ইরানের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ

শনিবার মুক্তমঞ্চঃ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী না।

শনিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২০

ইরানের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ
ইরানের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধঃ মাহমুদুল খান আপেল

Muktoবিগত কয়েক বছর ইরানের ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে বীর দর্পে এগিয়ে চলার পিছনে মূল ভূমিকা ছিলো যার, তিনি কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সুলাইমানী, ইরানের টপ সিকিউরিটি এন্ড ইন্টেলিজেন্স কমান্ডার, যে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামিক রেভোলুশনারী গার্ডস কর্পস এর কুদস ফোর্স এর নেতৃত্ব দিতো, তিনি গতকাল ইরাকের বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িতে করে বের হবার পথে আমেরিকার একটি এমকিউ-৯ র্যাপার ড্রোন (আনম্যান এয়ারক্র্যাফট) হামলায় নিহত হোন, তার সাথে ইরান ব্যাকড ইরকি সেনাবাহিনীর আরও কিছু মিলিটান্ট ছিলো যারা প্রায় সবাই নিহত হয়।

আমেরিকার ভাষায় বিগত দুই দশক ধরে ইরানের ইন্টেলিজেন্স এন্ড মিলিটারী ফোর্সের সব স্ট্রাটিজিক/গরুত্বপূর্ণ অপারেশনের কারিগর ছিলেন জেনারেল সুলাইমানী। জেনারেল সুলাইমানী খুব সক্রিয়ভাবে নিজে পরিকল্পনা করে আমেরিকার বিভিন্ন স্থাপনা, মার্কিন কূটনৈতিক । তার সুদক্ষ নেতৃত্বে এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তার কারণে প্রায় সারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে এসেছে। সেকারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে ছিলো সৌদি আরব।।


বিগত ৭/৮ বছর ধরে চলা সিরিয়া যুদ্ধের পরও আসাদ টিকে আছে শুধু তার বুদ্ধিমত্তার কারণে। ইসরাঈলও ছিলো বেকায়দায়। আমেরিকার প্রধান শত্রু এবং টার্গেটে পরিণত হলেও আমেরিকা পরিস্থিতে পর্যবেক্ষণে রেখেছিলো এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো। তবে অনেককের ধারণা জেনারেল সুলাইমানীকে হত্যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তেহরানের বিরুদ্ধে সিরিজ একশনের অংশ। আবার অনেকে বলছে গত ডিসেম্বরে ইরাকে আমেরিকান এক কন্ট্রাক্টরের হত্যার প্রতিশোধ স্বরূপ এই হামলা। অনেকের হয়তো মনে আছে কিছুদিন আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমোদন দিয়ে আবার সেটা বাতিল করে। সেটা নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে, যুদ্ধবাজ বোল্টনকে সেই অভিযোগে সরে যেতে হয়েছে। আমেরিকার সেই সরে আসা ছিলো এক কৌশল। বর্তমান টেকনোলজির যুগে একান্ত বাধ্য না হলে স্বশরীরে যুদ্ধের প্রয়োজন পড়েনা। বিশেষ করে ড্রোনে স্ট্রাইক টেকনোলজি এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এর মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে ট্র্যাক করে আমেরিকার লাজ ভেগাসে বসে বোতাম চাপিয়ে বিশ্বের যে কোনো স্থানে যেকোনো সময় হামলা করা সম্ভব। আমেরিকা চাইলে হয়তো অনেক আগেই তাকে হত্যা করতে পারতো, তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এই সময় কেন? এখানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কিছুটা যোগসাজশ থাকতে পারে। কিছুদিন থেকেই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বেশ উত্তপ্ত। প্রেসিডেন্ট কে কংগ্রেস এর নিম্ন কক্ষে ইমপিচ করা হয়েছে। এখন সেটা সিনেটে অর্থাৎ উচ্চ কক্ষে শুনানির জন্য পাঠানোর কথা। তবে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান দলের সংসদ নেতা সরাসরি কোনো রাখঢাক না করে প্রেসিডেন্ট এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাই নিম্ন কক্ষের হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ইমপিচমেন্টের পাশ হওয়া আর্টিকেল সিনেটে সুবিচার না পাবার আশংকায় সেখানে না পাঠিয়ে ধরে রেখেছেন। এই মুহূর্তে যেহেতু সিনেটে প্রেসিডেন্টের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, কাজেই তারা কোনো ধরনের শুনানি না করেই আর্টিকেলটি সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে বাতিল করে দিতে পারে। কিন্তু সেটা ধরে রাখার কারণে শুরু হয়েছে জটিলতা। এদিকে সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কিছু ইমেইলে ইমপিচমেন্ট এর অভিযোগের সত্যতার প্রমান মিলেছে। যেকারণে ইতিমধ্যে দুই জন রিপাবলিকান দলের সিনেটর ইমপিচমেন্ট আর্টিকেল এর উপর শুনানির দাবি জানিয়েছেন। সেটা রিপাবলিকান শিবিরে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। এভাবে একের পর এক প্রমান বের হতে থাকে তাহলে অনেক সিনেটরই বাধ্য হবে তাদের অবস্থান পাল্টাতে কারণ আসছে নভেম্বর নির্বাচনে তাদেরকে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে, সেক্ষেত্রে জনমত যদি ইমপিচমেন্টের পক্ষে যায়, তাহলে তাদের পক্ষে নির্বাচিত হয়ে আসা কঠিন হবে।

এরকম পরিস্থিতে রাজনীতির মোড় ঘোরানো দরকার, তাই হঠাৎই শান্ত মধপ্রাচ্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগে ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইরকি কুর্দ ফোর্সের উপর আমেরিকার এয়ার স্ট্রাইকে ব্যাপক ক্ষতি হয়, নিহত হয় অসংখ্য মিলিট্যান্টস। এর প্রতিশোধ নিতে তারা ইরাকে অবস্থিত আমেরিকান দূতাবাসে বেনগাজি স্টাইলে হামলা করে বসে। কয়েকদিনের বন্দি অবস্থা থেকে দূতাবাসকে মুক্ত করতে আমেরিকার একদল মেরিন সেনা এগিয়ে আসে এবং দূতাবাস কে হামলাকারীদের হাত থেকে মুক্ত করে। ধারণা করে হয় যে এই হামলার পেছনেও হাত ছিলো জেনারেল সুলাইমানীর।

দূতাবাস মুক্ত হবার পরেরদিনই জেনারেল সুলাইমানী ইরাকের বাগদাদে আসেন, আর সেই সুযোগটিই কাজে লাগায় আমেরিকা। সে ইরানের ভিতরে না থাকলে হয়তো এমনটি ঘটতো না। তবে জেনারেল সুলাইমানী কে হত্যা এক ভয়ঙ্কর পদক্ষেপ যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচের অবস্থা ভয়াবহ সংঘাতের দিকে যাবে সেটা বলাই যায়। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরাকের সব মার্কিন নাগরিকদের সেদেশ ত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল কমিটি কাশেম সুলাইমানীর হত্যাকে সমর্থন জানালেও কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়ে এমন অঘোষিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি উদ্বেগের সাথে দেখছে। কংগ্রেসের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মিশিগানের ফোরটিন্থ ডিস্ট্রিক এর কংগ্রেসম্যান এন্ডি লাভিং এক ফেইসবুক বার্তায় এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ইরানের নেতারা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বে এক জরুরি বৈঠক শেষে তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছে এবং বলা হয়েছে তিনদিনের শোক শেষ হলে প্রতিশোধ নেয়া হবে।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / জানুয়ারি ০৪,২০২০

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:০৭ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com