কাজী নজরুল ইসলাম এর ব্যক্তিগত জীবন

শনিবার, ২৭ আগস্ট ২০১৬

কাজী নজরুল ইসলাম এর ব্যক্তিগত জীবন

কাজী নজরুল ইসলাম এর ব্যক্তিগত জীবন
মনিরুল হক ফিরোজ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের ২৪ মে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তার বাবা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন মসজিদের ইমাম।
কাজী ফকির আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান কাজী নজরুল ইসলাম। শৈশবে তার ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। নজরুলের বয়স যখন মাত্র নয় বছর তখন তার পিতা মারা গেলে, পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তার শিক্ষাজীবন বাঁধাগ্রস্থ হয়। মাত্র দশ বছর বয়সে তাকে নেমে যেতে হয় জীবিকার সন্ধানে।


ব্যক্তিগত জীবনে কাজী নজরুল ইসলাম দুইবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।

প্রথম স্ত্রী: নার্গিস আসার খানম
নজরুলের প্রথম স্ত্রীর নাম নার্গিস আসার খানম (সৈয়দা খাতুন)। নার্গিসের মামা আলী আকবর খান নজরুলের সঙ্গে কলকাতায় পাশাপাশি থাকতেন। তিনি নজরুলকে তার বাড়ি কুমিল্লায় নিয়ে যান ১৯২১ সালে, উদ্দেশ্য ছিল তার পরিবারের কোনো মেয়ের সঙ্গেই নজরুলের বিয়ের ব্যবস্থা করা।

১২৯১ সালে কুমিল্লা যাবার পথে নজরুল ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ কবিতাটি লেখেন। ট্রেনে কুমিল্লা পৌঁছে নজরুলকে নিয়ে আলী আকবর খান তার স্কুলের বন্ধু বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায় উঠেন। বীরেন্দ্রকুমারের মা ছিলেন বিরজা সুন্দরী দেবী। চারপাঁচ দিন সেখানে কাটিয়ে কবি রওয়ানা দেন আলী আকবর খানদের বাসস্থান দৌলতপুরের খাঁ বাড়ির উদ্দেশ্যে। তবে সেই চারপাঁচ দিনেই সেনবাড়ির সবাই বিশেষ করে বিরজাদেবীর সঙ্গে নজরুলের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। নজরুল তাকে ‘মা’ সম্বোধন করতেন।

দৌলতপুরে নজরুলের জন্য আলী আকবর খানের নির্দেশে উষ্ণ অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করা হয়। নির্মাণ করা হয় তোরণ। বাড়ির জ্যেষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে নজরুল খুব দ্রুতই ঘনিষ্ট হয়ে উঠেন। তাদের কবিতা শুনিয়ে, অজস্র গান গেয়ে মুগ্ধ করে ফেলেন। দূরদুরান্ত থেকেও লোকেরা আসত কবিকে দেখতে, তার গান শুনতে।

নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের আলোচনার সূত্রপাত বাঁশি বাজানো নিয়ে। এক রাতে নজরুল খাঁ বাড়ির দীঘির ঘাটে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন, সেই বাঁশির সুরে মুগ্ধ হোন নার্গিস। একদিন নজরুলকে এসে শুধান, ‘গত রাত্রে আপনি কী বাঁশি বাজিয়েছিলেন? আমি শুনেছি’। এই পরিচয়ের পরই নজরুল নার্গিসের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন। তার আচার আচরণে নার্গিসের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ পেতে থাকে।

আলী আকবর খানও ব্যাপারটা খেয়াল করেন। মূলত নজরুলকে কুমিল্লা আনবার তার উদ্দেশ্য এই ছিল, নিজ পরিবারের কারো সঙ্গে নজরুলের বিয়ে দেওয়া। তার পরামর্শে নার্গিসের খাঁ বাড়িতে আসা যাওয়া বাড়তে থাকে।
তবে খাঁ বাড়ির মুরব্বীরা নজরুলকে নার্গিসের বর হিসেবে তেমন পছন্দ করতেন না । বাঁধন হারা নজরুলকে তারা ছিন্নমূল বাউন্ডুলে হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু গ্রাজুয়েট আলী আকবর খানের চাপে তারা প্রতিবাদ করতেন না। এক পর্যায়ে আলী আকবর খানের কাছে খোদ নজরুল বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যার জন্য তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ আষাঢ় বিয়ের দিন ধার্য করা হয়।

এরপর শুরু হয় স্বপ্ন ভঙ্গের খেলা। আলী আকবর খান তার গ্রাম্য ভগিনীকে বিখ্যাত কবি নজরুলের জন্য গড়তে নেমে পড়লেন। অশিক্ষিত নার্গিসকে খুব কম সময়ে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব ছিল না কিন্তু তিনি শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য সাহিত্যিকের উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো থেকে নার্গিসকে জ্ঞান দিতে থাকলেন। নজরুলের এইসব ভনিতা একেবারেই পছন্দ ছিল না, তিনি আলী আকবর খানকে তা জানালেও তিনি নজরুলকে পাত্তা দেন না। সেই সঙ্গে খুব দ্রুত বিয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকেন, নিমন্ত্রন পত্রও অতিথিদের মাঝে বিলিয়ে ফেলেন। এসব ব্যাপার নজরুলকে পীড়া দেয়, আস্তে আস্তে তার মোহ ভাঙতে থাকে।

এর ফাঁকে আলী আকবর খান আরো একটি কাজ করে যাচ্ছিলেন যা সবারই অগোচরে ছিল। তিনি নজরুলের জন্য কলকাতা থেকে আসা বন্ধুদের সব চিঠিই সরিয়ে ফেলতেন, সেই সঙ্গে নজরুলের বন্ধুদের উদ্দেশ্যে পাঠানো চিঠিও পোস্ট না করে নিজের কাছে রেখে দিতেন। কেননা তিনি জানতেন, নজরুলের বন্ধুরা কেউই আলী আকবর খানকে পছন্দ করেননা। সেই সঙ্গে সন্দেহের চোখে দেখেন।

নজরুল বিয়েতে তার পক্ষের অতিথি হিসেবে বিরাজা সুন্দরী দেবী ও তার পরিবারকে মনোনীত করেন। বিয়ের আগের দিন সবাই দৌলতপুরে এসে উপস্থিত হোন। কলকাতায় নজরুলের বন্ধুদের এমন সময় দাওয়াত দেওয়া হয় যেন কেউ আসতে না পারে। কবির অন্যতম ঘনিষ্ট বন্ধু কমরেড মোজাফফর আহমেদ নিমন্ত্রণ পত্র পান বিয়ের পরে।

এরপর আসে সেই বহু প্রতিক্ষিত ৩ আষাঢ়। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় এবং আকদও সম্পন্ন হয়। কিন্তু কাবিনের শর্ত উল্লেখ করবার সময়ই ঝামেলা বাঁধে। আলী আকবর খান শর্ত জুড়ে দিতে চান, নজরুলকে ঘর জামাই থাকতে হবে। নজরুল এই শর্ত প্রত্যাখান করেন। আকদ হয়ে যাবার পর আনুষ্ঠানিক অন্যান্য কাজে যখন সবাই ব্যস্ত তখন নজরুল অন্তর্দ্বন্দ্বে বিক্ষুব্ধ। বাসর না করেই তিনি ছুটে যান বিরজা সুন্দরী দেবীর কাছে। তাকে বলেন, ‘মা, আমি এখনই চলে যাচ্ছি’। বিরজা সুন্দরী দেবী বুঝতে পারেন এই অবস্থায় নজরুলকে ফিরোনো সম্ভব না। তিনি তার ছেলে বীরেন্দ্রকুমারকে নজরুলের সঙ্গে দিয়ে দেন। সেই রাতে দৌলত পুর থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত কর্দমাক্ত (আষাঢ় মাস) রাস্তা পায়ে হেটে নজরুল ও বীরেন্দ্রকুমার কুমিল্লা পৌছেন। পরিশ্রমে ও মানসিক চাপে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। নজরুলের জীবনে নার্গিস পর্ব সেখানেই শেষ।

১৯২১ সালের জুলাই মাসে নজরুল আলী আকবর খানকে চিঠিতে লেখেন,
বাবা শশুর,
আপনাদের এই অসুর জামাই পশুর মত ব্যবহার করে এসে যা কিছু কসুর করেছে, তা ক্ষমা করো সকলে, অবশ্য যদি আমার ক্ষমা চাওয়ার অধিকার থাকে। এইটুকু মনে রাখবেন, আম্র অন্তর-দেবতা নেহায়েৎ অসহ্য না হয়ে পড়লে আমি কখনো কাউকে ব্যাথা দিই না। যদিও ঘা খেয়ে খেয়ে আমার হৃদয়টাতে ‘ঘা টা বুজে’ গেছে, তবুও সেটার অন্তরতম প্রদেশটা এখনো শিরীষ ফুলের পরাগের মতই কোমল আছে। সেখানে খোঁচা লাগলে আর আমি থাকতে পারিনে। তা-ছাড়া আমিও আপনাদের পাঁচজনের মতই মানুষ, আমার গন্ডারের চামড়া নয়; কেবল সহ্য গুণটা একটু বেশি। আমার মান-অপমান সম্বন্ধে কান্ডজ্ঞান ছিল না বা ‘কেয়ার’ করিনি বলে আমি কখনো এত বড় অপমান সহ্য করিনি যাতে আম্র ‘ম্যানলিনেসে’ বা পৌরুষে গিয়ে বাজে- যাতে আমায় কেউ কাপুরুষ, হীন ভাবতে পারে। আমি সাধ করে পথের ভিখারী সেজেছি বলে লোকের পদাঘাত সইবার মতন ‘ক্ষুদ্র আত্মা’ অমানুষ হয়ে যাইনি। আপন জনের কাছ থেকে পাওয়া অপ্রত্যাশিত এই হীন ঘৃণা, অবহেলা আমার বুক ভেঙ্গে দিয়েছে বাবা! আমি মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। দোয়া করবেন আমার এ ভুল যেন দু’দিনেই ভেঙে যায়- এ অভিমান যেন চোখের জলে ভেসে যায়!
বাকী উৎসবের জন্য যত শীগগীর পারি বন্দোবস্ত করবো। বাড়ির সকলকে দস্তুরমত সালাম দোয়া জানাবে। অন্যান্য যাদের কথা রাখতে পারিনি তাদের ক্ষমা করতে বলবেন। তাকেও ক্ষমা করতে বলবেন, যদি এই ক্ষমা চাওয়া ধৃষ্টতা না হয়।’

১৯২১ এর সেপ্টেম্বর মাসে আলী আকবর খান কুমিল্লা থেকে আবার কলকাতা পৌছে নজরুলের সঙ্গে দেখা করেন। নজরুলকে তিনি টাকার লোভ দেখান, এতে নজরুল আরো রেগে যান। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর নজরুলের সঙ্গে নার্গিসের আর কোনো যোগাযোগও হয়নি। ১৯৩৭ সালে নজরুলকে নার্গিস একটা চিঠি লেখেন। চিঠি প্রাপ্তির সময় সেখানে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। নজরুল তাকেই চিঠি পড়তে বলেন। চিঠি পড়া শেষে শৈলজানন্দ নজরুলকে উত্তর লিখতে বলেন। নজরুল একটি গান লিখে দেন।

যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তারে
ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে।
আমি গান গাহি আপনার দুখে,
তুমি কেন আসি দাড়াও সুমুখে,
আলেয়ার মত ডাকিও না আর
নিশীথ অন্ধকারে।
দয়া কর, মোরে দয়া কর, আর
আমারে লইয়া খেল না নিঠুর খেলা;
শত কাঁদিলেও ফিরিবে না সেই
শুভ লগনের বেলা।
আমি ফিরি পথে, তাহে কর ক্ষতি,
তব চোখে কেন সজল মিনতি,
আমি কি ভুলেও কোন দিন এসে দাঁড়িয়েছি তব দ্বারে।
ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে।

১৯৩৭ সালের ১ জুলাই নজরুল নার্গিসকে আর একটি চিঠি লেখেন। এর প্রায় বছর খানেক আগেই শিয়ালদহতে নার্গিস ও নজরুলের উপস্থিতিতে উভয়ের আনুষ্ঠানিক বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।

বিচ্ছেদের সাত-আট মাসের মাথায় আলী আকবর খানে বই ব্যবসার ম্যানেজার আজিজুল হাকিমের সঙ্গে নার্গিসের বিয়ে হয়। আজিজুল হাকিমও বাংলা সাহিত্যে কবি হিসেবে সমাদৃত। এক সময় তিনিই নার্গিসের কাছ থেকে পাওয়া সেই ১৯২১ সালে আলী আকবর খানের সরিয়ে ফেলা নজরুলের বন্ধুদের ও বন্ধুদের কাছে লেখা চিঠিগুলো প্রকাশ করেন। আলী আকবর খানের মূল চরিত্র জনসম্মুক্ষে প্রকাশিত হয়।

দ্বিতীয় স্ত্রী: প্রমীলা দেবী
নজরুলের জীবনে প্রমীলা পর্ব শুরু হয় নার্গিস পর্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। বিয়ের রাতেই নার্গিসকে দৌলতপুরে ফেলে নজরুল বীরেনকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘপথ পায়ে হেটে কুমিল্লায় বীরেনদের ঘরে উঠেন। পরদিনই বীরেনের মা শ্রীমতি বিরজা সুন্দরী দেবী যিনি সপরিবারে (প্রমীলাসহ) দৌলতপুরে নার্গিস-নজরুল বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন, নৌকা যোগে ফিরে আসেন।

দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পরিশ্রম ও মানসিক কষ্টে নজরুল খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেন পরিবারের সবাই কবিকে সেবাযত্ন করে সারিয়ে তুলতে নেমে পড়েন। বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রমীলাই ছিলেন সবার বড় এবং নজরুলের সেবা যত্নের জন্য বিরজা সুন্দরী সব সময় তাকেই পাশে রাখতেন। প্রমীলার সঙ্গে কবি নজরুলের প্রণয়ের সম্পর্ক তখনই গড়ে উঠে।

নজরুল দৌলতপুর হতে কুমিলার কান্দিরপাড়ে পৌছেন ১৮ জুন। ৬ জুন কমরেড মোজাফফর আহমেদ কুমিল্লা পৌছুলে নজরুল তাকে ২০/২২টি কবিতা তুলে দেন। ৮ জুন মোজাফফর আহমেদ কবিকে নিয়ে কলকাতা ফিরে আসেন। একই বছর নভেম্বর মাসে কবি দ্বিতীয়বার ফিরে আসেন কুমিল্লাতে এবং প্রায় একমাস ছিলেন।

দ্বিতীয় বার কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফিরে এসেই কবি তার বিখ্যাত দুটি কবিতা লেখেন, বিদ্রোহী ও ভাঙার গান। এই বিদ্রোহী কবিতাই কবি নজরুল ইসলামকে দেশ জোড়া খ্যাতি এনে দেয়। নজরুল গবেষক ড. আবুল আজাদ লেখেন, ‘দুই অসামান্য রচনা বিদ্রোহী ও ভাঙার গান– নজরুল ইসলামের অন্তরের গভীর মর্মপীড়ার ফসল। কে এর প্রেরণার উৎস – নার্গিস না প্রমীলা? নজরুল ইসলামের তাবৎ সাহিত্য কর্মে এই দুই নারীর অপরিসীম প্রভাব মুল্যায়ন করতে গেলে দেখা যাবে প্রেমের জগতে অন্তরের গভীর প্রাধান্য পেয়েছিল নার্গিস………. পক্ষান্তরে প্রমীলাকে নিয়ে কবি জড়িয়েছেন জীবন জগতে বাস্তবে।’

১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কবি তৃতীয়বার কুমিল্লায় পৌঁছেন। এবারো তিনি বিরজা সুন্দরী দেবীর আশ্রয়ে উঠেন। তিনটি ভ্রমনেই, কুমিল্লার যুব সমাজ কবিকে কাছে পেয়ে আপন করে নেয়। এদের মাঝে অন্যতম ছিলেন সুলতান মাহমুদ মজুমদার। তৃতীয়বার কবি প্রায় পাঁচ মাস কুমিল্লা ছিলেন।

সুলতান মাহমুদ মজুমদার লিখেছেন, ‘নজরুল কুমিল্লা থাকাকালে সন্দেহাতীত ভাবে বুঝতে পারলাম যে নজরুলের সঙ্গে তার ভাবী পত্নী কুমারী প্রমীলা সেনগুপ্তের পূর্বরাগ চলছে। নজরুল আমাকে নিতান্ত ছেলে মানুষ মনে করতেন। একদিন মার্চ মাসের প্রথম ভাগে আমার হোস্টেলে এসে কবিতা লিখতে বসলেন। আর কোনোদিন তিনি হোস্টেলে বসে কবিতা লিখেননি। আমি নিকটে গেলে বললেন – প্রেমপত্র নয়, -কবিতা। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে কবি আমাকে ডাকলেন ও কবিতাটি যে কাগজে লিখেছিলেন সে কাগজটা ভাঁজ করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, আমি যেন সেটা তখনই দুলীর (প্রমীলা) হাতে পৌঁছে দিয়ে আসি। আমি বললাম, কবিতা পড়তে পারি? তিনি বললেন, ‘খুউব পড়তে পার।’ ততক্ষণে চা এসে গেল। তিনি চায়ে চুমুক দিলেন, আমি মনে মনে কবিতাটি পড়লাম। কবিতাটির নাম ‘বিজয়িনী’।

হে মোর রানী ! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।

আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।
আমা সমর-জয়ী অমর তরবারী
দিনে দিনে ক্লান্তি আনে, হ’য়ে উঠে ভারী,
এখন এ ভার আমার তোমায় দিয়ে হারি
এই হার-মানা-হার পরাই তোমার কেশে।।

ওগো জীবন – দেবী!
আমায় দেখে কখন তুমি ফেল্লে চোখের জল,
আজ বিশ্ব –জয়ীর বিপুল দেউল তাইতে টলমল!

আজ বিদ্রোহীর এই রক্ত রথের চূড়ে,
বিজয়ীনি! নীলাম্বরীর আঁচল তোমার উড়ে,
যত তুণ আমার আজ তোমার মালায় পুরে,
আমি বিজয়ী আজ নয়ন জলে ভেসে’।

তৃতীয় বার (১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে) কবির কুমিল্লা ত্যাগের পূর্বে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। প্রমীলা (দোলন)-নজরুলের সম্পর্কের কথা কুমিল্লা শহরের তরুণ সমাজে বেশ হিংসাত্বক আলোড়ন সৃষ্টি করে। মুসলমান নজরুলের হিন্দু বাসায় থাকা, সেই সঙ্গে হিন্দু মেয়ে প্রমীলার সঙ্গে দহরম-মহরমের একটা বিষক্রিয়া সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়। এক হিন্দু যুবকের নেতৃত্বে একদল হিন্দু ছাত্র নজরুল রথ দর্শনে গেলে তাকে অপমান ও লাঞ্ছিত করতে চেষ্টা করে। কুমিল্লার রক্ষণশীল হিন্দু মহলে এ ব্যাপারে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। এমনকি নজরুলকে আক্রমন করতে গুন্ডা লেলিয়ে দেওয়া হয়। শহরের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি নজরুলকে রক্ষা করেন এবং একরাতে আসাম-কলকাতা মেইল যোগে তাকে কলকাতা পাঠিয়ে দেন।

তৃতীয় বার কুমিল্লায় কবি দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। অনেক বিখ্যাত গান এই সময়ে লেখা। বিজয়িনী, প্রলয়োল্লাস তার এই সময়ে লেখা বিখ্যাত কবিতা। এর মাঝে অনেক কবিতায় তিনি প্রমীলার রূপে বর্ণনা তুলে ধরেন, যেমন প্রিয়ার রূপ, দোদুল দুল প্রভৃতি কবিতা। দোদুল দুল কবিতাটি দোলন চাঁপা কাব্য গ্রন্থে সবার আগে রয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থটি ১৯২৩ সালের ১৫ অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয়।

এদিকে ততদিনে নজরুল ‘ধুমকেতু’ সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করে তাতে সরকার বিরোধী বক্তব্য রাখেন। বৃটিশ সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। সেই সময় গিরিবালা দেবী প্রমীলা সেনগুপ্তকে নিয়ে বিহারের সমস্তিপুরে অবস্থান করছিলেন। নজরুল বিহার হতে গিরিবালা দেবীকে প্রমীলা সহ কুমিল্লা পৌঁছে দেবার জন্য কুমিল্লার পথে রওয়ানা দেন। মোটামুটি, এই যাত্রাই নজরুল-প্রমীলার বিয়ের ব্যাপার পাকাপাকি হয়ে যায়।

কুমিল্লায় ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর নজরুল গ্রেফতার হন। ১৯২৩ সালের ৮ জানুয়ারি তার একবছরের কারাদন্ডের আদেশ হয়। নজরুলের কারাদন্ড হওয়ায় দেশ ব্যাপি হৈ চৈ পড়েযায়। এর আগে অবশ্য তিনি ‘ধুমকেতু’-এর স্বত্ব প্রমীলার চাচি বিরজা সুন্দরী দেবীর নামে হস্তান্তর করেন। নজরুলের গ্রেফতারের খবরে ব্যথিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বসন্ত’ নাটকটি তাকে উৎসর্গ করেন। এদিকে নজরুল কারারক্ষীদের সাথে জেল কর্তৃপক্ষের খারাপ আচরণ ও কারা নির্যাতনের প্রতিবাদে হুগলি জেলে অনশন শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে অনশন ভঙ্গের জন্য অনুরোধ করে টেলিগ্রাম পাঠান। অথচ নজরুল অনশন ভাঙলেন না। নজরুলের আপন মা জাহেদা খাতুনও চুরুলিয়া থেকে অনশন ভাঙতে জেলে আসেন, কিন্তু নজরুল জেল গেটে কারো সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করেন। অবশেষে বিরজা সুন্দরী দেবী নজরুলের অনশন ভাঙাতে সক্ষম হোন।

১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর কবি বহরমপুর জেল থেকে মুক্ত হোন এবং সরাসরি চলে যান কুমিল্লায়। এর সম্পর্কে নজরুলের বন্ধু খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দিন লিখেছেন, ‘মুসলিম জগতে’র তৎকালীন সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিনের সঙ্গে এ আলোচনায় কত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছি। কিন্তু কোথায় নজরুল? বহরমপুর জেলে নজরুল আর নেই-সারা কলকাতায় নজরুল নেই। কোথায় তিনি? তার অগনিত ভক্তবৃন্দক একেবারে পথে বসিয়ে তিনি সরে পড়েছেন কুমিল্লায় – এক নিভৃত পল্লীতে’।

অবশেষে ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল নজরুল প্রমীলার বিয়ের দিন ধার্য হয়। নজরুল প্রমীলার বিয়ে খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে অনুষ্ঠিত হয়নি। ছেলে মুসলিম-মেয়ে হিন্দু হওয়ায় অনেক সামাজিক গুঞ্জন ও বাঁধার সৃষ্টি হতে পারে, তাই অনেকটা চুপচাপেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। এই উদ্দেশ্যে গিরিবালা দেবীও কন্যা প্রমীলাকে নিয়ে কলকাতা পৌঁছেন।

পরিবারের অনেকেই এর বিরুদ্ধে ছিলেন। খোদ বিরজা সুন্দরী দেবীর স্বামী ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত (প্রমীলার চাচা যার বাসায় কুমিল্লায় তারা থাকতেন) এই বিয়েতে মত ছিল না। এমনকি বিয়ের আগে বিরজাসুন্দরী দেবী স্বয়ং কলকাতা এসে গিরিবালা দেবী ও তার কন্যাকে ফিরিয়ে নিতে চান। কিন্তু তারা যাননি। বিরজা সুন্দরী দেবীর ছেলে বীরেন্দ্রকুমার পর্যন্ত এই বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন।

নজরুল প্রমিলার বিয়ের সব অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় সাহিত্যিক মিসেস এম. রহমান (মুসাম্মৎ মাসুদা খাতুন) এর তত্ত্বাবধানে। নজরুল তাকেও ‘মা’ সম্বোধন করতেন। মিসেস এম. রহমান বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় লিখতেন। নজরুলের ‘বিষের বাঁশী’ কাব্য গ্রন্থটি তাকেই উৎসর্গ করা হয়। নজরুলের অনেক হিন্দু – মুসলমান বন্ধুই বিয়ের কথ জানতেন, কিন্ত বিয়ে কখন, কোথা হচ্ছে তা জানতেন না। বিয়ের আসরে উপস্থিতদের মাঝ থেকে কাজী নিয়োগ করা হয় মৌলভী মঈনউদ্দীন হোসায়েনকে। আর সাক্ষী ছিলেন মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ও খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন। উকিল নিযুক্ত করা হয় মিসেস এম রহমানের পরিচিত জনৈক আবদুস সালামকে।

বিয়ের প্রথমেই যে সমস্যা বাঁধে তা হলো: কোন ধর্মমতে বিয়ে হবে? হিন্দু মতে বিয়ে হতে পারে না। হতে পারে এক সিভিল ম্যারেজ অথবা ইসলাম ধর্মমতে। কিন্তু সিভিল ম্যারেজ আইন অনুযায়ী বর কনে উভয়কে এক স্বীকৃতি দিতে হয় তারা কোনো ধর্ম মানেন না। কবি এতে প্রবল আপত্তি জানান। তিনি বলেন, ‘আমি মুসলমান-মুসলমানী রক্ত আমার শিরার শিরায় ধমনীতে ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে, এ আমি অস্বীকার করতে পারব না’। অনেকেই প্রস্তাব দিলেন মেয়েকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলতে। কবি এতেও আপত্তি তুললেন, ‘কারুর কোনো ধর্মমত সম্বন্ধে আমার কোনো জোড় নেই। ইচ্ছে করে তিনি মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করলে পরেও করতে পারবেন।’ সেই সঙ্গে কবি ইতিহাস হতে নানা যুক্তিও উপস্থাপন করেন।

এই বিষয়ে বিয়ের অন্যতম সাক্ষী খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন তার যুগস্রষ্টা নজরুল গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘কবির মত মেনে নিয়ে আমাদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হল যে, আহলে কেতাবিদিগের সংগে ক্ষেত্রে স্ব স্ব ধর্ম বজায় রেখে বিয়ে হওয়া ইসলাম আইন মনে অসিদ্ধ নয়। এখন কথা হচ্ছে হিন্দুগণ ‘আহলে কিতাব’ কিনা? এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বর পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন বলে মুসলমানেরা বিশ্বাস করেন। এই সকল পয়গম্বর যুগে যুগে বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। ভারতবর্ষেও পয়গম্বরের আবির্ভাব অসম্ভব নয়। অতএব, এ বিয়ে হওয়া সম্ভবত আইন মতে অন্যায় হবে না।’ শেষে ইসলাম ধর্মমতেই ১০০০ টাকা দেনমোহর ঠিক করে নজরুল-প্রমীলার বিয়ে সম্পন্ন হয়।

নজরুল-প্রমীলার বিয়ের পরেই রক্ষণশীল হিন্দু-মুসলিম গোষ্ঠী এর পেছনে আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে। প্রবাসী পত্রিকার ব্রাহ্মগোষ্ঠী এই উদ্দেশ্যে সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকাতে হিন্দু-মুসলিম বিয়ের ঘটনার বিরুদ্ধে লেখা শুরু করে। এমনকি প্রবাসী পত্রিকায় নজরুলের কবিতা ছাপাও বন্ধ করে দেয়। এক সময় সবই ঠান্ডা হয়ে যায়।

বীরেন্দ্রকুমারও নজরুলের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেন বাকিরাও মেনে নেয়। বিয়ের পর হুগলীতেই বসবাস করতে থাকলেন কবি ও নবপরিণীতা স্ত্রী প্রমীলা শাশুড়ি গিরিবালা দেবীসহ। ১৯৩৮ সালে প্রমীলা পক্ষাঘাত গ্রস্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত তাদের সংসার ভালোই চলছিল। পক্ষাঘাত গ্রস্থ হবার ২/৩ বছরের মধ্যেই কবির শরীরেও রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই কবি নজরুল ইসলাম চূড়ান্ত ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

অসুস্থ প্রমীলা-নজরুলের পরিবারকে আকঁড়ে ধরেন গিরিবালা দেবী। কিন্তু তখন কিছু অপবাদ ছড়িয়ে পড়ে। লোকে বলাবলি করতে থাকে, ‘নজরুলের অর্থ-সম্পদ গিরিবালা দেবী অসুস্থ নজরুলের সেবায় কাজে না লাগিয়ে, জমিয়ে রাখেন’। এই ক্ষোভে ১৯৪৬ সালের আগস্ট/সেপ্টেম্বরের দিকে গিরিবালা দেবী কাউকে কিছু না জানিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যান। পথে তিনি প্রমীলা দেবীকে চিঠি লিখে জানান তার জন্য কেউ যেন চিন্তা না করে। এরপর গিরিবালা দেবীর আর কোনো খোঁজই পাওয়া যায়নি।

নানা অভাব-অনটন, সংগ্রাম-সংঘাতের মাঝে প্রমীলা দেবী তার সংসার টিকিয়ে রাখেন। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কবিপত্নী প্রমীলা সেনগুপ্ত দীর্ঘ সময় পক্ষাঘাতগ্রস্থ থাকার পরে মৃত্যু বরণ করেন।

নজরুল সাম্যবাদের একজন অগ্রদূত ছিলেন। তিনি মুসলিম হয়েও চার সন্তানের নাম হিন্দু এবং মুসলিম উভয় নামেই নামকরণ করেন। যেমন: কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ।
শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / আগস্ট ২৭, ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:১২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৭ আগস্ট ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com