কনকনে শীতে

শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫

কনকনে শীতে

কনকনে শীতে
প্রচেত গুপ্ত

 


Litearture 01ডিসেম্বর মাস হয়ে গেল এখন শীত নেই৷‌ লেপমুড়ি দেওয়ার বদলে রাতে পাখা চালাতে হচ্ছে৷‌ পাখারাও বিরক্ত৷‌ সারা বছর তাদের অনেক ঘোরাঘুরি করতে হয়৷‌ বেচারিদের কটা দিন রেস্ট লাগে৷‌ তাও হচ্ছে না৷‌

সেদিন বেলা বারোটার সময়, গড়িয়াহাটের মোড়ে এক যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে৷‌ সহযাত্রীরা শান্ত এবং ভদ্রভাবে এই কাজটি করেছেন৷‌ আমি নিজে ঘটনাটা দেখিনি, শুনেছি৷‌ ইন্টারেস্টিং ঘটনা৷‌ টিকিট না কারার অপরাধে যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা শোনা যায়, ঝগড়া করে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা শোনা যায়, পকেটমারকে চাঁটি মেরে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা শোনা যায়৷‌ কিন্তু এই লোকটিকে যে কারণে বাস থেকে নেমে পড়তে হল, তা একেবারেই অভিনব৷‌ এমনটি কখনও ঘটেনি৷‌ ঘটনাটা চট করে বলে নিই৷‌

বাসটা দাঁড়িয়েছিল ট্রাফিক সিগন্যালে৷‌ গাড়ির জটও ছিল৷‌ যাত্রীরা বিরক্তি, গরমে ছটফট করছে৷‌ ডিসেম্বর মাসে যেন নতুন করে গরম পড়েছে৷‌ এমন সময় নজরে পড়ে, পিছনের সিটে এক যবুক বসে৷‌ যুবকের গলায় মাফলার৷‌ নর্মাল মাফলার নয়, রোঁয়া ওঠা কুটকুটে ভারী মাফলার৷‌ একে বলে এস্কিমো মাফলার৷‌ বরফের বাড়ি ইগলু থেকে বেরনোর সময় এক্সিমোরা পরে৷‌ তারপর কুকুর টানা স্লেজগাড়িতে উঠে বাজার করতে যায়৷‌ এই মাফলার গলায় দিতে হয় না৷‌ দেখলেই গরম লাগে৷‌ গড়িয়াহাটের মোড়ে গরমের মধ্যে এস্কিমো মাফলার ভয়ঙ্কর৷‌ সে মাস যতই ডিসেম্বর হোক৷‌ তার ওপর জ্যামে পড়া বাসের ভিতর তো ভাবাই যায় না৷‌ দেখা দূরের কথা, ভাবলেই গা চিড়বিড় করে৷‌ মাফলার যুবককে এক যাত্রী বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেনক্ট

‘ভাই আপনি কি অসুস্হ?’

মাফলার যুবক অবাক গলায় বলল, ‘কেন বলুন তো?’

আর এক যাত্রী বলল, ‘না, এই গরমে মাফলার পরেছেন তো তাই জিজ্ঞেস করছি৷‌’

যুবকটি বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কেন, বাসে কি মাফলার পরা নিষিদ্ধ?’

অন্য এক যাত্রী বলল, ‘আহা, চটছেন কেন? এই গরমে অমন একটা জম্পেশ জিনিস গলায় পেঁচিয়েছেন তো তাই বলছি৷‌’

যুবকটি বলল, ‘আপনাদের সমস্যা কী?’

‘আপনার যদি শরীর বা মাথা খারাপ হয় তাহলে কোনও সমস্যা নেই৷‌ নইলে সমস্যা তো কিছু আছেই ভাই৷‌’

যুবকটি এবার রাগী গলায় বলল, ‘দেখুন, আপনারা অপমানজনক কথা বলছেন৷‌ আমি একজন সুস্হ মানুষ৷‌ প্রতি বছর ডিসেম্বর মাস পড়লে আমি সোয়েটার, মাফলার পরে ফেলি৷‌ যে কোনও সুস্হ মানুষই পরে৷‌ এবারও পরেছি৷‌ আজ সোয়েটার আনতে ভুলে গিয়েছি৷‌ তাই শুধু মাফলার জড়িয়েছি৷‌ নইলে আমার গায়ে সোয়েটারও থাকত৷‌’

এই কথা শোনবার পর যাত্রীরা বলে, ‘আপনার এই নিয়মানুবর্তিতায় আমরা মুগ্ধ, কিন্তু আপনি দয়া করে মাফলারটা খুলে ফেলুন৷‌ এই গরমে অমন সাঙঘাতিক একটা জিনিস দেখে আমাদের শুধু ঘাম হচ্ছে না, বুক ধড়ফড় করছে৷‌’

যুবকটি তেড়েফুঁড়ে উঠে বলে, ‘কখনওই নয়৷‌ কভি নেহি৷‌ আমি মাফলার পরেই থাকব৷‌ শীতকালে শীতবস্ত্র পরব না কী করব? মাথায় ছাতা ধরে বসে থাকব? অসুবিধে হলে আপনারা বাস থেকে নেমে যান৷‌’

তিন-চার জন যাত্রী যুবকটিকে জোড় হাতে করে বলে, ‘ভাই, আপনি বাস থেকে নামুন৷‌ আমরা আপনাকে ভাড়া দিয়ে দিচ্ছি৷‌ চাইলে ডবল ভাড়া দিচ্ছি৷‌ কিন্তু এই গরমে আপনার ওই বিদঘুটে মাফলার সহ্য হচ্ছে না৷‌’

যুবকটি অপমানিত হয়ে নেমে পড়ে৷‌

এবার শীত না পড়ায় ওয়েদার এক্সপার্টরা নানা কথা বলছে৷‌ এলনিনোর এফে’, দক্ষিণ আকাশে নিম্নচাপ, পুব আকাশে ঘূর্ণাবর্ত, আফগানিস্তান থেকে উড়ে আসা সম্পূর্ণ উষ্ণ বাতাস, চীন থেকে বয়ে আসা অসম্পূর্ণ শীতল বাতাস হ্যানা-ত্যানা৷‌ কেউ বলছেন, ‘ওসব কিছু নয় ভাই রে, এরকমটা মাঝে মাঝে হয়৷‌ এক বছর বেশি শীত তো আরেক বছর শীত কম৷‌ আরে বাপু, হাওয়া-বাতাসের তো ভাঁড়ার আছে৷‌ সেখানেও টান পড়ে৷‌’

সবথেকে মজার কথা, যাকে নিয়ে এত আলোচনা, কেউ তার কথা বলছে না৷‌ আমার কিন্তু চুপিচুপি তার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে৷‌ শীতের সঙ্গে৷‌

‘কী হে, এবার আসতে দেরি কেন?’

‘আমার অভিমান হয়েছে সাগরভাই৷‌’

‘অভিমান! কেন?’

‘তোমরা বর্ষা নিয়ে কত আদিখ্যেতা করো, নাচ, গান, আবৃত্তি কত কিছু আহারে-উহুরে, কই শীত নিয়ে তো কোনও হইচই নেই!’

আমি বললাম, ‘সে কী! শীতের সময়েই তো যাবতীয় হইচই৷‌ পাড়ায় পাড়ায় ফাংশন, রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া গান, আর তুমি বলছ অনুষ্ঠানে নেই৷‌ ভাই শীত, এ তোমার ঠিক নয়৷‌’

‘সাগরদা, ওসব তো শীত নিয়ে অনুষ্ঠান নয়, শীতকালের লম্ফঝম্প৷‌ বর্ষামঙ্গলের মতো শীতমঙ্গল ধরনের একটা কিছু করবে যদি কথা দাও, তাহলে তাড়াতাড়ি চলে আসব৷‌’

আমি বললাম, ‘তোমার কথা মানছি৷‌ রবি ঠাকুরেরই তো শীত নিয়ে কত গান, কবিতা৷‌ আধুনিক কবিতাও আছে৷‌ এরকম একটা কিছু করাই উচিত৷‌ তবে এবার অভিমান কাটিয়ে চলে এসো৷‌ আমি লিখে দিচ্ছি৷‌ পরের বছর কেউ না কেউ নিশ্চয় শীতমঙ্গল করবে৷‌’

জানি না শীত আমার কথা শুনবে কিনা৷‌ তার অভিমান ভাঙবে কিনা৷‌ এই সুযোগে শীত নিয়ে আমি একটা গল্প বলে নিই৷‌ সে বছর ডিসেম্বর মাসে কড়া ঠান্ডা পড়েছিল৷‌ দিনটার কথা মনে পড়ছে৷‌ কুয়াশা কেটে হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটছে হু হু করে৷‌

বসে আছি গাড়ির ভিতর তবু ঠান্ডায় কাঁপছি৷‌ বাপ‍্রে, এমন শীত অনেক বছর পড়েনি৷‌ গাড়ির কাচ তোলা, তার পরেও কোথা থেকে যেন হাড়কাঁপানো বাতাস ঢুকছে৷‌ নিশ্চয় গাড়ির দরজায় ফাটাফুটি আছে৷‌ আমি সোয়েটারের ওপর কোট, মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ ধরে গুটিসুটি মেরে বসে আছি৷‌ সামনে সিটে বসে আছেন পিসেমশাই৷‌ আমার নয়৷‌ তমালের পিসেমশাই৷‌ উনি বসেছেন চালকের পাশে৷‌ ভদ্রলোকও শীতে কাবু৷‌ সোয়েটার, টুপি, চাদরের সঙ্গে হাতে গ্লাভসও পরেছেন৷‌ দু দিন আগে পর্যন্ত খুব হামবড়াই করেছেন৷‌

‘আরে বাপু, আমরা হলাম আমেরিকার মানুষ৷‌ শীতের দেশ৷‌ মাইনাসে থাকি৷‌ কলকাতার শীত আমার কী করবে? ফুঃ৷‌ এটা একটা ঘেমো শহর৷‌ কীভাবে যে বাইশ বছর পর্যন্ত এই ঘেমো শহরে ছিলাম! শিট! ভাবতেই অবাক লাগে৷‌ যে কটা দিন আছি, স্লিভলেস গেঞ্জি পরে কাটিয়ে দেব৷‌’

সেই পিসেমশাই ঠান্ডায় কাঁপছেন! আহা রে!

পিসেমশাই চালকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নিধু, ঠান্ডা লাগছে কেন?’

নিধু সহজ ভাবে বলল, ‘স্যার, ডিসেম্বর মাস বলে৷‌ ঠান্ডা তো ডিসেম্বর মাসেই লাগবে স্যার৷‌ মে মাসে তো লাগবে না৷‌’

পিসেমশাই শান্ত গলায় বললেন, ‘নিধু, তোমার কি ধারণা, ঠান্ডা গরমের মাস নিয়ে আমার সমস্যা আছে? কোন মাসে ঠান্ডা লাগে, কোন মাসে গরম আমি জানি না?’

নিধু গাড়ি চালাতে চালাতেই জিভ কাটল৷‌ বলল, ‘ছি ছি, তা কেন ভাবব স্যার? আপনি জিজ্ঞেস করলেন বলে বললাম৷‌ বড় মানুষরা সোজা উত্তর পছন্দ করেন৷‌ মনে হয়, এ বছর বেশি ঠান্ডা পড়েছে৷‌ তাছাড়া আমরা তো এখনও পাড়াগাঁয়ের ওপর দিয়ে চলেছি স্যার৷‌ চারপাশে গ্রাম, মাঠ, খেত আর পুকুর৷‌ এই কারণে ঠান্ডা বেশি ৷‌ হুগলি ব্রিজ টপকে কলকাতায় ঢুকলে ঠান্ডা থাকবে না৷‌’

পিসেমশাই নিধুর কথায় কতটা রাগছেন বুঝতে পারছি না৷‌ একেই তো আমি পিছনে বসে আছি, তার ওপর পিসেমশাইয়ের মুখও অনেকটাই ঢাকা৷‌ একটু আগে উনি আমার মাফলারটা নিয়ে টুপির ওপর পেঁচিয়ে নিয়েছেন৷‌

‘নিধু, তুমি যে এত বড় আবহাওয়া বিশারদ, সে কথা তো তমাল আমাকে বলেনি৷‌ সে বলেছিল নিধু ভাল গাড়ি চালায়৷‌ তুমি বরং এক কাজ কর৷‌ গাড়ি চালানোর কাজ ছেড়ে দাও৷‌ তোমাদের এখানে আবহাওয়া অফিস এখন কোথায়? আমি যখন কলকাতায় ছিলাম, তখন ওই অফিস ছিল আলিপুরে৷‌ এখনও কি সেখানে আছে? বিদেশে থাকবার সবথেকে বড় সমস্যা হল, দেশের খবর খুঁটিনাটি পাওয়া যায় না৷‌ যাই হোক, তোমাদের হাওয়া অফিস যেখানেই থাকুক, তুমি অ্যাপ্লাই কর৷‌ তুমি চাকরি পেয়ে যাবে৷‌’

আমি ভেবেছিলাম, পিসেমশাইয়ের এই শান্ত ধমক শুনে নিধু চুপ করে যাবে৷‌ নিধু চুপ করল না৷‌ সে একগাল হেসে বলল, ‘খুবই ভাল হবে স্যার৷‌ আমি একটা সরকারি চাকরি পেলে বউ-বাচ্চা নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি৷‌ আপনি তমাল স্যারকে একবার বলুন৷‌’

পিসেমশাই এবার ফ্যাঁচ করে আওয়াজ করলেন৷‌ বিড়বিড় করে বললেন, ‘এই লোকের সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই৷‌’ তারপর আমার উদ্দেশে বললেন, ‘সাগর৷‌’

আমি শশব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, পিসেমশাই৷‌’

পিসেমশাই বললেন, ‘একটা কনকনে হাওয়া দিচ্ছে না? অনেকটা নর্থ আমেরিকার ব্লিজার্ডের মতো৷‌’

আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ‘পিসেমশাই, আমি তো নর্থ আমেরিকার যাইনি, সেখানকার ব্লিজার্ড সম্পর্কে আমার কোনও ধারণাও নেই৷‌ তবে এই কনকনে বাতাসটা বর্ধমানের, এটা বুঝতে পারছি৷‌ পিসেমশাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি৷‌’

পিসেমশাই বললেন, ‘না করলেই ভাল৷‌ আমার রাগ হচ্ছে৷‌ তার পরেও কর৷‌’

আমি বললাম, ‘আপনি আমেরিকায় থাকেন৷‌ সেখানে তো শুনেছি তুমুল ঠাণ্ডা৷‌ বরফ পড়ে৷‌ আপনি তো কদিন আগে বলেছেন, এখানকার ঠান্ডা অতি তুচ্ছ৷‌ তার পরেও আপনি বর্ধমানের ঠান্ডায় কাবু হয়ে যাচ্ছেন কেন?’

পিসেমশাই হিমশীতল গলায় বললেন, ‘সাগর, তোমার বন্ধু তমাল আমায় বলে দিয়েছিল, তোমার বুদ্ধিসুদ্ধিতে গোলমাল আছে৷‌ এতটা গোলমাল আমি বুঝতে পারিনি৷‌ আমেরিকায় কোনও গাড়ি এরকম ভয়ঙ্কর হয় না৷‌ তাদের দরজার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢোকে না৷‌ জানলা পুরো আটকানো যায় না, এমন গাড়ি ওখানে নেই৷‌ সেখানে এমন গাড়িই পাওয়া যায় না যাতে কুলিং এবং হিটিং সিস্টেম নেই৷‌ আমি যে বাংলোতে থাকি, সেখানে টেম্পারেচার সেন্ট্রালই কন্ট্রোল করা হয়৷‌ তোমাদের মতো ভিখিরি মার্কা অবস্হা সেখানে নয়৷‌ তমাল এরকম একটা গাড়ি করে এই শীতের মধ্যে আমাকে দেশের বাড়ি দেখতে পাঠাবে, সে আমার ধারণা ছিল না৷‌’

নিধু একগাল হেসে বলল, ‘স্যার, তমাল স্যার আপনার জন্য এসি গাড়িটাই নিতে বলেছিলেন৷‌ আমিই ইচ্ছে করে নিইনি৷‌ হাওয়া-বাতাস খেলে এমন ফাটাফুটো গাড়ি নিলাম৷‌ এত বছর পর নিজের গ্রামে যাচ্ছেন স্যার, সেখানকার হাওয়া-বাতাস-ধুলো চোখেমুখে না লাগলে মজা কই? এসি গাড়িতে তো সে মজা নেই৷‌ কাচে নাক ঠেকিয়ে কি নিজের দেশ দেখা যায়? বলুন? আপনিই বলুন৷‌ এই যে সারাদিন জন্মভিটের ধুলো মাখলেন, এতে কি বেশি আনন্দ হল না? এ তো আর আমেরিকার ধুলো- বাতাস-ঠাণ্ডা নয় স্যার, ও তো পরের জিনিস৷‌ এই ধুলো-বাতাস-ঠাণ্ডা হল নিজের৷‌ আপন ভাই৷‌ আপনার সজলপুর গাঁয়ের৷‌’ নিধু দম নিতে একটু থামল৷‌ সামনের একটা ট্রাককে ওভারটেক করল৷‌ তারপর গদগদ গলায় বলল, ‘স্যার, এই সজলপুর গাঁয়েই তো এগারো বছর বয়স পর্যন্ত ছিলেন, তাই না? ভারি সুন্দর গ্রাম৷‌ নামটাও চমৎকার৷‌ সজলপুর৷‌ আহা!’

পিসেমশাই এবার ঘাড় ঘুরিয়ে নিধুর দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় বললেন, ‘তুমি আমাকে ঠান্ডা বাতাস খাওয়ানোর জন্য ফাটাফুটো গাড়ি এনেছ!’

নিধু বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, ভাল করিনি?’

পিসেমশাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ভাল করেছ৷‌ খুবই ভাল করেছ৷‌ নিজের দেশের কনকনে বাতাস যদি নিউমোনিয়া হয়, তাহলে আরও ভাল হবে৷‌ লোককে গর্ব করে বলতে পারব, দেশের নিউমোনিয়া৷‌ ইডিয়ট৷‌’ পিসেমশাই একটু থেমে বললাম, ‘সাগর৷‌’

আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘বলুন পিসেমশাই৷‌’

তারপর পিসেমশাই ইংরেজিতে যা বললেন, তার মোটামুটি বাংলা হলক্ট

‘এই গাধাটার বিরুদ্ধে কী অ্যাকশন নেওয়া যায়, এখনই জানাও৷‌ ডিসেম্বরের হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় আমাকে ফুটো গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে, তার জন্য এর বড় ধরনের শাস্তি প্রাপ্য৷‌ আমি কি ওকে ঘাড় ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেব?’

আমি ঝুঁকে পড়ে চাপা গলায় বললাম, ‘এখন কিছু না করাই ভাল পিসেমশাই৷‌ আগে কলকাতায় পৌঁছে নিই৷‌ তারপর না হয় তমালকে নালিশ করবেন৷‌ কলকাতা তো আর বেশি পথ নেই৷‌ চলে এল বলে৷‌’

পিসেমশাই আবার ইংরেজিতে বললেন, ‘আমি এই মুহূর্তে গাড়ি থেকে নেমে যেতে চাই৷‌ বাকি পথ এমন একটা গাড়ি করে কলকাতায় ফিরব, যেখানে কনকনে বাতাস ঢোকে না৷‌ সাগর, সেই ব্যবস্হা কি তুমি করতে পারবে? শুধু ঠান্ডা বাতাস নয়, এই চালকটিকেও আমি সহ্য করতে পারছি না৷‌’

আমি নিচু গলায় বললাম, ছেড়ে দিন মেসোমশাই৷‌ রাত এখন অনেক৷‌ এটা আমেরিকা নয়, ফোন করলে হাইওয়েতে ট্যাক্সি আসবে না৷‌ আপনি বরং আরেকটু অপেক্ষা করুন৷‌’

নিধু হেসে বলল, ‘সাগরদা ঠিকই বলেছে পিসেমশাই স্যার৷‌ নামবেন না৷‌ এই জায়গাটা ভাল নয়৷‌ গাড়ি থেকে নামলে ছিনতাই, ডাকাতি হয়ে যেতে পারে৷‌ এখানকার ডাকাতরা তবে মানুষ ভাল৷‌ আপনাদের দেশে শুনেছি ডাকাতরা অতি বদ৷‌ শটাশট গুলি চালায়৷‌ এখানে সে কারবার নেই৷‌ এরা শুধু জামাপ্যান্ট খুলে নেয়৷‌ একেই তো শীত, তার ওপর জামাপ্যান্ট ছাড়া৷‌ হি হি৷‌ ওই অবস্হায় যে কাছাকাছি ঘরবাড়িতে গিয়ে সাহায্য চাইবেন, সে উপায়ও নেই৷‌’

পিসেমশাই চুপ করে রইলেন৷‌ চুপ করে থাকবারই কথা৷‌ তমালের ড্রাইভার যে তার ইংরেজি বুঝতে পারবেন, তিনি কল্পনাও করতে পারেনি৷‌ এই হল সমস্যা৷‌ ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে থাকা মানুষরা নিজের দেশকে আন্ডার এস্টিমেন্ট করে৷‌ ছোট করে দেখে৷‌ নিজের গরিব দেশের বেশিরভাগ মানুষকে অশিক্ষিত ভাবে৷‌ তমালের পিসেমশাইয়ের সেই সমস্যাই হয়েছে৷‌ আমি অবশ্য জানি, নিধু ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াশোনা করা ছেলে৷‌ তার সঙ্গে আমার অনেক দিনের পরিচয়৷‌ হিউস্টনের ধনী পিসেমশাইয়ের সঙ্গে বারাসতে থাকা সামান্য নিধুর এই ট!র আমার ভাল লাগছে৷‌

ঘটনার পিছনটা চট করে বলি নিই৷‌ কেন, এই শীতের রাতে গাড়িতে করে ফিরছি? কোথায় গিয়েছিলাম?

তমালের পিসেমশাই থাকেন আমেরিকায়৷‌ তিনি দেশে এসেছেন বহু বছর পর৷‌ তাও আবার অল্প কটা দিনের জন্য৷‌ এসেই তমালের কাছে আবদার করেছেন, নিজের গ্রামে যাবেন৷‌ বর্ধমানের সজলপুর৷‌ এই গ্রামে দশ-এগোরো বছর পর্যন্ত থেকেছিলেন৷‌ পাঠশালায় পড়েছেন৷‌ নদীতে সাঁতার কেটেছেন৷‌ গাছে চড়ে পা ভেঙেছেন৷‌ তারপর কলকাতায় এসে লেখাপড়া শিখে হুশশশ‍্…৷‌ বাহান্ন বছর পর সেই গ্রাম নিজের চোখে একবার দেখতে চান পিসেমশাই৷‌ সেখানকার মাটি ছুঁতে চান৷‌ সেই গ্রামের জন্য মানুষটার এখনও নাকি প্রাণ কাঁদে৷‌ সেখানকার জল, মাটি, বাতাসের কথা মনে পড়লে মন নাকি হু হু করে ওঠে৷‌ তমাল পিসেমশাইকে সেই গ্রাম দেখবার ব্যবস্হা করে দিয়েছে৷‌ ছোট, কিন্তু কমপ্যা’ ট্যুর৷‌ পিশেমশাই সকালে গাড়ি করে যাবেন৷‌ শীতের মিঠে রোদে নিজের গ্রামে ঘুরবেন৷‌ পাঠশালায় যাবেন৷‌ খেতে যাবেন৷‌ নদীর ধারে বসবেন৷‌ ইচ্ছে হলে সুইমিং স্যুট পরে সাঁতার কাটবেন৷‌ নিজের সেই মাটির বাড়ি এখনও যদি থাকে, তাহলে দাওয়ায় বসে মুড়ি খাবেন৷‌ তার জন্য গাড়িতে প্যাকেটে করে মুড়ি তুলে দেওয়া হয়েছে৷‌ পিসেমশাই এই দেশে বাইরের কোনও খাবার বা জলে মুখ দেন না৷‌ গাঁয়ের মুড়ি মুখে তোলবার তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না৷‌ এই হল ট্যুর৷‌

কথা ছিল তমাল যাবে৷‌ শেষ মুহূর্তে অফিসের কাজে আটকে পড়েছে৷‌ আমাকে ডেকে বলল, ‘কাজটা করে দে৷‌ পিসেমশাইয়ের গাইড হয়ে ঘুরে আয়৷‌ পেমেন্ট দেব৷‌ খাওয়া ফ্রি৷‌’

আমারও টাকার দরকার৷‌ বাড়িভাড়া বাকি পড়ে গেছে৷‌ ভাত-মাছের হোটেলেও ধার৷‌ সব থেকে বড় কথা, সজলপুর নামটা বড় সুন্দর৷‌ বাংলার গ্রামের নামই কেবল এত সুন্দর হতে পারে৷‌ এমন সুন্দর নামের গ্রামও নিশ্চয় সুন্দর হবে৷‌ তমালের পিসেমশাইয়ের গাইড হয়ে ভালই হল৷‌ কিছু রোজগারও হবে৷‌ বেড়ানোও হবে৷‌

বললাম, ‘যাব৷‌ কিন্তু তোর পিসেমশাই মানুষটা কেমন?’

তমাল বলল, ‘খুব ভাল’৷‌

একদম বাজে কথা৷‌ আমি তমালের বউয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি৷‌ সে জানিয়েছে, লোক অতি বদ৷‌ আমেরিকায় থাকে বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করে৷‌ বিদেশ গিয়ে বাবা-মার কোনও খোঁজ রাখত না৷‌ তাঁরা চরম দুর্দশায় দিন কাটাতেন৷‌ দেশের বাড়িটা ভেঙে পড়ছিল, সারাবার জন্য একটা টাকাও পাঠায়নি৷‌ গাঁয়ের পাঠশালাটার জন্য একবার গাঁয়ের লোক ওর কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল৷‌ যদি কিছু টাকা পাওয়া যায়৷‌ কোনও জবাব দেননি৷‌ সজলপুরের পিন্টু খুব ভাল ছেলে৷‌ লেখাপড়ায় দারুণ৷‌ সে আমেরিকার বড় ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সুযোগ পেয়ে পিসেমশাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল৷‌ যদি কটা দিন তাঁর কাছে গিয়ে ওঠা যায়৷‌ পিসেমশাই বলেছিলেন, আমি কিছু পারব না বাপু৷‌ এখন নিজের গ্রাম বলে আদিখ্যেতা করছে৷‌ তার পরেও তমাল ভালমানুষ বলে পিসেমশাইয়ের কথা শোনে৷‌

তমালের বউ বলল, ‘সাগরদা, এই লোকের শিক্ষা হওয়া দরকার৷‌’

সেই শিক্ষাই তাকে আমি দিচ্ছি৷‌ হাড়কাঁপুনি শিক্ষা৷‌ নিধুর সঙ্গে কথা বলে একটা ফাটাফুটো গাড়ি এনেছি৷‌ নিধুর এই কাজে খুব উৎসাহ৷‌ পিসেমশাই নিজের দেশের ধুলো, মাটি, ঠান্ডা বাতাস মেখে বিদেশে ফিরবে৷‌ আর তো একটু পথ৷‌ এতে অসুখ-বিসুখ হবে না৷‌

সজলপুর ভ্রমণ কেমন হল? গাঁয়ের মানুষগুলো দারুণ৷‌ তারা পিসেমশাইকে চিনতে পেরে ফুল, শাল আর নলেনগুড়ের হাঁড়ি উপহার দিয়েছে৷‌ তারা কোনও রাগ মনে রাখেনি৷‌

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৭:৩৩ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com