে চায়।
একবার দিদি বাড়িতে যেতে হবে। আমার ইচ্ছে ছিল না। মা বলল ভাগ্নের অন্নপ্রাশন। এ সময় মামাকে থাকতে হয়। বলো আমার কি এখন সময় আছে?
তা ঠিক। মাত্র একদিনের জন্য বাড়িতে আসো। এ সময় কি আর বেড়ানোর মতন সময় হয়।
কে বোঝে কার কথা।
সুতরাং আজ থাক।
সেই ভালো।
আমি জানলে বলতাম না।
অন্য একদিন যাব নিশ্চয়ই । তোমাকে কষ্ট দিলাম।
এতে কষ্টের কী আছে। এ কষ্ট তো আমি আগেই তোমাকে দিয়েছি।
সত্যি খুব খারাপ লাগছে।
তুমি একদম ভাববে না। তুমি তো জানো, আমি  এটা খুব একটা পছন্দ করি না। এমনি  বলে ফেলেছি।
হিয়ার কাছে ব্যাপারটা রহস্যময় মনে হলো। দিবাকর প্রস্তাব গ্রহণ না করার লোক নয়। তাহলে এর মধ্যে কী কোন রহস্য আছে! সন্দেহ দানা বাঁধে ওর মনে। দিবাকর কি কোন মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে? নিশ্চিত হওয়া দরকার।
ওর বাড়িতে গিয়ে ভাগ্নের অন্নপ্রাশন এর খবর নেওয়া সম্ভব নয়। কী করে সম্ভব এই সত্য যাচাই। তিনটার দিকে ওর গতিবিধি লক্ষ্য করলে বোঝা যেতে পারে। ওর আড্ডাস্থল রেল ক্রসিং অথবা সিনেমা হল। একবার চেষ্টা করে দেখা যাক না। প্রথমে রেলক্রসিংয়ে পৌঁছে ওকে দেখা গেল না। না দেখার কথা। এসময় ওর এখানে থাকার কথা নয়! তাহলে সিনেমা হল টা একটু দেখা যেতে পারে। নিজেকে আড়াল করে একা অপেক্ষা করা দরকার। মিনিট পনেরো অপেক্ষা করতেই হবে।
সত্য জানার জন্য বেশি দেরি করতে হলো না। একটা অচেনা মেয়েকে নিয়ে আসছে দিবাকর। মেয়েটিকে এর আগে কখনো দেখেছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে বেশ সুন্দরী। তাহলে কি দিবাকর ওকে বিয়ে করতে যাচ্ছে? নাকি কোন মেয়ের সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলা। যেমন খেলেছে হিয়ার সঙ্গে। হিয়া ওকে লজ্জা দেবে না। ওর উদ্দেশ্য ছিল শুধু সত্যকে জানা, ওকে ছোট করা নয়। অনেক সুযোগ  পাওয়া যাবে দিবাকর, তুমি অনেক ভালো অভিনয় জানো। মনে মনে বলে হিয়া। ওরা হলে ঢুকে পড়তেই হিয়া দ্রুত পায়ে চলে আসে।

৭ম পর্ব।।

হিয়া মাধ্যমিক স্কুলের চাকরির জন্য আবেদন করেছিল। এজন্য বেশ পরিশ্রম করে নিজেকে তৈরি করতে হয়েছে। হিয়া এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেল। তারপর চাকরিতে যোগদান করলো। আর সেই সঙ্গেই যেন দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকলো।
অনেকেই এখন ওর সঙ্গে হেসে কথা বলে। পাত্রপক্ষের যে সব কর্তা ব্যক্তি পরে সংবাদ পাঠাবে বলে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল, তাদের সন্ধান মিলতে লাগলো। অবিবাহিত সহকর্মীরা একটু আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করল। এসব বেশ উপভোগ করছে হিয়া। এদের চোখে বোধ হয় এখন আর ওর শ্যামলা রঙটা ধরা পড়ে না।
কিছুদিন আর সাইকেলে চড়া হয় না হিয়ার। ভালো লাগে না। তাই ছুটির দিনে একটা রিকশা নিয়ে বের হয়েছে কিছু কেনা কাটার জন্য। পথেই দিবাকরের সঙ্গে দেখা। রিক্সা থেকে নেমে পড়ে হিয়া।
দিবাকর বলে- তোমার সাইকেলটা কোথায় হিয়া? হিয়া হাসতে হাসতে বলে- ওকে ডিভোর্স দিয়েছি?
বেশ বলেছ। এখন তুমি ম্যাডাম । তোমার আর সাইকেল চড়া সাজে না।
হ্যাঁ। তাই তো।
দুজনই হাঁটতে হাঁটতে মার্কেটের দিকে চলে। হিয়ার বেশ কিছু জিনিসপত্র দিবাকর পছন্দ করে দেয়। কেনাকাটা শেষ করে দুজনে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকে। হিয়া বলে কী খাবে বলো। কেন এটা কি তোমার চাকরি পাওয়ার খাওয়া নাকি?
তা বলতে পারো।
শুধু এই রেস্টুরেন্ট এ খাওয়ালেই চলবে না।
তাহলে তুমি বলো কোথায় খাবে? কোথায় যাবে?
হিয়া একটু চিন্তা করে বলে- মনে পড়েছে তোমার ভাগ্নের অন্নপ্রাশনের জন্য যেতে পারনি।
ও সে কথা বলছ?
ঠিক ধরেছ ।
আগামী দিন আমি আছি। তুমি যদি সময় দিতে পারো আমি আপত্তি করব না।
খানিকটা দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় হিয়া। কী বলবে ভেবে পায় না। দিবাকরের সঙ্গে সিনেমায় যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ব্যাপারটা সহজে মেনে নেওয়া চলে না। কী করা যায় ভাবতে থাকে ।
দিবাকর বলে – আমি তিন দিনের ছুটি নিয়েছি সুতরাং সময় আছে। কাল দেখা হচ্ছে তো। তাছাড়া তোমার সঙ্গে কিছু জরুরী কথা আছে। তোমার চাকরি কেমন লাগছে?
আমি তো শিক্ষকতাই পছন্দ করি। তাই ভালোই লাগছে। তোমার খবর কী?
কোন খবরের কথা বলছো? চাকরি ভালই চলছে। দিবাকর আর চাকরির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে চাইলো না।
তারপর এক সময় ওরা  রেষ্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যে যার  চলে গেল।
অফিসের আর্থিক দিক টা দেখার দায়িত্ব ছিল দিবাকরের উপর। এটা একটি অর্থ লগ্নিকারী সংস্থা। অফিসে লাখ লাখ টাকা লেনদেন হয়। অল্প দিনেই দিবাকর অবৈধ অর্থ উপার্জনের ছিদ্র খুঁজে পেয়ে যায়।
মিথ্যা টিএ বিল দেখিয়ে হাতে খড়ি হয়। অফিসের নাম করে বাইরে ঘুরে এসে ভাউচার দেয়। অর্থের বিনিময়ে ঋণ সুবিধা করে  দেয়। একজন সহকর্মী স্বাক্ষর নকল করে টাকা গ্রহণ করে তা আর জমা দেয় না।  নিজের বাড়ি নির্মাণের কাজে হাত দিতেই এসব কাজ শুরু করে। অল্প দিনেই নিজের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চায়। ঋণ সুবিধা নিয়ে মোটরসাইকেল কিনে তারপর সেটা একসিডেন্ট করেছে দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ তুলে নেয়।  এভাবেই একটু একটু করে দুর্নীতির মাঝে ঢুকতে থাকে দিবাকর।
সত্য চিরকালই প্রকাশিত হয়। কখনো দ্রুত আর কখনো ধীরে। দিবাকর অবশ্য ভেবেছিল এইসব দুর্নীতি হয়তো ধরা পড়বে না। কিন্তু অডিড ডিপার্টমেন্টে এই সব অনিয়ম ধরা পড়ে যায়। দিবাকরকে এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করা হয় না। বিষয়টি পরিচালকের দৃষ্টি গোচর হয়। দিবাকর তিন দিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছে। এরই মাঝে ওর বিরুদ্ধে গোপন তদন্ত শুরু হয়ে যায়। ও এইসব বিষয়ে কিছুই জানে না।
পরদিন হিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যায়। হইয়া তখন কিছু ছাত্র ছাত্রীকে পড়াচ্ছেন। হিয়া ওদের ছুটি  দিয়ে দেয়।
ওরা চলে যেতেই দিবাকর বললো- এখনো টিউশনি করো? ভালো, বুঝতেই পারছি ২০ হাজার টাকা বেতনে তো আর চলে না।
দিবাকর, আমি কিন্তু অর্থের জন্য এদের পড়াচ্ছি না। আগে তাদের পড়াতাম। এখন হঠাৎ করে ছেড়ে দিলে ওরা কোথায় যাবে। এখানে টাকা বড় কথা নয়। আর আমার বেতনের কথা বলছ। ওটা কিন্তু ২০ হাজার টাকা নয়, ওর দেড় গুণ মানে ত্রিশ হাজার টাকা।
তাই নাকি? দিবাকর যেন অবাক হয়।
তোমার জন্য চা তৈরি করে নিয়ে আসি। মায়ের শরীরটা ভাল নেই।
কেন তোমার কাজের লোক নেই? দেখ  হিয়া, এটা ঠিক না।
আমি তোমাকে কষ্ট করতে দেবো না।
কি করবে?
বিয়ের পর তুমি কোন কাজ করতে পারবে না।
শুধু চাকরি? সেটা হয় নাকি। আচ্ছা যদি সেটা না করি। তার মানে ধরো চাকরিটা যদি ছেড়ে দেই।
কি বলছো তুমি। তাই কেউ করে নাকি?
না এমনি বললাম। তুমি তো ভালোই আয় করছো। জীবনের জন্য আর  কত টাকা প্রয়োজন?
বাড়ির কাজে হাত দিয়ে বুঝেছি কত টাকার প্রয়োজন।
তোমার টাকার খুব প্রয়োজন? আমার কেন, সবারই প্রয়োজন।
ঠিক বলেছ।
আমি তোমার সঙ্গে সে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে এসেছিলাম।
বল, কোন কথা?
আমি আর দেরি করতে চাইনা। বিয়েটা করে ফেলতে চাই।
অবাক হয় হিয়া। দিবাকর সুন্দরী পাত্রীর খোঁজ খবর নিয়েছে অনেক। এ কথা হিয়া জানে। আজ ও কেন এত ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ওকে নিয়ে একটু খেলা করা দরকার। বলল – তুমি বড় অস্থির। এটাই তোমার সমস্যা।
ঠিক বলেছ হিয়া। আমি সব কিছু দ্রুত চাই। ধৈর্য আমার নাই। এটাই আমার সমস্যা। তুমি সিনেমার কথা বলছিলে যাবে নাকি?
কিন্তু আমি তো একটা সমস্যায় পড়ে গেছি।
কী সমস্যা হিয়া। আজ বিকেলে তো আমার কলিগের বাড়িতে যাওয়ার কথা আছে। কখন যাবে?
তিনটার দিকে।
তোমার সহকর্মীর বাড়ি কি বেশী দূরে?
রেলক্রসিংয়ের সামনে। সিনেমায় হলের দিকটায়।
কত সময় থাকবে ওখানে?
তা ঠিক বলতে পারছি না।
ঠিক আছে। তাহলে আর কী করা যাবে ?  পরে যাব।

শেষ পর্ব।

দিবাকর চলে যেতেই হিয়া অস্থির হয়ে ওঠে । ওকে এখন পর্যন্ত বুঝতে দেয়নি যে, হিয়া দিবাকরের সব কিছুই বুঝতে পেরেছে। সরাসরি সে কথা বলা যেত কিন্তু তাতে খেলাটা জমত না। এতে ওর শিক্ষাটা হতো না। হিয়ার চাকরিটায় ওর লোভ। আর ভালোবাসা? তা যদি থাকতো তাহলে অনেক আগেই ওদের বিয়ে হতে পারতো। ওর শ্যামলা বর্ণটাকে কাজে লাগিয়ে নিতে চেয়েছিল দিবাকর। না, তার হয় না।
হিয়া সহকর্মী অঞ্জনাদিকে সব কথা খুলে বলে। হিয়ার ব্যাপারে তিনি খোঁজ খবর নিতেন। সব কথা জানলেও হিয়ার অপমানের কথাটা তার বেশ খারাপ লাগলো।
হিয়া, দিবাকর তোমাকে যথেষ্ট অমর্যাদা করেছে। এরপরও তুমি কী করে এর সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছ?
সম্পর্ক রাখিনি অঞ্জনাদি। ওকে নিয়ে একটু খেলা করতে চাই। কিন্তু কীভাবে করব বুঝতে পারছি না।
সে ব্যাপারে তোমাকে সাহায্য করতে পারব বোধ হয়।
আচ্ছা, তুমি বিকেলে সহকর্মীর বাড়িতে যাবে বলেছ। নাম বলেছো কি?
আরে ধ্যাৎ মিছে ঘটনার মধ্যে নাম ঢুকাতে যাবো কেনো?
গুড , ভেরি গুড। মানে পুরুষ মহিলা যখন কিছু বলোনি তখন আর সমস্যা নেই। রেল ক্রসিং দিয়ে যাবে তাও বলেছ। সুতরাং ওখানে তোমার সঙ্গে একবার দেখা হয়ে যেতে পারে। ঠিক তাই আবার সিনেমা হলের সামনেও হতে পারে। আকাশ থাকলে সমস্যা হতো না।
আকাশ?
আরে আমার হাসব্যান্ড। ও বাড়িতে নেই। থাকলে ওকে দিয়েই কাজ চালিয়ে নেওয়া যেত।
তুমি কী বলছ অঞ্জনাদি? আমার মাথায় ঢুকছে না।
কোন বিবাহিত কে নিয়ে কাজটা করানো যাবে না। স্ত্রীর ধমক খেতে হতে পারে।  সবাই বউকে ভয় পায়।
তার মানে তুমি আমার সঙ্গে কাউকে প্রক্সি দিতে পাঠাবে?
ঠিক তাই। তোমাকে রিকশায় যেতে হবে আদিত্য কে নিয়ে।
তুমি যে কী বল না। এই সব হয় নাকি?
হয় না । কিন্তু এটা একটা খেলা। আদিত্য তোমার ব্যাপারে খুব উৎসাহী। এটা আমি লক্ষ্য করেছি।
তোমার যা কথা ।
দেখো হিয়া, আমি তোমার দিদি। আমি যা বলি করে যাও।
ঠিক আছে দিদি । তুমি যা বল। আদিত্য বাবু রাজি হবে বলে মনে হয় না। আমি রাজি।
আদিত্য ছেলেটা ভালো। আমায় ভক্তি করে। আমি বললে আপত্তি করবে না। ওতো ক্লাসে গেছে। ওর সঙ্গে কথা বলবো। তুমি কোন চিন্তা করো না, হিয়া।
আদিত্যর সঙ্গে রিক্সায় উঠতে সংকোচ বোধ করছিল হিয়া। কিন্তু পরিস্থিতিতে এমন একটা অবস্থায় চলে গেছে, এখন আর ফেরার উপায় নেই।
দিবাকর ছুটির দিনে রেলক্রসিংয়ে সময় কাটায় বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে। দূর থেকে হিয়াকে আসতে দেখল সে। কিন্তু সঙ্গে ওটা কে। তাহলে এই কি ওর সহকর্মী? লুকিয়ে পড়ল যাতে ওদের চোখে না পড়ে। ক্রসিং অতিক্রম করতেই দিবাকর পিছু নিল ওদের। হিয়া অবশ্য দিবাকরকে দেখে ফেলেছিল। সিনেমা হলের সামনে এসে রিক্সাটা থামতেই নেমে আদিত্য টিকিট নিয়ে এলো।
উত্তেজনা বাড়ে দিবাকরের। দূরে দাঁড়িয়ে সব লক্ষ্য করে। ওরা সিনেমা হলের ভিতরে ঢুকে পড়তেই দিবাকর ফিরে গেল।
ছবি শুরু হলো। সামাজিক ছবি। বেশ পরিচ্ছন্ন শিল্পসমৃদ্ধ ছবি। ভালোই লাগে হিয়ার। আদিত্য বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছে। হিয়ার শুধু একটা ভাবনা হচ্ছে, এ নিয়ে যদি স্কুলে কথা উঠে। অবশ্য অঞ্জনাদির যখন জানে তখন আর সমস্যা কী। তাছাড়া আদিত্যর তো এ নিয়ে কিছু ভাববার নেই।
আদিত্যকে শুধু  দু’একবার চোখ মুছতে দেখল হিয়া। সেদিকে লক্ষ্য না করাই ভালো। আদিত্য লজ্জা পেতে পারে। ওর  হয়তো খেয়াল নেই পাশে একজন তরুণী বসে আছে। অথবা অবাধ্য হয়ে উঠেছে নয়ন যুগল। অশ্রুপাত ও সংবরণ কোনটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মত ছবি। হিয়া উপভোগ করলো। বেশ ভাল লাগল। শেষ হলো ছবি। বের হয়ে মনে পড়ল অন্য দিনের কথা।
এই সিনেমা হলে একদিন দিবাকরকে নিয়ে এসেছিল। দুজনার মধ্যে কত ব্যবধান। অথচ দুজনেই লেখাপড়া জানা মানুষ। লেখাপড়া শিখলে শিক্ষিত হওয়া যায় না। বেশ একটা পরিতৃপ্ত মন নিয়ে ওরা দুজনে বেরিয়ে এল।
আদিত্য বলল-আপনার যন্ত্রণা কি কিছুটা অপনোদন হয়েছে?
হ্যাঁ, যাকে যা দেখানোর দরকার ছিল সে দেখেছে। আমি তৃপ্ত। আপনাকে ধন্যবাদ, আদিত্য বাবু।
বাইরে কিছু লোক জটলা করছে। আদিত্য বলল- আপনি দাঁড়ান, আমি একটু দেখে আসি ব্যাপারটা কী।
খানিকটা বাদে আদিত্য ফিরে এসে বলল- না, তেমন কোন ব্যাপার নয়। পুলিশ দিবাকর নামের একজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে।
দিবাকর!
কেন চেনেন নাকি ওকে?
হিয়া আর সে প্রশ্নের উত্তর দিল না। বলল – কেন ধরেছে তা কিছু জানেন নাকি?
অত কথা শোনার সময় পায়নি। তবে অফিসের কোনো গণ্ডগোল  এর কারণে বোধ হয়।
চলুন, আর কতক্ষণ দেরি করা যায়। হিয়া তাগিদ দেয়। একটা রিক্সা নিন।
কিন্তু পথ তো আলাদা আদিত্য বলে।
হিয়া বলে – ও তাই তো।
কেন আপনি কি ভুলে গিয়েছেন?
হিয়া এই কথার জবাব দিতে গিয়ে থেমে যায়।
কী ব্যাপার, চুপ হয়ে গেলেন যে। আদিত্য জানতে চায়।
না, এমনি।
কিন্তু আমার মনে হয় আপনি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
না আদিত্য বাবু, আমার কিছু বলার ছিল না। আপনি তো ঠিকই বলেছেন।
কোন কথা বলেছেন?
ওই যে বললেন পথ তো আলাদা। হিয়ার এই কথায় আদিত্য চুপ করে থাকে। তারপর হিয়ার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলে – খেলতে খেলতে কত কথা হয়ে গেল। হিয়া, আমি যদি তোমার সঙ্গে পথ চলতে চাই?
আদিত্যের আকস্মিক এ কথাই হিয়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। উত্তর দিতে পারে না।
আদিত্য বলে- আমি কি এখনই জবাব চেয়েছি?
এমন একটা অবস্থার জন্য হিয়া প্রস্তুত ছিল না। দিবাকরের সঙ্গে খেলতে গিয়ে আদিত্য যে এমন করে কাছে এসে দাঁড়াবে তা ভাবতে পারেনি। একসঙ্গে অনেক গুলি সত্য সামনে এসে দাঁড়াতে নিজেকে বড় বিব্রত মনে হলো।
বিদায়ী সূর্যের শেষ আলো টুকু যেন এসে পড়েছে হিয়ার অপ্রশস্ত আঙ্গিনায়। দিবাকর অস্তমিত প্রায়। আদিত্যের এ প্রশ্নের উত্তর কী এতো সহজে দেয়া যায়। কালো মেয়ের সংশয় বড় বেশি। হিয়া কী করে এই সব সংশয় কাটিয়ে উঠবে মুহূর্তের মধ্যে। আদিত্য অবশ্য সময় দিয়েছে।
এই সন্ধ্যায় একা একজন মেয়ে পথ চলতে পারে না। সমাজ সেটুকু জঞ্জাল সরাতে পারেনি। তাই অন্তত খানিকটা পথ ওকে এগিয়ে দিতে হবে। হিয়া আর সে কথার  গেল না। শুধু লজ্জা জড়িত কন্ঠে কোন ক্রমে বলল- একটা রিক্সা ডাকো।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ অক্টোবর ৩১, ২০২০

লেখকের আরো লেখা পড়তেঃ  ক্লিক করুন

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com