ঈশানা শুনছ আমার কথা?

শনিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

ঈশানা শুনছ আমার কথা?

ঈশানা শুনছ আমার কথা?
নুসরাত নীলা

 


Litearture 01‘বাহির হয়ে এস তুমি যে আছ অন্তরে’- উঁচু ভলিউমে বাজছে। ল্যাপটপের সঙ্গে দুইটা তার। একটা সাউন্ড বক্সের দিকে গেছে আর একটা থেকে ল্যাপটপ তার জেগে থাকার রসদ নিচ্ছে। ওয়াইফাই অন। ফেসবুক পাতা খোলা। কাকে যেন ডাকছে ঈশানা- এসো এসা আমার ঘরে এসো। আবার শুধরে দিয়ে বলছে, না না, কেন আসবে, এস না- আমি দারুণ আছি। দারুণ থাকার পরে আবার নিজেকেই জিজ্ঞেস করে, কেন আছি- এ থাকার কী মানে। মনে মনে ঠিক করে, আজ যাব, যেতেই হবে আমাকে। কোনো পিছুটান আর রুখতে পারবে না ঈশানা নিশ্চিত। তাও তো কয়েক ঘণ্টা হয়ে গেল। রিপ্লাই আসেনি এখনো।

অনেক আগে সে অনলাইনে ছিল। ফেসবুক দেখাচ্ছে এগারো ঘণ্টা! একটাই ভুল হয়েছে সেল নম্বর নেওয়া হয়নি। ঈশানা স্ক্রল করে করে ঘুরছে। ইনবক্স দেখছে। আরো অনেকেই আছে। না কারো জন্য মন টানছে না। যার জন্য টানছে আশ্চর্যজনকভাবে আজ সে হাওয়া! অনেকদিন এমন হয়েছে লগইন করে তাকে সবুজ বাতি হয়ে জ্বলতে দেখেই সে তাড়াহুড়োয় অফ লাইনে গেছে! প্রতিদিন এগুলো শুনতেও ভালো লাগে না। কবি মানুষ। তাই তার কথা কবিতা সব সময় রেডি। নারীরা নিজের রূপ-যৌবন নিয়ে শুনতে চায়, খুব সত্য। কিন্তু এ রূপ যৌবনের কী দাম যে একটা পুরুষকে বাঁধতে পারে না! আবার একই রূপ আরেক পুরুষ যাচে! সত্য তো এই, সেই পুরুষও যেচেই নিয়েছিল। কিন্তু মধু সে কলির- তাই রইল না। রইল না আবার কী কথা- রইল তো, বাড়ি রইল, গাড়ি রইল, সোনা-গয়না অই যে টেবিলে সাজানো সুস্বাদু খাবার সবই তো রইল। সে রইল না তার সব কিছু তো রইল! কাল সে মরে গেলে কে বলবে, সে আসলে ছিল না- আহা আহা বেচারা কত কিছু রেখে গেছে বউটার জন্য, দিনরাত কত পরিশ্রমই না করেছে এগুলো গোছাতে! হো হো করে হাসল ঈশানা। সত্যিই বউয়ের জন্যই তো সব! দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাল- প্লেনটা উড়ছে এখনো। সে যাচ্ছে স্বর্গে আর ঈশানা কিনা তার মৃত্যু নিয়ে ভাবছে! যাহ্ স্বর্গ বললে কেমন মনে হয় মৃত্যুর পর স্বর্গে যাচ্ছে সে! আবারও অট্টহাসি দিল ঈশানা। থাক আজ তাকে নিয়ে আর না ভাবুক ঈশানা। প্রতিদিন তো তাকে নিয়েই ভেবে ভেবে গেল। কূলকিনারা মিলল না কিছুই। দেরাজ খুলে দেখল অনেকগুলো না পড়া শাড়ি জমা হয়ে আছে। শাড়ি পরতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু কোথায় যাবে এখনো ঠিক হয়নি। যাবে এটুকু শুধু নিশ্চিত। সে বলেছিল, আপনাকে শাড়িতে আরো সুন্দর দেখাবে। ফেসবুকে কোনো শাড়ি পরা ছবি নেই। সবই পাশ্চাত্যের ঢঙে। সে বলে এগুলোও সুন্দর তবে বাঙালি নারী মানেই কল্পনায় শাড়ি আসে! বলেছিল, ‘একদিন আপনি শাড়ি পরে আসুন, আমি আপনার খোঁপায় লাল ঝোপা রঙ্গন গুঁজে দেব! আচ্ছা আপনার কি নেলপলিশ পরতে ভালোলাগে? আপনি চোখ বুঁজে থাকবেন আমি আপনার নখ রাঙাব! শরীরের একটা আলাদা এই ছোট্ট দুনিয়া কেমন নানা রঙে নেয়ে উঠবে- পায়েও পরাব, অবশ্য আলতা দিলে আরো ভালো দেখাবে মনে হয়।’

সেদিন হঠাৎ মনে পড়ল স্কুল ছেড়ে কলেজে উঠে একদিন হিন্দু বধূর মতো খুব শখে সেজেছিল। তার একটা ছবিও হয়তো কোথাও রয়ে গেছে- খুঁজলে পাওয়া যাবে। পা ভরা আলতা। পুকুরে সেই পা ডুবিয়ে কলসি হাতে ঘাটের দিকে চেয়ে আছে। সময়গুলো সুন্দর বয়ে গেছে সে সময়। অবশ্য বিষের বোঝা তো সে অনেক আগে থেকেই বইছিল! ঝুপ ঝুপ করে অনেকগুলো শাড়ি পড়ে গেল নিচে। কুড়িয়ে নিতে গিয়েই শুনল গান ছাপিয়ে ম্যাসেজ টোন বেজে উঠেছে। নিজের লেখাটা আগে পড়ল। ‘সশরীরে হাজির হতে চাই, মুগ্ধতার রেশ কতটুকু এরপরও রয়ে যায়- দেখব।’ প্রথমে উত্তর এসেছে একটা হাসির ইমো। তারপর লিখেছে, ‘মুড অফ না শাহী হেরেম আর ভালো লাগছে না? আসুন। কতক্ষণ লাগবে, শাড়ি পরবেন?’  তারপর ঠিকানা লেখা। ঈশানা লিখল, একটু সময় লাগবে, সিল্ক না সুতি বুঝতে পারছি না। ওপাশ থেকে উত্তর এলো, ‘একটা লাল টিপ দিবেন। আমি রঙ্গন খুঁজতে যাচ্ছি।’ ঈশানা লিখল, আসছি। ওপাশ থেকে এলো, ওয়েটিং। তারপর তিনটা হার্ট ইমো। শাড়ি হাতেই অনেকক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে থাকল ঈশানা। একবার বাথরুমে গেল সেখানে কিছুক্ষণ থমকাল। শরীরটা ভার ভার লাগছে। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হলো। অহেতুক এতক্ষণ সে সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য তড়পাচ্ছিল! মনের জোর নেই ঈশানা। বলল নিজেকে। শুয়েও পড়ল। এ অর্থহীন, খুব খারাপ হবে। একটা মানুষের অহেতুক স্বপ্নভঙ্গ। ভালোবাসা ছাড়া শরীর মেলে? আবার ঈশানা শরীর মেলাতে চাইলে সে যদি বলে, ভালোবাসা চাই। মনে মনে বলল, চাইলে চাইবে। তারপর ভেসে যাব, ডুবে যাব। সুখের তেপান্তরে নয়তো দুখের ঝড়ো হাওয়ায়। ঘড়িতে এখন তিন ঘণ্টা পার হয়েছে। প্লেন ল্যান্ড করেছে মনে হয়। বলেছে, সিম নিয়েই ফোন দেবে। ঈশানা চেঁচাল, মেকি মেকি, সব মেকি। বিশ্বাস ভঙ্গকারীর মুখে অনুরক্ততার একটা বাক্য শুনতেও ভালো লাগে না। তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে আবার চেঁচাল, যাব না কেন, যাব। আমি পারব। কাউকে ডুবিয়ে আমাকে ভেসে থাকতে হবেই। কিংবা এই ভেসে থাকার অর্থহীনতাকে প্রমাণ করে ডুবে যেতে হবে।

মস্ত এক টিপ কপালে দিল। মাঝখানে সিঁথি কেটেছে। বেশি উড়লে এক ফাঁকে চুলগুলো বেঁধে নেবে। রুপার চুলের কাঁটাটা ব্যাগে ভরে নিল। আর কানে পরল একটা রুপার ঝুমকা। ল্যাপটপটা অফ করল। দরজার কাছে পৌঁছালে ড্রাইভার দৌড়ে এলো- ভাবি গাড়ি নেবেন না? না- ছোট্ট করে বলল ঈশানা। এত অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে! আয়নায় নিজেকে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেছে। হিসাব করল, কতদিন দেখেনি সে-তাও কয়েক বছর! আবার তাকে নিয়ে ভাবনা! তার সমস্ত ভাবনায় কেন সে এমন উছলে ওঠে! ‘ঈশানা’-ডাকল নিজেকে, ‘শোনো ঈশানা, পুরোনো বসন্ত চলে গেছে- এক ডালে বারবার এক কোকিল ডাকে না। সে পারলে তুমিও পারবে, বলো নিজেকে।’ ঈশানা আজ পারবে। ঈশানা আজ পেরেই ছাড়বে। মনে মনে শক্ত ঈশানা এরপর একটা বাসে চড়ে বসল। কিন্তু তারপর ঈশানার কী হলো কে জানে, বারবার বিব্রত হতে চাইল তার ঠোঁট, বলতে, ড্রাইভার বাস থামান, আমি নেমে যাব। ভিন্ন আরেক আত্মা গুড়গুড় করে উঠল মেঘের মতো- ঈশানা কেন যাচ্ছ? তুমি পারবে? তোমার বিশ্বাস? সব খোয়ালে-এ স্রেফ গোয়ার্তুমি। তুমি শরিফ না। এতদিন নিজেকে বলে এসেছ শরীফের শিক্ষা আর তোমার শিক্ষা ভিন্ন, এ শিক্ষা তুমি নিজেই বলেছ, তোমার পরিবার তোমাকে দেয়নি, তুমি দিনে দিনে নিজ থেকে অর্জন করেছ! ঈশানা বলল, বিশ্বাস যখন কারো বাপের সম্পত্তি না, সেই তো বলেছে- এই ক্ষতবিক্ষত হতে হতে দেখি না একবার বিশ্বাস ভাঙার আনন্দ কেমন! এরপর খুব রেগে গেল ঈশানা। কেন পারব না- এই যন্ত্রণা কেউ বুঝবে? কেউ না। ভালোবেসে মানুষ বিশ্বাস ভাঙে। বিশ্বাস ভাঙার কী এত আনন্দ! আর আজ? সেই গুড়গুড় জানতে চাইল-কী আজ? এই যে আজ সে পাশে বসিয়ে নিয়ে গেল কাউকে। কেমন করে নিশ্চিত হলে- সে তো বলেছে অফিসের কাজ! আমি জানি, আমি জানি সব। আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। কী জানো। অইযে খোলা বুক, কেপে উঠল সে! খোলা বুক? হুম। তার সামনে দাঁড়ানো যে মানুষটা। আমি তাকে খুব ভালো বাসতাম। কত তার হাত ধরে হেঁটেছি! পৃথিবীর পথে অইতো আমার হাঁটার শুরু! সে যখন এমন করল…!

জীবনের সমস্ত বিষয়কেই দুই রকম দৃষ্টিতে দেখা উচিত ঈশানা। তুমি খুব একচোখা! কিন্তু এ চোখের সামনেই কেন এত কিছু পড়ে যায় বল? হয়তো তুমি অভাগা বলে। হয়তো তুমি একবার দেখে ফেলার পরে বারবার দেখতে চাও বলে। তুমি প্রমাণ চাও। ভালোবাসার কোনো প্রমাণ হয় না। সেই সব স্মৃতি আমার বিশ্বাস নড়বড়ে করে দিয়েছিল। মানছি, তবু তুমি পুরুষই যাচলে দেখ! এখনো তাই করছ! তুমি নিশ্চিত জান না সে কাউকে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ তুমি সেই শোধ নিতে আর একটা পুরুষকে চাইছ! আমি নিশ্চিত নই- কিন্তু পুরুষ এমনই। আমি তার কিছু ব্যক্তিগত কাগজ পড়ে ফেলেছিলাম। এরপর আর বিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না। পাঁচ মাস বিছানায় পড়ে ছিলাম; অসুস্থ, সে সময় সে- মানছি তার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন কি আমার ছিল না, আমার নেই? কই আমি তো আর কারো বিছানায় উঠে যাচ্ছি না! ও, তাহলে তুমি বলতে চাও তোমার প্রয়োজন মিটছে না বলেই বারবার ঠেলে তাকে এর তার বিছানায় তুলে দিচ্ছ যেন তোমার আর কোনো বিছানায় ওঠা সহজ হয়?

না, না এমনটা কখনই না। তুমি এভাবে ভেব না। আমি খুব সহজ ভাবে তার সঙ্গে জীবনটা শুরু করেছিলাম। একটা ক্ষতে ভরা  শৈশব-কৈশোর বয়ে নিচ্ছিলাম এ সত্য। কিন্তু আমি দম নিয়েছিলাম এইখানে এসে। মনে হয়েছিল কত দীর্ঘ দিন-রাত বারবার জীবনের বিচিত্র অলিগলি থেকে ধেয়ে আসা দুর্বোধ্য ধোঁয়া কেটে যে শহরে পৌঁছাব বলে একের পর স্টেশন বদলেছিলাম- নিশ্চিত হয়েছিলাম আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি; আমার যাত্রা শেষ হয়েছে। কিন্তু না, একদিন আবার ধেয়ে এলো ঝড়। বুবস মানে জানি না তখনো। নেটে এই শব্দটা খুব চলছে তখন। ঘুরতে ঘুরতে চোখে এসে পড়ল বিশাল বুক খোলা ছবিটার নিচে তার কমেন্ট। বমি উগড়ে এলো। এ কি! কেন? তারপর আঁতিপাঁতি করে খুঁজলাম চতুর্দিক। কত ছল, কত নোংরা দিয়ে আমার সেই সবুজ পৃথিবী ভরে গেল। ফিরে যাওয়ার পথ কই? এত কানামাছি, গোল্লাছুট নয় যে যা খেলব না বলে-চলে গেলাম।

সামনে পথ বাড়াব? পেছন খাঁমচে ধরে। আবার ঠিক দিন যে যায় না তা নয়, যায়। ধুঁকে ধুঁকে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ আমার সব এক রঙে রাঙা! কেন এমন করলে? কেন এত খুঁজতে গেলে? যেটুকু জেনেছিলে তারপরই থেমে যেতে। তোমার নিজের জন্য নিজের বেঁচে থাকা জরুরি ছিল। জান না সব মানুষেরই একটা গোপন জগৎ থাকে- এরপর আর তুমি কী করে বাঁচবে বল? আমি তো বেঁচে নেই। নিশ্বাসটাই কেবল পড়ছে। ভালোবাসার পরীক্ষায় হেরে গেছি আমি! তার প্রতিটা আচরণ আমার জঘন্য লাগে। মনে হয় আমি আড়াল হলেই সে দাঁড়িয়ে পড়ে একটা খোলা বুকের সামনে! আমি তাই বুক লুকিয়ে রাখি। আমি তাই শরীর লুকিয়ে রাখি। আমার খুব কষ্ট হয়। সেই কোন কালের স্মৃতি হয়তো আমাকে উসকে দিয়েছিল আরেকটা খোলা বুক খুঁজে পেতে। এবং কী আশ্চর্য দেখ আমি বারবার তাই খুঁজে পেয়েছি! ঈশানা, ঈশানা-কে যেন খুব দূর থেকে ডাকল- ঈশানা এখন তো তুমি অনেক বড় হয়ে গেছ। ওই স্মৃতিটার পক্ষে একটা ভালো যুক্তি দাঁড় করাও না। পৃথিবীর সব পুরুষ তার সঙ্গীর আড়ালে খোলা বুকের সামনে দাঁড়ায় না। তুমি এমনটা খুঁজে পেতে চেয়েছ বলেই পেয়েছ।

তোমার ভেতর পুরুষকে একটা কদর্য রূপ দেওয়ার প্রবণতা সেই ছোট্টকালেই গড়ে তুলেছিলে। মনে পড়ে যে পুরুষটাকে তুমি বিয়ে করতে চেয়েছিলে খুব করে আমি নিশ্চিত পেলে তাকেও তুমি এমন কদর্যতায় আঁকতে! মোটেই না। আমি নিশ্চিত। মনে আছে তোমার? একদিন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সে একটা মেয়ের বুকের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, দেখ মেয়েটা বুকের কাপড় আলগা করেছে কেমন! তুমি এখনো সেই স্মৃতি ভাব। কেন সে তোমাকে পাশে রেখেও অন্য নারীর বুকের দিকে চেয়েছিল- এই প্রশ্ন এখনো তোমার ভেতর রয়ে গেছে! আর তুমি কখনোই তাকে তোমার বুক খুলে দেখাওনি। সেই কদর্য স্মৃতি তোমাকে বলেছিল বুক লুকিয়ে ফেলতে। জীবনে একবার যে তোমরা খুব কাছাকাছি এসেছিলে, সেদিনও তুমি ব্যথায় কঁকিয়ে উঠেছিলে, যেন তুমি পাপ করছ- কারণ তোমার স্মৃতি তোমাকে বলেছিলে ওগুলো পাপ।

কে জানে আজ ভেবে দেখ সেদিন যদি তুমি এটাকে পাপ না ভাবতে আজ হয়তো তোমরা একসঙ্গে থাকতে। আমি নিশ্চিত আজ তুমি তাকে জিজ্ঞেস করো, সে বলবে সেই প্রত্যাখ্যান তার ভেতর দ্বিধা তৈরি করেছিল! হয়তো এর যে একটা বিশাল শূন্যতা ছিল তার ভেতর গলে সে বেরিয়ে গিয়েছিল। পুরুষের আদিমতাকে তোমার মানতে হবে, বুঝলে ঈশানা। ঈশানা। ঈশানা শুনছ আমার কথা? পুরুষের আদিমতা, বুঝলে? ঈশানা একটু কেঁপে উঠল। তারপর দেখল সামনের দেয়ালে একটা পোর্ট্রেট- দুটি হাঁস সঙ্গমের জন্য প্রস্তুত। একটা টিকটিকি দ্রুত দৌড়ে সেটার আড়ালে লুকিয়ে গেল! আঙুল তুলে দেখাল ঈশানা- রঙ্গন! ডাক্তার ফুলদানিটা দেখলেন।

তোমার প্রিয় ফুল-প্রথম দিনেই বলেছিলে। তোমার ভালো লাগবে ভেবে সাজিয়েছি। এরপর ঈশানা চোখ মেলে ঘরটা দেখল। বলল, আমার অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ছিল! কোথায়? ডাক্তার প্রশ্ন করলেন ঠিকই, উত্তর নিলেন না। বললেন, আজ আমাদের সিটিং। আমি তোমাকে রিমাইন্ড দিয়েছি। তুমি বললে, তুমি তৈরি হচ্ছ। খুব সম্ভবত তখন তুমি কোনো শাড়ি খুঁজছিলে। ঈশানা বলল, না অন্য কোথাও। তারপর একটু থেমে বলল, এটা খুব সহজ নয় ডাক্তার, পুরুষের আদিমতাকে বোঝা। কারণ আমি পুরুষ নই। আমি যুক্তি দিয়ে যতটা বুঝি, আবেগ দিয়ে তারচেয়ে বেশি। প্রতিদিন সে ভালো আর সে ভালো না- এই বিচার করার জ্বালা আপনি বুঝবেন না। সবাই ভাবে আমি এই সম্পর্কটা থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাই তাই বারবার সে ভালো, না ভালো না বলে চেঁচাই। তাকে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া আমার উদ্দেশ্য নয় কখনো যতটা উদ্দেশ্য নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো। তার প্রতি আমার যে ঘৃণা তা আর একটা পুরুষের দিকে প্রেম হয়ে বয়ে যেতে চাইছে।

ঘৃণা আর প্রেম খুব পাশাপাশি থাকে, জানেন তো। যখন দেখি না সে ভালো- নিজেকে বলি আমি ভালো থাকতে চাই। তার ভালো থাকা তার জন্য যতটা জরুরি আমার জন্য তার চেয়ে বেশি। আর যেটা বলছিলেন, হ্যাঁ সেই প্রত্যাখ্যান ওর ভেতর দ্বিধা তৈরি করেছিল সত্য কিন্তু আমাকে তা বিচিত্র প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। তাহলে কি আমি ধরে নেব, শরীর ছাড়া আমাকে কেউ ভালোবাসবে না? সমর্পণে আমার হাত আর ফাঁকা থাকবে না? কিন্তু কী হলো- সময় আমাকে বুঝিয়ে দিল শরীর দিয়েও কোনো পুরুষকে ধরে রাখা যায় না! যে থাকতে চায় সে কারণ ছাড়াই থাকে। আমি সেদিনটা ভাবতে পারি খুব। আমি ছুটে যাচ্ছি এক শহর থেকে আরেক শহরে। কেন? কারণ আমি হাত খুঁজে পেয়েছি। একটা সুনসান গলি। গলির মোড়ের দোকানে গান বাজছে।

আমার পায়ে হলুদ এক জোড়া জুতো। জুতোটা এত সুন্দর! সে বলল, এটা বাইরে রাখা যাবে না! খুব ক্ষিপ্রতায় তুলে ঘরের খাবারের টেবিলের তলে লুকিয়ে ফেলল সেটা। ভেতরে যখন গেলাম, সমস্ত ফাঁকি! ঘর এত অন্ধকার। অথচ সে বলেছিল তার ঘর আলো দিয়ে ভরা। বলেছিল সব সময় সে তার ঘর গুছিয়ে রাখে। দেখলাম চারপাশে ছড়ানো ময়লা! একটা এটাচ বাথ আছে, সেটাই সে ব্যবহার করে। বাথরুমটা নোংরা আর মাকড়সার জালে ভরা। যখন বললাম কই বলেছিলে এটাই তুমি ব্যবহার করো। সে বলল, হ্যাঁ করি তো। আমি দেখলাম এটার লাইট কাটা। অনেকদিন এখানে আলো জ্বলেনি! সবকিছু কেমন করে মিথ্যে হয়ে যায়- এক এই শরীর পাওয়ার জন্য এত ছল! তাকে বোঝাতাম- দেখ আমি এমন নই। সে বলত, হ্যাঁ সেটাই; তুমি তো কেবল উদারতা দেখিয়ে যাচ্ছ- আমিই খারাপ! তারপর একদিন ফাঁকা রাস্তায় ছেড়ে চলে গেল। তাকে বোঝানো গেল না উদারতা না- আমি ভালোবাসা নিয়ে এসেছি। রাগে এতটাই জ্বলছিল তার পায়ের একটা জুতো ছিঁড়ে গিয়েছিল- সে সেটা ছুড়ে দিয়ে হেঁটে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেল! পেছন ফিরে আর দেখল না। তার জানতেও ইচ্ছে হলো না আমি এবার কীভাবে পৌঁছাব!

এই যে এতদূর এলাম, সব হাঁটা মিথ্যে! একটা মেয়ে এক খোলা বুক দেখেছিল। হ্যাঁ সেও বুঝেছিল তারও শরীর আছে। কিন্তু সে শরীর সে তুলে রেখেছিল সময়ের জন্য। তার কাছে সত্যের ব্যবচ্ছেদকারীর দাম ছিল না। এ তার অসুস্থতা? হ্যাঁ আপনি বলবেন অসুস্থতা। আপনি বলবেন, পুরুষের আদিমতা! কিন্তু ঈশানা তুমি নিজেই বলছ তোমার ভেতরে যে ঘৃণা তার বিপরীতেই রয়েছে ভালোবাসা। আর সেটা অবশ্যই পুরুষের জন্য। না। ভালোবাসা নেই। এখানে কেউ ভালোবাসে না। কারণ আমি যেখানেই যাই আমাকে ওই যোনি বলেই ভাবা হবে। আমি একটি মাংস পিণ্ড। এর বেশি কিছু না। কিন্তু ডাক্তার, যদি পুরুষের আদিমতাকেই বুঝতে হয় তবে নারীরটা নয় কেন? নারী  হিসেবে হাওয়াই আগে আদমকে প্রলুব্ধ করেছিল এবং তারা দুজনেই এরপর একসঙ্গে নিজেদের নগ্নতা সম্পর্কে সচেতন হয়েছিল। শরীর পুরুষের একার ছিল না। একার এখনো নেই। কিন্তু আপনি কি বলতে চাইবেন আমি নষ্ট হয়ে গেছি? পঁচে গেছি? আলুথালু হয়ে গেছি? তবে একই রূপ কেন অন্যজন যাচে? কাকে বলে তবে পুরুষের আদিমতা? ডাক্তার চেয়ে আছেন ঈশানার মুখে। বললেন, কী বলতে চাও তুমি? কিছুই না। দৃঢ় হয়ে উঠল ঈশানার কণ্ঠ। রগগুলো ফুলে উঠল গলার। চোখের পাতা নিশ্চল হয়ে রইল কিছুক্ষণ-পড়ল না। বলল, শুধু এটুকুই, আমার অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ছিল। যাইনি। তার অর্থ এই না আমি কখনো যাব না। আমি চাই এইভাবে একইভাবে একটি কোনো পুরুষ এসে আপনাকে বলুক, নারীর আদিমতা নিয়ে! আমি এখানে আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি এই লজ্জা যার যার! পুরুষের একার, নারীর একার। আর একটা কথা ভালোবাসা এখনো খুব মিষ্টি শব্দ ডাক্তার। যে এর নাগাল পায় সেই খুব সুখী।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / সেপ্টেম্বর ০৩, ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:০১ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com