ছোট গল্প

কর্তব্য

শনিবার, ১৪ আগস্ট ২০২১

কর্তব্য
অলঙ্করণঃ [ মামুন হোসাইন ]

সকালে  দারোয়ান বারেকের ডাকে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন  শহরের বিশিষ্ট শিল্পপতি  রকিব চৌধুরী । পাশে ঘুমিয়ে থাকা স্ত্রী রাজিয়া চৌধুরীকে ডেকে বললেন, দেখত এই সাতসকালে  দারোয়ান ডাকে কেন ?
রাজিয়া চৌধুরী ফিরে এসে জানালেন, গ্রামের বাড়ি থেকে কে যেন এসেছে ? তুমি উঠে দেখ।
রকিব চৌধুরী উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে  চোখে  পুরু চশমা,পাজামা-পাঞ্জাবি পড়া  মধ্য বয়স্ক এক ভদ্রলোকের সাথে এক যুবতী  তার দরজায়  দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখেই রকিব উচ্ছসিত হয়ে বলে উঠল, আরে মাহমুদ! আয়,আয়। তাকে জড়িয়ে ধরে বলল ,কেমন আছিস ? দোস্ত ! তোর ভাবী যখনই বলল , গ্রামের বাড়ি থেকে যেন এসেছে ? তখনই বুঝলাম তুই ছাড়া কে আসতে পারে?
মাহমুদ বলল, বহু বছর পর তোর সাথে দেখা। তোর বউকে তো এই প্রথম দেখলাম । তোর বিয়েতে তো আসা হয়নি ।
আমি কিন্তু তোর বিয়েতে গিয়েছিলাম ।
হ্যাঁ । মনে হয় ওটাই ছিল তোর  গ্রামের বাড়ি শেষ  যাওয়া ।
আয় আয় , বস বস। বলে মাহমুদের হাত ধরে সোফায় বসিয়ে পাশেই বসে পড়ল রকিব ।
রকিবের পদধূলি নিয়ে সালাম করল মাহমুদের পাশে  দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি ।
সুখে থাক, বলে রকিব মাহমুদের দিকে তাকালো ।
আমার মেয়ে,আলো ।
ও আচ্ছা, ঠিক আছে মা ! বস বস ।
আলো তার বাবার পাশ ঘেঁষে বসল ।
সেই মূহুর্তে রাজিয়া বলল, তোমরা দুই বন্ধু বসে গল্প কর আমি একটু চায়ের ব্যবস্থা করি ।
হ্যাঁ কর, কর । শুধু চা কেন ? বারেককে দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে কিছু নাস্তা আনার ব্যবস্থা কর ।  চা-টা তুমি নিজেই তৈরি কর।  দোকানের চায়ের সাথে তোমার হাতের চায়ের তুলনাই হয় না, বলল রকিব।
ঠিক এমন সময় ঘরের ওধার থেকে ভেসে এলো,আমার জন্যেও আনবে , কিন্তু !
মাহমুদ সে দিক লক্ষ্য করে রকিবের দিকে তাকিয়ে পড়লে রকিব বলল, আমার মেয়ে মিনি।
মিনির কথার জবাব দিয়ে রাজিয়া বললেন , হ্যাঁ আনবে । তুই এদিকে আয় । দেখে যা কে এসেছে ? তোর এক কাকু ও একটা আপু এসেছে। মিনি এসে তার মায়ের পাশে বসল।
রকিব আলোর দিকে তাকিয়ে মাহমুদকে জিজ্ঞেস করল,তোর কি এই একটি মেয়ে ?
না , না। এক ছেলে দুই মেয়ে । ছেলে বড়  নাম আলীম , আব্দুল আলীম । ছোট মেয়ে আলিয়া ও তো আলো বললামই ।
বাঃ সুন্দর তো ! আলীম , আলো ও আলিয়া । তুই তো শিল্পী আলীমকেই মনে রেখেছিস। স্কুল জীবনে তুই আব্দুল  আলীমের মতই  তার গানগুলি গাইতি । আমরা সবাই তোকে আব্দুল আলীমের শিষ্য বলে ডাকতাম । একবার তো তুই তার একটা গান গেয়ে স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পুরস্কারও পেয়েছিলি ।
হ্যাঁ বাল্যকাল থেকেই একটু সঙ্গীত অনুরাগী ছিলাম । আর পল্লীগীতিটা বেশ ভালই গাইতাম । তাইত শখ করে ছেলেটার নামও রেখেছি  আব্দুল আলীম । আমি যা পারিনি  সন্তানের মাঝে যদি দেখতে পাই । তা আর হলো কই ? ছেলেটা তো  আর মানুষ হলো না ।
কেন ?
তার কথা আর বলিসনে । ক্লাশ টেন পর্যন্ত পড়ে আর পড়ল না । স্কুল মাধ্যমিক পরীক্ষাটা পর্যন্ত দিল না। এখন চাষবাস, কৃষিকাজ নিয়ে পড়ে আছে ।
ভালই তো ।  গাঁও গ্রামে ওটাই তো আসল । ঠিক মত করতে পারলে তো ভালোই।
সে কাল আর নেইরে। নিজের জমিজমা না থাকলে মহাজনের কাছ থেকে জমি বর্গা নিয়ে  চাষ করে ঘরে আজ কাল কিছুই তোলা যায় না। কোন মতে পেট চলে । তার পরে আমিও তো আগের মত কাজকর্ম  করতে পারিনে। হার্টের সমস্যা তো আগেই শুরু হয়েছে, এখন আবার চোখ দু’টোও গেছে , ভাল দেখতে পাইনে ।
সে কি ?  ডাক্তার দেখাচ্ছিস তো ?
হ্যাঁ , বাগেরহাটে ডাঃ মোসলেম উদ্দিনকে দেখিয়েছি । তার আর কতটুকু বিদ্যে ? ঢাকায় পাঠাল ডাঃ নজরুল ইসলামের কাছে । আজ বিকেলে  তাঁর ওখানে এ্যাপায়র্ন্টমেন্ট আছে। তাই তো ঢাকায় আসা।
ডাঃ নজরুল ইসলাম ? আরে বাহ্‌! সে তো ঢাকার মস্ত বড় চোখের ডাক্তার। আমার সাথেও আলাপ  আছে । ঠিক আছে  বিকালে আমি  তোর সাথে যাব।
তোর ছেলে মেয়ে ক’জন ? জিজ্ঞেস করল মাহমুদ ।
এক ছেলে , এক মেয়ে । ছেলে বড় । সে আমেরিকায় আছে । মিনির দিকে তাকিয়ে এই যে মেয়ে , ও ঢাকা কলেজে পড়ছে । সে আলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তা তুমি কি করছ মা ?
ইন্টারমেডিয়েট পাশ করেছিলাম । তারপরে আর পড়া  হয়নি ,জবাব দিল আলো।
কেন ? কেন ? রকিব উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করল ।
মাহমুদ বলল, তার পরেই তো ওর মা অসুস্থ হয়ে পড়ল । সংসারের পুরো ঝামেলাটা এসে পড়ল ওর ঘাড়ে । তাই আর পড়াশুনা করে উঠতে পারেনি ।
এরই মধ্যে বারেক নাস্তা  নিয়ে এলো।
বারেককে দেখে রকিব বলল,  চল, ওঠ মাহমুদ। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে বসে গল্প করা যবে।
রাজিয়া চৌধুরী আলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,  তুমি আমার সাথে এসো মা।
আলো উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আচ্ছা।
নাস্তা খেতে খেতে মাহমুদ বলল, বলছিলাম কি  রকিব  দেশে তো চাষ বাসের অবস্থা তেমন বেশী ভাল নয় । আলীমকে যদি তোর কাছে পাঠিয়ে দেই । মানে , যদি কোন কাজ কর্মের ব্যবস্থা করে দিতে পারতিস ?  শিক্ষকতার পেনশানে আর কত টাকাই পাই ? সে টাকায় তো আর সংসার চলে না।
রকিব একটু ভেবে , ক্লাশ টেন পর্যন্ত পড়া । হাই স্কুলও পাশ করে নাই। এখানে কি কোন কাজকর্ম পাবে ? যাকগে, মন খারাপ  করিসনে । তবু দেখছি কি করা যায় । তোর কি মোবাইল নাম্বার আছে ?
আরে  না। মোবাইল চালানোর সঙ্গতি কি আমার আছে ?
ঠিক আছে, ঠিকানা তো আমার কাছে আছে , যদি কিছু হয় । আমি তোকে জানাব । তা আমার এখানে থাকবি কদ্দিন ?
কদ্দিন আর থাকব ?  সকালেই ফিরতে  হবে ।
সে কি? কতদিন পরে তোর সাথে দেখা । ঢাকায়  এসেছিস ক’দিন থাকবি , যাদুঘর, চিড়িয়া খানা , বোটানিক্যাল গার্ডেন সংসদ ভবন ঘুরে ফিরে ঢাকা শহর  দেখবি। দুই বন্ধু মিলে জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমে একদিন জুম্মার নামায পড়ব । বাইতুল মোকাররম হলো বাংলাদেশিদের কাবা ।  আর তুই কিনা বলছিস কালই চলে যাবি তা কেমনে হয় ?
সে ভাগ্য কি আর আমার আছে রে ? বাড়িতে একজনকে রেখে এসেছি অসুস্থ । বলতে গেলে সে একা একা চলতে ফিরতেও পারেনা । আবার তো   ক’দিন বাদে আসব তখন না হয় দু’বন্ধু মিলে ঘুরাফিরা করা যাবে ।
রকিব সাহেব প্যান্ট- সার্ট পড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে প্রস্তত হচ্ছিলেন এমন সময়  স্ত্রী রাজিয়া বেগমকে সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, দেখত ঘরে কোন ডাক টিকিট  আছে কিনা ? সাইডের কাজকর্ম তো একটু বাড়ছে  সোহেল একা তো পেরে উঠছে না । মাহমুদও বলেছিল তার ছেলেটার একটা কাজের কথা । একটা চিঠি লিখে মাহমুদকে জানিয়ে দেই সে  যেন শিঘ্র ছেলেটাকে পাঠিয়ে দেয়।
দেখি বলে রাজিয়া বেগম ঘরের ভিতর গেল। একটু পরে ফিরে এসে বললো, না কোন টিকিত পেলাম না। বরং তুমি চিঠিটা রেখে যাও, আমি দারোয়ানকে দিয়ে  মেইল করে দিব।
আচ্ছা । তাই দিও বলে  চিঠিটা রাজিয়া বেগমের হাতে দিয়ে রকিব সাহেব বেড়িয়ে পড়লেন।
শরতের পড়ন্ত বিকেল । আকাশে খন্ড খন্ড মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে । বাগান বাড়িতে দোলনায় বসে বসে দোল  খাচ্ছিলেন রকিব সাহেব। মিনিও কেবল কলেজ থেকে  ফিরেছে । এক কাপ চা হাতে মিসেস রাজিয়া যাচ্ছিলেন বাগান বাড়িতে স্বামীর সাথে সময় দিতে যেখানে তিনি দোলনায় বসে দুলছেন। ঠিক সে সময় দারোয়ান এসে জানাল , ভাবী আপনাদের গ্রামের বাড়ি থেকে একটা ছেলে এসেছে। বাইরে অপেক্ষা করছে । তাকে আমি গেটের বাইরে দাঁড় করে রেখে এসেছি ।
কি নাম ?
বলল, আলীম ।
ঠিক আছে  মনে হয় সে তোমার স্যারের বন্ধুর ছেলে। তাকে ভিতরে আসতে দাও।
পায়ে স্যান্ডেল পাজামা আর শার্ট পড়া ঘাড়ে একটা ব্যাগ ঝুলাতে ঝুলাতে  গ্রাম্য বালক আব্দুল আলীম ধীরে ধীরে  বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল ।  রকিব চৌধুরীও এ সময়ে দোলনা ছেড়ে আস্তে আস্তে গেটের দিকে এগুচ্ছিলেন। আলীম এরই মধ্যে অনেকটা বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেছে। রকিব সাহেবকে সামনে পেয়েই  আলীম তাকে সম্বোধন করল, আসসালামু ওয়ালাইকুম।
ওয়ালাইকুম আসসালাম । জবাব দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আলীম ?
জ্বী , আমি আব্দুল আলীম ।
তোমার বাবা কেমন আছে ?
আলীম একটু বিমর্ষ হয়ে বলল ! বাবা তো নেই ।
নেই মানে ?
বাবা মারা গেছেন।
বল কী ?
আপনার পাঠান চিঠি আমাদের হাতে পৌঁছানোর কয়েক মাস আগেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন।
তার মানে ? মাহমুদ নেই । রকিব সাহেব মূর্ছে  পড়লেন । চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল ।
মিসেস রাজিয়া ও মিনি ছুটে এলো রকিবের কাছে । রাজিয়া তাকে বুকদাবা করে ধরে বললেন , চল , চল ঘরে চলো  বিশ্রাম নেবে। সেখানে এক  হ্নদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হলো । আলীম থ হয়ে সে দৃশ্যে দেখতে লাগল এবং মনে মনে ভাবল আসলেই মাহমুদ সাহেব এবং এই ভদ্রলোক আসলেই  প্রকৃত বন্ধু ছিল । মায়ের পেটের ভাই মারা গেলেও অনেককে এমন শোক পেতে দেখা যায় না।
নাস্তার টেবিলে আব্দুল আলীম  ও  মিনি খেতে বসেছে খাবার পরিবেশন করছেন মিনির মা  । তিনি আলীমকে  জিজ্ঞেস করলেন,  আলীম তুমি  ডিম আর পারোটা খাবে ? নাকি পান্তা ভাত খাবে । গাঁও  গ্রামে তো তোমরা সকালে পান্তা ভাত খেয়ে থাক ।আমরা তো আবার পান্তা ভাতে অভ্যস্ত নই ।
ডিম পারোটা চলবে ।
তার কথা শুনে মিনি মুখ নিচু করে হেসে উঠল ।
তার মা জিজ্ঞেস করল কি রে হাসলি যে ?
ডিম পারোটার চাকা আছে নাকি যে চলবে ? গাঁইয়ে , গাঁইয়ে ভূত । ডিম পারাটা চলবে ।
রাজিয়া বললেন , তুমি ওর কথায় কিছু মনে কর না বাবা ! ও  আমার পাগলি মেয়ে । সব সময় ওরকম কথা বলে ।
না, না আমি কিছু মনে করিনি কাকিমা।  জানেন না পাগলে কিনা বলে ছাগলে কিনা খায় । আমার বোন আলো সেও সব সময় আমার সাথে লাগে । আমার প্রতি কাজে কথায় সে আমার একটা খুত  ধরবে । আর সব সময় আমার সাথে ঝগড়া । এখানে আসার আমায় সে খুব কেঁদেছে । আমার সাথে ঝগড়া করলে  কি হবে আসলে কিন্তু সে আমায় খুব ভালোবাসে । সে তো আমার বোন আলোরই মত পাগলি , কাকিমা ।
জ্বি না। সবাই আপনার বোন আলোর মত পাগলি নয়, বুঝলেন মিষ্টার আব্দুল  আলি ?  যে বলে পাগলে কিনা বলে ছাগলে কিনা খায়। সেই পাগল ।
আমার নাম আব্দুল আলি নয় ? আব্দুল আলীম । জানেন না ? আব্দুল আলীম ছিলেন পল্লীগানের বিখ্যাত শিল্পী । আমার বাবা তাকে খুব পছন্দ করতেন তাই তার নামে আমার নাম রেখেছেন আব্দুল আলীম । আপনি কি জানেন ? সেই ভদ্রলোকের জন্মও আপনাদের শহরে নয় , গ্রামে । মুর্শিদাবাদের তালিবপুর । বড় বড় জ্ঞানী গুণি তাদের সবার জন্ম  শহরে নয় , অনেকেরই গ্রামে।
মিনি মুখ ভেংচিয়ে  বলে উঠল , ষ্টুপিড গাঁইয়ে  ।
ইতিমধ্যে রকিব সাহেব সেখানে এসে মিনির উদ্দেশ্যে বললেন ,নাও আর ঝগড়া নয় তাড়াতড়ি খেয়ে ওঠো। কলেজ যেতে হবে না ?
মিসেস রাজিয়া বললেন আলীম তুমি ওকে আপনি নয় তুমি করেই বলবে । মিনি তোমার বোন আলোর চেয়েও  ছোট ।
আলীমকে উদ্দেশ্য করে রকিব সাহেব বলেলন, তোমার খাওয়া হলে চলো আমার সাথে সাইডে যাবে। তোমার জন্য একটা কাজ ঠিক  করেছি । আমার ফার্মে সোহেল নামে এক সুপারভাইজার আছে তার সাথে থাকবে , আপাততঃ সাত হাজার টাকা করে পাবে । কাজকর্ম শিখে নিলে বেতন আরও বাড়িয়ে দেব । তুমি  কি ড্রাইভ করতে জান ? জানলে ভাল হত । মিনিকে মাঝে মধ্যে কলেজে পৌঁছে দিতে এবং নিয়েও আসতে। আর এই নাও সাত হাজার টাকা তোমাকে অগ্রিম  দিলাম । টাকা গুলো তোমার মাকে আজই পাঠিয়ে দাও । তোমার বাবা নেই এ সময়ে তাদের টাকা-পয়সার খুবই প্রয়োজন। বললেন রকিব চৌধুরী ।
কাকু আপনি সত্যিই ভাল মানুষ ।  কি বলে যে আপনাকে কৃজ্ঞতা জানাব ।
কৃজ্ঞতা জানাতে হবে না। তোমার বাবা ছিল  আমার বাল্যবন্ধু , আর সেই বন্ধুর অবর্তমানে তার পরিবারকে সাহায্য করা আমার কর্তব্য বলে মনে করি ।
আলো ভরদুপুরে পুকুরের সান বাঁধনো ঘাটে চুপচাপ বসে ভাবছে । মা শ্বাস কষ্টের রোগী প্রায়দিন তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আবার ফিরে ওঠেন সেখান থেকে । আর বাবা দিব্যি সুস্থ্য মানুষটি এই পুকুর ঘাটে পড়ে সেই যে শয্যা নিলেন আর উঠলেন না। দেখতে দেখতে আজ চারটি মাস হয়ে গেল  বাবা চলে গেলেন । তিনি যে এমন হঠাৎ সবার মায়া ছেড়ে চলে যাবেন সে কখনও ভাবতে পারে না । যার যাবার কথা সেই মা এখনও বেঁচে আছেন , আর বাবা সুস্থ্য মানুষটি চলে গেলেন সবার অগোচরে । বাবার কথা ভাবতে ভাবতে চোখের কোন দিয়ে অশ্রু  গড়িয়ে যায় আলোর । শড়ির আঁচল তুলে মুছে ফেলে সে অশ্রুজল  । এমন সময় ছোট বোন আলিয়া একরকম নাচতে নাচতে একটি চিঠি নিয়ে আলোর কাছে এসে বললো ,আপু  ও আপু  দেখ পোষ্ট মাষ্টার  কাকু এই মাত্র আমার কাছে একটা চিঠি দিল । ভাইয়া লিখেছে ঢাকা থেকে। পিতৃ হারানোর শোক ভুলে ভাইয়ের চিঠি পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠল আলো । আলিয়ার কাছে জিজ্ঞেস করল , সত্যি ?
আরে সত্যি নাতো মিথ্যে বলছি নাকি বলে সে চিঠিটা তার দিকে উচিঁয়ে ধরে বলল, এই দেখ ।
আলো ঘাট থেকে উঠে বলল , চল , চল মার কাছে যাই । ভাইয়া ঢাকা যাওয়ার পরে মা অস্থির হয়ে পড়েছেন তার  জন্যে । চিঠিটা হাতে মায়ের কাছে এসেই বললো, মা , মা ভাইয়ার চিঠি এসেছে ঢাকা থেকে ।ছেলের চিঠি পেয়ে মা সব ভুলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন । বললেন , কি লিখেছে খোল, খুলে পড় ।
আলো পড়তে শুরু করল, শ্রদ্ধেয়া মা আমার সালাম নিবেন । আমি কাকুর বাসায় ঠিক মত পৌঁছেছি পথে কোন অসুবিধে হয়নি । কাকু -কাকিমা খুবই ভাল মানুষ । কাকুর নিজ ফার্মে আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন । মাসে সাত হাজার টাকা মাইনে । কাজ কর্ম ভাল করে শিখলে মাইনে আরো বাড়িয়ে দেবে বলেছেন ।
মা অবাক হয়ে বললেন , সাত হাজার টাকা সে তো অনেক টাকা রে ? পড় , পড় আর কি লিখেছে ?
কাকুর সাইডের কাজ কর্ম দেখা শোনা করার জন্য  একটি গাড়িও দিয়েছে । মিনি নামে তার একটি মেয়ে আছে মাঝে মধ্যে তাকে কলেজে নামিয়ে এবং নিয়েও আসতে হবে । ভারি দুষ্ট মেয়ে সব সময় আলোর মত আমার পিছে লাগবে ।
হে খোদা ,তুমি এত করুণাময় দয়াবান । আগে তো জানতাম না । আলীমের এত উন্নতি হবে আমি তো কখনও ভাবতেই  পারিনে , গাঁয়ের ছেলে গরুর গাড়ির বদলে এখন মোটর গাড়ি চাপছে । আজ তোর বাবা বেঁচে থাকলে যে কি খুশী হতেন । কি থামলি যে  ?
আলো আবার শুরু করল,এক মাসের মাইনে অগ্রিম  দিয়ে কাকু বললেন, টাকাটা যেন আজই তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দেই। আলোকে ব্যাংকে খোঁজ  নিতে বলো টাকাটা কখন পৌঁছে ? সে যেন কলেজে খোঁজ নেয় তাকে আবার কলেজে ভর্তি করে দিব । ইনশাল্লাহ, আমাদের টাকা-পয়সার এখনতো টানাটানি থাকবে না । আলিয়া কি করে ওকি ঠিক মত স্কুলে যায় ? নাকি সারাদিন দুষ্টমি আর খেলাধূলা নিয়ে মেতে থাকে । আলো ও আলিয়াকে আমার আদর আর ভালবাসা দিবেন । ইতি –আপনার  স্নেহধন্য, আব্দুল আলীম ।
কালা জাহাঙ্গীর ও তার সতীর্থের আস্তানায় আলোচনা হচ্ছে রকিব চৌধুরীর কাছ থেকে  কিভাবে চাঁদা তোলা যায় । আরে শালারা ফন্দি একটা বের কর।  নইলে না খেয়ে মারা যাব যে । তাদের ভিতর কানা লিটন বলে এক যুবক  ছিল । চাঁদাবাজি করতে যেয়ে প্রতিপক্ষের সাথে সংঘর্ষে চাপাতীর কোপে একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছে  । তাই সবার কাছে সে কানা লিটন নামে পরিচিত। সে হুররে  হুররে বলে চিৎকার করে উঠল , ওস্তাত ফিকির মাৎ কর , ফন্দি মিল গিয়া।
আরেকজন বলে উঠল আরে হালা চিল্লাস পরে  কি   ফন্দি পাইলি আগে তাই ক?
তয় হোন , আগামি পহেলা ফাল্গুন হ্যাগো কলেজে  বাসন্তি মেলা । আর হ্যে মেলায় রাইতে কলেজে নাচ গানও অইব ।
আরে হ্যায়ডা ক্যাডা ?
হ্যায়ডা ক্যাডা বুঝলি না ? রকিব্যার মাইয়া মিনি । মিনি ঢাকা কলেজে পড়ে , ভাল নাচ গানও গায় । বাসন্তি মেলার নাচ গান কইরা রাইতে যখন বাড়িত ফিরব ঠিক  তখনই তারে কিডনাপ করতে অইব । কিডনাপ কইরা তার বাপেরে খবর দিতে অইব মুক্তিপণের ট্যাহার লাইগ্যা  । বড় আদুরে মাইয়া ,তখন দুই চার লাখ যা চাইবি  পাওন যাইব ।
আরেক সাঙ্গ জিজ্ঞেস করল, হ্যাগো কলেজে নাচ গান অইব তুই  জানোস ক্যামনে ? তুই তো কলেজ যাস না।
আমাগো মহল্লার সাদেইক্যা তাগো কলেজে পড়ে  হ্যার কাছে।
জাহাঙ্গীর খুশীতে ডগমগ হয়ে লিটনের পিঠ চাপড়িয়ে বলল , ইয়েস তাই হবে । আমি তো মনে করছিলাম তুই একটা বোকার হদ্দ, শুধু মারই খাস । এখন দেখছি তোর হালার বুদ্ধিও আছে । মিষ্টার রকিব এবার তোমার কাছ থেকে পাঁচলক্ষ টাকা আদায় করে ছাড়ব । আরে যা হুইসকির বোতলটা নিয়ে আয় একটু মৌজ করা যাক ।
সেদিন কলেজ থেকে ফিরে এসে মিনি  তার মাকে জানাল , মা এবার বসন্তকালের আগমনে আগামি পহেলা ফাল্গুন আমাদের কলেজে বসন্ত বরণ অনুষ্ঠান হবে ।  সন্ধ্যায় কলেজে একটা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও থাকবে । তুমি আব্বুকে বুঝিয়ে বলো ঐদিন আমার ফিরতে একটু রাত হবে ।
দিনকাল বেশী ভাল না । তোর কি  না গেলে নয় ?
না মা, আমার যেতে হবে । বন্ধু বান্ধবীদের কথা দিয়েছি , তাছাড়া অনুষ্ঠানে আমার একটা গানও গাওয়ার কথা আছে ।
ঠিক আছে যাবি যখন আলীমকে  সঙ্গে নিয়ে যা । সে তোকে ড্রাইভ করে  দিয়ে নিয়ে যাবে এবং নিয়েও আসবে । সে সাথে থাকলে তোর একজন নিরাপত্তা রক্ষীও হবে ।
অনুষ্ঠান শেষে মিনি কেবল কলেজ গেট থেকে বেড়িয়েছে এমন সময় হঠাৎ একটা পজেরো জীপ এসে তার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ।
মিনিও হণ হণ করে গাড়ি থেকে নেমে এসে বলল , হোয়াট ইজ দিস ?  এ রকম গাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামালেন কেন ?
প্রত্যুত্তরে গাড়িতে থাকা একজনে বলল , তোমাকে দেখব বলে রাণী ।
সাট আপ । আমার নাম রাণী নয় । মিনি ।
আমিও জানি। রকিব চৌধুরীর আদরের দুলালি। মিনির কথা শেষনা হতেই সে বলে উঠল।
তো ? তাই বলে গাড়ির সামনে গাড়ি থামাবেন । যদি এ্যাকসিডেন্ট হতো ?
হয় নাই , হবে ।
তার মানে ?
মানে পরিস্কার ।
তোমায় এক্ষুণি আমাদের সাথে যেতে হবে ।
কোথায় ?
আমাদের আস্তানায় , তুমি এখন আমাদের হাতে বন্দি । আমাদের ঠিক এই মুহূর্তে পাঁচ লাখ টাকার দরকার । তোমার বাবার অনেক টাকা । চাইলে তো তিনি এমনি   দিবেন না । তোমাকে তুলে নিয়ে তার কাছ থেকে এ টাকাটা আদায় করতে হবে । তোমার বাবা টাকা না  দিলে কি হবে তা নিশ্চয় তোমার জানা আছে ? সবার ভাগ্যে যা ঘটে তোমারও তাই ঘটবে ।
মিনি চিৎকার করে উঠল , তোমরা কে কোথায় আছ আমাকে বাঁচাও , আমাকে গুন্ডায় ধরেছে ।
এ সময় তাদের একজন মিনির মুখ চেপে ধরে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছিল । আলীম এতক্ষণ গাড়িতে বসে বসে তাদের তর্কাতর্কি  শুনছিল । যখন দেখলো মিনিকে জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছে সে  গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে মিনির মুখ চেপে ধরা লোকটার নাক মুখ জুড়ে ঘুষি মারতেই সে পড়ে গেল । আর ঠিক সেই মুহূতের্  আরেক লোক এসে আলীমের মাথায় রামদা বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আলীমও মাটিতে লুটিয়ে পড়ল । ইতিমধ্যে অনেক লোকজন এসে পড়লে গুন্ডাগুলো পালিয়ে গেল । লোকজন আলীমকে মিনির গাড়িতে তুলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে  নিয়ে গেলো ।
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসেই মিনি তার বাবাকে ফোন করল , বাবা তুমি তাড়াতাড়ি এখানে চলে এসো ।গুন্ডারা আলীম ভাইকে ছুরি মেরেছে । তাকে নিয়ে আমি হাসপাতালে আছি ।
কে? কেন তাকে ছুরি মেরেছে ?
এখন বলার সময় নাই, সে সিরিয়াস । তুমি তাড়াতাড়ি এসো । আসলে সব জানতে পারবে ।
রকিব সাহেব স্বস্ত্রীক হাসপাতালে চলে এলেন। তিনি যখন এলেন আলীম তখন জরুরী বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে  । আর মিনি তারই সামনের ওয়েটিং রুমে বসে আছে । সে তার বাবাকে আদ্যোপান্ত জানাল ।
মিনির মা বলল , এ মূহুর্তে তো আলীমের মাকে একটা খবর দেওয়া দরকার । ছেলেটার যদি কিছু হয়ে যায় ।
হ্যাঁ দিতে তো হবেই । জবাব দিলেন রকিব সাহেব ।
কিছুক্ষণ পরে  আলীমকে স্ট্রেচারে করে ঠেলে নিয়ে  বেরিয়ে এলেন ডাক্তার ও নার্সেরা । মিনি ও তার মা বাবা  এগিয়ে গেল তার দিকে। মিনি পরিচয় করিয়ে দিল ডাক্তারকে তার মা বাবার। ডাক্তার বললেন ,অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে , ভয়ের কিছু নেই । অল্প  দিনের মধ্যেই সে সুস্থ্য হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ । চোটটা মাথায় তো তাই রক্তক্ষরণটা একটু বেশী   হয়েছে । আমরা প্রথমে মনে করছিলাম হয়ত রক্ত দেওয়া লাগতে পারে , কিন্তু তা আর লাগবে না । সপ্তাহ খানেক তাকে হাসপাতালে থাকতে  হবে ।
সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল খুলনা । সর্বদা ব্যস্ত এ  টার্মিনাল । ছোট বড় মাঝারি নানান ধরণের যানবাহন রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা উপজেলা,শহর বন্দর, মফস্বলে ছুটে যাচ্ছে এবং ছুটে আসছে । আলো,আলিয়া ও তাদের মা ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসের  টিকিট কেটে ওয়েটিং রুমে বসে আছে । সাতক্ষীরা থেকে একটা বাস আসলো টার্মিনালে ।  তড়িঘড়ি করে এক বয়স্ক দম্পতি নেমে এলো সে বাস থেকে সঙ্গে আঠার বিশ বয়সের এক যুবক । আলোরা যেখানে বসে ছিল ঠিক তার পাশে দু’টো খালি চেয়ার থাকায় যুবকটি জিজ্ঞেস করল, এখানে কি কেউ  আছেন ?
আলো জবাব দিল, না ।
যুবকটি কাঁধের ব্যাগটি চেয়ারে রেখে তার  মা বাবার উদ্দেশ্যে বলল, আপনারা  এখানে বসেন । আমি টিকিট নিয়ে আসি ।
সে কাউন্টারে গেলে আলো মহিলাকে   জিজ্ঞেস করল , আপনারা ঢাকা যাবেন বুঝি ?
হ্যাঁ। আমার বড় ছেলেটা ঢাকায়  থাকে । সে যে মালিকের কাজ করে তার মেয়েকে দূর্বৃত্তেরদের হাত থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে জখম হয়ে হাসপাতালে গিয়েছে । জানিনা মা ছেলেটা কেমন আছে  ?
আলোর মা বলে উঠল , বুবু বলেন কী ? আমার ছেলেরও একই রকম ঘটনা । মালিকের মেয়েকে কলেজের কি এক অনুষ্ঠান থেকে  আনতে গেলে চাঁদাপাট্টির গুন্ডারা মেয়েটাকে তুলে নিতে চেষ্টা করে । তাদের কবল থেকে মেয়েটাকে রক্ষা করতে গিয়ে গুন্ডাদের আঘাতে আমার ছেলেও হাসপাতালে । হুতাস করে বললেন,কী যে হলো দেশটার। নিরাপদে বাঁচার উপায় নেই ।
একই বাসে পাশাপাশি সীট নিয়ে আলাপচারিতার  মধ্যদিয়ে  একসঙ্গে ঢাকা গাবতলী বাস টার্মিনালে  এসে   পৌঁছাল । গাবতলী পৌঁছে ভদ্র মহিলা আলোর মাকে বললেন বুবু , আল্লাহ আপনার ছেলের মঙ্গল করুন । তাড়াতাড়ি যেন সুস্থ্য হয়ে ওঠে । আমরা তবে আসি ।
তিনি আপনার ছেলেরও মঙ্গল করুন । আমার ছেলে যার অধীনে চাকরি করে সে তার বাবার বন্ধু , আমরা এখন তার ওখানেই যাচ্ছি । তাকে সঙ্গে নিয়েই আমরা হাসপাতালে যাব ।
রকিব সাহেব তার পরিবারবর্গ এবং আলো , আলিয়া ও তার মা সবাই একসঙ্গে হাসপাতালে এলো । তারা হাসপাতাল কেবিনে ঢুকেই চমকে গেল , একি সেই মহিলা এখানে ? যার সাথে বাস টার্মিনালে দেখা  হয়েছিল । মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা আলীম তার একান্ত কাছে বসে আছে । আর মহিলা তার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
রকিব সাহেব কেবিনে  ঢুকেই ডাক দেয়  আলীম ?
মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা ছেলেটা ফিরে তাঁকায় তার  দিকে ।
আলোর মা এবারে আরো চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে  ওকে ?
রকিব সাহেব জবাব দেয় আলীম !
না , সে আলীম নয় ।
তার মানে ? সেই তো আলীমের পরিচয়ে আমার কাছে এসেছে।
না সে আলীম  নয় , সে অন্য কেউ ?
রকিব সাহেব উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল কী তুমি আলীম  নও ? তবে তুমি কে ? আর এরা বা কারা ?  আলীমই বা কোথায় ?
না , আমি আব্দুল আলীম নই। আবুল কাসেম । আর এই এরা আমার মা বাবা । আমাদের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর। পরিস্থির শিকারে আমি এ অভিনয় করতে  বাধ্য হয়েছি এবং তা আপনাদেরই স্বার্থে ।
আমাদের স্বার্থে ? উত্তেজিত হয়ে রকিব চৌধুরী জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ , আপনাদের স্বার্থে ।
এক বেকার যুবক । বিএ পাশ করে  বেকারত্বের অভিশাপ বুকে নিয়ে চাকরির আশায়  এ অফিস থেকে ওঅফিস  চরকির মত ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম । সেদিন কল্যাণপুরে এক অফিস থেকে চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়েছি । এমন সময় আলীমের সাথে দেখা । একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে আমায়  জিজ্ঞেস করল,
এই যে ভাই শুনুন ,  এই ঠিকানাটা চেনেন ?
কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলাম , কবি জসিম উদ্দীন রোড কমলাপুর , ঢাকা ।
এটা তো কমলাপুর নয় । আপনি এসে পড়েছেন কল্যাণপুর ।
কল্যাণপুর , এটা কলমাপুর নয় ? দেখুন তো ভাই শহরের ট্যাক্সিওয়ালারা কি বদমাইশ ? গাবতলী থেকে আমি তাকে বললাম , আমি কমলাপুর যাব আর সে কিনা আমাকে কল্যাণপুরে এনে ছেড়ে দিল । তাহলে বলুন তো ভাই কি ভাবে কমলাপুর যাওয়া যায়? তাকে কমলাপুরের ডাইরেকসান দিলাম ।

[ লেখা পাঠানঃ
শনিবারের চিঠির সাহিত্য পাতায় প্রতি শনিবার  কবিতা, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী প্রভৃতি প্রকাশিত হয় । আপনি লেখা  পাঠাতে চাইলে আপনার লেখা সংযুক্ত করে নিচের ইমেইল ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন। লেখার সঙ্গে অবশ্যই ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে হবে। ইমেইলঃ editor@thesaturdaynews.com ]
——————————————————————————————————–
আলীম চলে যেতেই গুলির শব্দে এলাকা কম্পিত হয়ে উঠল । রাজনৈতিক দুটি পক্ষ এক পক্ষ আরেক পক্ষকে আক্রমণক করেছে। গুলির শব্দে ভীতসন্ত্রস্ত লোক জন দ্বিগবিদিক ছুটছে। হঠাৎ করে হায় হায় রব উঠল । ভীড় ঢেলে গিয়ে চেয়ে দেখি গুলি খাওয়া হতভাগা সেই ছেলেটি আলীম। যে আমার কাছে একটু আগে কমলাপুর যাওয়ার ডাইরেকশান চেয়েছিল। গুলিটা মস্তক ভেদ করে চলে গেছে । অনেকটা রক্ত  বেরিয়ে গেছে।
উপস্থিত লোকজনের সহযোগীতায়  একটি ট্যাক্সি ডেকে তাকে হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করলাম।  তার সাথে আমিও ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম ।
ট্যাক্সিতে উঠে তার মাথার রক্ত মুছতে মুছতে পরিচয় জিজ্ঞেস করলাম ,আচ্ছা ভাই তোমার নাম কি ?
আমার নাম আলীম , আব্দুল আলীম ।
তোমার বাড়ি কোথায় ? মানে তোমার এই অবস্থা  বাড়িতে খবর দিতে হবে তো !
বাড়ি বাগেরহাট , টেংরাখালি গ্রাম ।
বল কী ? আমার বাড়িও দক্ষিণাঞ্চলে। শ্যামনগর, সাতক্ষীরা ।
আলীম আবার বলতে শুরু করল, বাবার নাম মাহমুদ শরীফ,স্কুল শিক্ষক ছিলেন । তিঁনি বেঁচে নেই । গত চার মাস আগে  তিনি মারা গেছেন। মা শ্বাসকষ্টের রোগী । আমার এ্যাকসিডেন্টের খবর তাঁকে দেয়া যাবে না। তিঁনি এ খবর পেলে হার্টফেল করে মারা যাবেন । তা হলে আমার বোনদের কে দেখবে ? ওরা যে এতিম হয়ে যাবে । আমার দুই বোন, আলো ও আলিয়া । আলো ইন্টারমেডিয়েট পাশ করে বাড়িতে বসে আছে। আর্থিক অনটনে তাকে আর পড়াতে পারিনি।
ঢাকায় কোথায় এসেছিলে ?
এক চাচার বাসায় যাচ্ছিলাম । বাবার বন্ধু , রকিব উদ্দিন চৌধুরী । বিরাট বড় লোক , শিল্পপতি । তিনি আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। সে চাকরি  বোধহয়  আমার  আর করা হলো না। আমার মা বোনদের তো কেউ নেই। তা হলে ওদের কি হবে ?
ওসব  কথা ভাবছ কেন ? ওসব কথা তুমি পরে ভেব ।
সেই মৃত্যুপথ যাত্রী আলীম কুকড়িয়ে কুকড়িয়ে আমায় জিজ্ঞেস করল,আচ্ছা ভাই, আপনি কি করেন?
আমি বেকার।
বিএ পাশ করে চাকরির জন্যে ফ্যা ফ্যা করে  ঘুরছি  ।
আমি সামান্য লেখা পড়া করেছি ,ক্লাশ টেন পর্যন্ত। মাধ্যমিক পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি ।  আমি বুঝতে পারছি , আমি আর বাঁচবনা ভাই ,বাঁচবনা । আপনি আমাকে একটা  কথা দিন ।
কি কথা ? বল ।
আপনি আমার হয়ে রকিব চৌধুরীর সাথে দেখা করুন । তিনি আপনার একটা  চাকরির ব্যবস্থা করে দিবেন । আর সে চাকরি পেলে আমার মা বোনকে দেখবেন । ওদের তো দেখার আর কেউ নেই ।
কিন্তু রকিব সাহেব আমায় চাকরি দেবেন কেন?
দেবেন, নিশ্চয় দেবেন । আপনি আলীম সাজবেন। আলীম সেজে তার বাড়িতে যাবেন । তিনি তো আমাকে দেখেননি । এই ব্যাগের মধ্যে বাবাকে দেওয়া তার হাতের লেখা চিঠিটাও আছে। তার নিজের হাতের লেখা চিঠি দেখলে বুঝবে আপনিই আসল আলীম ।
পুরো পরিবার নিরব হয়ে এ কাহিনী শুনতেছিলেন। এবার আলোর মা অশ্রু বিজরিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন ,তারপর ? তারপর কি হলো ?
আমরা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই আলীম ট্যাক্সিতে মারা গেল।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পোষ্টমর্টের পরে আমাকে  আলীমের আত্মীয় ভেবে মরদেহটা আমারই হাতে তুলে দিল । তখন কিযে করি  কি করব বুঝতে পারছিলাম না। আপনাদেরও খবর দিতে বারণ করেছে। দু’ চারজন বন্ধু ডেকে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের সহায়তায় আজিমপুর কবরস্থানে তাকে কবর দিয়ে তার শেষ কার্যটি আমরাই সম্পন্ন করলাম ।
বন্ধুদের সাথে সলাপরামর্শ করে অবশেষে  আমি আলীম সাজলাম । ভাবলাম মাসে মাসে দু’ চার হাজার টাকা পেলে আপনাদের অনেক উপকার হবে আর আমার মা বাবাকে কিছু দিতে পারলে তারাও উপকৃত হবেন। পরে সময় সুযোগ হলে আসল ঘটনাটা আপনাদের খুলে বলব। সে সুযোগ আসার আগেই এ দূর্ঘটনা ।
রকিব সাহেব বললেন , তুমি যাই করেছে না কেন এটা একটা রীতিমত প্রতারণা । এ প্রতারণার একটা শাস্তি হওয়া দরকার । এখনই পুলিশ ডেকে তোমাকে তাদের হাতে সোর্পদ করা উচিৎ ।
রকিব সাহেবের স্ত্রী রাজিয়া একটু রেগে বললেন , এ তুমি কি বলছ ? সে কর্ত্যবের খাতিরে একটা প্রতারণা করলেও কোন অন্যায় তো করেনি। তোমার ব্যবসা বণিজ্যে কোন রকম ক্ষতি করেনি বরং সে না থাকলে তোমার ব্যবসার অনেক ক্ষতি হতো ।
মিনি তার বাবার কাছে এসে বলল, বাবা তোমার  কি মাথা খারাপ ? তুমি  কি একবারও ভেবে দেখেছ সে না থাকলে তোমার মেয়ে এতক্ষণে দূর্বৃত্তদের হাতে বন্দি হয়ে যেত । তোমার লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে আমাকে উদ্ধার করতে হতো । নইলে রাস্তার পাশেই তোমার মেয়ের লাশ পরে থাকত ঐ আলীমের মত।
আলীমের মা এবার কান্না থামিয়ে বলেলন , না ভাই ওকে পুলিশে দেবেন না । আলীমের মৃত্যু খবরটা আমাদের না জানালেও সে তার কর্তব্যে কোন আবহেলা করেনি । বরং  আলীমের কথা রেখেছে । প্রতি মাসে টাকা পয়সা দিয়ে আমাদের  পরিবারটিকে  সচ্ছল রেখেছে। যা আজকাল নিজের গর্ভের সন্তানেও করে না। তারই ইচ্ছায় আলো আবার কলেজে ভর্তি হয়েছে যা আপনার বন্ধু বেঁচে থাকতেও সম্ভব  হয়নি ।
কাসেমের মা বাবা স্তব্দ হয়ে শুধু সবার মন্তব্যগুলো শুনতে ছিলেন কিছুই বলছিলেন না , যেহেতু তাদের ছেলে অপরাধী ।
রকিব সাহেব এবার ভাবগম্ভীর হয়ে বললেন , আমি  কি তাকে পুলিশে দিচ্ছি নাকি ? এমন দায়িত্ব-কর্তব্যবান সোনার ছেলেকে  কি পুলিশে দেওয়া যায় ? শুধু তার সর্ম্পকে সবার মনের খবরটা নিচ্ছিলাম মাত্র ।  তিনি কাসেমের মা বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনাদের কোন  আপত্তি না থাকলে  পুলিশ না ডেকে আমি এখনই  কাজী ডেকে আনি । আমার বন্ধুর অবর্তমানে তার সংসারটি সে যেভাবে আগলিয়ে রেখেছে সে দায়িত্ব থেকে যাতে সরে যেতে না পারে তাই আমার বন্ধুঝি আলোর সাথে তার বিয়ে  দিয়ে  একটা পাকাপোক্ত কয়েদি করে রাখতে  চাই ।
প্রচণ্ড ঝড়ের পর হঠাৎ সূর্যের আলো দেখা গেলে সবার মনে যেমন স্থতির দেখা মেলে কাসেমের মা-বাবার মনেও তেমন  স্থতি ফিরে এলো । চোখে মুখে হাসির ঝিলিক দেখা গেল ।  এ সময় আলো লজ্জা পেয়ে তার মায়ের আঁচলে মুখ লুকালো ।
মিনি এসে আলোকে  জড়িয়ে ধরে বললো , কি আপা লজ্জা পাচ্ছ বুঝি ! এ সময় কাসেমও এক নজর তাকালো আলোর দিকে।
রকিব সাহেব কাসেমের বাবার দিকে এগিয়ে বললেন, আসুন বেয়াই সাহেব আমরা সব ভুলে এদের বিয়ের ব্যবস্থা করি । তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ।


আটলান্টা, জর্জিয়া ।।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ২:৩১ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৪ আগস্ট ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com