কলমি লতা

বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০১৪

কলমি লতা

 

 


সিকদার মনজিলুর রহমান

 

ভুল সবই ভুল

এ জীবনের পাতায় পাতায়

যা লেখা …

Litearture 02শুত্রুবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। বাথরুম থেকে গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে এলেন কাসেম সাহেব। জায়া-পতি ও একটি মাত্র মেয়ে নিয়ে ছোট্ট সংসার কাসেম সাহেবের।মেয়ে লেখা একটি প্রাইভেট ব্যাংকের সেকেন্ড অফিসার । কিছুদিন হলো সে নিজ পছন্দে বিয়ে করেছে তারই এক সহকর্মীকে। এখন ঘরে বাইরে শুধু দুই বুড়ো বুড়ি। স্ত্রী সালেহা বেগম সকালের নাস্তা তৈরী করতে রান্নাঘরে ঢুকেছে। কাসেম সাহেবের গুনগুনানি শুনে তিনি সাড়া দিলেন , ও লেখার বাবা তুমি উঠেছ ?

 ঘুমের আলসে তখনও কাটেনি কাসেম সাহেবের । আলসে টানতে টানতে সেই অবস্থায় জবাব দিলেন, হ্যাঁ এই মাত্র।

কাল যে বললে ছুটির দিনে একটু বেশি ঘুমাবে ?

‘ না তা আর হলো কৈ ? রোজকার মত অভ্যেস হয়ে গেছে । যে দিন অফিস না থাকে ঐদিন ঘুম ভেঙে যায় সকাল সকাল, আবার অফিসের দিন একদম ভাঙতে চায় না।’ আসল ঘটনাটা যে তা নয়, তার আর স্ত্রীকে বুঝতে দিলেন না। সেদিনের ঐ ঘটনার পর থেকে তার ঘুমেরও কেমন ব্যঘাত ঘটছে।

এই নিয়ে দশ দিনের মধ্যে দু’বার ঘটল একই ভুল। ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে মনে হলো ভিতরে এমন কিছু আছে যেটা থাকার কথা নয়। শুধু তাই নয় , এবারের ভুলটা যেন একটু বেশি। প্রথমে মনে হয়েছিল জিনিসটা ঠাণ্ডা । আজ মনে হলো ঠাণ্ডার সঙ্গে শক্তও । সাধারণ শক্ত নয়, লোহা-লক্কর যেমন শক্ত হয় সে রকম শক্ত। বাজারের ব্যাগে লোহা-লক্কর আসবে কোথা থেকে ?

 প্রথমবারের মত ঝট করে হাত সরিয়ে নিলেন আবুল কাসেম। তার ভুরু কুঁচকে গেল। তিনি আগামি মার্চে পঞ্চাশের কোঠায় পা রাখবেন। এই বয়সে একই ভুল প্রতিনিয়ত হতে থাকলে দুশ্চিন্তায় ভুরু কুঁচকে যাওয়াটা স্বাভাবিক। আজ বাজারের ব্যাগে ভুল, কাল ভুল হবে অফিসের কাজে, পরশু আরেক দিকে। প্রাইভেট কোম্পানীর কেরাণী সাহেব। ছোট পদের চাকরি। সামান্য ভুল হলে বড় রকমের বিপদ হতে পারে। তার ওপর অফিসের অবস্থা ভাল নয়, নড়বড় করছে। গত এক বছর ধরে অর্ডার কমেছে। ম্যানেজমেন্টও খরচ কমাচ্ছে । রোজার ঈদে বোনাস দিয়েছে অর্ধেক , কোরবাণীর সময় দিবে কিনা সন্দেহ। কিছুদিন আগেও অসুখ-বিসুখ, মেয়ের বিয়ে, ফ্লাটের জন্যে লোন চাইলে পাওয়া যেত। এখন হাজারটা ফ্যাকড়া তুলে আটকাচ্ছে। চাকরিতেও হাত পড়েছে। ইতি মধ্যে দুই জন পিয়নকে ছাঁটাই দিয়েছে।
 কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে এবার কেরাণী অফিসারদের পালা। কঠিন পরিস্থিতি। সবাই কাঁটা হয়ে আছে। এই অবস্থায় সামান্য ভুল মানে সর্বনাশ। এ বয়সে চাকরি হারালে ভিক্ষা করা ছাড়া আর কোন গতি থাকবে না।

 ভুরু কোঁচকানো অবস্থাতেই কাসেম সাহেব ব্যাগের দিকে তাকালেন। না, কোন গোলমাল নেই। প্রতিদিনের মতো রান্নাঘরের দরজা ঠেলে নিঃসংকোচে ঢুকে পড়লেন। এরই মধ্যে স্ত্রী সালেহা বেগম দাঁত কটমট করতে করতে এসে জিজ্ঞেস করলেন বাজার থেকে যা যা আনতে বলেছিলাম সব এনেছ ?

 হ্যাঁ-এনেছি। ঠিক আছে যাও।

কলপাড় থেকে হাত মুখ ধুয়ে এসো। তোমার জন্যে চা নিয়ে আসছি। আর শোন, কাল থেকে আর লুঙ্গী পড়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাজারে যাবে না। এ আধুনিক যুগে কেউ লুঙ্গী পরে বাড়ির বাইরে যায় নাকি ?

 কাসেম সাহেব প্রতিদিনই তো লুঙ্গী পড়ে ব্যাগ নিয়ে বাজরে যান । আজ হঠাৎ স্ত্রীর এমন আচরণে অবাক হয়ে বললেন, ” কেন যাবে না। অনেকই তো যায়। এতো নতুন নয়।”

 সালেহা বেগম চাপা ধমক দিয়ে বললেন, “যে যায় যাক, তুমি যাবে না। টোকাইর মত লাগে। কাল থেকে তুমি লুঙ্গী পরে ব্যাগ ঝুলাতে ঝুলাতে হেঁটে বাজারে যাবে না। যাবে রিকশায়।

কাসেম সাহেবের মনে হলো স্ত্রীকেও পাল্টা একটা ধমক দেওয়া উচিৎ । বলা দরকার ,’ না, আমি লুঙ্গী পড়েই যাব। এত বছর ধরে যা করছি হঠাৎ পাল্টাব কেন ? তাছাড়া কাঁচা বাজারে কি কেউ স্যুট-টাই পড়ে যায় নাকি ? মাছ তরকারির কাদা পানিতে স্যুট-টাই নোংরা হয়ে যায় না ?

 ধমক দিতে পারতেন কিন্ত দিলেন না। আজ থেকে দশ-পনের বছর আগে হলে হয়তো পারতেন, কিন্তু এখন পারেন না। ঘরে বাইরে কোথাও পারেন না। এটা তার পক্ষে যেমন অসুবিধের হয়েছে, তেমন আবার সুবিধেরও হয়েছে। অসুবিধা হলো, এর ফলে কোথাও কোন সময়েই আর উচিৎ কথা বলা হয় না। আর সুবিধা হলো, জীবনটা ক্রমশ ঝগড়া- ঝামেলাহীন শান্তিপূপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি হিসেব করে দেখেছেন, ‘ একটা বয়সের পর জীবনে উচিৎ কথার কোন দাম নেই, আছে শান্তির। শান্তির জন্য তিনি নিজেই এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। ঘরে বাইরে খানিকটা ধমকানি , দু’ পাঁচটা অপমান, কিছুটা অবজ্ঞা চুপচাপ হজম করে নিলেই কাজ হচ্ছে । আজকাল বাস ট্রেনে কেউ পা মারিয়ে দিলে আর গায়ে লাগান না।

অসহ্য গরমে রাতে টানা লোডশেডিং চললেও ঘামে ভিজে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকেন। বাজারে ছোটখাটো ওজন ঠকানোর ঘটনায় চোখ ফিরিয়ে নেন। অল্প ক’টা পয়সার জন্যে ঝামেলা পাকাতে যান না।

সেদিন স্ত্রী সালেহাকে ধমকাতে গিয়েও থমকে গেলেন। কোমল কণ্ঠে বললেন, ‘ কী হয়েছে বলো তো ? তুমি হঠাৎ লুঙ্গীর মত সামান্য ব্যাপারে যুদ্ধে নামলে কেন ?

সালেহা বেগম ঝাঁঝের সাথে বললেন ” আমি নামিনি, নেমেছে তোমার মেয়ে ।” কাসেম সাহেব তাচ্ছিল্যের সাথে জিজ্ঞেস করলেন মেয়ে ?

কাসেম সাহেব তাচ্ছিল্যের সাথে জিজ্ঞেস করলেন মেয়ে ?

হ্যাঁ তোমার মেয়ে। সেদিন মোবাইলে জানাল, ” তার শ্বশুর নাকি গাড়ি থেকে তোমায় দেখেছেন। একমাত্র মেয়ের শ্বশুর মানুষটি অতিরিক্ত রকমের বড়লোক। তার প্রসঙ্গ উঠলে কাসেম সাহেবের নার্ভাস লাগে। সেদিনও লাগল। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, লেখার শ্বশুর আমায় দেখেছেন ? সালেহা বেগম বললেন , ” তোমায় দেখবেন কেন? তুমি এমন কিছু রাজা, বাদশা নও যে তোমায় দেখতে হবে। দেখেছে এক কাগজ কুড়ানোওয়ালাকে। ভদ্রলোক সিঙ্গাপুর না ব্যাংককের ফ্লাইট ধরবেন বলে ওই পথে শাহজালালে যাচ্ছিলেন, তুমি লুঙ্গী পড়া ব্যাগ একটা হাতে ঝুলিয়ে হন হন করে কাগজ কুড়ানোওয়ালার মত বাজারে যাচ্ছ।

শাহ জালালে? তা আবার কোথায়? কাসেম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।

সালেহা বেগম এবার গলার ঝাঁঝটা বাড়িয়ে বললেন, তুমি তো এ সংসারের কোন খবরই রাখ না। আওয়ামী লীগ সরকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নাম বদল করে তার নতুন নাম রেখেছে ,” হজরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর।”

ও তাই বলো। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাবলে দিন বদলের নামে নাম বদল করে চলেছে । ক্ষমতা তো কারো চিরস্থায়ী বন্দোবস্থ নয় বাবা ! বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই শাহজালালের নাম বদলে যে তৈয়্যেবা মজুমদার বিমান বন্দর হতে পারে তা কি তাদের জানা আছে ? সে যাক , ওসব রাজনৈতিক প্যাচালে আমাদের দরকার নাই। লেখার শ্বশুর কি বলেছেন ? তাই বলো।

আজকাল সকালে ব্যাগ নিয়ে কাগজ কুড়াতে বেরোচ্ছ। তিনি ফিরে এসে এ নিয়ে লেখার সাথে হাসাহাসি করেছেন।

কাসেম সাহেব হাঁ হাঁ আওয়াজে বোকা ধরণের হেসে বললেন, কথাটা তিনি ভুল বলেননি। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে ক’দিন পরে ব্যাগ নিয়ে কাগজ কুড়োতে বেরোলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বেঁচে থাকতে হলে আয়-রোজগারের একটা বিকল্প রাস্তা থাকা দরকার।

সে দিক থেকে কাগজ কুড়ানেওয়ালা সব থেকে ভাল। মূলধন লাগবে না।

সালেহা বেগম এবার গলা তুলে ধমকে উঠলেন, ” চুপ করো । আমার সাথে বাজে রসিকতা করবে না। মেয়ের একটা প্রেস্টিজ আছে । আগে ছিলনা না বিয়ের পরে হয়েছে। তোমার মত দু’পয়সার কেরাণীর ঘরে তার বিয়ে হয়নি। তুমি সম্বন্ধ দেখলে অবশ্য তাই হতো। মেয়ে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে বলে হয়নি। লেখার শ্বশুর বাড়ির টাকা -পয়সা সম্পর্কে কি তোমার এখনও ধারণা হয়নি ?”

স্ত্রীর ধমকে দ্রুত হাসি মুছে কাসেম সাহেব বিড়বিড় করে বললেন, ” অবশ্যই হয়েছে, মেয়ের বিয়ের দু’বছর গেল এখনও ধাক্কা সামলাতে পারিনি, মাথার ওপর বিরাট ধার । রাতে ভাল ঘুম হয়না।”

সালেহা বেগম মুখে তাচ্ছিল্যের আওয়াজ করে বললেন, ”তোমার টাকা নেই তাই ঘুম হয়না। সেটা তো আমার মেয়ের শশুর বাড়ির অপরাধ নয়। তারা তো আর এসে তোমায় ঘুম পাড়ানি গান শোনাতে পারবে না। যাই হোক কাল থেকে তোমার ঐ লুঙ্গী বাতিল।

তোমার মেয়ে বলে দিয়েছে ,আর একদিনও যদি তার শশুর বাড়ির কেউ তোমাকে ওই অবস্থায় দেখে ; তা হলে সে বিষপানে আত্মহত্যা করবে।

কাসেম সাহেব নরম গলায় বললেন, লুঙ্গীর বদলে আমি যদি বাজার বদল করি ?

বাজার বদল মানে ?

মানে, এমন কোন বাজারে গেলাম যে দিকটায় বিমান বন্দর যাওয়ার পথ পড়ে না। লেখার শশুর তো প্লেন ছাড়া যাতায়াত করেন না।

সালেহা বেগম এবারও স্বামীর দিকে আগুন চোখে তাকালেন। কাসেম সাহেব বুঝলেন আর কথা বাড়ালে যুদ্ধ বেঁধে যাবে । চোখ নামিয়ে তাড়াতাড়ি বললেন,” ঠিক আছে লুঙ্গীর পরিবর্তে প্যান্ট-শার্ট অথবা পাজামা-পাঞ্জাবী পড়ে যাবো। তাতে কাদা পানি লাগলে তুমি নিত্য ধুয়ে দিবে ।

সালেহা বেগম ঝামটি মেরে বললেন “ দিতে হয় , দিব।”

বাজার করার পোষাক বদলেছে কিন্তু ব্যাগ বদলায়নি। একদিন নয়, পর পর দু’দিন ঘটল। হাত ঢুকিয়ে মনে হল, ভেতরে এমন কিছুPublication101 আছে যা বাজারের ব্যাগে থাকার কথা নয়। বিচ্ছিরি ধরণের মনের ভুল। এমন কেন হচ্ছে ? প্রথম ঘটনাটা এক সোমবার। বাজার থেকে ফিরে প্রতিদিনের মতো তরিতরকারি বের করতেছিলেন কাসেম সাহেব। টানাটানির সংসারে বাজার করা তরিতরকারি এমন কিছু সোনা চান্দি নয় যে একটা একটা করে বের করতে হবে। সালেহা বেগম স্বামীর এই একটা একটা করে আলু-পটল বের করা সহ্য করতে পারেন না। এই কারণেই স্বামী বাজার নিয়ে ফেরার সময় তিনি রান্নাঘরে আসেন না। খানিক পরে আসেন। সে দিনও আসেননি। কচি লাউটা বের করার সময়ে মুহূর্তের জন্য ব্যাগের ভিতরে অজানা জিনিসের স্পর্শ পেয়েছিলেন কাসেম সাহেব। একা একাই চমকে উঠেছিলেন তিনি। তিনি মন শক্ত করে ব্যাগের মুখটা বড় করে খুলে ধরলেন । না, কেঁচো -ব্যাঙ , লোহা -লক্কর, অজানা অচেনা কিছুই দেখা যাচ্ছে না ব্যাগের মধ্যে। উঁকি ঝুঁকি মারছে আলু পটল, উচেছ, বেগুন আর এক হালি কাঁচকলা।

ভুল বুঝতে পেরে লজ্জা পেয়ে ছিলেন তিনি। কেন এমন হল ? গোসল করতে করতে ঘটনাটা মনে পড়ল;

বছর খানেক আগে অফিসের হালিম সাহেব একটা গল্প বলেছিলেন, নতুন শালা বউয়ের উপলক্ষে বেড়াতে গিয়েছেন শ্বশুরবাড়ি। বাজার থেকে সওদা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে শ্যালক। নতুন বউ ব্যাগ থেকে তরিতরকারি বের করতে গিয়ে ঠাণ্ডা তেলতেলে কিছু একটা ধরে ফেলে। বের করতে দেখা গেল ইঞ্চি তিন-চার লম্ভা একটা কেঁচো লালশাকের তোরায় জড়িয়ে আছে। লাফ দিয়েই বেচারি রান্নাঘরে বেহুস। মনে আছে গল্প বলতে বলতে হালিম সাহেব তো হেসে খুন। নিশ্চয় সেই গল্প এখনও মাথায় রয়ে গিয়েছে, আর তাতেই ভুল।

মাথা খুবই আশ্চর্য জিনিস। কম্পিউটারের ফাইল-ফোল্ডারের মত সব সেভ হয়ে থাকে। হঠাৎ সে ফোল্ডারে টিপ দিলে যেমন খুলে যায়। মাথাও তেমনি কখন কোন পুরানো ঘটনা কখন উঁকি মেরে ফিরে আসে কেউ বলতে পারে না।

কিন্তু সে তো বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা । আজ আবার একই ভুল হবে কেন ?

তিনি ভেবেছিলেন, বেলা গড়ালে ব্যাগের ঘটনাটা মন থেকে হারিয়ে যাবে। হারালো না। আবছা ভাবে রয়ে গেল। অস্বস্তির মতো। অস্বস্তি মানেই অশান্তি। কাসেম সাহেব বিরক্ত হলেন তিনি অশান্তি পছন্দ করেন না।

খাওয়ার সময় সালেহা বেগম পাতে লাউয়ের তরকারি দিতে দিতে বললেন সামনের শুক্রবারে লেখা আসছে । ক’টা দিন থাকবে বলেছে। জামাই দিতে আসবে। আমি জামাইকে দুপুরে খেতে বলেছি। প্রথমে রাজি হচ্ছিল না, আমি জোর করেছি।

কাসেম সাহেব অন্য মনষ্ক গলায় বললেন, জোর করতে গেলে কেন?

সালেহা বেগম পরিবেশন থামিয়ে বললেন, মানে !

ছেলেটাকে কতদিন খাওয়ানো হয়নি বলো তো ?

কাসেম সাহেব মুখ নামিয়ে ভাতের গ্রাস মুখে তুললেন। আমি তা বলিনি , হয়তো ওর জরুরি কোন কাজ ছিল।

কাজ ছিল তো কী হয়েছে ? তাই বলে দাওয়াত করব না? মেয়েটা বা কি ভাববে ? এখন কিছু বলবে না, পরে কথা শোনাবে ।

কাসেম সাহেব বিড়বিড় করে বললেন ” তা হলে ঠিকই করেছ।”

সালেহা বেগম মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, ” তোমার কাছে ঠিক-ভুলের সার্টিফিকেট চাওয়া হয়নি। ওই দিন ঠিক মত বাজার করবে। লেখা বলেছে জামাই পাঙ্গাস মাছ পছন্দ করে ।

বড়টা পারবে না , সে মুরদ তোমার নেই। মাঝারিটা আনবে। ডিমপাড়া একটি মুরগি আনবে। ফার্মের মুরগিতে কেমন একটা বিশ্রী গন্ধ কয়। দেশি মুরগি আনবে।

অফিসে যাওয়ার পথে রিকশায় বসেই কাসেম সাহেব হিসেব কষতে লাগলেন পাঙ্গাসের কেজি আজকাল কত যাচ্ছে ? কার কাছে টাকা ধার চাওয়া যায় ?অফিসে একমাত্র হালিম সাহেবের সাথে তার আন্তরিক সম্পর্ক। সংসারের অভাব-অভিযোগ সব ব্যাপারেই তিনি তার সাথে আলোচনা করেন । টাকা-পয়সা ধার-দেনা দরকার হলে তিনি তার কাছেই চেয়ে থাকেন । হালিম সাহেবও মাঝে-মধ্যে তার কাছ থেকে ধার-দেনা নিয়ে থাকেন।এবারও ভাবছেন তাকে একবার বলে দেখা যেতে পারে। নইলে অন্য চেষ্টা করতে হবে। হাতে তো ক’দিন সময় আছে।

ধার চাওয়া আর হল না। হালিম সাহেব অফিসে আসেননি। পরের দিনও না। পরপর তিন দিনই তিনি অনুপস্থিত। তার সম্পর্কে মারাত্মক একটা খবর পাওয়া গিয়েছে। সেই খবর সত্য না মিথ্যা, বোঝা যাচ্ছে না, তবে অফিসে সবাই বলাবলি করছে, ” হালিম সাহেবের শ্যালক নাকি কালাচাঁদপুরে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। তার বাজারের ব্যাগে রিভলভার পাওয়া গিয়েছে। কলমিলতার মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশে হাতে নাতে ধরেছে। তল্লাশির সময় তারা ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে প্রথমে ঠাণ্ডা, শক্ত জিনিসের ছোঁয়া পায়। এমনি শক্ত নয়, লোহা পিতলের মতো শক্ত। এর পরই অস্ত্রটা টেনে বের করে। তখনও নলের সাথে নাকি ক’টা কলমির ভেজা ভেজা পাতা ঝুলছিল। হালিম সাহেব তাকে ছাড়াতে থানা পুলিশ করে বেড়াচ্ছেন। : খবর শুনে অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলেন কাসেম সাহেব । যার বউ লালশাকে কেঁচো দেখে অজ্ঞান হয়েছিল । তার কিনা এই কাণ্ড ?

শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকাল সকাল বাজারে গিয়ে জামাইয়ের জন্য বাজার করলেন কাসেম সাহেব। মাঝারি সাইজের পাঙ্গাসের সাথে বড় পাবদাও নিয়েছেন। দেশি ডিমপাড়া মুরগি একটি। যেমন সালেহা বেগম বলে দিয়েছেন। আনাজপাতির লিস্টের বাইরে দুম করে এক কেজি কলমিলতা কিনে ফেলেছেন যার কোন দরকার ছিল না, তবুও কিনেছেন। কলমিলতা নজরে পড়তেই মনে পড়ে গেল কিশোর বেলার সেই স্মৃতি , ” বাবা তখন কৃষি কাজ করতেন চার-পাঁচ জন মজুর খাটত বাবার কৃষিকাজে । আষাঢ়- শ্রাবণ মাসে মাঠ থেকে ফেরার পথে ইছাহাক নামের এক বালক প্রায় প্রতিদিন কলমিলতা তুলে নিয়ে আসত মার জন্যে। মা সেখান থেকে কচি কচি শাক গুলো খুব যত্ন করে চিংড়ি মাছ দিয়ে চচ্চড়ি রাঁধতেন। মায়ের হাতের রান্না দারুণ মজা লাগত। সে দিনের সেই কলমিলতা ঢাকার বাজারে আজকাল চড়া দামে বিক্রি হয়। সচরাচর পাওয়াও যায় না। অনেকদিন পর চোখের সামনে পড়ায় এক কেজি কিনে ফেলেছেন ঠিক করেছেন বাড়িতে ফিরেই সালেহা বেগমের আগোচরে গোপনে ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে দেখবেন হাতে রিভলভারের ঠাণ্ডা ছোঁয়া লাগে কিনা । দু’বার ভুল হয়েছে বলেই যে বার বার ভুল হবে তার কি মানে আছে ?

আটলান্টা।
 

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com