মিনি উপন্যাস ( ধারাবাহিক )

করোনা ও কফিন

তৃতীয় , চতুর্থ ও শেষ পর্ব

শনিবার, ১৯ জুন ২০২১

করোনা ও কফিন
প্রচ্ছদঃ সংগৃহিত

পূর্বে প্রকাশের পর …..

 


তৃতীয় পর্ব

সকালের দিকে কফিনের দোকানটি সবে খোলা হয়েছে। মারিও, আদ্রিয়ানা ও পিয়েরো যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এমন সময় হুড়মুড় করে দোকানে প্রবেশ করে লুকা। লুকাকে দেখেই আদ্রিয়ানা বলে উঠলো, আরে লুকা যে। এত সকাল সকাল দোকানে এসে হাজির হলে। জরুরি কিছু? আমাদের তো আজ সন্ধ্যার পরে দেখা হওয়ার কথা ছিল, ইস্ট্রাত্তস ক্যাফেতে। লুকা আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ করে বললো, খবর শুনেছো কিছু। ইতালিতে তো করোনার অবস্থা ভয়াবহ! মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা দশ হাজার। এর মধ্যে আমাদের এই লোম্বার্দিয়া প্রদেশে আট হাজার আক্রান্ত। গতকাল পর্যন্ত শুধু ক্রেমা শহরেই মারা গেছে শখানেক। পার্শ্ববর্তী শহর লোদি, ব্রেসিয়া ক্রোমোনিয়া, মিলান প্রভৃতি মিলে মৃতের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। কী যে হচ্ছে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। সরকার লকডাউনের আদেশ করলো অথচ শহরের মেয়র তাতে রাজি হলো না। এখন দেখো তো কী অবস্থা!

মারিও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো, লুকা তুমি ঠিকই বলেছো। চীন দেশের করোনা এখানেও যে এভাবে ছড়িয়ে পড়বে আমরা তো কেউ কল্পনাই করতে পারিনি। লোকজন তো সব মিলানোর সানছিরো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নশিপ লিগকেই এর জন্য দায়ী করছে। সরকার তো লকডাউনের আদেশ দিয়েছিল কিন্তু মিলানোর মেয়র সে-আদেশ উপেক্ষা করে কীভাবে ফুটবল খেলার অনুমতি দিলো? এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষ কীভাবে হয়। আদ্রিয়ানা বললো, যেখানে চীনে করোনার ভয়াবহ চিত্র আমরা রোজ দেখতে পাচ্ছিলাম, সেখানে আমাদের কিন্তু বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। লুকা চুকচুক করে বললো, এখন কী যে হবে ঈশ্বরই জানেন। পিয়েরো লুকাকে উদ্দেশ করে বললো, আচ্ছা লুকা, ক্রেমা শহরে লোক মারা গেছে শখানেক? কিন্তু আমরা তো কফিন তৈরির ফরমাশ পেলাম মাত্র দশখানার। বাকি নব্বইটা কফিন কে সাপ্লাই দিচ্ছে? আদ্রিয়ানা ধমক দিয়ে পিয়েরোকে থামিয়ে দিলো, কী বলছো পিয়েরো এসব! এই শহরে কি কফিনের দোকান আর নেই। লুকাও বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে পিয়েরোর দিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আদ্রিয়ানা লুকাকে লক্ষ করে বললো, চলো নদীর ধারটায় একটু হেঁটে আসি দুজন। দুপুরে আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ সেরে তারপর যাবে।

হাঁটতে হাঁটতে দুজন পৌঁছে যায় সেরিনা নদীর তীরঘেঁষে বৃক্ষঘেরা ছায়াচ্ছন্ন অরণ্যে। বার্চ গাছের নিচে দুজন জুত করে বসে পা-দুটো এলিয়ে দিয়ে। লুকা আলতো করে আদ্রিয়ানার হাতের আঙুলগুলো স্পর্শ করে। চোখ দিয়ে ইশারা করে ঠোঁট দিয়ে তার ঠোঁটে উষ্ণ স্পর্শ বুলিয়ে দিতে। আদ্রিয়ানা ঈষৎ হেসে বললো, দেখতে পাচ্ছো না এখন করোনা কাল চলছে। এসব নিষিদ্ধ এখন। দূরে গিয়ে বসো। ব্যক্তিগত দূরত্ব বজায় রাখো। চুম্বনের মাদকতার অন্তরালে আদ্রিয়ানা যেন স্পষ্ট শুনতে পায় মৃত্যুর বিদ্রƒপাত্মক হাসি। প্রিয়তমের আদিম আহ্বানে তার সামনে ভেসে ওঠে রক্তমাংসহীন কংকালসার মৃত্যুমুখের দৃশ্য। লুকা আক্ষেপ মেশানো কণ্ঠে বললো, আমার কি করোনা হয়েছে নাকি যে দূরে গিয়ে বসতে হবে! আচ্ছা তোমার হাতে ওটা কী বই? আদ্রিয়ানা সহাস্যে বলল, দান্তের ডিভাইন কমেডি।

– সপ্তাহখানেক ধরে দেখছি তুমি এই বইটাই পড়ছো। ব্যাপারটা কী খুলে বলো তো।

– ব্যাপার আবার কী? অনেকদিন আগে পড়েছিলাম একবার। এখন আবার নতুন করে পড়ছি। এটা তো বারবার পড়ার মতোই বই। তাই নয় কি?

– হ্যাঁ, সে তো ঠিক আছে। আমি নিজেও পড়েছি একবার কিন্তু এটা তো চিরায়ত সাহিত্য, ক্ল্যাসিক, পাঁচশো বছর আগের লেখা কাব্য, আধুনিক সাহিত্যের বইটই তোমার কিছু পড়া উচিত। তুমি আলবার্তো মোরাভিয়া পড়েছো?

– পড়েছি, কেন পড়ব না। তুমি ভুলে যাচ্ছো যে আমি সাহিত্যের ছাত্রী। আমার তো ইউনিভার্সিটিতে পাঠ্যই ছিল মোরাভিয়া। তবে ওঁর লেখায় যৌনচিত্র বড্ড বেশি। লুকা কণ্ঠে উষ্মা প্রকাশ করে বললো, কী বলছো এসব! মোরাভিয়ার রচনায় যৌনচিত্রের আধিক্য থাকলেও এটাই তাঁর একমাত্র অবলম্বন নয়। তাঁর রচনার প্রধান গুণ গল্প বলার সাবলীল ভঙ্গি। ভাষা সংযত ও সরল। আঙ্গিক খোঁজার নাম করে ভাষার কান মুচড়ে সেটাকে অস্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করেননি মোরাভিয়া। এজন্যই গল্পপিপাসু পাঠকদের কাছে ওঁর লেখা এতটা প্রিয়।

– দান্তের কাব্য প্রকাশের রীতিও তো সাবলীল। বিশেষ করে দান্তের সচ্ছল ও সংযত ভাষা পাঠকদের প্রথম থেকেই আকৃষ্ট করে রাখে। লুকা তুমি শুনে অবাক হবে যে, দান্তের ডিভাইন কমেডিতে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যিক ও দার্শনিকরা যেমন এসেছেন, ঠিক তেমনি দান্তের পরলোক ভাবনার সঙ্গে ভারতীয় দর্শন ও পুরাণের ভাবনার কিছু কিছু মিল পাওয়া যায়। মহাভারতে যুধিষ্ঠির যে নরক দেখেছেন সেসব বর্ণনার সঙ্গে দান্তের নরকের সাদৃশ্য দেখা যায়।

– এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে। আদ্রিয়ানা তুমি জানো কি না জানি না। গে্যঁটে, নিটশে, শোপেনহাওয়ার প্রমুখ মনীষী ভারতীয় চিন্তাধারা দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। শোপেনহাওয়ার তো বেশ জোর দিয়েই বলেছেন যে, ভারতীয় দর্শনের এক পৃষ্ঠায় যতটা সারবস্তু পাওয়া যায়, কান্টের দশখানা দর্শনের বইয়ের মধ্যেও তা নেই। তাছাড়া তুমি নিশ্চয়ই জানো চারজন বিদেশি লেখক ভারতবর্ষ নিয়ে লিখে নোবেল পেয়েছেন। কিপলিং, কার্ল গেলেরুপের, টমাস মান ও হেরমান হেসে।

– তাই নাকি? দারুণ তো! আচ্ছা লুকা তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাসো বলো তো। ধরো আমি দান্তের প্রেমিকা বিয়াত্রিচ আর তুমি দান্তে। আমাদের যদি বিয়ে না হয়। তুমি কি পারবে আমার কথা ভেবে ভেবে সমস্ত জীবন পার করতে? তোমার সমস্ত কাব্য-কবিতায় থাকবো শুধু আমি।

– কী বলছো এসব আবোল-তাবোল। আমি কীভাবে দান্তে হবো। আমি তো কিছু লিখতেই জানি না। কোথায় মহামানব দান্তে আর কোথায় এই আমি চুনোপুঁটি লুকা।

– একটিবার ভেবে দেখো লুকা, দুজনের মধ্যে কী দুর্দান্ত ভালোবাসা। কী অসামান্য প্রেম। দান্তে বিয়াত্রিচকে জীবনে শুধু দুবার দেখেছিলেন। একবার নয় বছর বয়সে, আরেকবার আঠারো বছর বয়সে। অথচ জীবনে কখনো বিয়াত্রিচকে ভুলতে পারেননি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ভিটানোভার কাহিনি তো মূলত দান্তের নিজেরই জীবনের কথা। এ-কাব্যে তিনি বর্ণনা করেছেন কেমন করে বালক বয়সে বিয়াত্রিচ নামে এক ফুটফুটে পরীর মতো সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল, কীভাবে তিনি অলক্ষ্যে ও অজান্তে বিয়াত্রিচকে ভালোবেসেছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় কি জানো লুকা – দান্তের সেই ভালোবাসার মধ্যে কামজলিপ্সা ছিল না একবিন্দু।

লুকা অট্টহাসি হেসে বললো, আমি বিশ্বাস করি না এসব গালগল্প। শারীরিক আকর্ষণই তো প্রেমের চালিকাশক্তি। – সবাই কি তোমার মতো। দেহ? সে তো মনের ইশারাতেই চলে। বাতাস ছাড়া যেমন গাছের পাতা নড়ে না। ঠিক তেমনি মন না চাইলে শরীরও জাগে না।

– আমি পৃথিবীর সবার মতো। আমি তোমার এসব কথা মানি না।

– লুকা তুমি বিশ্বাস করো বা না করো এটাই সত্যি। পৃথিবীতে দু-একজন ব্যতিক্রমও হয়। আমি বিশ্বাস করি দেহাতীত, ইন্দ্রিয়াতীত, কামগন্ধহীন সেই অপূর্ব প্রেমের মাধুর্যে নিশ্চয়ই নিষিক্ত হয়ে উঠতো দান্তের মন। এই গোপন প্রেমের অনুভূতিকে সম্বল করেই দান্তে শুরু করেছিলেন তাঁর কাব্যসাধনা। বাস্তব বিদায় নিয়ে বিয়াত্রিচ এবার দৃঢ়ভাবে আসন গেড়ে বসলো তাঁর হৃদয়বেদিতে। বিয়াত্রিচ গৌরবান্বিত হলেন দান্তের লেখায়। একটি বিষয় লক্ষ করেছো লুকা?

– কোন বিষয়ের কথা বলছো! খুলে না বললে বুঝবো কীভাবে?

– ওই যে ডিভাইন কমেডি কাব্যে দান্তে কী দারুণ মহিমায় সম্মানিত করেছেন বিয়াত্রিচকে। শুদ্ধলোক থেকে স্বর্গে ঢোকার প্রবেশমুখে দান্তে কবি ভার্জিলকে ফিরিয়ে দিলেন। এবার সঙ্গী হলেন তাঁর আরাধ্য মানস প্রণয়িনী বিয়াত্রিচ। বিয়াত্রিচ দান্তেকে সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন, এখন আপনি অমৃতলোকে উপস্থিত হয়েছেন। বিশুদ্ধ আত্মা যখন ঈশ্বর দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়, তখনই কেবল এখানে আসা সম্ভব। দান্তের কল্পিত ও বর্ণিত স্বর্গ কিন্তু মধ্যযুগীয় জ্যোতির্বিদ্যায় ও ধর্মতত্ত্বে নির্দেশিত স্বর্গলোকের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। মধ্যযুগে ধারণা করা হতো, চন্দ্রসহ নয়টি গ্রহলোকের ঊর্ধ্বে স্বর্গলোক অবস্থিত। বিয়াত্রিচ দান্তেকে সঙ্গে করে প্রথমেই দুজনে এসে উপস্থিত হলেন চন্দ্রগ্রহে। এর অধিপতি চন্দ্র। বিয়াত্রিচ   তাঁর    প্রজ্ঞাময়        আলোচনার  মাধ্যমে দান্তেকে বোঝালেন চন্দ্র ও নক্ষত্রের অতীন্দ্রিয় রহস্যের কথা। ঈশ্বরের করুণালাভে যাঁরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয়েছেন তাঁদের কয়েকজনকে দেখা গেল স্বর্গের এ-স্তরে। এরপর বুধরাজ্যে …। এভাবে নয়টি স্তরের সবগুলোতেই সঙ্গী হলেন বিয়াত্রিচ। জানো লুকা, একলোক থেকে অন্যলোকে যেতে যেতে বিয়াত্রিচের ঐশী সৌন্দর্যও ক্রমশ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে লাগলো।

লুকা অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললো, তোমার এসব প্রেমজাতীয় লেকচার অন্য একদিন শুনবো। দুপুর হয়ে গেছে, ক্ষুধায় পেট

চো-চো করছে। লাঞ্চ যদি করাতে চাও তো চলো, না হয় আমি চললাম।

আদ্রিয়ানা ফিক করে হেসে বললো, আমি জানি তুমি ক্ষুধা সহ্য করতে পারো না। ঈশ্বর যদি তোমাকে এখন স্বর্গেও পাঠাতে চায় তুমি রাজি হবে না। তুমি অমøানবদনে বলবে, আগে লাঞ্চ সেরে নিই তারপর যাবো।

দুজনই একসঙ্গে হেসে উঠলো, তারপর রওনা হলো দোকানের দিকে।

চার

করোনা ভাইরাসটি যে এমন মহামড়ক হিসেবে আবির্ভূত হবে সেটা কেউ কল্পনাও করেনি। এযাবৎ মৃতের সংখ্যা পনেরো হাজার ছাড়িয়েছে। তার মধ্যে এই লোম্বার্দিয়া অঞ্চলের অবস্থাই সবচেয়ে বেশি করুণ। এখানেই মারা গেছে প্রায় হাজারদশেক মানুষ। সর্বনাশা দুর্যোগটি যে এভাবে হানা দেবে সেটা চিন্তারও অতীত। এমন দুর্দৈব মহামারি ইতালির মানুষ কেন, পৃথিবীর মানুষও নিকট অতীতে দেখেনি। ‘আলতিমো সেলুট্যো’ নামক এই দোকানটির এমন রমরমা অবস্থা যে, ভাবাই যায় না। দিনে এক থেকে দুশো কফিন সাপ্লাই দিয়েও কূলকিনারা করা যাচ্ছে না। চাহিদা আসছে আরো বেশি বেশি কফিনের। আরো দুজন নতুন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে মারিও দিনি। এদের মধ্যে আন্দ্রেয়া পিতো, পেশায় ছুতার। সে কাঠের কাজকর্ম মোটামুটি ভালোই জানে। কিন্তু মার্কো ছেলেটি বয়সেও তরুণ, কাজেরও পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সুবিধা একটাই, তাকে দিয়ে মাল ডেলিভারির কাজটা ভালোভাবে সম্পন্ন করা যায়। দোকানের সবাই এখন ভীষণ ব্যস্ত। অনিবার্যভাবে সবাইকে মুখে মাস্ক পরতে হয়েছে, হাতে গ্লাভস। দেখে মনে হয় যেন এটা কফিনের দোকান নয় বরং হাসপাতাল। দুপুরের দিকে সবাই যখন আহারে ব্যস্ত। আদ্রিয়ানা লক্ষ করল মার্কো কিছুই খাচ্ছে না। সে চিবুকে হাত রেখে কী যেন ভাবছে। আদ্রিয়ানা অনুসন্ধিৎসু কণ্ঠে মার্কোকে বলল, কী ভায়া, তুমি কিছু খাচ্ছো না যে? কী এত ভাবছ? মার্কো দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বললো, চারদিকে শুধু মৃত্যুর মিছিল। এত এত মানুষ মারা যাচ্ছে। ভাবছি আমিও কি আক্রান্ত হতে পারি না করোনায়? আদ্রিয়ানা বললো, আরে এত চিন্তার কী আছে। তুমি বয়সে তরুণ। করোনায় তো বয়স্ক লোকজনই মারা যাচ্ছে বেশি। তাছাড়া ঈশ্বর যদি তোমার মৃত্যু এভাবে লিখে রাখে সেটা কেউ তো আর খণ্ডাতে পারবে না।

মারিও দিনি বড় প্লেটভর্তি এক প্লেট স্প্যাগেটি নিয়ে বসেছে। সে মার্কোকে বললো, বৎস, তোমার বয়স অনেক কম। করোনা তোমাকে আক্রান্ত করবে না। করোনার কিন্তু আমার মতো বৃদ্ধলোক পছন্দ। সে হিসেবে তোমাদের সকলের মধ্যে মৃত্যুর সারিতে আমিই প্রথম। আদ্রিয়ানা খাওয়া থামিয়ে বললো, তুমি থামবে বাবা, এমন অলক্ষুণে কথা তোমার মুখ দিয়ে কীভাবে বেরোয় বুঝি না আমি। মার্কো আদ্রিয়ানাকে বললো, আচ্ছা আদ্রিয়ানা, দু-একদিন ধরে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ভাবছিলাম। আদ্রিয়ানা বললো, বলো কী জানতে চাও? মার্কো বললো, আচ্ছা দোকানের পেছন দিকটায় আপনাদের যে মালগুদাম ঘরটা আছে ওখানে গিটারসদৃশ কাঠের বড় একটি বাক্স দেখলাম। ওটা কী জিনিস? আদ্রিয়ানা ঈষৎ হেসে বললো – ওরে পাগল, ওটা বাক্স নয় গিটার কফিন।

– গিটার কফিন? এ আবার কী জিনিস?

– ক্রেমা শহরের এক শিল্পীর ভ্রাতা এই গিটার কফিনটার ফরমাশ করে গেছে। দু-চারদিনের মধ্যেই হয়তো নিয়ে যাবে। ওই শিল্পীর মৃত্যুর পর তাকে সমাহিত করা হবে এই গিটার কফিনে।

মার্কো সাগ্রহে বললো, এমন অদ্ভুত জিনিস আমি জীবনে কখনো দেখিনি। মারিও দিনি থালার শেষ স্প্যাগেটিটুকু মুখে তুলে চিবুতে চিবুতে বললো, দেখো বাছা, তোমার বয়স অল্প। এখনো অনেককিছু দেখার বাকি। আমি বছর কুড়ি আগে একবার গিয়েছিলাম আফ্রিকার দেশ ঘানায়। সেখানে দেখলাম এক অদ্ভুত জিনিস। যে ব্যক্তি গান করে অর্থাৎ গায়ক বা শিল্পী যাই বলো না কেন, সে-লোকটিকে সমাহিত করা হচ্ছে কাঠের তৈরি গিটার কিংবা মাইক্রোফোনের মতো কফিনে। আবার যে-লোকটা হয়তো মদের দোকানে কাজ করতো তার জন্য মদের বোতলসদৃশ কফিন। যে ব্যক্তিটি গাড়ি ব্যবসায়ী তাকে কবর দেওয়া হচ্ছে গাড়ি আকৃতির কফিনে।

এভাবে যে যে-ব্যবসা কিংবা পেশায় যুক্ত তার জন্য হুবহু সে-ধরনের কফিন। বন্দুক ব্যবসায়ীর জন্য বন্দুক কফিন। ক্যামেরাম্যানের জন্য ক্যামেরা কফিন। ব্যক্তিজীবনে হয়তো যে-মানুষটি ছিল প্রচণ্ড রাগী ও বদমেজাজি তার জন্য লাল টুকটুকে মরিচ কফিন। ঘানায় এসব দেখে আমার মাথায় হঠাৎ একটি ব্যবসায়িক বুদ্ধি খেলে গেল। ভাবলাম লোম্বার্দিয়া অঞ্চলেও কি এ-ধরনের সংস্কৃতি চালু করা যায় না? তাহলে তো বেশ ভালোই হয়। তারপর যখন এ-ধরনের কফিন বানানো শুরু করলাম, বিস্ময়ে লক্ষ করলাম, মানুষের মধ্যে এ-ধরনের কফিনের চাহিদা অসামান্য। তো বিশ বছর আগে যে-প্রথা চালু করেছিলাম আজ সেটা ফুলেফেঁপে মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। শুধু লোম্বার্দিয়াতেই নয়, ইতালির সমস্ত উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে আমার চালু করা এই সংস্কৃতি। এবার বুঝেছো?

লেখা পাঠানঃ শনিবারের চিঠির সাহিত্য পাতায় প্রতি শনিবার ছোট গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ভ্রমন কাহিনী সব ধরণের লেখা প্রকাশিত হয় । আপনিও অংশ গ্রহণ করতে পারেন এ পাতায় । লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ  editor@thesaturdaynews.com 
—————————————————————————————————————————–

মারিও যখন মার্কোকে এসব বোঝাচ্ছিল, তখন দোকানে এসে ঢুকলো বয়স্কমতো এক খদ্দের। বুওন পমেরিজ্জো – শুভ অপরাহ্ণ। মারিও ওই ভদ্রলোকের শুভাশিসের উত্তরে বললো, বুওন পমেরিজ্জো – শুভ অপরাহ্ণ। খদ্দের বেচারা লকডাউনের কারণে হয়তো অনেকটা পথ হেঁটে এসেছেন। ঈষৎ হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আমার একটি কফিন প্রয়োজন। তবে কফিনটি তৈরি করতে হবে ইয়ুবৃক্ষের কাঠ দিয়ে। মারিও বিস্ফারিত নেত্রে বললো – ইয়ুকাঠ? সে তো বেশ খরচার জিনিস। ইয়ুকাঠের কফিন বানাতে কিন্তু দাম পড়বে অনেক। কম করে হলেও দু-হাজার ইউরো। মারিও লোকটির দিকে তাকিয়ে বললো, হঠাৎ ইয়ুকাঠের কফিন চাচ্ছেন কেন? হাজারখানেক ইউরোর মধ্যেই তো ভালো কফিন পাচ্ছেন।

আগন্তুক খদ্দের বললেন, আসলে হয়েছে কী জানেন, আমার বাবা হচ্ছেন একটি চার্চের পাদ্রি। অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষ। তার জীবনের শেষ ইচ্ছা তাকে যেন ইয়ুকাঠের কফিনে সমাহিত করা হয়। আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন ক্রিশ্চিয়ান ধর্মে ইয়ুকাঠ কতটা পবিত্র। মারিও নির্লিপ্তভাবে বললো, সে তো জানি কিন্তু প্রথমত, ইয়ুকাঠ জোগাড় করা খুব কষ্টসাধ্য হবে এ মুহূর্তে। আর দ্বিতীয়ত, দেখছেন তো চারদিকে কী অবস্থা! আমরা গড়ে দেড়-দুশো কফিন সরবরাহ করতেই হিমশিম খাচ্ছি। আপনার চাহিদামাফিক এ-ধরনের কফিন তৈরি করা তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আগন্তুক ক্রেতা বললেন, সে আপনি সময় নিন না দু-এক সপ্তাহ। কিন্তু কফিনটার দাম আমার কাছে একটু বেশি মনে হচ্ছে। মাসচারেক আগে আমি অন্য আরেকটি দোকানে খোঁজখবর নিয়েছিলাম। ওরা আমাকে ধারণা দিয়েছিল যে, পনেরশো ইউরোর মতো দাম পড়বে কফিনটার। মারিও বললো, সে আপনি ঠিকই বলেছেন। চার মাস পূর্বে আমিও হয়তো আপনাকে ওই মূল্যেই দিতে পারতাম। কিন্তু আপনারও তো নিশ্চয়ই জানা আছে দু-মাস আগে সপ্তাহব্যাপী ১৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়বৃষ্টিতে এক কোটি চল্লিশ লাখ গাছ ধ্বংস হয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলীয় এলাকার এনটিনো, ভেনেতো ও লোম্বার্দিয়া এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই ঝড়ে। ঝড়ে আল্পস এলাকায় পাইন, রেড ওক, ইয়ু প্রভৃতি বৃক্ষ দেশলাইয়ের কাঠির মতো সারি ধরে ভেঙে পড়েছে। সেজন্য এখন কাঠের ভীষণ অভাব।

টাকা-পয়সার ঘাটতি থাকলে আপনি অন্য একটি কাজও কিন্তু করতে পারেন। সাধারণ কফিনের ভেতর ইয়ুগাছের ডালপালা ভরে দিয়েও তাকে সমাধিস্থ করা যেতে পারে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ফজিলত কিন্তু সেই একই। আমি অনেককেই দেখেছি এমন করতে।

খদ্দের মাথা নেড়ে বললেন, আমার বাবা আমাকে লালনপালন করেছেন। আমাকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে তৈরি করেছেন। আমি যে করেই হোক বাবার শেষ ইচ্ছেটুকু পূরণ করতে চাই। হোক দাম দু-হাজার ইউরো। আপনি কবে নাগাদ ডেলিভারি দিতে পারবেন সেটা বলুন? মারিও বললো, আচ্ছা তাহলে এক হাজার ইউরো অ্যাডভান্স করে যান, বাকিটা ডেলিভারির সময় দেবেন। সময় লাগবে কিন্তু কুড়ি দিনের মতো।

আগন্তুক পকেট থেকে টাকা বের করে মারিওর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, কফিনের ভেতরের বিছানা যেন নরম ও আরামদায়ক হয়। আর ভেতরের কাপড়টা হওয়া চাই কিন্তু টার্কিশ সিল্ক।

মারিও টাকা গুনতে গুনতে বললো, সে আপনি ভাববেন না। সবকিছু আপনার রুচি ও পছন্দ মাফিকই হবে। খদ্দের মারিওকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে প্রস্থান করতেই মার্কো ছেলেটা মারিওকে বললো, আচ্ছা মারিও, ইয়ুকাঠের মাহাত্ম্যটা তো বুঝলাম না। মার্কোর কাঁচা বয়স বলেই হয়তো সবকিছুতে তার আগ্রহ প্রবল। মারিও বললো – দেখো বাছা, সারাবছর ধরে সবুজ থাকে এমন একটি দেবদারু জাতের গাছ হচ্ছে এই ইয়ু। যেটি হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে। অনেকেই এই গাছটিতে পুনর্জন্ম এবং অনন্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেন। এর কারণ, এই গাছের ভেঙে বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ডালপালা থেকে নতুন গাছের জন্ম হতে পারে। এমনকি পুরনো গাছের গুঁড়ির ভেতর থেকেও নতুন একটি ইয়ুগাছের জন্ম হতে পারে। তাই অনেকে একে পুনর্জন্মের উদাহরণ হিসেবেও মনে করেন। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইয়ু একটি প্রতীকী গাছ। মারা যাওয়া স্বজনদের ইয়ুকাঠের কফিনে সমাহিত করা হয় কিংবা ইয়ুগাছের অঙ্কুর দেওয়া হয় কফিনের ভেতর। অনেক চার্চের পাশে এই গাছটি দেখা যায়। তবে খ্রিষ্টান ধর্মেরও বহু পূর্ব থেকে অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী এই গাছটিকে পূজা করে আসছে। তারা তাদের প্রার্থনার স্থান নির্বাচন করতো ইয়ুগাছের নিচে। মার্কোকে উদ্দেশ করে মারিও বললো, এবার বুঝেছো বৎস ইয়ুকাঠের মাহাত্ম্য। মার্কো মাথা নেড়ে বললো – হুম, বুঝেছি।

আদ্রিয়ানার দিকে তাকিয়ে মারিও বললো, তোকে আমার মনের একটা কথা বলি আদ্রিয়ানা। ঈশ্বর যদি আমাকে অনেক ধনী করতেন, তবে আমি আমার মরদেহকে কবর দিতে দিতাম না। লেনিন, মাও সে তুং এবং হো চি মিনদের মরদেহ যেভাবে সংরক্ষিত করা হয়েছে, আমার দেহটিকেও সেভাবে সংরক্ষিত করতাম। আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে বললো, ওঁদের মরদেহ কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে বাবা? মারিও বললো, তোরা এত এত লেখাপড়া করেছিস আর এসব তথ্য তোদের কাছে নেই? ওঁদের মরদেহগুলোকে মমি করে রাখা হয়েছে গ্লাসের কফিনে। লেনিনেরটা আছে মস্কোর রেড স্কয়ারে, মাও সে তুংয়েরটা চীনের তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে। আর হো চি মিনেরটা ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের হো চি মিন জাদুঘরে। প্রতিবছর হাজার হাজার অনুসারী তাদের এই মহান নেতাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়।

আদ্রিয়ানা বললো, কিন্তু বাবা, তুমি তো আর নেতা কিংবা বড় কোনো কেউকেটা নও যে তোমায় মমি করা গ্লাসের কফিন মানুষ লাইন ধরে দেখবে। মারিও সকৌতুকে বললো, কী বলিস? আমি সাধারণ আমজনতা বলেই তো সাধারণ মানুষ আসবে আমাকে দেখতে। বলবে এই দেখো, একজন সাধারণ মানুষ যাকে মমি করে রাখা হয়েছে সুদৃশ্য কাচের কফিনে।

গল্পগুজব চলছিল ভালোই কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বড় একটি ট্রাক দোকানের সামনে এসে হাজির। মারিও শশব্যস্ত হয়ে বললো, ওরে আন্দ্রেয়া, মার্কো, পিয়েরো তোরা সবাই মিলে কফিনগুলো সব ট্রাকে তুলে দে। আর মার্কো তুই যা মালগুলোর সঙ্গে। আমার শরীরটাও বেশি ভালো নেই, জ্বরজ্বর লাগছে। বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে।

পাঁচ

সকালের টুকিটাকি কাজকর্ম সেরে চায়ের পেয়ালা হাতে দরজার সামনে পড়ে থাকা পত্রিকাটি হাতে তুলে নেয় আদ্রিয়ানা। পত্রিকার পাতা ওলটাতে গিয়ে তার চোখ পড়ে লাল অক্ষরে লেখা বড় হেডিংটার ওপর – ‘করোনায় মৃতের সংখ্যা বিশ হাজার’। অস্ফুট কণ্ঠে আদ্রিয়ানা বলে ওঠে – হায় ঈশ্বর! কী যে হবে! দেশের মানুষগুলো কি সবই মারা যাবে করোনায়! ওদিকে বেলা হয়ে যাচ্ছে অনেক কিন্তু বাবার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ভেজানো দরজাটা ঈষৎ ঠেলে ঘরে প্রবেশ করে আদ্রিয়ানা। দুদিন ধরে মারিও জ্বরে আক্রান্ত। এরই মধ্যে একেবারে শয্যালগ্ন হয়ে পড়েছে বেচারা।

বিছানায় বসে কপালে হাত দিতেই চমকে ওঠে আদ্রিয়ানা। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।  আদ্রিয়ানা বললো, বাবা তোমার তো ভীষণ জ্বর। মারিও গোঙানির মতো শব্দ করে বললো – জ্বর, সে তো আছেই। মাঝরাত থেকে প্রচণ্ড গলাব্যথা। একবার ভাবলাম তোকে ডেকে তুলি। আবার মনে হলো তোকে ডেকেই বা কী লাভ। সকাল থেকে শ্বাস নিতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। আদ্রিয়ানা বললো, বাবা শোনো, আর দেরি করা চলে না। তোমাকে এখনই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। আদ্রিয়ানা দ্রুত কল করে একটি অ্যাম্বুলেন্স ডাকলো। তারপর চটপট রেডি হয়ে দু-চারটি জিনিসপত্র ব্যাগে গুঁজে মারিওকে নিয়ে ছুটলো হাসপাতালে।

মনে মনে যা ভেবেছিল আদ্রিয়ানা হয়েছে আসলে সেটাই। ডাক্তার রক্ত ও সিরাম পরীক্ষা করে জানালেন মারিও করোনায় আক্রান্ত। আদ্রিয়ানার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। ছোটবেলায় সে মাকে হারিয়েছে, এখন যদি …। তবে তো দুনিয়াতে আপন বলে তার আর কেউ রইবে না। খবর পেয়ে লুকা ছুটে এলো। লুকা আদ্রিয়ানাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ভয়ের কিছু নেই। মাত্র দশ শতাংশ মানুষই মারা যায় এ-রোগে। বাকি লোকজন সব সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরে। চিন্তার কিছু নেই। ভালো করে চিকিৎসা করলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবে মারিও। আদ্রিয়ানা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, এমন এক রোগ হলো, যন্ত্রণাক্লিষ্ট বাবার পাশে বসে যে বাবাকে সেবা-শুশ্রƒষা করে সারিয়ে তুলবো সে-সুযোগও সুদূরপরাহত।

এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল দেখতে দেখতে। অবস্থার উন্নতি কিংবা অবনতি কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মূর্তিমতী শোকের মতো কাচের দেয়ালের এক পাশে দাঁড়িয়ে নির্নিমেষ নেত্রে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আদ্রিয়ানা। শৈশব থেকে স্নেহ-ভালোবাসাবঞ্চিত এই মানুষটি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে মেয়ের শোকাচ্ছন্ন মূর্তি দেখে কি একটু হলেও শান্তি পাচ্ছে? কে জানে।

ডাক্তার আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ করে বললেন – আশ্চর্য! এমন ভঙ্গুর দেহেও এমন দুর্দমনীয় প্রাণশক্তি। বিছানায় শুয়ে শুয়েও মারিও নাকি বারবার স্বগতোক্তি করছিল – আমাকে বাঁচতে হবে। যে করেই হোক আমাকে আমার মেয়ের জন্য হলেও বাঁচতে হবে।

কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

যমে-মানুষে টানাটানি চললো আরো চারদিন। ভেন্টিলেটর দিয়েও বাঁচানো গেল না। সমস্ত প্রাণশক্তি নিঃশেষ করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লো মারিও। আদ্রিয়ানা পিয়েরোকে সঙ্গে নিয়ে এলো কফিনের দোকানে। ওয়্যারহাউজে যে-কফিনগুলো তৈরি আছে, সেখান থেকেই যে-কোনো একটা কফিন দ্রুত নিয়ে ফিরে যেতে হবে হাসপাতালে। তারপর মর্গ থেকে শবদেহটা তুলে সমাহিত করা হবে ক্রেমা গোরস্তানে। ডজন-দুয়েক কফিন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মালগুদাম ঘরটায়। হঠাৎ একটি কফিনে চোখ আটকে গেল আদ্রিয়ানার। মেহগনি কাঠের বাদামি কফিন। চকচকে-তকতকে। সুন্দর করে পলিশ করা। আরেকটু কাছে যেতেই চমকে উঠলো সে। দেখা গেল কফিনটার শরীরজুড়ে করোনা ভাইরাসটি কদম ফুলের মতো খোদাই করে ক্রাফ্ট করা। দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো জাতশিল্পী কফিনের প্রতিটি জায়গায় নিপুণ হাতে নকশা কেটেছেন করোনা ভাইরাসের। আশ্চর্য! এই কফিন তো আগে চোখে পড়েনি আদ্রিয়ানার। চোখদুটো কপালে তুলে পিয়েরো বললো, কই আমিও তো দেখিনি এটা আগে। তন্নতন্ন করে রেজিস্টার বই খুঁজেও পাওয়া গেল না এর ফরমাশদাতাকে। তবে কে অর্ডার করেছে এমন একটি কফিন। তাহলে কি বাবাই …। আদ্রিয়ানা ও পিয়েরো দুজনেই বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো অদ্ভুত কফিনটার দিকে।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৯ জুন ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com