এক বুলেটেই সব শেষ

এক বুলেটেই সব শেষ

ঘন কুয়াশায় রাজ্যের নীরবতা বুকে জড়িয়ে সীমান্তের কাঁটাতারে ফেলানী ঝুলে ছিল সাড়ে চার ঘণ্টা। সেই গুলিতে শুধু ফেলানীর মৃত্যু হয়নি, চিরতরে মুছে গেছে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সুখের ঘর বাঁধার স্বপ্নও।

গাওয়া হয়নি লীলাবালি গান। হয়নি কোনো বিয়ের সাজ। অথচ অনাড়ম্বর জীবনে চুপিসারে বধূ বেশেই রওনা হয়েছিল সে। কিন্তু একটা বুলেট, স্রেফ একটা বুলেট শেষ করে দিয়েছে সব স্বপ্ন। বাজেনি কোনো বেদনা মাখা সুর।


এমনকি কাঁটাতারে ঝুলতে থাকা নিথর দেহটির কপালে জোটেনি কোনো আহাজারিও। ঘন কুয়াশায় রাজ্যের নীরবতা বুকে জড়িয়ে সীমান্তের কাঁটাতারে ফেলানী ঝুলে ছিল সাড়ে চার ঘণ্টা। সেই গুলিতে শুধু ফেলানীর মৃত্যু হয়নি, চিরতরে মুছে গেছে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সুখের ঘর বাঁধার স্বপ্নও। ঘটনার শুরু ২০০০ সালে। ফেলানী তার মা জাহানারা বেগম ও নানী হাজেরা বিবির সঙ্গে প্রথমবারের ভারতের আসাম থেকে বেড়াতে আসে বাংলাদেশে বসবাসরত বড় খালা আঞ্জিনা বেগমের বাড়িতে। বাড়ির উঠানে চলছিল মেয়ে-ছেলেদের চিরাচরিত আড্ডা। ঠিক তখনই বড় খালা ফেলানীকে নিজ ঘরে বউ করে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে সম্মতি দেন ফেলানীর নানী। তখন থেকেই স্বপ্নবোনা শুরু। সেসব দিনের কথা জানাচ্ছিলেন গল্পের নায়ক আমজাদ হোসেন, যিনি ফেলানীর শোকে আজও মুহ্যমান।

মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন বলছিলেন, ‘তখন আমিও ছোট ছিলাম, সেও (ফেলানী) ছোট। আমার নানী ছিল, আর মা ছিল। তারা বলছিল যে আমাদের বিয়া দিব। আমাগো নিজেগো পরিবারের মধ্যেই সারব। আমিও এরপর ছোট থিকা পছন্দ করতাম ওকে। দুই পরিবারে কথাবার্তা হইল, বলল যে ঠিক আছে তাইলে বিয়া হবে। তারাও রাজি ছিল, আমরাও রাজি ছিলাম।’

যাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনেছিলেন, চেয়েছিলেন ছোট্ট সুখের ঘর বাঁধতে সেই সঙ্গীকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল মাত্র একবার। ফেলানী, সেই ছোট্ট ফেলানী যাকে আমজাদ দেখেছিল মাত্র তিন বছর বয়সে। তখন তার (আমজাদ) বয়স সাত। সেই স্মৃতি ভাসা ভাসা মনে পড়লে আজও তিনি খুঁজে বেড়ান ফেলানীর অবয়ব।

আমজাদ বলছিলেন, ‘ওরা বেড়াইতে আইছিল আমাদের বাড়িতে, তখন ওরে আমি প্রথম দেখি। তখন আমার বয়স মনে হয় সাত-আট বছর ছিল। আমার নানী ছিল, আমার মা ছিল, তারাই প্রথম আমাগো বিয়ার প্রস্তাবটা তোলে। তো সেই যে এখান থেকে বেড়ায়া গেল, তারপর থেকে ফেলানীকে আর দেখি নাই। ফেলানীর বাবা মাঝে মাঝে বাংলাদেশে আসলে বলত ফেলানী বড় হলে নিয়ে আসব।’

আমজাদ বলতে থাকেন, ‘তখন তো ছোট ছিলাম। সেই রকম কিছু বুঝতামও না। যখন বিয়ার আনুষ্ঠানিকতা হওয়ার কথা, তখন ফেলানীর বাবা আসল ইন্ডিয়া থিকা। আমাকে বলল যে, হ্যাঁ মেয়ে দিব। তারপর আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলল। আমি তখন ঢাকায় ছিলাম। তখন কথাবার্তা বলার পর বলল, যে ঠিক আছে অমুক তারিখে বিয়া হবে। আমি বললাম ঠিক আছে তাইলে। অফিসে ছুটির জন্যে দরখাস্ত করলাম। যে বিয়ের সময় আসুম।’

‘ফেলানী বাংলাদেশ থেকে ঘুরে যাওয়ার পর আর কখনো দেখাও হয় নাই, কথাও হয় নাই। খালি মনে মনে জানতেছি যে আমাদের বিয়ে হবে। ছোট থাকতে তো এতটা ইয়ে কাজ করত না। যখন বড় হইছিলাম তখন আরকি অন্য রকম একটা আবেগ কাজ করত।’

২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ফেলানী ও আমজাদের। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য চারদিন আগে ৬ জানুয়ারি মেয়ে ফেলানীকে নিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হন তার বাবা নূর ইসলাম। কিন্তু বধূবেশে ফেলানীকে দেখা হয়নি আমজাদের, ৭ তারিখে হবু স্ত্রীর মৃত্যুর সংবাদ পান তিনি।

বিভীষিকাময় ওই স্মৃতি হাতড়ে আমজাদ বলেন, ‘ওরা ভারত থেকে রওনা হওয়ার পরই জানতে পারি যে, আসতেছে। তখন আমি ঢাকায়, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঘটনাটা জানিতে পারি। আমি ঘুমে ছিলাম, তখন আমার খালা আছে একটা; সে ফোন দিয়া আমাকে বলতেছে তোর আর আসা হইল না। আমি বললাম কেন? কি হইছে? পরে কয় যে ফেলানী তো নাই। তাও সেই রকমভাবে বলতেছে না। কিন্তু আমার মনের মধ্যে কেমন যেন কামড় দিতেছে-ধুঁকধুঁক করতেছে। যে কি হইলো! পরে ভালো কইরা শুইনা হাইরা, আমি বাড়িতে ফোন দিলাম মায়ের কাছে। যে মা দেখ তো কি হইছে।’

আমজাদ আরও বলেন, ‘আমি পুরো প্রস্তুতি নিয়ে রাখছিলাম যে, ৯ তারিখে আমার সেলারি দিব, ১০ তারিখে আমি চইলা আসব। আমি মিরপুরে কাজ করতাম, একটা গার্মেন্টে অপারেটর হিসেবে। তো এই খবর শোনার পর মামায় বলল যে এখন আর আসার দরকার নাই, লাশ এখনো দেয় নাই। তারপর ওইখানে মনে করেন তিন ঘণ্টা খালি পানিই ঢালসে আমারে। যে বাসায় ছিলাম, ওই খানকার মানুষ বলছিল যে তিন ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম। এখান থেকে আমার মা গেছিল আমার আব্বা গেছিল। ওই ঘটনার ছয় মাস পর আমি গ্রামে আসি।’

ফেলানীর হবু স্বামী আমজাদ হোসেনের বাড়ি লালমনিরহাট জেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের চর কুলাঘাট গ্রামে। ফেলানীকে না পাওয়ার বেদনায় দীর্ঘদিন বিমর্ষ ছিলেন আমজাদ, বলেছিল জীবনে আর বিয়েই করবেন না। পরবর্তীতে ত কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের প্রস্তাবে আবারও দুই পরিবার এক হওয়ার একটি উপলক্ষ খুঁজে পায়। বর্তমানে সেই ফেলানীরই ছোট বোন মালেকা খাতুন আমজাদের ঘরের বউ হয়ে সংসার করছে।

এ প্রসঙ্গে আমজাদ বলেন, ‘ফেলানী খুন হওয়ার পর আমি কাউরে কিছুই বলি নাই। কেমন যেন হয়া গেছিলাম। যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসছিল, তখনকা আমার মামা ফোন দিয়া বলল যে, চিন্তা করার কোনো দরকার নেই। তোমার আশা ভঙ্গ হবে না। ছোট আরেকটা আছে। ওইটার সঙ্গে তোমারে দিবে; এইটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বইলা গেছে। ফেলানীর ছোট বোনরে বিয়ে করার কথাটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনই প্রথম বলছিল। পরে ফেলানীর পরিবার একেবারে ইন্ডিয়া থেকে চলে আসল। আমিও গেলাম, ফেলানীর ছোট বোন মালেকারে দেখাল। তখনো ও ছোট। পরে আমার শাশুড়ি বলল, তিন চার বছর বাইরে থাক। মেয়েটা বড় হোক। পরে মনে করেন ১৩ বছর বয়সে যখন আসল তখন একবার ঢাকা থেকে আইসা দেখা করে চইলা গেছি। তারপর ২০১৪ সালে বিয়ে করলাম। বিয়ের পরও বাবার বাড়িতেই ছিল। বলল ইন্টার পাস করব। এর মধ্যে ২০১৮ সালে আমরা ওরে এই বাড়িতে নিয়া আসি। বিয়া কইরা ঢাকায় চইলা গেছি। ছয় মাসে বছরে একবার আসতাম। পরে করোনা শুরু হওয়ার পর একেবারে চইলা আইছি।’

ফেলানীকে নিজের দ্বিতীয় মা ভাবতেন ছোটবোন মালেকা খাতুন। বড়বোনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমার বড় বোন আমার মায়ের মতোনই ছিল। কারণ আমার মা তো বাসায় থাকত না, মানুষের বাসায় কাজ করত। তখন ও-ই আমাদের দেখাশোনা করত। আমরা স্কুলে যাইতাম। তখন টিফিন বানিয়ে দেওয়া, কাপড় চোপড় ধুয়ে দেওয়া-সব ও-ই করে দিত। তখন আমরা ৫ ভাই-বোন ছিলাম। বোন দুইজন, ভাই তিনজন। তারপরে আরও একটা ছোট বোন হয়।’ ফেলানীর সঙ্গে শেষ দেখা হয়নি সেই আক্ষেপ হয়তো সারা জীবনই রয়ে যাবে মালেকার। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আপা আসার সময়ে আমি বাসায় ছিলাম না। আমার এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গেছিলাম। তখন আমার রেজাল্ট বের হইছিল। তো রেজাল্ট পাওয়ার পর আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে বেড়াইতে গেছিলাম। এর মধ্যেই আপা চইলা আসছে। হুট কইরাই সব ঠিক হইছিল।’

ফেলানী নেই, আজ ১০ বছর। স্বাভাবিক গতিতেই বয়ে চলছে জীবন। আমজাদ-মালেকার ঘর আলো করে এসেছে ফুটফুটে একটি কন্যাশিশু। কিন্তু তবুও কোথায় যেন আজও তাদের তাড়া করে ফেরে ফেলানীর স্মৃতি। আমজাদের মনে আজও রয়ে গেছে ফেলানীর প্রতি সেই অমলিন ভালোবাসা।

আমজাদ-মালেকার মনে আজও প্রশ্ন, পুরো ঘটনাটা তো অন্যরকমও হতে পারত। কি হতো যদি বিএসএফ সদস্য অমীয় ঘোষ গুলি না করত? কিংবা যদি এই নজিরবিহীন নির্মম হত্যাকা-ের বিচার হতো, তাহলে কি তারা সান্ত¡না পেত? হয়তো হ্যাঁ-হয়তো না। কিন্তু একটি বুলেট দুটি পরিবারের প্রতিটি মানুষের জীবনে চিরদিনের জন্য মেখে দিয়ে গেছে ছোট্ট ফেলানীর বিষাদ মাখা ইতিহাস।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৭ মার্চ ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com