কপোতাক্ষের ময়না তদন্ত

শনিবার, ০৪ মার্চ ২০১৭

কপোতাক্ষের ময়না তদন্ত

বই আলোচনা:

 


 কপোতাক্ষের ময়না তদন্ত
মুস্তাক মুহাম্মদ

মুস্তাক মুহাম্মদ

মুস্তাক মুহাম্মদ

কপোতাক্ষের  ময়না তদন্ত এ বছর প্রকাশিত মুহা. আবুল কালাম আজাদের বই। কপোতাক্ষ নদের  পূর্ব এবং বর্তমান অবস্থা এবং সংষ্কার আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে লিখিত। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে তেরো শত নদী। পদ্ম,মেঘনা ,যমুনা এবং ব্রক্ষ্মপুত্র হচ্ছে প্রধান নদী। এই নদীগুলোর শাখা প্রশাখা বিস্তৃত সমগ্র দেশে। সিন্ধু সভ্যতা মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মতো নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক সভ্যতা। এক সময় বাংলাদেশের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিলো নদীপথ। জীবন জীবিকা , অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল নদীকে কেন্দ্র করে।

পদ্মার শাখা নদী ভৈরবের একটি শাখা নদ কপোতাক্ষ । যশোর জেলার চৌগাছার তাহিরপুর থেকে উৎপত্তি হয়ে ২৪০ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে খুলনার পাইকগাছার নিয়ামতকাঠি খোলপেটুয়া নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। কপোতাক্ষের শাখা নদী পাঁচটি হরিহর ,ভদ্রা, শারিখা নদী, মরিচচাপ এবং কয়রা নদী। কপোতাক্ষ নদ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক ভৈরব মাথাবাঙা নদী প্রসঙ্গ এনেছেন যা প্রসঙ্গীক।

এক সময়ে প্রমত্ত কপোতাক্ষের এখন মরণ দশা। সুদূর ফ্রান্সের ভার্সাই নগরে বসে খর¯্রােতা কপোতাক্ষের কুলকুল ধ্বনি কবি মধুসূদন শুনতে পেয়েছিলেন । মায়ের দুধে মত পানি তার তৃষ্ণা মিটিয়েছিল । সেই খর¯্রােতা নদী আজ প্রায় মৃত। শুকিয়ে চৈত্রের মাঠের ফাটলের মত । যে নদের কারণে এক সময় প্রচুর ফসল ফলতো  সে নদে পানি নেই। বর্ষা মৌসুমে  দুকূল উপছে জলাবদ্ধাতার সৃষ্টি করে। জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে বসত বাড়ি ,ক্ষেত খামার, জনপদ।

১৯৭৪ সালে ফারাক্কা বাধ , কুষ্টিয়ার ভৈরব উৎসমুখে সংকীর্ণ রেলব্রীজ স্থাপন করা, ভৈরবের পশ্চিম তীরে ১০/১২ কি.মি. তিনটি ভেড়িবাধ নির্মাণ। ১৯৩৮ সালে দর্শনার ভৈরব বাঁক ভরাট করে কেরু কোম্পানীর চিনি কল স্থাপন করা, ১৮ শতকে কলকাতা  খুলনা  রেললাইন স্থাপন কালে  নদীর উপরে সংকীর্ণ ব্রীজ স্থাপন করা , ১৯৩৮ সালে যশোর ক্যান্টমেন্ট স্থাপনের জন্য রোড সংস্কার করার ফলে খালগুলো বন্ধ হয়ে যায়, মুক্তেশ্বরীর পানি প্রত্যাহারের জন্য শুইস গেট নির্মাণ করা হয়। এছাড়া বহুবিধ কারণে কপোতাক্ষের আজ এই হাল। এই সব লেখক মুহা. আবুল কালাম আজাদ সূক্ষভাবে তুলে এনে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।

২০০০ সালে বন্যার পর যশোর জেলার কপোতাক্ষ অববাহিকায় জলাবদ্ধাতার সৃষ্টি হয়। সুতরাং কপোতাক্ষ কে বাঁচাতে শুরু হয় আন্দোলন। ২০০৩ সালের ১৫ জুলাই মনিরামপুরের ঝাঁপা হাই স্কুলে  “ কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন” শুরু হয়। বিভিন্ন্ শ্রেণীর সমাজ দরদী মানুষ সে আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। তারপরে কপোতাক্ষ বাঁচায় আন্দোলন কমিটি বিভিন্ন কর্মসূচী, সমাবেশ, মিছি মিটিং, মানববন্ধন, সংবাদ  সম্মেলন এবং লেখালেখির মাধ্যমে জনমত গঠন করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সরকারও এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে কয়েকবার কপোতাক্ষ সংস্কারে বাজেট দিয়েছেন কিন্তু অব্যবস্থাপনা , দুর্নীতির কারণে  তার সফল হয়নি। এখনো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে নিয়মিত।

সামাজিক দায় বোধ থেকে এবং কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় কর্মী মুহা. আবুল কালাম আজাদ এই সব বৃত্তান্ত নবপ্রজন্মেও কাছে তুলে ধরেছেন। লেখক দীর্ঘ সময় ধরে কপোতাক্ষ কেন্দ্রীক যে সব আন্দেলন হয়েছে তার সংবাদ পত্র শিরোনাম তুলে ধরে বইটি আরো তথ্য সমৃদ্ধ করেছেন। কপোতাক্ষ নদ এবং সংস্কার আন্দোলনের সচিত্র ইতিহাস বর্ণনা করেছেন লেখক। সেই সাথে প্রয়োজনীয় রেফারে¯ উল্লেখ করে একজন গবেষকের দক্ষতার ষোল আনা পূর্ণ করেছেন।  যশোর  খুলনা তথা কপোতাক্ষ অববাহিকার ইতিহাসে বইটি স্থান করে নেবে অনায়সে সে কথা  বলা যায়। কপোতাক্ষের আদি থেকে আজ পর্যন্ত প্রকৃত অবস্থা তুলে এনেছেন লেখক তার “ কপোতাক্ষের ময়না তদন্ত ” বইয়ে। প্রচ্ছদটি করেছেন জাহাঙ্গীর আলম । কপোতাক্ষের পূর্ব ও বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেছেন তিনি । তবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ছবিটি বেশি উজ্জ্বল  না করে জলছাপ দিলে হয়তো আরো ভাল হত। বইটি প্রকাশ করেছে তৃণলতা প্রকাশ, ৪০/৪১ বাংলাবাজার  , ঢাকা ১১০০,  প্রকাশকাল: একুশে গ্রন্থ মেলা ২০১৭, মূল্য:১৮০ টাকা মাত্র।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / মার্চ ০৪,২০১৭

 

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৪ মার্চ ২০১৭

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com