উজানভাটি

শনিবার, ১৭ জুন ২০১৭

উজানভাটি

ছোট গল্প

 


উজানভাটি
পদ্মনাভ অধিকারী

 

Litearture 01দরিয়াপুর গ্রামের বিদ্যাবিনোদ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জেএসসি পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে গতকাল। ষাটজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র হতদরিদ্র দিনমজুর বাবুরাম সর্দারের পোতা ছেলে নেতাই এ প্লাস পেয়েছে। বাকি সব শিক্ষার্থী বি পেয়ে পাশ করে। ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোন রকম আনন্দ উৎসব করার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। স্কুলের সকল শ্রেীণর ছাত্র ছাত্রীর মনে একটা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা গোপনে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয় যে, নেতাই সর্দার ভাল ফলাফল করার জন্যে, কমিটির হর্তা-কর্তা সদস্যরা নিজেদের বিফলতার কথা না ভেবে, সম্মানের কথাটা বড় করে দেখছে। যে সিদ্ধান্ত কেবল নেতাইকে নয় বরং সকল ছাত্র-ছাত্রীর উপর অবিচার করা হয়েছে। সুতরাং সকল ছাত্র-ছাত্রীও তাদের অভিভাবক মিলে পরদিন এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কারণ স্কুলের প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষক কোচিং ছাড়া ছাত্র-ছাত্রীর উন্নতির কথা ভাবেনি কোন ব্যক্তি। কোচিং ছাড়া কেউ পাশ করতে পারে না। সে যত ভাল লেখাপড়া করুক না কেন।

স্কুল শিক্ষকের কেবল কোচিংই নয়, স্কুল কমিটির সভাপতির মনোনীত গাইড বইও কিনতে ছাত্র-ছাত্রীদের বাধ্য করেছেন। মূল বইয়ের সাথে তাদের তেমন কোন সম্পর্কই নেই। ঠিক এমন কারণে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের মেধায় প্রশ্নোত্তর লিখতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে পরীক্ষার হলে। ফলে মুখস্ত বিদ্যার জোরে যেমন লিখতে পেরেছে, তেমন নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। বিষয়টি পড়–য়ারাই নয় তাদের শিক্ষিত সচেতন অভিভাবকেরাও হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছেন। আর তার শিক্ষার্থী অভিভাবকের নতুন পরিকল্পনা হাতে নেয়। দুদিনের মধ্যে দুটি গ্রামের শিক্ষার্থীও অভিভাবকদের মাঝে গোপনে যোগাযোগ করে সার্বিক কর্ম পরিকল্পনা কার্যকরী করার বন্দোবস্ত হয়ে যায়।

তৃতীয় দিন। পৌষের হালকা শীতের পরশমাখা কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরবেলা প্রতিটি শিক্ষার্থী আর তাদের অভিভাবকেরা দল বেঁধে দুটি গ্রামের ভেতরকার সকল পথ পরিক্রমা করে আর সমবেত কণ্ঠে স্লোগান দিতে দিতে স্কুলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। সমবেত কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে কোচিং বাণিজ্য চলবে না- চলবে না। কোচিং বাণিজ্য বন্ধ কর, করতে হবে। গাইড বই পড়ব না- পুড়িয়ে দাও জ্বালিয়ে দাও। জ্বালিয়ে দাও- পুড়িয়ে দাও। মিছিল তো নয় যেন হাজার মানুষের স্রোত। প্রতিরোধের কেউ নেই।

খুব ভোরে শ্লোগানের শব্দ কানে শুনে স্কুল কমিটির হর্তা-কর্তা আর সদস্যরা অবাক হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তারা কি করবে। আর কি হচ্ছে ভেবে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। স্কুলের দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। যে পথেই যেতে চেষ্টা করে সে পথেই বাধাগ্রস্ত হয়। অগত্যা নীরবে সবার পেছনে হাঁটতে থাকে।

বিশাল জনস্রোত স্কুলের মাঠে এসে পৌছায়। স্কুল ময়দানের মাঝখানটা বিরাট গোলাকারে ফাঁকা রেখে ছাত্র-ছাত্রী অভিভাবকেরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে থাকে। ফাঁকা জায়গায় কয়জন ছাত্র-ছাত্রী দাঁড়িয়ে স্কুল কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের কুশপুত্তলিকা মাটিতে গর্ত করে পুতে দেয়। তারপর আগুন তাতে ধরিয়ে চিৎকার করে স্লোগান দিতে থাকে। কুশ আগুনে পুড়ে মাটিতে পড়ে গেলে চারদিক থেকে গাইড বই ছুড়তে থাকে। আগুন ক্রমে ক্রমে ভয়াল রূপ নিতে থাকে। বৃত্তের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছাত্র আকরাম বলতে থাকে সমবেত ছাত্র-ছাত্রী, ভাই ও বোনেরা আর আমাদের পিতা-মাতাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাই। স্কুল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর অনিয়মের কারণে আজ আমাদের স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। তবে আমরা কেউ ফেল করিনি। কিন্তু কর্মকর্তারা নেতাই সর্দারের ভাল ফলাফলের কারণে তারা হিংসা করে স্কুলে প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর যে আনন্দ উৎসব হয় তারা তা করতে চান নাই। কারণ কি? নেতাই সর্দার নিম্নশ্রেণীর ছেলে। কিন্তু সেতো এই স্কুলের ছাত্র। সে আমাদের গর্ব। তার কোন শিক্ষক ছিলনা, কোচিং করতে পারেনি। গাইড বই কেনার সামর্থ্য তার ছিল না। মূল বই পড়ে সে আজ আমাদের সকল ছাত্র-ছাত্রী আর স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করেছে। সে যদি পেরে থাকে তাহলে কোচিং আর গাইড বইয়ের কিসের প্রয়োজন ?  জ্বালো জ্বালো- আগুন জ্বালো। কয়েক মিনিট স্লোগান হতে হতে আকরাম হাত উচু করে। স্লোগান থেমে যায়। আকরামের পাশে এসে দাঁড়ায় যুথিকা। সে বলতে থাকে আজ এইখানে সবার মাঝে দাঁড়িয়ে সবাইকে সাক্ষী রেখে বলতে চাই। শিক্ষামন্ত্রী আর সরকারের প্রতি এই আহ্বান আপনারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে, টেলিভিশনের পর্দায় কেবল গালভরা কথা না বলে আমাদের পাশে দাঁড়ান। বাজার থেকে গাইড বই তুলে নিন। কোচিং বন্ধ করার জন্যে কঠিন পদক্ষেপ নিন। আমরা পরীক্ষার্থী হতে চাই না। আমরা শিক্ষার্থী হতে চাই। পাশের হার দেখিয়ে বিদেশের কাছে বাহবা নিতে গিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেবেন না। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করার ব্যবস্থা নিন। আপনারা যদি মনে করেন, যে পাশ করা ছাত্রদের শ্রমিক হিসাবে বিদেশে পাঠিয়ে শিক্ষিতের নামে কলুর বলদ বানিয়ে রেমিটেন্স নিয়ে গর্ব করবেন, তাহলে ভুল করবেন। কারণ বিদেশী সুক্ষিত-দক্ষ-যোগ্যরা আমাদের দেশে এসে আমাদের কর্তা আর শিক্ষক সেজে মোটা অংকের মাহিনা নিয়ে চলে যাবে আর আমরা হবো সামান্য বেতনের শ্রমিক। এর চেয়ে লজ্জা জাতির জন্যে কি হতে পারে। মুখে যা বলবেন, বাস্তবে সেটা করার চেষ্টা করুন। শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে করতে এমন ব্যবস্থা করেছেন, যে ব্যবস্থায় আমরা আমাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকার বলে মনে করছি। জ্বালো-জ্বালো স্লোগান শুরু হয়। সহসা থেমে গেলে ছাত্র আজিজুর বলে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে বৈদেশিক শ্রম বাজারের শ্রমিক তৈরী করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিভার বিকাশ ঘটানো হয়। আর এদেশে প্রতিভার বিনাশ ঘটানো হচ্ছে। তার প্রমাণ এই যে, ঢাকা ভার্সিটিতে ইংরেজীতে পড়ার জন্য দুই হাজার পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে মাত্র তিনজন সুযোগ পেয়েছে। তার মানেটা কি? মেধার বিকাশ ঘটানোর মত শিক্ষানীতি নাই (কথার মাঝে জ্বলন্ত আগুনে গাইড বই এসে পড়তেই থাকে। স্কুল কর্তৃপক্ষ গোপনে থানায় সংবাদ পাঠিয়ে দেয়। ফলে দারোগা পুলিশ এসে হাজির হয়, ভিড় ঠেলে দারোগা ও স্কুলের সভাপতি আজিজুরের সামনে এসে হাজির হয়। আমি মনে করি এ শিক্ষা ব্যবস্থা… এই ছেলে খুব পাকাপাকা কথা বলছো। চুপ করো তা না হলে

না হলে কি করবেন?

দেখতে চাও? বেয়াদপ কোথাকার।

বেয়াদপি করছেন আপনি। বন্ধুগণ হুশিয়ার। আগামীকাল থেকে কেউ কোন স্কুলে যাবে না। কি-রাজি।    সবাই বলে, রাজি।

তাহলে একটা কাজ করতে হবে কাজটা হচ্ছে সরকারের পেটুয়া বাহিনী এসেছে। যাদের মহিন গায়ের পোষাক, অস্ত্র আমাদের টাকায় হয়, তারা আমাকে ভয় দেখাচ্ছে এতো বড়ো সাহস কোথা থেকে পায়? এটাই যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়, এটাই যদি স্বাধীনতার ফল হয়, তাহলে জবাব দিতে হবে আক্রমণ করো।

সমবেত জনতা ক্ষিপ্ত সিংহের মত ঝাপিয়ে পড়ে। ফাঁকা গুলির আওয়াজ করতে করতে পুলিশ পালাতে থাকে। জনতা ছুটতে থাকে পিছু পিছু। এদিকে একদল দারগাকে ঘিরে ধরে। দারগা জ্বলন্ত আগুনের চারপাশে ঘুরতে থাকে। আজিজুর বলে গণতন্ত্রের নামাবলি পরে, জনগণের সাথে ধোঁকাবাজির ফলটা জানেন, বলেই তিন বন্ধু মিলে দারগাকে দাবড়াতে থাকে। দারগা দৌড়ায় আর বাঁশিতে ফুঁক দিতে থাকে। অবশেষে দারগা খালের জলে ঝাপ দেয়। তিন বন্ধু পাড়ে থমকে দাঁড়ায়। আনিচুর বলে আমাদের ডুবানো ব্যবস্থা যেমন করেছে, তেমন তোমরাও ডুব দিতে দিতে খাল পার হও। ছাত্রদের সাথে পাকামো চলে না। ওরা স্থান ত্যাগ করে। ডিসি এসপির গাড়ী এসে খাল পাড়ে দাঁড়ায়। বেলা দ্বিপ্রহর। উৎসুক গ্রামবাসী ভিড় করতে থাকে। একটা মাছরাঙ্গা ছো মেরে মাছ নিয়ে উড়ে যায়।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ১৭ জুন, ২০১৭

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৭ জুন ২০১৭

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com