জেনারেল ওসমানী আমাদের লাইট হাউস হিসাবে তার পদ চারনা

শনিবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জেনারেল ওসমানী আমাদের লাইট হাউস হিসাবে তার পদ চারনা

জেনারেল ওসমানী আমাদের লাইট হাউস হিসাবে তার পদ চারনা
গোলাম সাদত জুয়েল

 


Muktoজেনারেল আতাউল গনি ওসমানী,  জেনারেল ওসমানী  নামে অধিক পরিচিত (জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯১৮ – মুত্যু ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪), বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন। আজ বড় দুঃসময় আমরা পার করছি । মুক্তিযোদ্বের মহানায়কে পদনমিত করার জন্য একটি চক্রান্ত চলছে খুব সুক্ষ ভাবে । আতাউল গনি ওসমানির ১০০ তম জন্ম শতবর্ষে আজ নেই কোন জাতীয় উদ্যেগ । অথচ রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল,বাউল করিম বা হুমায়ুন আহমেদ কে নিয়ে আমাদের যত উচ্ছাস । অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্বের এই মহানায়ক কে অবমুল্যায়নের এক নিরব প্রচেষ্টা চলছে । আতাউল গনি ওসমানী তো সিলেট কেন্দ্রীক কেউ ছিলেন না । তিনি জন্মেছেন সিলেট কিন্তু তার কর্মপিরিধি ছিল বাংলাদেশ কেন্দ্রীক । তাও তাকে সিলেটে ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তাও যেখানে সিলেটের লোকদের মাধ্যমে সারা বছর ব্যাপী স্মরন রাখার চেষ্টা চলে । এবার তার ১০০ তম জন্ম শত বাষিকী সিলেটে , দুবাই, কুয়েত ,কাতার ও সৌদি আরবে উদযাপনের উদ্যেগ নেয়া হয়েছে । আজ নতুন করে শোনা যায় ওসমানী নাকি ছিলেন মুক্তিযুদ্বের সমরাস্ত্র শিবিরের প্রধান অর্থাৎ অতি সুচতুর ভাবে তাকে প্রধান সেনাপতি বলতে এক শ্রেনীর অনিহা । ইতিহাস বড় কঠিন,সত্য বেরিয়ে আসে অবলিলায় । তিনি ছিলেন তিনি থাকবেন , জাতির জনককে যেমন মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল ২১ বছর জেনারেল ওসমানীও সদর্পে মুক্তিযোদ্বের  ইতিহাসের মহানায়ক হয়ে ফিরে আসবেন সাধারনের মানুষের মাঝে । তাকে স্মরন করতে যদিও সিলেট ব্যতিত ৬৩ জেলার অনিহা তাও থাকবে না । আমি গত ফেব্রুয়ারি তে দুবাইতে ওসমানীর ৩৪ তম মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম,দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের কাছে ওসমানী কতটা জনপ্রিয় । দুবা্ই ওসমানী স্মৃতি পরিষদ আয়োজিত তার মৃর্ত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দুবাইয়ের ৫ টি প্রদেশের বাংলাদেশি প্রবাসীরা অনেক দুর থেকে শুধু ওসমানীকে ভালবেসে গভীর রাত পর্যন্ত দোয়া মাহফিলে উপস্থিত হন ।

ওসমানীকে স্বীকৃতি দিলে জাতির জনকের কোন ক্ষতি হবে না , জাতির জনক আমাদের ইতিহাসের এক মহানায়ক । আর ওসমানী আমাদের গৌরবের মক্তিযুদ্বের মহানায়ক । তাদের মধ্যে কোন দ্বন্ধ ছিল না , যে কোন ভাবে কে বা কারা সরকারি ভাবে ওসমানিকে সম্মান দিতে চায় না তারা ভা্বে ওসমানী কে গুরুত্ব দিলে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান খর্ব হবে ।  এটা নিতান্ত ভুল । সরকার রবীন্দ্র -নজরুলের জন্ম বাষিকী পালনে কোটি কোটি টাকা খরচ করে, অথচ জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীকে মূল্যায়নে অনিহা ।  লালন উৎসব হয়, বাউল করিমের জন্য কোটি টাকার বাজেট থাকে অথচ মুক্তিযুদ্বের সর্বাধিনায়কের জন্য নেই কোন বরাদ্ব । সিলেট শহরের কয়েকজন আবেগ তাড়িত শিক্ষাবিদ,সাংবাদিক,সমাজসেবী, ব্যবসায়ী স্বউদ্যগে এগিয়ে এসে জাতীয় ভাবে যা করার ছিল সেই জন্ম শতবাষিকী অনুষ্ঠানের ডাক দিয়েছেন । সিলেট জেলার ব্রাকেট বন্ধী করে জেনারেল ওসমানীকে আঞ্চলিকতার বাহুডোরে আবদ্ব করে রাখা হয়েছে জাতীয় ভাবে । কোন ভাবেই জেনারেল ওসমানী জাতীয় ভাবে সম্মানিত হচ্ছে না । ইতিহাস ক্ষমা করবে না ,যারা এ্ই মহান নেতার প্রতি অবহেলা করছেন ।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল বা কবি ঠাকুরকে নিয়ে যে টানা হেচড়া চলে বছর ব্যাপী তার সিংহ ভাগও ওসমানীর জন্য হয় না ।  মুক্তিযুদ্বের ঘোষক ও ঘোষনা পাঠ নিয়ে যেমন রাজনীতি চলে জেনারেল ওসমানীকেও সম্মান দেখাতেও প্রতিটি সরকারের ভুমিকা একই ।

সিলেটে একটি একটি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, একটি হাসপাতাল ও ঢাকায় একটি মিলনায়তন । এই দিয়েই আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর উপর দায়িত্ব শেষ করেছি । অথচ ওসমানীকে আরও নানান ভাবে স্মরন করার সুযোগ রয়েছে । তার নামে জাতীয় পদক ঘোষনা , প্রতি্টি ‍বিভাগে একটি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর স্থাপন করা যায় । তার নামে মুক্তিযোদ্বাদের পোষ্যদের বৃত্তি প্রদান করা যায়, তার নামে সেনাবাহিনীতে আলাদা ব্রিগেড তৈরী করা যায়, তার নামে সেনানিবাসের নাম করন করা যায় , তার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নাম করন করা যায় । যেহেতু তিনি কৃতদার ছিলেন তাই সরকারের স্ব উদ্যেগে  এ্ই মহানায়কের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্বা জানানোর চেষ্টা করা উচিত ।

ইতিহাস সব সময় সত্য খোঁজে, আজ যারা ওসমানীর স্মৃতি মুছে ফেলতে চাচ্ছেন তাদের ইতিহাস ক্ষমা করবে না ।  বাংলাদেশের মুদ্রায় তার ছবি সংরক্ষনের সুযোগ রয়েছে ।  শুধু সিলেটের লোকরা কেন ওসমানীকে স্মরণ রাখবে , তিনি তো সারা বাংলাদেশের ওসমানি ছিলেন । তাহলে কেন জাতীয় ভাবে তার জন্ম ও মৃত্যু মুল্যায়ন পাচ্ছে না ।  প্রবাসীরা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের  কাছে জেনারেল ওসমানী চির জাগ্রত । জেনারেল ওসমানীর জীবনী  পাঠ্যপুস্তকে , সরকারি বেসরকা্রি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংরেজী মাধ্যমে স্থান দেবার চেষ্টা করতে হবে ।

ওসমানীর প্রতি বৈষম্য শুরু ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল থেকেই যা আজ্ও চলছে । অনেক প্রশ্ন ? আজও আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্বা খুজি কিন্তু আমরা কখনও খুজি না, আত্বসমর্পনের দিন চুক্তি করতাছে ভারতের জগজিৎ সিং অরোরা বনাম পাক জেনারেল নিয়াজি, অসহায়, অন্য মনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মুক্তিযুদ্ধের অতিরিক্ত প্রধান সেনাপতি এ কে খন্দকার সাহেব। আর রঙিন অথবা সাদা কালো এই ছবিটি দেখলে আমরা আবাল বাঙালী আপন মনে তৃপ্তির ঢেকুর গিলে থাকি। কিন্তু কোথায় আমাদের মুক্তি যোদ্ধা কমান্ডারগন যারা ফ্রন্টলাইনে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল? কোথায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী যিনি অসীম সাহস আর দুর্দান্ত রণকৌশল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? কেউ কখনো প্রশ্ন করেছে? এজন্যই কাগজে কলমে স্বাধীন হয়েও আজ আমাদের বিদেশী প্রভুদের দাসত্ব করতে হচ্ছে!! কে ওসমানীর হেলিকপ্টারে গুলি করেছিল ? অনেক প্রশ্ন করতে নেই । অনেক শিক্ষিত পন্ডিতরা হয়ত ইতিহাস না জানার ভান করে আছেন । কেন ওসমানীকে অন্তরালে রাখা হল , সব বেরিয়ে আসবে হয়ত কোন সময় ।  এ বিষয়ে জীবিত অবস্থায় ওসমানীর বক্তব্য ছিল :

“ আমি তখন রণাঙ্গনে সফররত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী তথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জানতেন আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে। তাছাড়া মিত্র বাহিনীর উচ্চতম কর্মকর্তারাও জানতেন আমি কোথায়। তা-সত্ত্বেও আমাকে কেন খবর দেয়া হয় না। বরং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রধান আমার ডেপুটি চীফ-অব-স্টাফ তদানীন্তন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে.খন্দকারকে পাঠান। ঐ দিন ও এর আগের দিন আমি ময়নামতির রণাঙ্গনে এবং ১৬ই ডিসেম্বর দুপুরে লেঃ জেনারেল স্বাগত সিংহের সাথে মধ্যাহ্ন ভোজন করি। ১৬ ডিসেম্বর দুপুরের পর তদানীন্তন লেঃ কর্নেল সফি উল্লাহর অধিনায়কত্বে ‘এস’ ফোর্স রণাঙ্গন পরিদর্শন করার জন্য আমার যাওয়ার কথা ছিল। জেনারেল স্বাগত সিংহ সেদিন না যেতে অনুরোধ করেন, বলেন, যে ‘এস’ ফোর্স পরিদর্শনে অসুবিধা হতে পারে।

ওসমানীর ব্যাক্তিগত জীবন : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর জন্ম ১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে। পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান, মাতা জোবেদা খাতুন। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি।

শিক্ষাজীবন : প্রাথমিক শিক্ষা শুরু ১৯২৩ সালে গোহাটি-র ‘কটনস্ স্কুল অব আসাম’-এ। ১৯৩২ সালে সিলেট গভর্নমেন্ট পাইলট হাই স্কুল এ ভর্তি হন ৷ ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে প্রথম স্থান অধিকার করে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৩৮ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। .

সেনাজীবন : ১৯৩৯ সালে তিনি রয়্যাল আর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। দেরাদুনে মিলিটারি একাডেমীতে প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে মেজর পদে উন্নীত হন। দেশবিভাগের পর ১৯৪৭ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৫১ সনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর ১ম ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক হন। এর পর তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কর্নেল পদমর্যাদা লাভ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন। ১৯৬৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। .

রাজনৈতিক জীবন :১৯৭০ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে ‘৭০-এর নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান : মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ওসমানী ভারতে চলে যান। ১৯৭১-এ মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তাঁকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি করা হয়। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মাঝে সমন্বয়সাধন করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ রাখা, অস্ত্রের যোগান নিশ্চিত করা, গেরিলা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা – প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করেন ওসমানী। প্রাক্তন ইপিআর এর বাঙালি সদস্য, আনসার, মোজাহেদ, পুলিশ বাহিনী ও যুবকদের নিয়ে একটি গণবাহিনী বা গেরিলাবাহিনী গঠন করেন। নৌবাহিনীর কিছু অফিসার এবং কিছু গেরিলা যুবক নিয়ে একটি নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন করেন। শেষের দিকে ছোট্ট একটি বিমানবাহিনী গঠন করেছিলেন তিনি।

শেষজীবনঃ ১৯৮৪ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার্থে লন্ডন থাকাকালীন এম. এ. জি. ওসমানী ১৬ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলার মাটিতে তোমার জন্ম বলেই এই মাটি হয়েছে ধন্য, আকাশের কাল মেঘ ভেদ করে এনেছে যে স্বাধীনতা, তুমি আর কেউ নও – ষোল কোটি বাঙালির স্বপ্নের পুরুষ!

হে মহাবীর, গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী – তোমাকে জানাই সালাম।

লেখকঃ সম্পাদক প্রবাসের নিউজ, ফ্লোরিডা

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / সেপ্টেম্বর ০১, ২০১৮

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৫:২৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com