ইমাম আকুনজি ও তারা মিয়া হত্যায় সর্বোচ্চ সাজা ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষের প্রভাব পড়েনি ন্যায়বিচারে

শনিবার, ৩১ মার্চ ২০১৮

ইমাম আকুনজি ও তারা মিয়া হত্যায় সর্বোচ্চ সাজা ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষের প্রভাব পড়েনি ন্যায়বিচারে

 

নিউইয়র্কঃ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের অনেকে বেশ কিছু বিষয়ে ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন। ছয় মুসলিম দেশের নাগরিকদের আমেরিকা ভ্রমণে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। ফলে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি ইমাম আলাউদ্দিন আকুনজি ও তারা মিয়া হত্যা মামলার রায়ে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন। তবে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কোনো নেতিবাচক মনোভাবেরই প্রভাব পড়েনি এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ে। এই দুজনকে হত্যার দায়ে অস্কার মুরালকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন নিউইয়র্কের আদালত। ফলে তাঁকে বাকি জীবন কারাগারেই কাটাতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২৩ মার্চ দুপুরে নিউইয়র্কের কুইন্স ফৌজদারি আদালতের ১২ সদস্যের জুরি বোর্ড ও এক বিচারক চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আসামি মুরাল খুনি প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ মাত্রার খুনি হিসাবে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত। সেই হিসেবে তাঁর সর্বোচ্চ কারাদণ্ড হবে।
নিউইয়র্কের শীর্ষ দৈনিক নিউইয়র্ক ডেইলির এক খবরে বলা হয়, আগামী মাসের মাঝামাঝি আকুনজি ও তারা মিয়া হত্যা মামলার চূড়ান্ত সাজা ঘোষণা করবেন আদালত। চূড়ান্ত রায়ে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আদালতের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১৫ এপ্রিল দণ্ড ঘোষণা করা হবে।
সর্বোচ্চ এই রায়ে, সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিকেরা। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই বিচারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আইন, ন্যায়বিচারের প্রতি নতুন করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন অনেকেই। ইসলামিক টিভি ইউএসএর প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বেশ কিছু বিষয়ে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। তাতে মুসলিমরা অনেকটা অনাহূত মনে করতে শুরু করেছিলাম এই দেশে। অথচ এই দেশটিকে আমরা আমাদের মনের মধ্যেই স্থান দিয়ে ফেলেছি। মনে মনে উঁকি দিচ্ছিল, হয়তো প্রেসিডেন্টের ইসলাম বিদ্বেষ বিচারাঙ্গণেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু ইমাম আকুনজি ও তারা মিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচারে যেভাবে সর্বোচ্চ শাস্তি ঘোষিত হয়েছে, সেটাতে এটিই প্রমাণিত হয়েছে—আমেরিকা ন্যায়বিচারের দেশ। এখানে অন্তত রাষ্ট্রীয়ভাবে দাঁড়ি-টুপির অবমাননা হয় না। আমরা খুবই খুশি এবং কৃতজ্ঞ।’


নিউইয়র্কে অবস্থিত বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অন্যতম বৃহৎ ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুমের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইয়ামিন হোসাইন বলছিলেন, ‘আমি মনে করি বিচার বিচারের মতোই হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তি না হলে একটা ধারণা তৈরি হতো, আমেরিকায় অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। এই রায় তার প্রমাণ করেছে, অপরাধ করলে আমেরিকার মাটিতে শাস্তি পেতেই হবে। কোনো জাত-ধর্ম ও পরিচয়বোধ তাঁকে রক্ষা করতে পারবে না। এখানে বিচার বিভাগ যে সবার জন্য ন্যায়বিচার করে সেটা প্রমাণিত হলো। এ রকম ঘটনা যেন আর ভবিষ্যতে না ঘটে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে হবে’।
২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট নিউইয়র্কের ওজোন পার্কে দুর্বৃত্তের গুলিতে ওই এলাকার আল-ফোরকান মসজিদের ইমাম আলাউদ্দিন আকুনজি (৫৫) ও তাঁর সহযোগী মুসল্লি তারা মিয়া নিহত হন। স্থানীয় লিবার্টি অ্যাভিনিউয়ের ৮০ স্ট্রিটে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিউইয়র্কের অন্যতম বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা ওজোন পার্ক। প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশির এই এলাকায় বসবাস করেন। এখানেই বাস করতেন আল-ফোরকান মসজিদের নিহত ইমাম আলাউদ্দিন আকুনজি ও বৃদ্ধ তাঁরা মিয়া।
তাঁরা মিঞা ছিলেন ইমাম আলাউদ্দিন আকুনজির প্রতিবেশী। প্রতিদিন তাঁরা দুজনে একসঙ্গে মসজিদে যেতেন। ইমাম মাওলানা আকুনজির বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জে আর মুসল্লি মরহুম মুহাম্মদ তারা মিয়ার বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গাহাটা গ্রামে। চার বছর ধরে ইমাম আকুনজি আল-ফোরকান মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম কোনো মুসলিম ইমাম হত্যার ঘটনা।
এমন একটি হত্যাকাণ্ডে সর্বোচ্চ রায় দিয়েছেন বিচারক। আগামী ১৫ এপ্রিল আবার সাজা ঘোষণা করার কথা রয়েছে। এ দেশের আইনে যেহেতু ফাঁসির ব্যবস্থা নেই, তাই অন্য সর্বোচ্চ শাস্তিই পাবেন অস্কার মুরেল। আদালতে তার বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ দিয়েছেন তদন্তকারীরা। তবে আইনজীবীর মাধ্যমে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সাজা ঘোষণার পর আপিলের সুযোগ পেতে পারেন অস্কার মোরেল।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ৩১ মার্চ , ২০১৮

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:৫৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ৩১ মার্চ ২০১৮

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com