এটিএম আজহারুলের মৃত্যুদন্ড

মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪

এটিএম আজহারুলের মৃত্যুদন্ড

 

Danঢাকাঃ  জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল আসামির উপস্থিতিতে জনাকীর্ণ ট্রাইব্যুনালে এ রায় ঘোষণা করে। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। ১৫৮ পৃষ্ঠা রায়ের সংক্ষিপ্তাংশ উপস্থাপন করা হয়। রায়ের প্রথম অংশ বিচারপতি আনোয়ারুল হক, দ্বিতীয় অংশ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং শেষ ও চুড়ান্ত অংশ উপস্থাপন করেন ট্রাইব্যুনাল-১এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। এটি ট্রাইব্যুনালের ১৫ তম রায় এবং ট্রাইব্যুনাল-১এ ঘোষিত ৭ম রায়। আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটি ষষ্ঠ রায়।


রায়ে বলা হয়, আসামি আজহারের বিরুদ্ধে আনীত ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে। এর মধ্যে ২, ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড, ৫ নম্বর অভিযোগে তাকে ২৫ বছরের কারাদন্ড ও ৬ নং অভিযোগে ৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। এক নম্বর অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় তাকে ওই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি (খালাস) দেয়া হয়।  রায়ের পর্যবেক্ষনে মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত বীরাঙ্গনা নারীদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পাঠ্যপুস্তকে বীরাঙ্গনাদের বিষয়টি তুলে ধরতে বলেছে ট্রাইব্যুনাল। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আজহারের ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার একজন বীরাঙ্গনাকে পুনর্বাসন করতে রাষ্ট্রকে বলেছে ট্রাইব্যুনাল।

এর আগে রায় ঘোষণার প্রাক্কালে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আজ আমরা রায় ঘোষণা করব। রায়ের বিরুদ্ধে কোনো সহিংস কর্মসূচি আমরা আশা করিনা। আর বিশেষ রায় ঘোষণার ক্ষেত্রে বিচারকদের উপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করাও উচিত না।’ চেয়ারম্যান বলেন, ‘সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে রায় পরিবর্তন করা যায় না। এর জন্য আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেতে হবে। ফৌজদারি মামলায় সব পক্ষকে খুশি করে রায় দেয়া সম্ভব নয়।’তিনি আরো বলেন, বিচারকরা আইন এবং সংবিধানসম্মতভাবে বিচার করে থাকেন। আইনের সেই বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল থাকলে সেটা আইনসম্মতভাবেই প্রতিকারের সুযোগ আছে। যে পক্ষই অসন্তুষ্ট বা সংক্ষুব্ধ হন না কেন, তা উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে। অপরাধী কোন দলের, কোন পর্যায়ের নেতা সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়।’

বেলা ১১টার দিকে আজহারকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানা থেকে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে রায় পড়া শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণা উপলক্ষে আজ সকাল ৯ টার দিকে কারাগার থেকে আজহারকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় আনা হয়। রায় ঘোষণা উপলক্ষে ট্রাইব্যুনাল ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোড়দার করা হয়। সেখানে অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য। ট্রাইব্যুনালে প্রবেশে করাকড়ি আরোপ করা হয়। পরিচয়পত্র নিশ্চিত না হওয়া ছাড়া কাউকে ভিতাে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। গত ১৮ সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। আজ রায় ঘোষণার বিষয়টি গতকাল সোমবার ধার্য করে দেয় ট্রাইব্যুনাল।

প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম আজ সাংবাদিকদের বলেন, আজহারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে প্রসিকিউশন। এ রায়ে দেশবাসী খুশী হয়েছে। এ রায় আইনের শাসনের জন্য আরো একটি মাইলফলক। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট ছয়টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে গত বছর ১২ নভেম্বর আজহারের বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এর আগে ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল আজহারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। গত বছর ১৮ জুলাই আজহারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়। ২৫ জুলাই আজহারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর আজহারের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করে প্রসিকিউটর। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে গত ৬ জুলাই পর্যন্ত আজহারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এম ইদ্রিস আলীসহ ১৯ জন সাক্ষী। আজহারের পক্ষে একজন সাফাই সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেয়। গত ২৭ আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আজহারের আইনজীবী আব্দুস সুবহান তরফদার ও শিশির মোহাম্মদ মুনির। অন্যদিকে ৭ কার্যদিবসে আজহারের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ও তাপস কান্তি বল।

আজহারের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, রংপুরের কারমাইকেল কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালে আজহার জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের রংপুর শাখার সভাপতি ও ওই জেলার আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। রংপুর ক্যান্টনমেন্টে যাতায়াতের মাধ্যমে তিনি পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এ আসামি মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজন, মুক্তিকামী বাঙালি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে দিতেন এবং তাদের হত্যা, গণহত্যা, আটক ও নির্যাতনে পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র করে তা বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। আজহারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ছয়টি অভিযোগ হলো: প্রথম অভিযোগে-৭১’এর ২৪ মার্চ থেকে ২৭ মার্চের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক রংপুর শহরের বিশিষ্ট আয়কর আইনজীবী এ ওয়াই মাহফুজ আলীসহ ১১ জনকে অপহরণ, আটক ও শারিরীক নির্যাতন করা হয়। এরপর তাদের ৩ এপ্রিল রংপুর শহরের দখিগঞ্জ শ্মশানে নিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। তবে তাঁদের মধ্যে একজন বেঁচে যান। ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি নিধনের যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছিল, এ ঘটনা তারই অংশ ছিল।

দ্বিতীয় অভিযোগ-আসামি আজহার ৭১’এর ১৬ এপ্রিল তার নিজ এলাকা রংপুরের বদরগঞ্জ থানার ধাপপাড়ায় ১৫ জন নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালিকে গুলি করে হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে আজহার অংশ নেন। ওই ঘটনায় শহীদদের মধ্যে ১৪ জনের নাম-পরিচিতি শনাক্ত করে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে- আজহার ৭১’এর ১৭ এপ্রিল রংপুরের বদরগঞ্জের ঝাড়ুয়ারবিল এলাকায় এক হাজার ২’শরও বেশি নিরীহ লোক ধরে নিয়ে হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। যাদের মধ্যে ৩৬৫ জনের নাম-পরিচিতি পাওয়া গেছে। শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ, কেউ ওই হত্যাকান্ডের ঘটনায় বাদ যায়নি। হত্যাকান্ডের শিকারদের মধ্যে ২০০ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন, যা প্রমাণ করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে ধ্বংসের উদ্দেশে ওই হত্যাকান্ড চালানো হয়েছিল।

চতুর্থ অভিযোগ- আজহার ৭১’এর ১৭ এপ্রিল রংপুর কারমাইকেল কলেজের চারজন অধ্যাপক ও একজন অধ্যাপক পত্মীকে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে অপহরণ করে দমদম ব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। প্রমানিত হওয়ায় দুই, তিন ও চার নম্বর অভিযোগে আজহারকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। পঞ্চম অভিযোগ- ৭১’এর ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে রংপুর শহর ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মহিলাদের ধরে এনে টাউন হলে আটকে রেখে ধর্ষণসহ শারীরীক নির্যাতন চালানো হয়। একই সঙ্গে মহিলাসহ নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালিদের অপহরণ, আটক, নির্যাতন, গুরুতর জখম, হত্যা ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলো এ আসামি। এ অভিযোগে তাকে ২৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়।

ষষ্ঠ অভিযোগে- ৭১’এর নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রংপুর শহরের গুপ্তপাড়ায় একজনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ১ ডিসেম্বর রংপুর শহরের বেতপট্রি থেকে আজহারের নেতৃত্বে একজনকে অপহরণ করে রংপুর কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসে নিয়ে আটক রেখে শারীরিক নির্যাতন ও গুরুতর জখম করা হয়। এ অভিাযোগে তাকে ৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এ মামলায় ট্রাইব্যুনালের আদেশে রাজধানীর মগবাজারস্থ নিজ বাসা থেকে ২০১২ সালের ২২ আগস্ট আজহারকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

 

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:১২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com