মিনি উপন্যাস ( ধারাবাহিক )

করোনা ও কফিন

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব

শনিবার, ১২ জুন ২০২১

করোনা ও কফিন
প্রচ্ছদঃ সংগৃহিত

অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙে আদ্রিয়ানার। সার্প সাতটা। বকের পালকের মতো শুভ্র লেপের তলা থেকে কচ্ছপের মতো মাথা ও শরীরটা ঈষৎ বের করে ক্রমাগত আর্তনাদরত ঘড়িটা এক হাতে বন্ধ করে সে। তারপর তন্দ্রাতুর শরীরটা আবার সুড়সুড় করে ঢুকে যায় কোয়েল্টের নিচে। এটা আদ্রিয়ানার চিরকালের অভ্যাস। একবারে কিছুতেই উঠতে পারে না সে। মিনিট পনেরো এভাবে শুয়ে থাকবে লেপের তলায়। তারপর কিছুক্ষণ বিছানায় আড়মোড়া ও গড়াগড়ি দিয়ে তবেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসবে। হঠাৎ আদ্রিয়ানার মনে হলো বিছানাটা কেমন যেন আর্দ্র আর্দ্র লাগছে। অদ্ভুত একরকম স্যাঁতসেঁতে অনুভূতি। এক ঝটকায় লেপটা সরিয়ে দিতেই বিস্ফারিত চোখে সে তাকাল বেডশিটের ওপর। রক্তজবার মতো লাল রক্তে ভিজে আছে বিছানার মাঝখানটা। সমস্ত চাদরটা যেন দেখাচ্ছে জাপানের পতাকার মতো। আরেব্বাস! রাতে তার রজস্বলা হয়েছে, সে টেরই পায়নি। আজ তো ঋতুস্রাব হওয়ার কথা নয়। ধার্য তারিখ আরো দুদিন পর। জলের স্রোতের মতো হঠাৎ এমন রজোদর্শনে খানিকটা

উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে আদ্রিয়ানা। এর কারণ, দিন দশেক আগে একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে প্রেমিক লুকার সঙ্গে অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন তাদের খুব কমই হতে হয়; কিন্তু সেবার কীভাবে যে কী হয়ে গেল।


লুকার সঙ্গে আদ্রিয়ানার সম্পর্ক বছরতিনেক ধরে। লুকা দেখতে ওরকম আহামরি সুদর্শন পুরুষ নয়। গড়পড়তা চেহারা, উচ্চতা মাঝারি গোছের। আদ্রিয়ানার মাথা বরাবর। দুজন একসঙ্গে হাঁটলে বরং আদ্রিয়ানাকেই লম্বা মনে হয়। তবে লেখাপড়ায় অতি মেধাবী ও চৌকস লুকা। প্রচণ্ড ধীসম্পন্ন পুরুষ। লোম্বার্দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ছাত্র লুকাও। আদ্রিয়ানা নিজেও তার শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে বেশ খুঁতখুঁতে। এ-জমানায় সুন্দরী হতে হলে ক্ষীণাঙ্গী হতে হয় কিন্তু আদ্রিয়ানার শরীর পূর্ণবিকশিত। প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুপরিপুষ্ট। দেহ একটু ভারী, সেজন্য চলাফেরাও ঈষৎ মন্থর। আদ্রিয়ানার মুখাবয়বে স্নিগ্ধতার স্পর্শ নেই। আদ্রিয়ানা প্রায়ই রসিকতা করে বলে – জানো তো লুকা, ঈশ্বর আমাকে তৈরি করার সময় চেহারায় লাবণ্যের ময়ান দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। লুকা হেসে বলে – তোমার ক্ষেত্রে ঈশ্বর যদি লাবণ্যের ময়ান দিতে ভুলে গিয়ে থাকেন তবে আমার ক্ষেত্রে ঈশ্বর নির্ঘাত সার দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। দেখো না দীর্ঘকায় সব মানুষের ভিড়ে আমি কেমন খর্বকায় হয়ে রইলাম। লুকা দেখতে রাজপুত্র নয়, এটা ঠিক। আয়-রোজগারও কিছু নেই। ছাত্র মানুষ। সেজন্য আয়-রোজগারের প্রশ্ন অবান্তর। শুধু বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আদ্রিয়ানার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে বলে সে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করেছে লুকার কাছে।

আদ্রিয়ানার বাবা মারিও দিনি গোঁড়া ও প্রাচীনপন্থী মানুষ। মা-মরা একমাত্র মেয়েকে সেজন্য সে সবসময় কঠোর শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বড় করেছে। জীবনের সংকীর্ণ এই জানালা দিয়ে যতটুকু দেখা যায় ততটুকুই আদ্রিয়ানার পৃথিবী। তার বাইরে নিষিদ্ধ এলাকা। সুতরাং প্রত্যক্ষ জীবনের সংকীর্ণ গণ্ডি নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। ঘরের জীবনকে বাইরে প্রসারিত করার অথবা বাইরের জীবনকে ঘরে আহ্বান করার স্বচ্ছন্দ অধিকার তার কখনোই ছিল না। তাছাড়া মা নেই বলে সংসারের প্রতিকূল স্রোত ও ঝড়ো বাতাসগুলো ছোটবেলা থেকে প্রতিনিয়ত আদ্রিয়ানার শরীরের ওপর দিয়েই বয়ে যায়। বর্ষার নদীতে বাঁশের খুঁটির মতো সে থরথর করে কাঁপে বটে, কিন্তু ভেসে যায় না।

আদ্রিয়ানা সোজা ছুটল স্নানঘরে। প্রাতঃকৃত্য সেরে ও নিজেকে গুছিয়ে ভাবতে লাগল, এক্ষুনি বাবাকে ডেকে তোলা দরকার। বাবা নিশ্চয়ই অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বাবার ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে আদ্রিয়ানা হাঁক ছাড়ল – বাবা এখন কি উঠবে নাকি ঘুমাবে আরো কিছুক্ষণ। ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আদ্রিয়ানা পুনরায় হাঁক ছাড়ল – বাবা সকাল হয়ে গেছে। তুমি কি উঠবে এবার। নাকি ঘুমাবে আরো কিছুক্ষণ? এবার সাড়া পাওয়া গেল।

মারিও দিনি তন্দ্রা-মেশানো কণ্ঠে বললেন, কাজ সেরে তুই দোকানে চলে যা। আমি দুপুরের দিকে আসব। শরীরটা ভালো লাগছে না। আদ্রিয়ানা সন্ত্রস্ত হয়ে বলল,  জ্বরটর আসেনি তো আবার। দরজাটা খোলো। তোমার শরীরটা একটু দেখে যাই। মারিও ওপাশ থেকে বললেন – তেমন কিছু নয়। শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে। সারারাত ঘুম হয়নি। শেষরাতের দিকে কেবল চোখদুটো ধরে এসেছিল একটু। কাঁচা ঘুম ভেঙে এখন আমি দোকানে যেতে পারব না। আদ্রিয়ানা আশ্বস্ত হয়ে বলল, তুমি তাহলে ঘুমাও আরো কিছুক্ষণ। শরীর যদি ভালো লাগে তাহলে এসো।

সকালে প্রাতঃকৃত্য সেরে রোজ ঘণ্টাখানেক দৌড়ানোর অভ্যাস আদ্রিয়ানার। তারপর বাড়ি ফিরে স্নান ও প্রাতরাশ সেরে সোজা চলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে বিকেলের দিকে ঘণ্টাদুয়েক সে বসে কফিন বিক্রির দোকানে। তবে এখন যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, তাই পুরোটা সময়ই সে দোকানে বসে। আদ্রিয়ানাও লোম্বার্দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। পড়ছে ইতালিয়ান সাহিত্য নিয়ে। বাবা মারিওর ইচ্ছে ছিল মেয়েকে ডাক্তারি পড়াবে; কিন্তু ছোটবেলায় মা-হারানো এই মেয়েটির প্রতি তেমন সুনজর দিতে পারেনি বাবা মারিও দিনি। তাছাড়া ছোটবেলা থেকে ডাক্তারি কিংবা অন্য কোনো বিষয়ের চেয়ে সাহিত্য পড়ার প্রতি আদ্রিয়ানার ঝোঁক ছিল।

শরীরে ট্র্যাকস্যুট ও পায়ে ট্রেইনার গলিয়ে ঘর থেকে বের হয় আদ্রিয়ানা।

জানুয়ারির মাঝামাঝি শীতের তীব্রতা যেন অসহ্য হয়ে ওঠে। পাইন, ওক, চেস্টনাট আর ম্যাপল গাছের হলুদ রঙের পাতায় পথ ঢেকে যায়। পা দিয়ে পাতা সরিয়ে গন্তব্যে পথ করে নিতে হয় পথিকের। আদ্রিয়ানা দেখতে পায় ঝোপঝাড়ে ফুটে আছে অ্যাস্টর, ব্লু বেলস, কসমস, সিলভিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, ক্যালেন্ডুলা, গ্লাডিওলাসসহ কত নাম-না-জানা ফুল। এগুলো শীতের ফুল। বসন্তে ফুটবে লিলি, পানসি, রোডেন্ড্রন প্রভৃতি ফুল। পাতার আড়াল থেকে একটা তাসকুনি দোয়েল ডেকে ওঠে – চিইক্ … চিইক্ …।

বাড়ি থেকে সিকি মাইল দূরের সেরিয়া নদীটি ভয়ার্ত এই শীতে শৌর্যহীন অশীতিপর বৃদ্ধের মতো জবুথবু মেরে আছে। দড়ির মতো শীর্ণ নদীটি এঁকেবেঁকে ধাবিত হয়েছে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের বুকে। বর্তমানে নদীটির এমন দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা হলেও বর্ষায় এর বাড়বাড়ন্ত শরীর। যৌবনবতী তরুণীর মতো তখন সেটা খলখলিয়ে ও উদ্দাম নৃত্যে বয়ে চলে।

লোম্বার্দিয়া প্রদেশের ক্রেমা শহরে কফিনের দোকান কুড়িয়ে-বাড়িয়ে হাতেগোনা চার-পাঁচটির মতো। শহরের ঈশানকোণের একেবারে শেষ প্রান্তে কফিনের দোকান ‘অলতিমো সেলুট্যো’ – অন্তিম বিদায়। দোকানটির মালিক আদ্রিয়ানার পিতা মারিও দিনি। ক্রেমা শহরে তাদের তিন পুরুষের বসবাস। মারিওর পিতাসহ সান্দ্রিও দিনি লোম্বার্দিয়া অঞ্চলে এসেছিলেন ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগ্রেব থেকে। তিনি ছিলেন সম্পন্ন কৃষক। মারিওর পিতা আলবের্তো দিনি কৃষি পেশায় না গিয়ে কফিন বেচাকেনার ব্যবসায় নেমেছিলেন। সেই থেকে কফিন বিক্রির এই ব্যবসা। মারিওর বয়স সত্তর অতিক্রম করেছে গত বছর। যদিও পিয়েরো নামে একজন কর্মচারী দোকানে কাজ করে বটে; কিন্তু মারিওর একমাত্র কন্যা আদ্রিয়ানা ও মারিও দুজন মিলেই দেখাশোনা করে ব্যবসাটি।

সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে আদ্রিয়ানা হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় বহুদূর। সেরিওর তীরঘেঁষে সোজা পুবে। নদীর পাড় ধরে বেশ কিছুক্ষণ দৌড়ালে ছোট্ট অরণ্যকুঞ্জের মতো একটা জায়গা পাওয়া যায়। সেখানে পৌঁছে আদ্রিয়ানা বুকভরে নিশ্বাস নেয়। ভোরবেলা সূর্য উঠছে অরণ্যরাজির মাথাঘেঁষে। গাছপালা ও বাড়িঘরের ওপরে ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি আবির। নদীর কূল ধরে হাঁটতে হাঁটতে আদ্রিয়ানা ঘন অরণ্য গোছের একটি স্থানে এসে খানিক বিশ্রামের জন্য বসে পড়ে সবুজ ঘাসের ওপর। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য পানির ফ্লাস্ক খুলে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নেয়। চারদিকে লার্চ, বিচ, হর্নবিম অ্যাশ আর চেস্টনাট গাছের প্রাচুর্য। অজস্র বৃক্ষ বুক চিতিয়ে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্যজুড়ে।

আদ্রিয়ানা উঠি উঠি করছিল, ঠিক এমন সময় ঈষৎ দূরে কিছু মানুষের চেঁচামেচি শুনে সেখানে যেতেই দেখা গেল ভ্রমরের পাখার  মতো কালো কুচকুচে দীর্ঘকায় একটি সাপ কিলবিল করে ডাঙ্গা ছেড়ে ছুটে যাচ্ছে জলের দিকে। পাশ থেকে কে একজন বলল, আরে এটা তো ‘ওয়েস্টার্ন হুইপ স্নেক’। মারাত্মক বিষধর! আদ্রিয়ানা অস্ফুট স্বরে বলল, হুইপ স্নেকই বটে! একেবারে কুচকুচে কালো। লম্বা চাবুকের মতো। জনৈক পথচারী বলল, কদিন আগে এ-বনে নাকি একটি মাদামি ভালুক দেখা গেছে। আদ্রিয়ানা বলল, বাপ রে! কী ভয়ানক কথা। তাহলে তো এদিকে ঘেঁষা যাবে না আর। আদ্রিয়ানা মনে মনে ভাবল, এবার তাহলে বাড়ি ফেরা দরকার।

 দ্বিতীয় পর্ব

সকাল দশটা নাগাদ আদ্রিয়ানা দোকানে এসে পৌঁছায়। পিয়েরো নামে যে-ছেলেটি দোকানে কাজ করে সে ঘণ্টাখানেক আগে এসে ধুলোবালি সাফসুতরো করে দোকানটি একেবারে ঝকঝকে করে তুলেছে। ছেলেটি বড় কাজের। বছর-দুয়েক ধরে কাজ করছে এখানে।

পিয়েরো আদ্রিয়ানাকে দোকানে ঢুকতে দেখে হাত তুলে বলল, বনজোরনো – সুপ্রভাত। আদ্রিয়ানা ঈষৎ হেসে বলল, বনজোরনো। কেমন আছো পিয়েরো? সব ঠিক আছে তো। পিয়েরো বারদুয়েক কেশে বললো – ভালোই। তবে দেখুন না কী ভয়ানক ঠান্ডা পড়েছে। মনে হচ্ছে যেন হাড়-মাংস সব জমে যাবে। বলেই পুনরায় দু-তিনবার কাশল সে।

– সে তুমি ঠিকই বলেছো পিয়েরো। জানুয়ারির মাঝামাঝি ঠান্ডা তো পড়বেই। ভাগ্য খারাপ হলে তুষারপাতও হতে পারে। পিয়েরো নিজের টেবিল-চেয়ার ছেড়ে আদ্রিয়ানার টেবিলের সামনে এসে বসে। সকালের দিকে দোকানে খদ্দের তেমন একটা আসে না। দু-একজন যাওবা আসে মধ্যাহ্নের পর। বেশিরভাগ সকালই দুজন গল্প করে কাটিয়ে দেয়। পিয়েরো চেয়ারটা আদ্রিয়ানার টেবিলের সামনে টেনে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলো – আমাদের বড় কর্তা আসবে কখন। পুরনো কাপড় দিয়ে টেবিলের উপরিভাগ মুছতে মুছতে আদ্রিয়ানা বললো, বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আসতে দেরি হবে। হয়তো দুপুরের দিকে আসবে।

পিয়েরো হঠাৎ চেঁচিয়ে বললো, আদ্রিয়ানা ওই দেখুন, আপনার জুতোর সঙ্গে একদলা কাদা লেগে আছে। আদ্রিয়ানা ট্রেইনারের দিকে তাকিয়ে বললো – আরে যা! তাই তো, এ কী অবস্থা! সকালে মর্নিংওয়াক করতে গিয়ে লেগেছে হয়তো। পিয়েরো ঠোঁটে একচিলতে হাসি তুলে বললো, আপনার বুঝি নাইকি ব্র্যান্ডের ট্রেইনার পছন্দ? আদ্রিয়ানা বললো, হুম! জানো তো গ্রিক মিথোলজিতে নাইকি হচ্ছে ‘গডেস অব ভিক্টোরি’ অর্থাৎ বিজয়ীর দেবী। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে জুতা কোম্পানিটি যে একজন দেবীর নামে এই ব্র্যান্ডের নামকরণ করেছে এই-বা কম কী। এজন্য এ-ব্র্যান্ডের জুতাই আমি পরি সবসময়।

পিয়েরো সোৎসাহে বললো, একটা বিষয় খেয়াল করেছেন আদ্রিয়ানা, চারপাশ ভীষণ ঠান্ডা হলেও বাইরে কিন্তু ঝলমলে রোদ।

– তাই তো দেখছি, কাঁচা সোনারঙা রোদ্দুর কচি পাতার ওপর কেমন চকচক করছে। আঙুল তুলে দূরে নির্দেশ করে আদ্রিয়ানা বললো, দেখেছো পিয়েরো, চাপা ফুলের মতো সূর্যের আলো দূরের সেরিও নদীতে কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন একরাশ আলোর মালা ক্রমশ দোল খাচ্ছে নদীতে। শীতে নদীটা কেমন শুকিয়ে যায়, অথচ ভরা বর্ষায় এই একই নদী তরুণীর উচ্ছ্বসিত আবেগঘন অশ্রুরাশির মতো চারদিকে ছলছল করে।

– তা বেশ বলেছেন আদ্রিয়ানা। আমি খেয়াল করে দেখেছি সাহিত্যের ছাত্রী বলেই হয়তো আপনার মুখ দিয়ে এত সুন্দর সব কথা বের হয় সবসময়।

বেলা গড়িয়ে যায় কিন্তু খদ্দেরের দেখা নেই। অখণ্ড অবসর। আদ্রিয়ানা তার টেবিলের দেরাজ থেকে দান্তের ডিভাইন কমেডি কাব্যগ্রন্থটি বের করে চোখ বুলাতে থাকে। দৈনন্দিন হস্তস্পর্শে মলিন হয়ে উঠেছে বইটি। পিয়েরো আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ করে বললো, আপনি কবিতার বই নিয়ে বসলেন? কী বই এটা, দান্তের?

বই থেকে মুখ না ফিরিয়েই আদ্রিয়ানা বললো, হুম, দান্তের লা দিভিনা কোম্মেদিয়া। জানো তো পিয়েরো, ইংরেজদের যেমন শেক্সপিয়র, ফরাসিদের ভিক্তর হুগো, জার্মানদের গে্যঁটে, রুশদের তলস্তয় আমাদেরও ঠিক তেমনি দান্তে। লা দিভিনা কোম্মেদিয়া হচ্ছে বিশ্বসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

আদ্রিয়ানা কৌতূহলী কণ্ঠে পিয়েরোকে জিজ্ঞেস করলো – তুমি কি ইংরেজ কবি শেলি, বায়রন, এলিয়টদের নাম শুনেছো? পিয়েরো তার পিঙ্গল বর্ণের বর্তুল চোখদুটোতে বিস্ময় তুলে বললো, না শুনিনি।

আদ্রিয়ানা বিজ্ঞের মতো বললো, দান্তের ডিভাইন কমেডি কাব্যটি ইতালিয়ান ছন্দ ‘টারজা রাইমায়’ রচিত। এটি দান্তেরই আবিষ্কৃত ছন্দ। শেলি, বায়রন, এলিয়ট এঁরা সবাই দান্তের উদ্ভাবিত ছন্দই ব্যবহার করেছেন তাঁদের কবিতায়।

আদ্রিয়ানা বললো, বুঝেছো পিয়েরো, ডিভাইন কমেডি হচ্ছে দান্তের কল্পনায় নরক, স্তব্ধলোক ও স্বর্গে ভ্রমণের বিবরণ। দান্তে যখন নরকে প্রবেশ করছেন, তখন তাঁর পথপ্রদর্শক হচ্ছেন তাঁর অতিপ্রিয় রোমান কবি ভার্জিল। ভার্জিল তাঁকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলেন, তারপর তাঁকে নিয়ে চললেন নরকের প্রবেশপথের দিকে। দান্তের কাব্যে নরক বা ইনফারনোর আকার দেখতে অনেকটা কলার মোচার মতো।

কলার মোচা দেখেছো কখনো, আদ্রিয়ানা জিজ্ঞেস করলো পিয়েরোকে। পিয়েরো প্রত্যুত্তরে বললো, হ্যাঁ বেশ দেখেছি। আদ্রিয়ানা বললো, তো মোচার মতো সেই নরকের বহিরাঙ্গনে দেখা গেল অসংখ্য প্রেতাত্মার ভিড়। ভিমরুলজাতীয় বড় বড় পোকার দংশনে তাদের শরীর হতে রক্ত ঝরে পড়ছে। ভীরু এবং দোদুল্যমান চিত্ত মানুষকে মৃত্যুর পর এরকম শাস্তি পেতে হয়। সেই মোচাকৃতি জায়গার শুরুতেই নরক। তো সেই নরকের প্রথম বৃত্তে দেখা গেল হোমার, ওভিদ, হোরেস প্রমুখের মতো লেখককে, যাঁরা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের সুযোগ পাননি। তাঁরা নানা সদ্গুণের অধিকারী হলেও যিশুর কৃপালাভ থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলে নরকের প্রথম বৃত্তেই স্থান হয়েছে তাঁদের। অর্থাৎ তাঁদের পাপী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে বটে কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে নরকের শুরু নিম্নাভিমুখী মোচাকৃতির দ্বিতীয় বৃত্ত থেকে। যারা কামজ প্রেমে মত্ত হয়ে সমস্ত জীবন কাটিয়েছে, তারা এখানে লুটোপুটি খেয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। মুহূর্তের জন্য তাদের শান্তি নেই। দান্তে এদের মধ্যে দেখতে পেলেন ইতালির রাভেল্লা শহরের পাওলো ও ফ্রান্সেসকে, যাঁদের করুণ অবৈধ প্রেমের কাহিনি দান্তে প্রথম বিবৃত করেছেন এবং তারপর সেগুলো বহু গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। নরকের তৃতীয় বৃত্তে দান্তে পেলেন পেটুকদের। ভোজন ছিল এদের একমাত্র আনন্দ। শাস্তির জন্য এদের রাখা হয়েছে কর্দমের স্রোতে। এদের ওপর লক্ষ রাখছে এক ত্রিমুণ্ডধারী ভীষণাকৃতি পাহারাদার। পরের বৃত্তে দেখা গেল কৃপণদের। তাদের শাস্তি একটা প্রকাণ্ড পাথরের চাঁইকে ক্রমাগত ঠেলে নিয়ে যাওয়া। ভার্জিল এবার দান্তেকে নিয়ে গেলেন পঞ্চম বৃত্তে। তারপর ষষ্ঠ, সপ্তম এবং এভাবে অষ্টম ও নবম বৃত্তে পৌঁছালেন দান্তে। অষ্টম ও নবম চক্রে শাস্তিভোগ করে সেসব পাপী, যারা বুদ্ধিবিচারের অপব্যবহার করেছে। মর্তের সব জীবের মধ্যে একমাত্র মানুষেরই যুক্তি-বুদ্ধি-বিচারের ক্ষমতা আছে। ঈশ্বর-প্রদত্ত সেই শ্রেষ্ঠ ক্ষমতার যারা অপব্যবহার করে, পাপীদের মধ্যে তারা সবচেয়ে অধম।

পিয়েরো চোখদুটো বড় বড় করে বললো, ওরেব্বাস! এ তো বিশাল কাহিনি। কিন্তু কাহিনিটা বেশ অন্যরকম।

আদ্রিয়ানা উৎসাহ পেয়ে বললো, তুমি কি জানো পিয়েরো, এই যে সামনে সেরিও নদীটা দেখছো এটাকে কিন্তু আমি মোটেও সেরিও নামে ডাকি না। এটা আমার কাছে সেই বিখ্যাত লিথি নদী। পিয়েরো ভ্রু কুঁচকে বলল, লিথি নদী? এ আবার কোন নদী? আদ্রিয়ানা মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো, নরক ভ্রমণশেষে দান্তে পৌঁছলেন পুর্গাতোরিও। পুর্গাতোরিও অর্থ কি সেটা জানো তো নিশ্চয়ই?

– হ্যাঁ। পুর্গতোরিও মানে তো শুদ্ধলোক। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো পিয়েরো। শুদ্ধলোক, অর্থাৎ মানুষ নরক ভোগ করার পর শুদ্ধলোকে এসে পরিশুদ্ধ হয়ে তারপর প্রবেশ করে স্বর্গে। তো হয়েছে কী – নরক ভ্রমণ শেষ করে শুদ্ধলোক পরিভ্রমণশেষে দান্তে গেলেন লিথি নদীতে স্নান করতে। স্নান সেরে উঠতেই বিস্মৃত হলেন অতীতের সব স্মৃতি। তাঁর আত্মা পরিশুদ্ধ হলো। এবার যাত্রা মূল স্বর্গের পথে। ভার্জিলের যাত্রা এখানেই শেষ হলো। ভার্জিল এখান থেকেই ফিরে গেলেন। দান্তের সেই ভুবনখ্যাত প্রণয়িনী বিয়াত্রিচ হলেন স্বর্গে তাঁর পথপ্রদর্শক।

দান্তের ডিভাইন কমেডি নিয়ে কথা বলতে বলতে কখন যে মধ্যাহ্ন পার হয়ে পশ্চিম আকাশ জবাফুলের মতো রং ধারণ করেছে দুজনের কেউই টের পায়নি। মাঝখানে অবশ্য দুপুর নাগাদ আদ্রিয়ানার লাঞ্চ বক্স থেকে দুজন দুটো করে এগ স্যান্ডউইচ খেয়েছে শুধু। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। দোকানের সামনের সড়ক দিয়ে দূরের মাঠ ও খামার থেকে ট্রাকবোঝাই ডালিম, ডুমুর ও পেস্তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শহরে। আর পাকা আঙুরবোঝাই গাড়িগুলো যাচ্ছে চোলাইয়ের কারখানায়। সেই আঙুর পচিয়ে তৈরি হবে উৎকৃষ্ট ওয়াইন।

এমন সময় মারিও এসে ঢুকলো দোকানে। আদ্রিয়ানা ও পিয়েরো সমস্বরে অভিবাদন জানালো – ‘বুয়ানা ছেরা’ – শুভ সন্ধ্যা। মারিও-ও কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বললো, বুয়ানা ছেরা। মারিওকে দেখতে বেশ অসুস্থ ও বিধ্বস্ত লাগছে। মনে হচ্ছে যেন ঝড়ে পতনোন্মুখ একটা গাছকে কোনোরকমে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আদ্রিয়ানা সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বললো, বাবা তোমাকে তো বেশ অসুস্থ দেখাচ্ছে, আজ না এলেও তো পারতে। মারিও চেয়ারে বসতে বসতে বললো – এ আর এমন কী অসুস্থতা। কাল রাতে ঘুম হয়নি। এজন্য সকালের দিকে শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল।

মারিও আদ্রিয়ানাকে লক্ষ করে বললো, কী রে তোর হাতে কী বই ওটা? আদ্রিয়ানা ঈষৎ বিরক্ত কণ্ঠে বললো, বাবা তুমি কী অন্ধ। দেখতে পাচ্ছো না এটা দান্তের ডিভাইন কমেডি। এমন অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে মারিও অবাক হলো। সে মলিন কণ্ঠে বললো, আমি তো অন্ধই। অন্ধকে অন্ধ আর খঞ্জকে খঞ্জ কি আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়। আদ্রিয়ানা ভীষণ লজ্জা পেল। সে বেশ অপ্রস্তুত ও অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলো। আদ্রিয়ানার মনেই ছিল না যে তার পিতার একটা চোখ অন্ধ। আদ্রিয়ানার মতো মারিও দিনিও শৈশবে মা হারিয়েছে। জন্মের পরে মারিওকে এক স্তন্যদাত্রী ধাত্রীর বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিছুকাল পরে দেখা গেল মারিওর চোখদুটি অন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আসল রোগ চোখের নয়। যে স্তন্যদাত্রীর স্তন্য পান করে মারিও বড় হচ্ছিলো তিনি গলগণ্ড রোগে আক্রান্ত। সেজন্য চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে দিনকে দিন। বাড়ি এনে অনেক চিকিৎসা করা হলো। একটি চোখ প্রায় গেছে বলা যেতে পারে। গলগণ্ডকে তখন বলা হতো রাজব্যাধি। লোকজনের মধ্যে কুসংস্কার ছিল, রাজা বা রানী যদি রোগীকে স্পর্শ করে দেন তাহলে রোগ ভালো হয়ে যায়। চিকিৎসায় যখন কিছু হলো না, তখন সিদ্ধান্ত হলো ছোট্ট মারিওকে নিয়ে যাওয়া হবে কোনো রাজা কিংবা রানীর আরোগ্যস্পর্শের জন্য। মারিওর বয়স তখন বছর আড়াই। কিন্তু রাজা-রানী পাওয়া যাবে কোথায়? এই চিন্তায় সবাই অস্থির। ইতালিতে কোনো রাজা-রানী নেই। বিপ্লবীরা ফ্রান্সে রাজা-রানীকে গিলোটিনে শিরñেদ ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে রিপাবলিক। ইংল্যান্ডে অবশ্য রানী এলিজাবেথ সবেই সিংহাসনে বসেছেন। কিন্তু ব্রিটেন তো অনেক দূরের পথ। খায়-খরচাও আকাশচুম্বী। তাছাড়া আড়াই বছরের শিশুকে এতদূর নিয়ে যাওয়াও সমস্যা। খোঁজখবর করে দেখা গেল, রানী এলিজাবেথের শাশুড়ি অর্থাৎ প্রিন্স ফিলিপের মা রানী এলিস গ্রিসের একটা চার্চের ধর্ম-প্রচারিকা। ইতালির নেপলস থেকে এথেন্স জাহাজে তিন-চারদিনের পথ। খরচও তেমন নয়। অবশেষে মারিওর পিতা আলবের্তো দিনি ছেলেকে নিয়ে রওনা হলেন এথেন্সে। রানি এলিসকে দেখে তো আলবের্তোর ভিরমি খাওয়ার মতো অবস্থা। কে বলবে যে ইনি গ্রিস ও ডেনমার্কের রানি। হতদরিদ্র চেহারা। মলিন পোশাক। গলায় ক্রুশের মালা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ছাড়া এটাকে আর কী বা বলা যায়। এথেন্সের একটা কনভেন্টের বেশ কিছু সেবিকার দেখাশোনা করেন রানী এলিস। কথায়  কথায় রানির এই দুর্দশার কারণ জানা গেল। কনিষ্ঠ পুত্র হয়েও শৈশবে মায়ের কাছ থেকে এতটুকু ভালোবাসা পাননি ফিলিপ। উপরন্তু প্রতিনিয়ত জুটেছে নিগৃহ ও রূঢ় ব্যবহার। সেজন্য মায়ের প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই প্রিন্স ফিলিপের। এমনকি জীবনে একটি ফুটোকড়িও পাঠাননি মায়ের জন্য। যা হোক রানী সযত্নে শিশুকে কোলে বসিয়ে গলায় মাদুলি ঝুলিয়ে দিলেন। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, রানীর সস্নেহ স্পর্শ মারিওর বাঁ-চোখটিকে রক্ষা করতে পারেনি। ওই চোখটিকে হারাতে হলো চিরদিনের জন্য।

আদ্রিয়ানা বললো, বাবা আমি সত্যি দুঃখিত। ওভাবে বলিনি আমি। তুমি মনে কষ্ট নিও না। ‘ইস্কুজামি’ – আমাকে ক্ষমা করে দাও। উদ্ভূত পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করার জন্যই বোধহয় পিয়েরো দুজনকে উদ্দেশ করে বললো, শুনেছেন নাকি চীনের উহান প্রদেশে করোনা নামে একটা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। এ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। আদ্রিয়ানা ও মারিও দুজনেই মাথা নেড়ে বললো, বিগত এক সপ্তাহ ধরে তো শুধু চীনে মৃত্যুর খবরই পাচ্ছি। কী ভয়ংকর অবস্থা! মৃতের সংখ্যা নাকি এক হাজার ছাড়িয়েছে। আদ্রিয়ানা আফসোস করে বললো, আহা কী হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। মারিও বললো, উহানে নিশ্চয়ই এখন হাজার হাজার কফিন বিক্রি হচ্ছে? তাই না রে আদ্রিয়ানা। অথচ দেখো আমাদের এখানে কফিন বিক্রির কী করুণ অবস্থা। আদ্রিয়ানা কণ্ঠে উষ্মা তুলে বললো, বাবা তুমি কি পাগল হয়ে গেলে। কী চাও তুমি, আমাদের এখানেও এ-ধরনের মড়ক শুরু হোক, যাতে করে হুড়হুড় করে কফিন বিক্রি হয়। তোমার এই কফিন বিক্রির জন্য কি এখন এদেশের মানুষগুলোকে মরতে হবে সব। বিপন্নের মতো হাত-দুটো কচলে মারিও বললো, এত রাগ করছিস কেন। দেখছিস না বিক্রিবাট্টার কী অবস্থা। সপ্তাহে দু-চারটের বেশি কফিন বিক্রি হয় না। ওদিকে বাড়িটার মর্টগেজের টাকা শোধ করতে হয় প্রতি মাসে এত এত। সংসারের খরচ, তোর পড়াশোনা এসব না হয় না-ই বললাম। কফিন বিক্রি না হলে কীভাবে চলা যায় বল তো দেখি।

আদ্রিয়ানা চোখ-দুটো বড় বড় করে বললো, তাই বলে তুমি মানুষের মৃত্যু কামনা করবে। এ কেমন কথা। এ-কাজ যদি না পোষায় তবে অন্য পেশা খুঁজে নাও। কিন্তু তাই বলে …।

ফিলিওলা – মাই চাইল্ড, আমার কথায় রাগ করিস না। এ-কথা আমি অনেক কষ্টে বলেছি। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য কত কিছুই না করেছি। জীবনটা অনেক কঠিন রে মা। এ-পেশায় আসব না বলেই তো জীবনের বারোটা বছর নষ্ট করেছি। অর্থকড়ি আয়-রোজগার করতে পারিনি বটে, কিন্তু অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছি। সবকিছু করে ব্যর্থ হয়ে তবেই এসেছি এ-পেশায়। আমার বয়স তখন উনিশ কি কুড়ি। গায়ে-গতরে ও চোখেমুখে তারুণ্যের ঝিলিক। মাথায় কী যে খেয়াল চাপল বলতে পারব না। মনে হলো নৌকর্মী হয়ে পৃথিবী ঘুরবো। চলে গেলাম ভেনিসে। সেখান থেকে বড় বড় সব জাহাজ যায় উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, চীন, জাপান, ভারত, সিংহল কত কত দেশে। আমার আত্মীয়পরিজন বাধা দিয়ে বললো, সমুদ্রযাত্রা! সে তো ভীষণ বিপদসংকুল। ওখানে গিয়ে লাভ কী বাপু। কুলি-কামিনগিরি করে খাও, তবু নিজ দেশ ভালো। তারা আক্ষেপ করে বললেন, সমুদ্র-মন্থন করে কী এমন হীরে- জহরত তুলে আনবে যে সমুদ্রে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছো। আমি মুখে কিছুই বলি না, তবে মনে মনে ভাবি, বড় হবো আমি তাই জীবনের আবর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে আমাকে। মনে মনে ভাবি, ঠুলিবাঁধা বলদের মতো একই বৃত্তে ঘুরে মরাই কি আমার ললাটলিপি। কুলগৌরব নেই তো কী হয়েছে ঈষৎ অর্থগৌরব যদি অর্জন করা যায় তবে জীবনটা নিশ্চিন্তে চলে যাবে। পারিবারিকভাবে বিত্তশালী না হলে কী হবে, প্রাণপ্রাচুর্যে উচ্ছল মানুষ আমি। প্রতিনিয়ত আমার ভাবনা, নিরানন্দ, নিঃসঙ্গ ও বৈচিত্র্যহীন এ-জীবন প্রাণপ্রাচুর্য ও ঐশ্বর্যে যে করেই হোক ভরিয়ে তুলতেই হবে আমাকে। সমস্যা হচ্ছে ব্যক্তিগত বেদনার নিরাভরণ এই প্রকাশকে কেউ মূল্য দিতে চায় না।

‘রেজিনা ডেল সারে’ নামক একটি জাহাজে উঠে পড়লাম। তবে নৌকর্মী হিসেবে নয়, জাহাজের পাচকের সাহায্যকারী হিসেবে। আমার একটি চোখ নষ্ট বলে নৌকর্মী হিসেবে  কেউ নিতে রাজি হলো না। তবে আমার সব কথা শুনে জাহাজের পাচক পদে নিতে রাজি হলো। কোনো এক অনির্দেশ লক্ষ্যের মোহে তন্ময় হয়ে ভেসে পড়লাম সমুদ্রে।

‘রোজিনা ডেল সারে’ অর্থাৎ ‘সমুদ্রের রানি’ নামের সেই জাহাজটি যাচ্ছিল ভারত ও সিংহল হয়ে চীনে। আফিম আর গন্ধকের বিনিময়ে ইতালি রফতানি করে গাড়ি ও গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ। মারিও দিনি বললো, আমাদের সময় প্রচলিত একটি প্রথা ছিল আফিম খেয়ে নেশা করা। সে-সময় আফিম বিক্রির ছোট ছোট দোকানে আফিম বিক্রি হতো। এমনকি মুদিদোকানেও পাওয়া যেত আফিম। আর গন্ধক ব্যবহৃত হতো দেশলাই তৈরির কাজে। যা হোক জীবনের মূল্যবান বারোটি বছর কাটিয়েছি সমুদ্রে। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা, চীন, জাপান, ভারত – কত দেশ-বিদেশ ঘুরেছি। কত কত অভিজ্ঞতা। তাইওয়ানে গিয়ে একটি মজার জিনিস দেখেছিলাম। সেখানে কিছু মানুষের রুচি অনুযায়ী ঝিনুকের খোল চূর্ণ করে তৈরি হয় কফিন। আবার জাপানে কিছু মানুষ এতই সৌখিন যে, মৃত্যুর পরও যাতে তাদের সৌখিনতা অক্ষুণ্ন থাকে সেজন্য তারা কফিনের গায়ে সুন্দর সুন্দর সব ছবি আঁকে। যেমন ধরো সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের ছবি। কেউ কেউ আঁকে অরণ্য, গাছপালা, বৃক্ষরাজি। কেউ ফুল-ফল-পাখি। আবার হয়তো দেখা যায় কোনো দেশপ্রেমিক কফিনে আঁকে নিজ দেশের পতাকা। চীন ও জাপানিদের আরেকটি সৌখিন বিষয় আমার নজর কেড়েছে। ওরা অনেক সময় সিপ্রেস সুগা, থুজা প্রভৃতি সুগন্ধি ও অপচনশীল কাঠ ব্যবহার করে কফিন তৈরিতে।

সিংহলে আমি কাটিয়েছিলাম বছরখানেক। সেখানে দেখেছি চীন, জাপানের ঠিক উলটো চিত্র। মৃতের সৎকার যত সস্তায় করা যায়, সেটাই যেন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। সেখানে অতিসস্তা কাঠের তৈরি কফিনে মৃত মানুষকে সমাহিত করা হয়। সেখানে কফিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ছাতিম গাছের কাঠ। আদ্রিয়ানা ভ্রু কুঁচকে বললো – ছাতিম গাছ? মারিও হেসে বললো, ওই তো আমাদের ‘এলস্টনিয়া স্কলারিস’। স্কলারিস শব্দটির সঙ্গে বিদ্যা অর্থাৎ লেখাপড়ার যোগ আছে। এ-ধরনের নামকরণের কারণ ছাতিমের নরম কাঠ থেকে পেনসিল ও সেøট তৈরি হয়। মারিও এবার গল্প থামিয়ে বললো, দেখ তো আদ্রিয়ানা সময় কত হলো। দোকান বন্ধ করার সময় হয়ে এসেছে বোধহয়। আদ্রিয়ানা ঘড়ি দেখে বললো, সন্ধ্যা সাতটা।

– দোকানপাট বন্ধ করে এবার বাড়ি ফেরা যাক তাহলে।

আদ্রিয়ানা পিয়েরোর দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করলো দোকানের  ভেতরের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে-গাছিয়ে দোকান বন্ধ করতে। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে জনৈক এক খদ্দের প্রবেশ করলো দোকানে। সেই খদ্দের মারিও দিনিকে উদ্দেশ করে বললেন, ইস্কুজামি – অনুগ্রহ করে আমায় ক্ষমা করবেন। আপনারা বোধহয় দোকান বন্ধ করছিলেন কিন্তু আমার একটি কফিন প্রয়োজন। মারিও দিনি বললো, সে তো বুঝলাম কিন্তু কী ধরনের কফিন চাই আপনার। সস্তা, নাকি দামি কাঠের। জনৈক সেই ক্রেতা বললেন, সস্তাও নয় আবার বেশি দামিও নয়; মোটামুটি গোছের একটা হলেই চলবে। মারিও কফিন ক্রেতাকে উদ্দেশ করে বললো, পাইন কাঠের কফিনগুলো সবচেয়ে সস্তা। ওগুলোর একেকটার দাম পড়বে চারশো ইউরো। ওক কাঠ আরেকটু দামি, ওগুলোর একেকটার দাম পড়বে ছয়শো ইউরো। চেরি কাঠের কফিনের দাম এক হাজার। মেহগনি কাঠের দাম …। আগন্তুক মারিওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমার অত দামি কাঠের কফিন প্রয়োজন নেই। ওক কাঠের একটা হলেই চলবে। আদ্রিয়ানা বসেছিল একটু দূরে। সে একটি কবিতা ভাজতে লাগলো গুনগুন করে।

একদা চমৎকার একটি পিতৃভূমি ছিল আমার নিজের

ওক বৃক্ষের সারি, আমি যতদূর মনে করতে পারি ॥

লম্বা হয়ে জন্মাতো সেখানে, এবং

ফুটতো মিষ্টি ভায়োলেট ফুলগুলো

এটা আমার স্বপ্ন, হয়তো।

পিয়েরো অস্ফুট কণ্ঠে আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ করে বললো, এটা কার কবিতা? আদ্রিয়ানা ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি তুলে বললো, বিখ্যাত জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের। ক্রেতা লোকটা ওক কাঠের কফিনের কথা বললো বলে কবিতাটির কথা মনে পড়লো।

মারিওকে উদ্দেশ করে ক্রেতা বললো, শুনুন আমার মা খুবই অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। ডাক্তার আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, যে-কোনো সময় তার প্রাণপ্রদীপ নিভে যাবে। সেজন্যই কফিনটা তৈরির ফরমাশ দিতে এলাম।

মারিও আশ্বস্তের সুরে বললো, আপনাকে ফরমাশ দিতে হবে কেন? ওক কাঠের কফিন আমাদের দোকানের পেছনে যে-পণ্যাগারটি আছে ওখানেই তো আছে বেশ কয়েকটা। আপনি পছন্দ করে নিয়ে নিন না যেটা আপনার পছন্দ।

আগন্তুক বললো, আপনার তৈরি করা কফিন তো আমি নিতে পারবো না। মারিও দিনি আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে বললো, কেন? সমস্যা কোথায়?

– আমি যে-কফিনটা নিতে চাচ্ছি সেটাতে কোনো ধাতব বস্তু থাকা চলবে না। এই যেমন ধরুন লোহার হাতল কিংবা পেরেক ইত্যাদি। মারিও ক্রেতাকে উদ্দেশ করে বললো, কিছু মনে করবেন না, আপনি কি ইহুদি?

– কী করে বুঝলেন?

– কী যে বলেন। এতদিন ধরে কফিনের ব্যবসা করছি। আপনিই বুঝি প্রথম ইহুদি যে কি না আমার দোকান থেকে কফিন নিচ্ছে। আপনার আগেও বহু ইহুদি আমার কাছ থেকে কফিন নিয়েছে। আপনার কফিন তো তাহলে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে কোনো ধাতব বস্তু না থাকে। কফিনের হাতলগুলোও তৈরি করতে হবে কাঠ দিয়ে। আর লোহার পেরেকের বদলে ব্যবহার করতে হবে কাঠের গোঁজ। তাই তো?

– হ্যাঁ। আপনি ঠিক-ই ধরেছেন। তবে আগামীকালের মধ্যেই যদি কফিনটা তৈরি করা যায় তাহলে উপকৃত হই। বলা তো যায় না কখন …।

– আপনি কফিনের দামটা অ্যাডভান্স করে যান। আমি চেষ্টা করব কাল না হয় পরশু আপনি কফিন অবশ্যই পেয়ে যাবেন।

আগন্তুক কফিনের টাকা অগ্রিম জমা করে চলে যেতেই আদ্রিয়ানা তার বাবাকে উদ্দেশ করে বললো, ইহুদিদের কফিনে ধাতব বস্তু ব্যবহার নিষেধ কেন বাবা?

– তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। তবে ইহুদি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সৎকারের জন্য খুবই সাধারণ জিনিস ব্যবহার করে। ধনী, গরিব, উঁচু-নিচু সব মানুষের জন্য একই ধরনের সাধারণ শবাচ্ছাদন বস্ত্র ব্যবহৃত হয়। তবে আমার কাছে অবাক লাগে, যখন দেখি খ্রিষ্টান ধর্মের কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও তাদের জেল্লা-জৌলুস দেখাতে কুণ্ঠা বোধ করে না। তাদের কফিনগুলো তৈরি হয় অনেক মূল্যবান কাঠ কিংবা ধাতু দিয়ে। পারলে তো অনেকে হীরে-জহরত দিয়েই তাদের কফিনগুলো তৈরি করে। তোমরা শুনে অবাক হবে যে, সেই ১৯৬২ সালে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি কেনেডির কফিন কেনা হয়েছিল চার হাজার ডলার দিয়ে। এখনকার মূল্যমানে যা চার লাখ ইউরোর সমান। ভাবা যায়! তবে হিন্দুধর্মের মধ্যেও এই ধরনের প্রথা কিছুটা বিদ্যমান। আমি বোধহয় খবরেই দেখেছিলাম নাকি পত্রিকায় পড়েছিলাম মনে নেই, ১৯৮৪ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে যখন শিখ আততায়ীরা হত্যা করে, তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তাঁকে পোড়ানো হয়েছিল অতি উচ্চমূল্যের সুগন্ধি চন্দন কাঠ দিয়ে। কথা শেষ করে মারিও বললো – ও মাই গড। সাতটা পেরিয়ে গেছে সেই কখন, চলো চলো এবার ওঠা যাক।

চলবে ….

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১২ জুন ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com