এক নজরে বারী সিদ্দিকী

শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৭

এক নজরে বারী সিদ্দিকী

শনিবার বিনোদন ডেস্কঃ চলে গেলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী। আধ্যাত্মিক ও লোকগানের এই প্রথিতযশা শিল্পী চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দিনগত রাত সোয়া দুটার পর রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহে…রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার চল্লিশাকালী গ্রামে বারী সিদ্দিকী জন্মগ্রহণ করেন। ।  তার মূল নাম আব্দুল বারী সিদ্দিকী । সঙ্গীত জগতে তিনি বারী সিদ্দিকী নামে পরিচিত।  বাবা প্রয়াত মহরম আলী ও মা প্রয়াত জহুর-উন-নিসা। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে বারী সিদ্দিকীই ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলায় বয়স যখন তিন কিংবা চার হবে সেই বয়সেই মা’র কাছে তার প্রথম শুনা গান ছিলো ‘শ্বাশুড়িরেও কইয়ো গিয়া’।


সেই গানের সুরই বারী’র মনে গেঁথে যায় ছোটবেলায়। যদিও তার পরিবার গানের পরিবার ছিলো না। কিন্তু সৌখিন গানের পরিবার ছিলো তার। বারীর নানা শেখ সাবির সরদ বাজাতেন। আর তার নানীর কাছ থেকেই মা গান শিখেছিলেন টুকটাক।

বারীর বয়স যখন পাঁচ তখন বড় ভাইয়ের বাঁশিতে ফু দেয়া তার মধ্যে অন্যরকম আগ্রহের সৃষ্টি করে বাঁশি শেখার প্রতি। বারীর নানারা দুই ভাই ছিলেন। তার নানার একটা সঙ্গীতের দল ছিল। নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন। দেশে ফিরে এসে লোকগীতির সাথে ক্লাসিক মিউজিকের সম্মিলনে গান গাওয়া শুরু করেন।

বারীর বাবা গানের সাথে জড়িত না থাকলেও গান বাজনা তার পছন্দের ছিলো। বারী তার বাঁশি শেখা এবং গান শেখার দুটোরই উৎসাহ পেয়েছেন তার মায়ের কাছ থেকে। বারী ছোটবেলায় বাঁশি বাজাতেন মূলত বড় ভাইদের নকল করে। তখন পদ্ধতিগতভাবে নেত্রকোণায় বাঁশি শেখার উপায় ছিলো না। তাই মাত্র সাত আট বছর বয়সেই মা জহুর-উন-নিসার কাছে গান শেখা শুরু করেন। মার কাছ থেকে জীবনে তিনি প্রথম যে গানটির সুর বাঁশিতে তুলে নিয়েছিলেন সেই সুরটিই তিনি পরবর্তীতে হুমায়ূন আহমেদ’র ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেছিলেন। সেটি ছিলো শ্যাম বিচ্ছেদের একটি সুর। কলিটা ছিলো এরকম ‘আস্ট আঙ্গুল বাঁশের বাঁশি/মধ্যে মধ্যে ছ্যাদা/ নাম ধরিয়া ডাকে বাঁশি/ কলংকিনী রাধা/।

1511491839_1বারী সিদ্দিকী যখন হাইস্কুলে পড়তেন তখন থেকেই তিনি নেত্রকোনা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে পদ্ধতিগতভাবে সঙ্গীত শেখা শুরু করেন নেত্রকোনা। তার সঙ্গীতের ওস্তাদ ছিলেন শ্রী গোপাল দত্ত। সে সময় বড় দুই ভাই এবং রফিক মাহমুদ, বিপুল চৌধুরী, দুলাল দত্তনবীশ, হযরত আলীর কাছ থেকেও গানে সহযোগিতা পেয়েছেন। ছোটবেলায় মূলত সঙ্গীতশিল্পী হবারই স্বপ্ন ছিলো বারী সিদ্দিকীর। তার মা তাকে উচাঙ্গ সঙ্গীত শিখে তা বাঁশিতে ট্রান্সফর্ম করতে বলতেন।

তিনি গোপাল দত্ত এবং ওস্তাদ আমিনুর রহমান থেকে লোক এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পাঠ নিয়েছেন। মূলতঃ বংশী বাদক বারী সিদ্দিকী কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের প্রেরণায় নব্বুইয়ের দশকে সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন এবং অল্পদিনেই বিরহ-বিচ্ছেদের মর্মভেদী গনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন। দৈনিক আমার দেশ সংবাদপত্রকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সিদ্দিকী বলেন, “হুমায়ূন আহমেদ আমার গাওয়ার পেছনে যথেষ্ট উত্সাহ দিয়েছিলেন। মূলত তার সাহস নিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পেয়েছি।”

১৯৯৫ সালে হুমায়ূন আহমেদ’র এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তার বাসায় যান বাঁশি বাজাতে। সেখানে বাঁশি বাজানোর পাশাপাশি গানও করেন তিনি।  গান শুনে মুগ্ধ হন হুমায়ূন আহমেদ।  এর পর তিনি সেই বছরই  বিটিভির ‘রং-এর বারৈ’ নামে এক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের সুযোগ করে দেন হুমায়ূন আহমেদ । ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রে ৭টি গানে কণ্ঠ দেন। এর মধ্যে “শুয়া চান পাখি” গানটির জন্য তিনি অতিদ্রুত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

11170323843662_10210907865232234_6503878547150647617_n১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করেন।

একই বছর তিনি   ফ্রান্সে ওয়ার্ল্ড ফ্লুট সম্মেলনে এই উপমহাদেশ থেকে তিনিই প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। এটা ছিলো বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট অর্জন। একজন গায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পাবার আগে বারী সিদ্দিকী একজন বংশীবাদক হিসেবে বাঁশি বাজিয়েছেন দু’দশক ধরে। কিন্তু গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার পর দেশের বাইরে বংশীবাদক হিসেবে তার সফর কমে যায়। কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন।

বারী সিদ্দিকী ১৯৮৬ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ফরিদা ইয়াসমিনের সঙ্গে। তিনি দুই পুত্র এবং এক কন্যা সন্তানের জনক ।

সঙ্গীতের পাশাপাশি তিনি এস এম শাহেনওয়াজের মাটির পিঞ্জিরা  চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সহশিল্পীরা ছিলেন শাহিদ খান, শম্পা, রাইসুল ইসলাম আসাদ,আফরোজা বানু, নাসিমা খানসহ আরো অনেকে । পরবর্তীতে তিনি ফেরারি অমিতের নির্দেশনায় ‘পাগলা ঘোড়া’ নাটকেও অভিনয় করেন। সহশিল্পীরা ছিলেন আনিসুর রহমান মিলন, তানিয়া কাজী । তবে অভিনয় করতেন নিতান্তই অনুরোধে এবং শখের বশে।

বিখ্যাত গান- শুয়া চান পাখি, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘সাড়ে তিন হাত কবর’, ‘পুবালি বাতাসে’, ‘তুমি থাকো কারাগারে’, ‘রজনী’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘ওলো ভাবিজান নাউ বাওয়া’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো প্রভৃতি গানের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

বিখ্যাত সেই শুয়া চান পাখির ইতিহাস এবং গানটি শুনতে নিন্মের লিঙ্কে ক্লিক করুনঃ

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ২৪ নভেম্বর, ২০১৭

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:১৯ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৭

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com