ঈদের ছুটিতে বেড়িয়ে আসুন খলিফাতাবাদের রাজধানী বাগেরহাট থেকে [ভিডিও]

শনিবার, ২৫ জুন ২০১৬

ঈদের ছুটিতে বেড়িয়ে আসুন খলিফাতাবাদের রাজধানী  বাগেরহাট থেকে [ভিডিও]

ঈদের ছুটিতে বেড়িয়ে আসুন খলিফাতাবাদের রাজধানী  বাগেরহাট থেকে

সিকদার মনজিলুর রহমান


 

 

খান জাহান আলীর সমাধি সৌধ

খান জাহান আলীর সমাধি সৌধ

আসন্ন ঈদ উপলক্ষে প্রধান মন্ত্রী দীর্ঘ নয় দিন ছুটি ঘোষণা করেছে । ঈদের এই লম্বা  ছুটিতে  ভাবছেন মহাস্থানগড় , রাঙামাটি কক্সবাজার  বা অন্য কোথাও যাবেন । একটু পয়সাওয়ালা হলে ভাবছেন সিঙ্গাপুর না হয় ব্যাংকক। এদিক সেদিক তো অনেক স্থান দেখে এসেছেন । একবার কী ঘুরে এসেছেন বাংলার একেবারে দক্ষিণের জেলা বঙ্গোপ সাগরের সৈকতে অবস্থিত সেই মধ্যযুগের ওয়েল ফেয়ার রাষ্ট্র হিসেবে খ্যাত খলিফাতাবাদ বা বর্তমানের বাগেরহাট থেকে ।

যান না একবার ঘুরে আসুন । এখানে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মংলা পোর্ট,বিশ্বের বৃহত্তম ম্যাগ্রোভ বন সুন্দরবন, ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ , খান জাহান আলী (রঃ) এর মাজার  রেজা খোদা মসজিদ  জিন্দা পীর মসজিদ , ঠান্ডা পীর মসজিদ,  সিংগাইর মসজিদ , বিবি বেগুনি মসজিদ , চুনাখোলা মসজিদ , নয় গম্বুজ মসজিদ , কোদাল মঠ , রণবিজয়পুর মসজিদ , দশ গম্বুজ মসজিদ , সুন্দরবন এর করমজল ,  সুন্দরবন রিসোর্ট বারাকপুর ,  চন্দ্রমহল রনজিতপুর ,  প্রস্তাবিত খানজাহান আলী বিমান বন্দর, খুলনা।  এটিও বাগেরহাটের খুলনা মংলার মহাসড়কের ফয়লায় নির্মান হচ্ছে । রামপাল বিদ্যুৎ প্লান্ট আরো কত কী ?

এই জেলায় রয়েছে শতশত বছরের প্রাচীন মঠ, মন্দির, মসজিদ ও সমাধিসৌধ । তবে সে কারনে বাগেরহাট জেলার খ্যাতি জগৎব্যাপী, তা হচ্ছে এখানে রয়েছে সাড়ে পাঁচশ বছর প্রাচীন একটি চিত্তাকর্ষক সমাধিসৌধ এবং একটি নজরকাড়া মসজিদ। এই সমাধিসৌধ ও মসজিদটির নির্মাতা ছিলেন প্রজাহিতৈষী শাসক ও মহান সুফিসাধক খান জাহান আলী (রহ:)। এবার ঈদের ছুটিতে যেসব ভ্রমনপিয়াসী একই সঙ্গে তীর্থ ভ্রমন ও পুরাকীর্তি দর্শনে আগ্রহী তাদের জন্য বাগেরহাট সবচেয়ে আদর্শ জায়গা। খান জাহান আলী (রহ:) প্রথম জীবনে দিল্লিতে উচ্চ রাজপদে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি পনের শতকের গোড়ার দিকে রাজ্য জয়ে দক্ষিনবঙ্গে অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি দক্ষিনবঙ্গের বিশাল এলাকা জয় করে তা তৎকালীন গৌড়ের সুলতান নাসিরুদ্দিন মহমুদ শাহের সম্মানে বিজিত রাজ্যের নাম রাখেন খলিফাতাবাদ। তিনি বাগেরহাটে রাজধানী স্খাপন করে রাজ্য শাসন শুরু করেন। তিনি জীবন শুরু করেছিলেন সৈনিক হিসেবে। দেহত্যাগ করেন সুফিসাধক হিসেবে। তাকে রাজনৈতিক সন্ন্যাসী বলা হতোএ দেশে আসা রাজ্যজয়ী শাসক কিংবা ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসা পীর ফকির ও দরবেশদের মধ্যে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তার চরিত্রে বহু গুনের সমন্বয় ঘটেছিল। রাজ্য শাসন ছিল তার দায়িত্ব, ইসলাম ধর্ম প্রচার ছিল তার কর্তব্য, সুফিসাধনা ছিল তার আধ্যাত্ম, প্রজার কল্যান ছিল তার লক্ষ্য এবং শিল্পসমৃদ্ধ স্খাপনা নির্মান ছিল তার আনন্দ। বস্তত তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত নির্মাতা। সমগ্র দক্ষিনবঙ্গের পথে-প্রান্তরে রয়েছে তার অসংখ্য কীর্তিমাখা নির্দশন। এসব স্খাপত্যকীর্তির কোন কোনটি তাকে জগতজোড়া খ্যাতি দিয়েছে। তাই মানুষ হাতে সময় পেলেই এসব স্খাপনা দেখার জন্য এখানে ছুটে আসে।

বাগেরহাট শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিন-পশ্চিমে এবং খুলনা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দক্ষিন-পূর্বে খান জাহান আলী (রহ:) সমাধিসৌধ অবস্খিত। খুলনা বাগেরহাট মহাসড়ক থেকে ৩০০ গজ দূরে এর অবস্খান। বাস থেকে নেমে এটুকু পথ আপনাকে হেঁটে যেতে হবে। পথের পাশে রয়েছে সারি সারি দোকান। দূর থেকে স্খানটি টিলার মতো উঁচু মনে হবে। ধারনা করা হয় খাঞ্জালি দিঘিটি খননের ফলে যে বিপুল মাটির স্তুপ জমা হয়, তার ওপর এই স্খাপনা গড়ে উঠেছে। এই সমাধিতে প্রবেশের সময় আপনার চোখে পড়বে একটি আকর্ষনীয় উঁচু ফটক। এই ফটক পার হলেই সমাধিসৌধটি দৃষ্টিগোচর হবে। এই সমাধিসৌধের প্রবেশপথ রয়েছে দুটি। পূর্বদিকের প্রবেশপথটি কারুকার্যময়। তবে সব সময় বন্ধ থাকে। দক্ষিনের প্রবেশপথটি সব সময় খোলা থাকে। বর্তমানে এই সমাধিটি খানজাহান আলী (রহ:) মাজার কমপ্লেক্স নামে পরিচিত। এই কমপ্লেক্সের ভেতর আপনি আরও দেখতে পাবেন নজরকাড়া এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি বিশাল মসজিদ ও তাহির ঠাকুরের সমাধি। খান জাহান আলীর (রহ:) সমাধিসৌধের নির্মানশৈলী ও নির্মানসামগ্রী আপনাকে বিস্মিত করবে। এর উপরের অংশটি ইট নির্মিত একটি অর্ধবৃত্তাকার বিশাল গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। চারকোনে চারটি চারটি কুইঞ্চ গম্বুজটির ভার বহন করছে। কুইঞ্চের কোণে ৪টি টাওয়ার রয়েছে। এতে রয়েছে ঘুরানো ত্রিমাত্রিক বাঁকানো কার্নিশ। বৈশিষ্ট্যে তা বাংলার স্বকীয় স্খাপত্য রীতির পরিচয় বহন করে। এই সমাধিসৌধের গোলাকৃতির টাওয়ার, দেয়ালের খালি গাত্রাদেশ এবং খিলানের নির্মানরীতি বাইরে থেকে আগত। সমাধিসৌধের নিচের দিকটি পাথরে নির্মিত। লক্ষ্য করলে দেখবেন বড় বড় খাজ কাটা পাথর দ্বারা তা নির্মিত হয়েছে।

খুলনা-বাগেরহাট লবনাক্ত এলাকা বলে দূরদর্শী খান জাহান আলী (রহ:) সমাধিসৌধের নিচের দিকে যাতে মরিচা না ধরে সে জন্য এমন নির্মানসামগ্রী ব্যবহার করেছেন। সমাধিসৌধের ভেতরে প্রবেশ করলে দেখতে পাবেন খান জাহান আলী (রাঃ) কবরটি কালো পাথরে নির্মিত। তাতে ফার্সি ভাষায় বিভিন্ন উদ্ধৃতি লেখা রয়েছে। ভেতরে মোনাজাতরত বহু ভক্তকেও দেখতে পাবেন। সমাধিসৌধের ভেতরে মহিলাদের প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। তবে এর বাইরে মহিলাদের প্রার্থনা করতে দেখা যায়। এর সমাধিসৌধের পশ্চিমে রয়েছে প্রধান খাদেম তাদের ঠাকুরের সমাধি। আর এর পেছনে সমাধিসৌধের বাইরে রয়েছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি বিশাল মসজিদ। নির্মানকাল ১৪৫০ সাল। এই মসজিদে খান জাহান আলী জুমার নামাজ পড়তে আসতেন। নামাজ শেষে এখানে বিচারকাজ করতেন। খান জাহান আলী এই মসজিদটি ও সমাধিসৌধটি মৃত্যুর (মুত্য ২৫ অক্টোবর, ১৪৫৯ সাল) দশ বছর পূর্বে নির্মান করেছিলেন। সমাধিসৌধটি নির্মান করে তিনি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। রাজ্য শাসন এবং ধর্ম প্রচারের জন্য এ দেশে ব্যক্তিদের মধ্যে এমন দৃষ্টিনন্দন সমাধিসৌধ আর দেখা যায়না। তবে এখানে আসলে যে জিনিসটি আপনাকে মুগ্ধ করবে, তা হচ্ছে একই সঙ্গে কোন মুসলিমকে মোনাজাত করার এবং কোন হিন্দুকে ভক্তি করার বিরল দৃশ্য। সাধকের সমাধি যে জাতিভেদের উর্ধ্বে এবং সব মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধার স্খান এই দরগায় আসলে তার চাক্ষুষ প্রমান পাবেন।

খান জাহান আলীর (রহ:) সমাধিসৌধ দেখা শেষে আপনি চলে আসুন এখান থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমে ষাট গম্বুজ মসজিদ চত্বরে। ভ্যান বা রিকশায় চেপে গেলে সময় লাগবে ১৪/১৫ মিনিট । কোস্টার চেপেও আসতে পারেন। বাগেরহাট -খুলনা মহাসড়ক থেকে ২০০ গজ দূরে উত্তর দিকে এই অতি প্রাচীনর দৃষ্টিনন্দন মসজিদটির অবস্খান। তিনি আনুমানিক ১৪৫০ সালে এই মসজিদটির নির্র্মান করেন। তিনি দিল্লি থেকে যেসব দক্ষ কারিগর সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন, তাদের দ্বারাই এই অপূর্ব মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। এতে ব্যবহৃত পাথর তিনি বহু দূর দেশ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। এই মসজিদটি নির্মান করতে সময় লেগেছিল প্রায় ২০ বছর। এই মসজিদটি বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম স্খাপত্যের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরন। এই মসজিদটি খান জাহানের অমরকীর্তি। এর নির্মানশৈলি আপনাকে মুগ্ধ করবে। সাধারনত এই মসজিদকে ষাট গম্বুজ মসজিদ বললেও এতে রয়েছে মোট ৮১ টি গম্বুজ। এসব গম্বুজ ও ছাদের ভার বহনের জন্য মসজিদের মসজিদের ভেতরে রয়েছে ৬০ টি স্তম্ভ। পাথরের বড় বড় টুকড়া দিয়ে এই স্তম্ভগুলো নির্মান করা হয়েছে। সংস্কারের ফলে এখন এই পাথরগুলো দৃষ্টিগোচর হয় না। একটি অনুচ্চ প্রাচীর দিয়ে এই মসজিদটি ঘেরা। ভেতরে সবুজ লন ও ফুলের বাগান দেখতে পাবেন। মসজিদের মূল প্রবেশপথটিও বেশ আকর্ষনীয়।আশির দশকে ইউনেস্কো এই মসজিদটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষনা করে। এই অসামান্য সৌন্দর্যময় মসজিদটি দেখার জন্য প্রতিদিন দেশি-বিদেশীদের ভিড় লেগে থাকে।

প্রতিদিন অসংখ্য বাস মতিঝিল, গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে বাগেরহাট -খুলনা যাতায়াত করে। বাগেরহাট যাওয়ার দুটি পথ রয়েছে। অন্যটি ঢাকা মাওয়া হয়ে। এসি/নন এসি ও সাধারন কোচ সব ধরনের বাসই পাবেন।

বাগেরহাটে ফাইভ স্টার মাপের কোন হোটেল না থাকলেও রাহাত,  মমতাজ, সাগরিকা, সালামত,  আল আমিন প্রভৃতি স্থানীয় ভাবে গড়ে ওঠা অনেক হোটেল রয়েছে । যেখানে আপনি রাত্রীযাপন করতে পারবেন । আগেভাগে যোগাযোগ করলে বাগেরহাট ডাকবাংলোতেও লজিং করতে পারেন ।  মাজার কমপ্লেক্সেও থাকার মতো বাসা ভাড়া পাওয়া যায় । এছাড়া দরগার এলাকায় ফকিররা সামান্য দক্ষিণার বিনিময়ে সাধারন ভক্তদের বাসায় থাকার ব্যবস্খা করেন। মংলা বন্দর সংলগ্ন বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত পর্যটন হোটেল আছে পরিবার নিয়ে সেখানেও থাকতে পারেন। বেশিরভাগ দর্শনাথী খুলনা থেকে বাগেরহাটে পুরাকীর্তি দেখতে আসেন। কারন খুলনায় থাকা-খাওয়ার ভাল মানের অসংখ্য হোটেল রয়েছে। খুলনা থেকে বাগেরহাট আসতে সময় লাগে মাত্র একঘন্টা। এছাড়া নিজস্ব পরিবহন থাকলে তো কথাই নেই।

 বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দরঃ মংলা বন্দর

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দরঃ মংলা বন্দর

বাড়তি পাওনা , বাগেরহাটে গেলে মংলা পোর্টও যেতে পারেন । একবারে বঙ্গোপসাগর সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি । এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর । মংলা গেলে সুন্দরবন আর বাকী থাকবে কেন ? পরিবারপরিজন নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন থেকে । জাতীয় উদ্যান সুন্দরবনে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, সাপ, বানর ,কুমির, বন মোরগ আরো কত কী নানান জাতের জীব জানোয়ার । তাদের বন্যজীবন আপনি স্বচক্ষে দেখে আসতে পারেবেন ।

কী খাবেন !  বাগেরহাটে নারকেল পাওয়া যায় । আর ঘের জুড়ে বাগদা , গলদা চিংড়ি । সেটিও সংগ্রহ করতে পারেন । অর্ডার দিয়েও রান্না করাতে  পারেন নারকেল এর দুধ দিয়ে মজাদার শ্রীম কারী । সবচেয়ে বড় পাওনা ষাটগম্বুজ মসজিদে নামাজ পড়ার সৌভাগ্য ক’জনার হয় । ভাবতে পারেন একটি স্থাপত্য ৬০০ বছর ধরে অক্ষুন্ন আছে এবং সেই খান জাহান যিনি সব কিছু দিয়ে সাধারণ মানুষের বেশে আজও সেই মাটিতে শুয়ে আছে। আজও সেই মহান শাসক এবং ওলী – যার কথা স্মরণ করে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে স্খানীয় মানুষ শ্রদ্ধা,ভক্তি আর ভালবাসায় বিগলিত হয়ে যায় । যান না একটু দেখে আসুন , ঘুরে আসুন প্রত্নতাত্তিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাগেরহাট থেকে । আমার জন্মস্থান বলে বলছি না, সত্যিই আপনার ভাল লাগবে ।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / জুন ২৫ , ২০১৬

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:০২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৫ জুন ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com