ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি কী এবং তা কীভাবে কাজ করে?

সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২০

ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি কী এবং তা কীভাবে কাজ করে?
ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি কী এবং তা কীভাবে কাজ করে?

বিশ্বে আমেরিকাই একমাত্র দেশ যেখানে দেশের জনগণ সরাসরি বা প্রত্যক্ষ ভোটে তাদের সাংসদ, মেয়র, গভর্নর, স্টেট সাংসদ, এ্যাটর্নী জেনারেল, কোর্ট ক্লার্ক সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারী অফিসারদের নির্বাচিত করতে পারলেও সরাসরি তাদের দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে পারেননা!তারা মূলত নিরাচিত করেন ইলেক্টোরাল কলেজ নামে পরিচিত এক দল কর্মকর্তাকে যাদের পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন দেশের প্রেসিডেন্ট! আর এই ইলেকটোরাল কলেজ ভোট সিস্টেম কিভাবে কাজ করে সেটা নিয়ে বিশ্বব্যাপি মানুষের কৌতুহলের অন্ত নেই!

আসুন জেনে নেয়া যাক এই পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু বিষয়ঃ


আমেরিকার ফাউন্ডারগন ১৭৮৭ সালে ফিলাডেলফিয়ায় কন্সটিটিউশনাল কনভেনশনে সংবিধানে এই ধারাটি সংযোজন করেন যেনো জনগন কোনভাবে ভুল কাউকে মানে অযোগ্য কাউকে নির্বাচিত করে বসলে যেনো সেটা সংশোধনের আরেকটা ধাপ থাকে! সংবিধানের আর্টিকেল দুই, সেকশন ১, ক্লোজ ২ এ এই বিধানটি সংযুক্ত আছে!

মোট ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটের সংখ্যা হলো ৫৩৮ টি, এই সংখ্যা নির্নয় খুব সহজ! আমেরিকা মোট ৫০টি স্টেটের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা! এখানকার সংসদে দুটি কক্ষ আছে, সিনেট বা উচ্চকক্ষ যাদের প্রতিটা সদস্যকে সিনেটর বলে এবং হাউজ অফ রিপ্রেজেনটিটিভ বা নিম্নকক্ষ যার প্রতিটা সদস্য কে ইউএস কংগ্রেসম্যান বলে ডাকা হয়! সংসদে মোট ইউএস সিনেটর আছে প্রতিটা স্টেটে দু জন করে মোট ১০০ জন, আর হাউজে কংগ্রেসম্যান আছে মোট ৪৩৫জন, তবে সিনেট সদস্য সংখ্যা প্রতিটা স্ট্রেটে সমান হলেও কোন রাজ্যের কতজন কংগ্রেসম্যান হবেন সেটা নির্ভর করে ওই রাজ্যের জনসংখ্যার ওপর, সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে ফলে এই রাজ্যে প্রতিনিধির সংখ্যাও সর্বোচ্চ, ৫৫, তবে কোন রাজ্য থেকে কতজন ইলক্টর নির্বাচিত হবেন তার উদাহরণ হিসেবে বলা যায়; যেমন মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্য আছেন দুজন সিনেটর এবং ৮জন কংগ্রেসম্যান সেহিসেবে এই রাজ্যে মোট ইলেকটোরাল কলেজ ভোটও মোট ১০টি। এই সংখ্যানুপাতটিই ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটের সংখ্যা নির্ধারনে ব্যাবহার করা হয়, সে হিসেবে্মোট ৫৩৫জন ইলেক্টর নির্বাচিত হয় ৫০টা স্টেট থেকে; তার সাথে যুক্ত হয় রাজধানীর সংখ্যাটা (৩)! উল্লেখ্য যে আমেরিকার রাজধানীর নাম ওয়াশিংটন ডিসি! সিটির নাম ওয়াশিংটন আর ডিসট্রিক্টের নাম ডিসট্রিক্ট অব কলোম্বিয়া, এটা কোন স্টেটের অধীনে পরেনা সেকারনে এদের কোন সিনেটর বা কংগ্রেসম্যান নেই তবে জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে এখানে ৩ জন ইলেকটোরাল কলেজ ভোটার নির্বাচিত হোন সেটা ধরলে মোট সংখ্যাটা হয় মোট ৫৩৮! মোট ইলেক্টোরাল ভোটের অর্ধেক অর্থাৎ ২৬৯ পেলেই জয়ী হয়ে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার কথা কিন্তু মেইন এবং নেভাস্কা অঙ্গরাজ্যের ব্যাতিক্রমী নিয়মের কারনে তাদের দুটির একটি নিয়ে যেকোন প্রার্থীকে মোট ২৭০টি ভোট পেতে হয় নির্বাচিত হবার জন্য!

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন প্রার্থীরা সারা দেশে ভোটারদের কাছ থেকে যেসব ভোট পান সেগুলোকে বলা হয় পপুলার ভোট এবং ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটকে বলা হয় ইলেক্টোরাল ভোট। এই ইলেক্টোরাল কলেজ বডিগুলি প্রতি চার বছর পর পর আমেরিকার প্রধান দুইটি দল ডেমোক্রেট এবং রিপাবলিকান দল থেকে নির্বাচিত হয় শুধু মাত্র দেশের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট কে নির্বাচিত করার জন্য! যখন তাদের নিয়োগ করা হয় তখন তারা কমিট করেন যে তাদের স্ট্রেটে যে প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তাকেই তারা নির্বাচিত করবেন! আর ইলেকটোরাল কলেজ ভোটার নির্বাচিত করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার দল তবে অঙ্গরাজ্য ভেদে এই নিয়ম আলাদা আলাদা! এরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থী বা দলের প্রতিনিধি হলেও নিয়ম হলো যে রাজ্যে যে প্রার্থী বা দল সংখ্যাগরিষ্ঠ পপুলার ভোট পাবে সে রাজ্যের সব ভোট সেই প্রার্থী পাবে! উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টেক্সাস রাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী যদি ৫০.১% ভোট পান, তাহলে ওই রাজ্যের ৩৮টি ইলেকটোরাল ভোট তাদের পকেটেই যাবে। অন্যভাবে বলা যায় মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ১০ জন ইলেকটরের ৬ জন হয়ত ডেমোক্রেট এবং ৪ জন রিপাবলিকান দলের কিন্তু ভোট দেবার সময় নিয়মানুযায়ী সবাইকে বিজয়ী প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে! তবে এ ব্যাতিক্রমও হয়। যেমন প্রথা ভেঙ্গে নজিরবিহীন ভাবে ২০১৬ সালের নির্বাচনে ৭ জন ইলেকটর নিয়ম ভেঙ্গে ব্যালটের বাহিরের প্রার্থীকে ভোট দেন! তার মধ্যে কলিন পাওয়েল কে তিনজন, বার্নী স্যান্ডার্স, জন ক্যাসি, রন পল ফেইথ স্পটেড ঈগল এক জন করে ইলেক্টোরাল ভোট দেন! যারা তাদের প্রমিজ ভেঙ্গে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেয়, তাদের কে ফেইথলেস ইলেকটর বলে ডাকে জনগন! ৩৩টা স্টেট এবং ডিসট্রিক্ট অব কলোম্বিয়াতে আইন করে এই নিয়ম পালনে বাধ্য করা হয় এবং কিছু স্ট্রেটে আইন আছে সেখানে এরকম করলে তাকে মাইনর শাস্তির মুখামুখি হতে হয়! তবে সুপ্রিমকোর্ট একবার এটাকে আইন করে বাধ্যতামূলেক করতে রুল ইসু করেছিলো কিন্তু এতেকরে ইলেক্টোরদের ইচ্ছেমত ভোটদানের স্বাধীনতা খর্ব হবে বলে তা কার্যকর হয়নি!

তবে যদি টাই হয় অর্থাৎ দুই প্রার্থীই যদি সমান সংখ্যক ভোট পায় সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গড়ায় কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ অর্থাৎ হাউজে! এক্ষেত্রে কমগ্রেসের নিম্ন কক্ষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করলেও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন উচ্চ কক্ষ বা সিনেট! এরকম একবারই ঘটেছিলো ১৮২৪ সালে এবং কংগ্রেসের ভোটে জন এ্যাডাস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন!

এই জটিল সমিকরনের কারনে কোন প্রার্থী পপুলার ভোট বেশী পেয়েও নির্বাচিত হতে পারেন না প্রয়োজনীয় সংখ্যাক ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট না পাবার কারনে! সে কারনে প্রার্থীকে হিসেব করেই আগাতে হয়! সবচেয়ে বেশী ইলেক্টোরাল কলেজওয়ালা যেমন ক্যালিফোর্নিয়া (৫৫) তেমনি ছোট ছোট আটটির বেশী স্টেটে মাত্র তিনটি করে ভোট থাকে, কাজেই হিসেবটা সেরকমই হতে হয়!

প্রতি চার বছর পর পর নভেম্বরের প্রথম মঙ্গলবার সাধারন ভোট অনুষ্ঠিত হলেও ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটাররা বসে তাদের ভোট প্রদান করেন এবং জানুয়ারীর ২০ তারিখ নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নেয়ার মধ্যদিয়ে দায়িত্বভার গ্রহন করেন।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ নভেম্বর ০৯, ২০২০

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৪:০৬ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com