একুশে পদক বেচা ছাড়া উপায় নেই

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

একুশে পদক বেচা ছাড়া উপায় নেই

ঋণের বোঝায় জর্জরিত একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রয়াত আবদুর রহমান বয়াতির পরিবার। দায় পরিশোধ করতে একুশে পদকের স্বর্ণের মেডেলটিই এখন তাদের শেষ সম্বল। এটিই বিক্রি করে ঋণের বোঝা কমানোর কথা ভাবছেন তারা।

সারাজীবন গান করে মানুষের মনের খোরাক ‍জুগিয়েছেন। অথচ দীর্ঘদিন রোগ শস্যায় থাকাকালীন তার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি কেউ। শেষ মুহূর্তে চিকিৎসার খরচ মেটাতে হয়েছে ঋণ করেই। প্রায় দুই বছর ধরে এই ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন রহমান বয়াতির পরিবার।


২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট রাজধানীর জাপান-বাংলাদেশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চিরবিদায় নেন দেশের লোকসঙ্গীতের প্রখ্যাত এ শিল্পী। প্রায় চার যুগ ধরে বাউল গানে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশের মঞ্চ মাতিয়েছেন তিনি। পৃথিবীর অনেক দেশেই লোকসঙ্গীত পরিবেশন করে নিজ দেশের গানের এ ধারাটিকে বিদেশিদের কাছে পরিচিত করেছেন আবদুর রহমান বয়াতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই তাকে সর্বপ্রথম বিদেশে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন। পৃথিবীর প্রায় ৩২টি দেশে বাংলার লোকসঙ্গীতের মরমী সুর ছড়িয়ে দেন এ শিল্পী।

৬৫ বছরের সঙ্গীত জীবনে পেয়েছেন অনেক পদক। একুশের পদক ছাড়াও তিনি সিটিসেল-চ্যানেল আই অ্যাওয়ার্ড, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী কর্তৃক গুণীজন সংবর্ধনা, নজরুল একাডেমী সম্মাননা, বাংলাদেশ বাউল সমিতি আজীবন সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড, বাউল একাডেমী পদক, লোকসঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য স্বীকৃতিস্বরূপ লোকজ বাউলমেলা পদক ২০০৪ সহ আরো অনেক সম্মাননা। গানই শুধু নয় চলচ্চিত্র, নাটকসহ বহু বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয়ও করেছেন তিনি।

বাংলামেইলের এক অনুসন্ধানে বেরিয়েছে আবদুর রহমান বয়াতির পরিবারের বর্তমান দরিদ্রক্লিষ্ট অবস্থা। এই শিল্পীর একুশে পদক প্রাপ্তির অনুভূতি জানতে চাইলে তার পরিবারের সদস্যরা বলেন, একুশে পদক পেয়ে আমরা খুবই গর্বিত। আমরা মনে করি এ পদক শুধু আবদুর রহমান বয়াতির নয় দেশের সকল বাউল শিল্পীর। তবে শিল্পীর জীবদ্দশায় এ পদক পেলে আরো বেশি খুশি হতাম আমরা।

আবদুর রহমান বয়াতির তিন ছেলে। মেঝো ছেলে আলম বয়াতি বাবার পথ ধরেছেন। একতা বাউল শিল্পী সমিতির সভাপতি তিনি। তিনি জানালেন, তার বাবা ২০০৩ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বদেশ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রেকর্ডিং করতে গিয়ে ব্রেইন স্ট্রোক করেন। এ যাত্রা বেঁচে গেলেও ২০১০ সালে আবার স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে এক মাস থাকার পর বাসায় আনা হয়। এরপর তিনি আর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। ২০১২ সালে শ্বাসকষ্ট দেখা গেলে গলায় ছিদ্র করে শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হয়। তখন থেকে পাইপ দিয়ে খেতে হয়েছে তাকে। এই অবস্থায় জীবনের শেষ চারমাস রাজধানীর জাপান-বাংলাদেশ হাসপাতালে চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। এছাড়া হাসপাতালের চার্জতো ছিলই। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেশবরেণ্য এ বয়াতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে চার্জ ফ্রি করে দেয়।

আলম বয়াতি আরো জানালেন, তার বাবার মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ৩ লাখ টাকা অনুদান পেয়ে এই দেনার প্রায় অর্ধেক পরিশোধ করেন। বাকি ৪ লাখ টাকা এখনও ঋণী হয়ে আছেন তারা। প্রতিদিন এ টাকার সুদ বাবদ গুণতে হচ্ছে ১৮৫০ টাকা। বছরখানেক হলো নিজের রোলার কোম্পানির চাকরিটিও চলে গেছে। এখন গানের অনুষ্ঠানই একমাত্র ভরসা। গানের অনুষ্ঠান করে যা পান তাতে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই বাবার চিকিৎসার ঋণের বোঝা আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ।

এদিকে আবদুর রহমান বয়াতির সহধর্মীনী খাতুন জারা দীর্ঘদিন যাবৎ রোগে ভুগছেন। তার শরীরে পানি জমে থাকে। অর্থাভাবে চিকিৎসা চালাতে পারছেন না। শরীরের ব্যথা শুরু হলে শুধু গামছা দিয়ে হাটু বেঁধে রাখেন।

খাতুন জারা বাংলামেইলকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী অনেক দয়াশীল মানুষ। তিনি দেশের শিল্পীদের বিপদে সহযোগিতা করেন। তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারলে এতদিনে আমাদের সমস্যার একটা সুরাহা হতো। প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা পেলে অন্ততপক্ষে আমাদের ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াতে হতো না। তাই এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করছি।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া প্রধানমন্ত্রী যদি খোলা ময়দানে আমাদের একটু জায়গা দিতেন। তাহলে ঘর তুলে থাকতে পারতাম। ভাড়া দিয়ে থাকার মতো অবস্থা আর আমাদের নেই।’

প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে যারা সহযোগিতা করেছেন বয়াতির পরিবার তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে সাবেক তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, ‍শিল্পী ফকির আলমগীর, কুদ্দুস বয়াতি ও চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগর এর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান তার পরিবারের সদস্যরা।

তারা বলেন, চ্যানেল আইয়ের ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না আমাদের পরিবার। তবে সিটিসেল চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননার সঙ্গে মাসিক অনুদানের কোটাটা পেলে আরো ভালো হতো।

ঋণে জর্জরিত আবদুর রহমান বয়াতির পরিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চায়। এজন্য তারা যোগাযোগ রেখে চলছেন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব সাইফুজ্জামানের সঙ্গে। কিন্তু আজ অবদি সাক্ষাতের সুযোগ হয়ে ওঠেনি।

তাই পরিবারের সদস্যরা জানান, যদি কারো সহযোগিতা পাওয়া না যায় তাহলে হয়তো শেষ পর্যন্ত কিংবদন্তী এ শিল্পীর একুশে পদকসহ সব সম্মাননা পদক বিক্রির টাকায় ঋণ পরিশোধ করা ছাড়া আর উপায় থাকবে না।

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com