কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা নিয়ে ধুম্রজাল

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০১৫

কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা নিয়ে ধুম্রজাল

 

ঢাকাঃ মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দন্ড প্রাপ্ত জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় গতকালও কার্যকর হয়নি। প্রেসিডেন্টের কাছে তিনি প্রাণ ভিক্ষা চাইবেন কিনা সে বিষয়টি গতকালও চূড়ান্ত হয়নি। গতকাল (বৃহস্পতিবার) সকালে কামারুজ্জামান তার আইনজীবীদের জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষার বিষয়ে সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্বান্ত নিবেন তিনি। অপরদিকে কামারুজ্জামান প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না সে সিদ্ধান্ত আজই (বৃহস্পতিবার) জানাতে হবে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। সর্বশেষ তার প্রাণভিক্ষার আবেদন করা হবে কিনা এ নিয়ে বিষয়টি ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত গড়িয়েছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট আসামি কামারুজ্জামানকে জিজ্ঞাসা করে নিশ্চিত হবেন যে তিনি প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কি না। গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এ ব্যাপারে একজন ম্যাজিস্ট্রেটও যাননি।


গতকাল বেলা ১০টা ৫৫ মিনিটে অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের আইনজীবী টিম মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছান। প্রতিনিধি দলের অপর আইনজীবীরা হলেন- শিশির মো. মনির, এহসান আবদুল্লা সিদ্দিক, মুজিবুর রহমান ও মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন। প্রায় আধাঘণ্টা কামারুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলেন আইনজীবীরা। এ সময় মামলার বিধি-বিধান নিয়ে কামারুজ্জামানের সঙ্গে তাদের কথা হয় বলে জানান শিশির মনির। তিনি জানান, কামারুজ্জামান শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। তিনি বিচলিত নন। মানসিকভাবে দৃঢ় আছেন। তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। কামারুজ্জামান প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না সে সিদ্ধান্ত আজই (বৃহস্পতিবার) জানাতে হবে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী কামাল জানান, ‘আদালতের রায়ের নির্দেশনা ও কারাবিধি’ অনুযায়ীই তারা সব পদক্ষেপ নেবেন। আমাদের কাছে যে নির্দেশ এসেছে আদালত থেকে সে অনুযায়ী আইজি প্রিজন্স কাজ করছেন। কিছু সময়ের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করবেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষার জন্য আবেদন করলে তা প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হবে। অন্যথায় রায় দ্রুত কার্যকর করবে সরকার।

এদিকে কারাগার থেকে সাক্ষাৎ শেষে কামারুজ্জামানের আইনজীবী শিশির মনির বলেন,  প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষার ব্যাপারে সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্তের কথা জেল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন কামারুজ্জামান। এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কামারুজ্জামান আইনজীবিদের কাছে শুধু আইনের বিধি-বিধান সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমরা তাকে সে বিষয়ে অবগতি করেছি। সিদ্ধান্ত না জানানো পর্যন্ত রায় কার্যকর করা যাবে না বলে উল্লেখ করে শিশির মনির আরো বলেন, ভাবনা-চিন্তার জন্য একদিন, দুদিন, তিন দিনও সময় নিতে পারবেন তিনি। যতক্ষণ পর্যন্ত না কামারুজ্জামান তার সিদ্ধান্ত জানাবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এ রায় কার্যকর করা অনুচিত। আইনগতভাবেও এ রায় কার্যকর করা ঠিক হবে না। ভেবে দেখতে কতদিন সময় চেয়েছেন কামারুজ্জামান-সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, জেল কোড অনুযায়ী রায় যেদিন হয়, এর পর থেকে আসামির ৭ দিন পর্যন্ত সময় পাওয়ার কথা। কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রে কারাবিধি প্রযোজ্য হবে এমন দাবি করেন এই আইনজীবী।

সেল থেকে ১৫ গজ দূরে ফাঁসির মঞ্চমানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে রাখা হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ৬ নম্বর কনডেম সেলে। সেখান থেকে ফাঁসির মঞ্চের অবস্থান মাত্র ১৫ গজ দূরত্বে। ৬ নম্বর কনডেম সেলের ঠিক উত্তর পাশে আনুমানিক ১৫ গজ দূরে রয়েছে দুটি ফাঁসির মঞ্চ। এর মধ্যে পুরাতন মঞ্চটিতেই কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হবে। তিনজন কারারক্ষী পালা করে এই ফাঁসির মঞ্চটি পাহারা দিচ্ছেন। এদেরই একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ফাঁসির মঞ্চটি পুরোপুরি প্রস্তুত। এই ফাঁসিমঞ্চেই জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

কামারুজ্জামানের সেলের আশপাশে আরও সাতটি সেল রয়েছে। সেলের ভেতরে তিনি তৃতীয় শ্রেণির কারাবন্দীর সুবিধা পেয়ে থাকেন। সাধারণ বন্দীরা যে ধরনের খাবার পান, তিনিও সেই খাবার পাচ্ছেন। এর আগে তিনি বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত বন্দী ছিলেন। কিন্তু আদালতের আদেশে তা বাতিল হয়ে যায়। সেলের ভেতরে কামারুজ্জামান দিনরাত তসবিহ জপেন বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারা সূত্র জানায়, ফাঁসির রায় বহাল রেখে দেয়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের খবরটি তিনি প্রথম পরিবারের লোকদের মুখ থেকে জানতে পারেন। এর আগ পর্যন্ত তিনি এ খবর জানতেন না। খবর শোনার পর তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। এরপর সবাইকে দোয়া করতে বলেন।

যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি স্থগিতের আহ্বান জাতিসংঘেরকাদের মোল্লার পর এবার যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তর।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের মুখপাত্র রাভিনা শ্যামদাসানি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদ- দিয়েছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু ওই বিচারে নানা অনিয়ম এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় না রাখার অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা ও নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালে জামায়তের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদ- দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আপিল আদালতও সেই রায় বহাল রাখে। সর্বোচ্চ আদালতের সেই রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনও গত সোমবার খারিজ হয়ে গেলে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের আলোচনা শুরু হয়।

শ্যামদাসানি বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তর দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাইব্যুনালের বিচারের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলে আসছে, মৃত্যুদ- কার্যকর করা বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে না। কামারুজ্জামানের রিভিউ খারিজ প্রসঙ্গে শ্যামদাসানি দাবি করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মেরিটের ভিত্তিতে তা না শুনে আবেদনটি খারিজ করে দেয়। জাতিসংঘ সনদে বাংলাদেশের সই করার কথা মনে করিয়ে দেয় মুখপাত্র বলেন, ওই সনদ অনুযায়ী মৃত্যুদ-ের মতো সাজার ক্ষেত্রে অবশ্যই সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে; অন্যথায় তা হবে অধিকারের লঙ্ঘন। জাতিসংঘ কোনো বিচারের ক্ষেত্রেই সাজা হিসাবে মৃত্যুদ-ের পক্ষে নয় জানিয়ে এই সাজার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির আহ্বান জানান রাভিনা শ্যামদাসানি। এর আগে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকরের আগেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি পাঠিয়ে ফাঁসি স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার নাভি পিলাই।

মৃত্যুদ- কখনোই অপরাধ দমন করতে পারে না দাবি ইইউ’র মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- বহাল থাকায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ঢাকায় অবস্থিত সংস্থাটির কার্যালয় থেকে বৃহস্পতিবার দুপুরে গণমাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে ওই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।বিবৃতিতে বলা হয়, সাজা হিসেবে মৃত্যুদ- কখনোই অপরাধ দমন করতে পারে না। বরং এতে বিচারের উদ্দেশ্য সফল হয় না। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যে কোনো ধরনের মৃত্যুদ-ের বিপক্ষে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানায়, এ ধরনের সাজা বৈশ্বিকভাবে বিলুপ্তির জন্য ইইউ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইইউ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছে, মৃত্যুদন্ডের  মতো সাজা স্থগিত করা হোক।

 

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ১০ এপ্রিল ২০১৫

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৩০ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com